মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

molina

সে একজন মা। একজন কারুর স্ত্রী, একজন কারুর মেয়ে, একজন কারুর বোন। এবং মা। এইসব পরিচয় তৈরি হয় সমাজে। তারপর সারাজীবন সেই ছাপ্পা গুলো নিয়ে চলতেই হয়। সেটাই দস্তুর।

হ্যাঁ মাতৃত্বের আনন্দ আছেই । আনন্দটুকুকে এতটুকুও খাটো করছিনা। অনন্ত সুখের পিন্ড আছে সন্তানে। কিন্তু তারপরেও থাকে অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা।

প্রথম যেদিন সে মাতৃত্বের রণডংকা বাজতে শুনেছিল, সেদিন ছিল তুমুল দুর্যোগের দিন। বিবাহিত জীবনের মোটে আট কি ন মাসের মাথায় সেই দিন।

তার আগে সে তার বরকে, যৌন সঙ্গমের সময়েও , নানা বিধিনিষেধের মধ্যে রেখে, নিজের গর্ভাধান আটকানোর চেষ্টা করেছে। তার বরও কিছু কম শিক্ষিত পরিশীলিত নয়। সে নিজেও চাইত না বিয়ের পরের রাত্তিরেই বউকে প্রেগনেন্ট করার মত “নীচকর্ম” করতে। যেটা তার অনেক বন্ধু করেছে, এবং আড়ালে খিঁকখিঁক হেসেছে তারা , এরা সব ফার্স্ট নাইট কেস।

শিক্ষিত স্বামী হবার নাতে, স্ত্রীর সঙ্গে বসে ক্যালেন্ডার দেখে সংসর্গ ঠিক করেছে। দু হাজারের দম্পতি তারা।

বহু স্ত্রীর এই সৌভাগ্য হয়না সে জানে। সে দিক থেকে তার কোন আপশোস অভিযোগ নেই স্বামীর প্রতি।

সেটা অন্য গল্প, যে তথাপি অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়া থাকে, এবং ঘটিলে তাহা “ঈশ্বরের দান” হিসাবে মানিয়া লইতে হয়।

অ্যাক্সিডেন্ট ঘটল এবং পিরিওড মিস হল। সে দেখল, মুহূর্তে পৃথিবীর রঙ পালটে পাটকিলে, ধোঁয়াটে এবং অসম্ভব ক্লান্তিকর হয়ে গেল তার কাছে। গুরুভার হয়ে উঠল জীবন।

কিন্তু সে তো তার নিজের কাছে। অফিসে একটা নতুন অ্যাসাইনমেন্ট। সেটাতে দক্ষতা দেখাতে পারবে না , ভেবে বসের কাছে কুঁকড়ে যাওয়া। শরীরের নানা আশ্চর্য নতুনত্বের ঝড় , তাকে বহন করার জন্য দক্ষতা অর্জন। সব ছিল কার্যক্রমে। প্রথম তিনমাসের অসম্ভব গা গুলনো এবং আর যা যা হয়ে থাকে।  সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘর থেকে আসা এমনকি সাদা পটল আলুর ছেঁচকির সেই সম্বর দেবার গন্ধেও অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসতে থাকছিল তার।

এইসব পেরিয়ে সে দেখল, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যার পুরাতন, আদিম, প্রাচীনতম খেলা শুরু। শ্বশুর এবং শাশুড়ি আনন্দে আটখানা। অন্য সবকিছু গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা থাকলেও, সন্তানসম্ভাবনা একধরণের প্রোমোশন।

ভয়ানক পরিশীলিত এবং বাঙালি ভদ্রলোকের এপিটোম তার শ্বশুরমশাই হঠাৎ বসবার ঘরে সবার সামনে আবেগ থরথর কন্ঠে প্রায় আবৃত্তির ঢঙে বলে ফেললেন, প্রথমে সে তুমি ছিলে কন্যা। তারপর স্ত্রী হলে। এখন হবে মা। নারীত্বের সম্পূর্ণতাই তো মাতৃত্বে। তোমার পদোন্নতি হল। জীবনের সর্বোচ্চ ধাপে উঠে গেলে তুমি।

তার শাশুড়ি কেমন ভয়ানক গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন তাঁকে। প্রায় যা পুলিশি খবরদারির মত দেখায়!

একমাত্র আনন্দ জন্মেছিল তিনমাসের মাথায় প্রথম সোনোগ্রাফির দিনে, অপরিচিত এক নতুন ধুকপুকুনির শব্দ ডাক্তার যখন শোনালেন, আর সোনোগ্রাফির স্ক্রিন তার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন কী ভীষণ দৌড়চ্ছে আপনার বাচ্চা জলের ভেতর। মাছের মত ঘাই মারছিল একটি ছায়া। সেই ছায়াকেই ভালবাসল সে। মুখহীন এক শিশু।

সন্তানটির আসার আগে, সকলের ফুর্তি আর পুলক তাকে খুবই বিচলিত করলেও, সে মেনে নিল মাসে একবার করে ডাক্তার দেখিয়ে আসা।

তারপর, মেনে নিল সবার তার ওপরে নানা খবরদারি। এটা করবে না ওটা ধরবে না। এভাবে শোবে না, ওখানে বসবে না। কিচ্ছু বাইরের খাবে না।

ফুচকা চুরমুর চিকেন রোল আদি দীর্ঘ কয়েক মাসের জন্য বন্ধ হল।

তারপর সেই মহা মুহূর্ত। সে ঢুকে গেল ভীত চকিত এক স্ফীতোদর শরীর নিয়ে, নার্সিং হোমের গর্তে। সেই রাতেই তার যৌনকেশ ব্লেড দিয়ে শেভ করতে করতে বয়স্কা নার্স বললেন অমোঘ বাণীঃ মেয়েদের এই এক জ্বালা। যতই পড়ো আর যতই বড় চাকরি কর, এর থেকে নিস্তার নেই।

সাতদিনের নার্সিং হোম বসবাসে সে দেখে শুনে বুঝে ফেলল সন্তানজন্ম নিয়ে আয়াদের উল্লাস, নতুন শাড়ি পাওয়ার আশ্বাস। চোখে মুখে অশ্লীল ভঙ্গি করে কত না রসিকতা, সন্তানজন্মের গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে। দাদার এবার একতলায় ঢোকা বন্ধ, দোতলায় নতুন ভাড়াটে এসেছে। হি হি।

স্বামী তো অদ্ভুত আচরণ করছে, সে দেখল।  অপারেশনের দিন দেখতে এল,  তারপর কেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে , অন্যমনস্ক হয়ে, কেমন যেন উদাসীন, বাড়ি চলে গেল, একটু মিষ্টি কথাও না বলে। গলা আটকে এল কান্নায় , মেয়েটির। বাচ্চাটা আমাদের দুজনের তো। তাহলে কেন আমাকেই শুধু থাকতে হবে ঠান্ডা সাদা এই নার্সিং হোমটায়। আর তুমি ভিতু আত্মীয়ের মত, অসুস্থা গিন্নিকে দেখে কাষ্ঠ হাসি হেসে চলে যাবে, তারপর পরদিন বলবে, সারা সন্ধে ছেলে বন্ধুরা তোমাকে ঘিরে রেখেছিল মালের আড্ডায় , কেননা, বাচ্চা হলেই গিন্নির প্রেম চলে যাবে, সব অ্যাটেনশন কেন্দ্রীভূত হবে বাচ্চার দিকে, তাই একলা হয়ে যাবে স্বামী, এই ভয়ে সে পারছিল না একা একা সন্ধেটা কাটাতে।

অপারেশনের দিনের সেই ধক করে নাকে আসা ক্লোরোফর্মের গন্ধ আর তার আগের মুহূর্ত অব্দি ডাক্তারদের হাসাহাসি, অ্যানেস্থেটিস্টের নানা টুকরো কথা, এ বাবা, পেশেন্ট অ্যাতো ফ্যাকাশে কেন, ব্লাড কাউন্ট দেখি তো!  আর গোটা ব্যাপারটার প্রবল শীত-করা প্রাইভেসিহীন নিশ্ছিদ্র নৈর্ব্যক্তিক একটা পরিবেশে দম আটকে এসেছিল তার। উলঙ্গ সে এক বিটকেল পিঠখোলা হাস্পাতাল সবুজ মোটা কাপড়ের জামার তলায়। এই বোধ এসেছিল। তলপেট উন্মুক্ত করে তাকে কেটেকুটে বাচ্চাকে বার করবে পুরুষ ডাক্তার, অন্তত আজকের জন্য স্বামীর চেয়ে সে বেশি প্রিভিলেজড, ভাবতে গিয়ে অসংখ্য গোল গোল জোরালো আলোর বৃত্ত দেখতে দেখতে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।

জ্ঞান ফিরেছিল চাপ চাপ অনির্দেশ্য ব্যথায়। অবশ হয়ে আছে সারাটা তলপেট অঞ্চল। কিছু জানে না। অথচ প্রচন্ড ব্যথা। চোখ খুলতে একটা ন্যাকড়ার পুটলি এনে তাকে দেখানো হয়েছিল। এই তো বাচ্চা, ছেলে হয়েছে, ছেলে।

বর এসে হাত ধরেছিল বিবর্ণ মুখে।

আবার কেবিনে ঢুকে ঘুম, ঘুম, ওষুধের ভেতর।

পরদিন থেকে ক্ষতচিহ্ন, ব্লিডিং, শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নতুনত্ব, নার্সের বকুনি, আয়ার ধমক।

সবকিছুর মধ্যে ছোট একটা নতুন মাংসদলার ধুকপুক, ভয় আর আনন্দের জোট বাঁধা অদ্ভুত এক ফিলিং।

এই ডেটাবেসের প্রান্তে ছিল আবার বাড়ি ফিরে আসা। বালতি বা কোণ ভারি জিনিশ না তুলতে পারা ইত্যাদি ইত্যাদি, প্রায় দু মাস।

একটু ইনফেকশন, ব্লিডিং বন্ধ না হওয়ায় অনেকটা ওষুধ পালটানো, ভয় ডর। ক্যাথিটার লাগিয়ে রাখার পর যন্ত্রণা আর চুলকুনি তার যোনিদ্বারে। এই অস্বস্তিগুলি তো কিছুই নয়। তারপর যা আরম্ভ হল তা জীবনের নতুন দিক।

নার্সিং হোমেই শাশুড়ি গিয়ে নাতির মুখদর্শন করে, বউমাকে দেখে ফিকফিক করে হেসে বললেন, এবার দেখব কেমন অফিস গিয়ে ছটা সাড়ে ছটা অব্দি অফিস কর, চারটে বাজলেই বাড়ি ফিরে আসতে শুরু করবে ত! বাচ্চার টান, বাবা, হুঁ হুঁ!

কন্টিনুয়াস সারভেইলেন্সে বন্দিদশায় থাকা শুরু হল। শিশুটির জন্য আয়া আছে। তবু সে বই পড়ে শিখে নিয়ে তাকে স্নান করাতে চেষ্টা করত, জামা পরাত, হাগু পরিষ্কার করে দিত। হিসির কাঁথা পাল্টাত। কিন্তু যারা কিছুই করত না , সেই সব বাড়ির লোকেরা তার আশেপাশে ঘুরত। মা ছিল না বলে মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকা হয়নি তার। শ্বশুরবাড়ির লোকের পুলিসগিরি তার সহ্য হত না। সে যে বাচ্চা বিষয়ে কিছুই জানেনা, এটা নতুন মা-কে চোখে আঙুল দিয়ে বলার মধ্যে এক অদ্ভুত সুখ আছে সকলের, সে বুঝতে পারে।

বাচ্চা কাঁদলে অভিযোগের আঙুল উঠত, কাঁদছে কেন? খাওয়াচ্ছ না ঠিক করে?

খাওয়াতে গেলে বলা হত, মাথাটার তলায় হাত দাও ঠিক করে। পশ্চার ঠিক হয়নি।

শুইয়ে রাখলে শাশুড়ি এসে নাতির মুখচন্দ্রমা নিরীক্ষণ করতে করতেই ইম্যাজিনারি পিঁপড়ে খুঁজে পেতেন, অথবা ঠিক করে কাঁথা দিয়ে ঢাকা হয়নি ওকে, বলে তাকে এক প্রস্থ জ্ঞান দিয়ে যেতেন।

শিশু ছ মাস  হতে হতে অলটারনেটিভ খাবার দেওয়া শুরু। সেই সময়ে বোতল ঠিক ঠাক পনেরো মিনিট ধরে  না ফোটানোর অপকারিতা আর বুকের দুধ অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ানোর উপকারিতা নিয়ে লেকচার শোনানো হত তাকে। কে না এসে জ্ঞান দিয়ে যেত। কে না এসে বক্তব্য রাখত। যেখানে পৃথিবীতে যত মহিলা আছে যারা কখনো না কখনো বাচ্চা রেখেছে বা পেটে ধরেছে, তাদের বক্তব্য রাখার অধিকার জন্মে যায় কীভাবে যেন। আর নতুন মায়ের কাজ সবার কাছ থেকে তাদের নিজস্ব টিপস শুনে যাওয়া। জমা করা। ডেটাবেসে। শুধু শ্বশুর শাশুড়ি নয়, বাবা, কাকা, পিশি, পিশে, মাসি শাশুড়ি , কে নয় এই জ্ঞানদাতাদের দলে। এমনকি আয়া, বাড়ির ঘরমোছার লোক। এমনকি রাস্তার অপরিচিত মহিলা। ডাক্তারখানার হেল্পার।

ঠিক করে ধরুন। ধরা ঠিক না আপনার।

বাব্বা, ছেলেটাকে সামনে দিয়ে জামা পরিয়েছে দ্যাখো, হি হি , পেছনটা পুরো বেরিয়ে আছে…

কেন দাঁত উঠল না এখনো? আমার নাতনির তো ক—বে…

কেন শিশু কথা বলতে শিখল না আজো? আমার ছেলে তো কত আগে…

একবছর হয়ে গেছে বাচ্চাটার? এ মা, হাঁটতে পারে না? আমাদের টা তো এরই মধ্যে…

বাড়ির নানা পলিটিক্স তার এতদিনে গা সওয়া হয়ে গিয়েছে, বাচ্চার দৌলতে।

তার নিজের বাড়ি ছিল না কোন, বাপের বাড়ির লোক মানে তার মামিমা কাকিমারা এসে মুখ দেখে গেল শিশুর, ব্যাস তাদের কর্তব্য শেষ।

শ্বশুরবাড়ি তার সর্বেসর্বা হল। এর আগে, বিবাহের অব্যবহিত পরে, নিজে যখন তার বরের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে থাকত, প্রাইভেসির দৌলতে, তখন মনে হত এঁরা যথেষ্টই লিবারাল এবং শিক্ষিত। কিন্তু সে ইতিপূর্বে যা যা দেখেনি, এখন শিশু সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নাটকের মত অভিনীত হতে শুরু করল।

তার জগত হয়ে গেল সচ্ছিদ্র, অন্যদের কথাবার্তা কাজ কর্ম এসে পৌঁছতে শুরু করল শিশুর হাত ধরে।

তখনই শুরু তার সহস্র হাতের পাশাপাশি সহস্র কানের জন্মের। সে শুনতে পায়, পাশের ঘরে আলোচনা চলছে তার শিশুর বাড়বৃদ্ধি নিয়ে, এবং তার উপরে তার মায়ের ভূমিকা নিয়ে।

সে দেখতে পায় , শিশুকে ঘিরেই বর্ণনা হয়, বিশেষত পুরুষ শিশু , প্রথম বংশরক্ষক। ছেলে কই, ছেলের মায়ের সঙ্গে বেরোচ্ছে। এরকম কথা শুনতে শুনতে সে স্তম্ভিত হয়ে টের পায়, তার নিজের একটি নাম ছিল , বেশ বড় নাম, বরবর্ণিনী রায় চট্টোপাধ্যায় গোছের ( চট্টোপাধ্যায়টি তার স্বামীর অবদান অবশ্যই) … সেটি বেবাক বেমালুম হাপিশ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ তার বিবরণ হয়ে যাচ্ছে “ছেলের মা” বা ‘পুটুশের মা’ বা ‘বিংগোর মা’।

আদি অকৃত্রিম সামাজিক প্রক্রিয়ায় কাজের লোকেদের জগতে যেভাবে পুঁটির মা বা ক্ষেন্তির মা জন্ম নেয় সেভাবেই হচ্ছে। বাড়িতে আসা লোক বলছে, বাড়ির কাজের লোক বলছে, এমনকি তার বাড়ির লোক, মানে শ্বশুর শাশুড়িও বলছেন, এমনকি তার বর ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় বলছে!

ইতিমধ্যে সে তার নিজের চাকরির জন্য বদলি হল অন্য প্রদেশে, ছোট এক শহরে। নিজের ব্যক্তিজীবনে সে একজন সরকারি চাকুরে। উইথ অল ইন্ডিয়া ট্রান্সফার লায়াবিলিটি । কথাটা লোকেরা ধীরে ধীরে হৃদয়ংগম করতে পারছে এখন, বিয়ের পর পর জোর গলায় ত আর বলা যায় না, কালই আমি দিল্লি বম্বে পোস্টিং নেব! সে সত্যের অভিঘাত ওদের সহ্য হত না বলেই বলা যায়না। কিন্তু স্লো লি ওদের মাথায় ঢুকল সেটাও। তখন প্রতিভাত হল, ম্যাটারটি বৌমার ইচ্ছাধীন, সে চাইলেই কেঁদে ককিয়ে তার হেডকোয়ার্টারস কে বলে বদলি ঠেকাতে পারে। কিন্তু করছেনা, তার মানে, “আমাদের সঙ্গে থাকতে চাইছে না”।

অ্যাজ ইফ তার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম দিত তার হেডুরা। উলটে তারা ওকে পাঁচ বছর কলকাতায় থাকার পর বাইরে ঠেলবেই, এটা নিশ্চিত। তবে সেটা হলেই সে এ যাত্রা  এই কনটিনুয়াস সার্ভেলেন্স থেকে বেঁচে যাবে, এটা ভাবতেই নিজেকে বেশ অসভ্য আর সস্তা লাগছিল তার। মীন লাগছিল। মীনগণ হীন হয়ে রহে সরোবরে টাইপের।

তখনই কানে আসে বরের এক পিশি আর তার শাশুড়ির কথোপকথন :

শোন বৌদি, বৌমার তো বদলির চাকরি, তা সে যেখানে খুশি যায় যাক। বাচ্চাটাকে কিন্তু তুমি ছেড়ো না। বৌ ত পরের ঘরের মেয়ে, ছেলেটা তো তোমাদের। যাকে বলে বংশের বাতি। ওকে এখানেই কোন ইশকুলে ভর্তি করে রেখে যেতে বল। আমাদের ছেলে আমরা ছাড়ব কেন? মা যাক না গিয়ে যেখানে প্রাণ চায়?

আসলে সন্তান একটি প্রপার্টি। যেরকম স্ত্রী ও একটা প্রপার্টি, তবে কিনা আজকালকার দিন, দু পাত ইংরিজি পড়ে চাকরি করে সব বউগুলো নিজেদের ভেবে ফেলেছে মহা মাতব্বর, সে আর কী করা যাবে।

সন্তানটি তো বাবার পদবি ধারণ করে, মায়ের নয়! কাজেই তার ওপর একটা দখল থাকেই শ্বশুরবাড়ির।

এ ছাড়াও কথা আছে। বউ যেখানে যাবে, সেখানে বাচ্চাকে দেখবে কে? বউ তো সারাদিন অফিসে থাকবে। “আমাদের বাড়ির বাচ্চা”-র দেখভাল করবে মাইনে করা কাজের লোক? তা তো হতে পারে না। এমনিই তো চাকরি করা বৌয়ের হাতের অবহেলা আর উদাসীনতায় ছেলেটা রোগা হয়ে গেল।

সুতরাং সে যখন বদলি হয়ে ভুবনেশ্বর গেল, তার ছেলের দেখভাল করার কথা তুলে শাশুড়ি এবং শ্বশুর অলটারনেটিভলি যেতে লাগলেন সেখানে। একেবারে থাকতে লাগলেন। নজরবন্দী দশা ঘুচল না। ছেলেও বড়লোকের অওলাতের মত আহ্লাদে, আতুপুতু হল। একেবারেই সে যেভাবে তাকে মানুষ করবে ভেবেছিল সেভাবে “নিজের কাজ নিজে কর “ টাইপ সেলফ রিলায়েন্ট করে মানুষ করা গেল না।

ছেলে ক্রিকেট খেলতে শিখল, ছবি আঁকতে শিখল কিন্তু গান গাইতে শিখল না। তাকে নানারকম খেলনা কিনে দেবে ভেবেও দেখল, পুরুষোচিত র‍্যাট ট্যাট ট্যাট বন্দুক আর আর্মির ছাপ ছোপ মারা হেলিকপ্টার দেওয়া হচ্ছে তাকে, উপহারে। দেখল, বাড়ির কোন জিনিশ ভাঙ্গলে চুরলে তাকে বাহবা দিয়ে বলা হচ্ছে, মারো, মারো, তোমারই তো সব। এগুলো কিন্তু সব তোমার , বাবু, এই ফ্রিজ, এই টিভি। গেলে তোমার যাবে।

তাকে শেখান হচ্ছে অধিকার, আবার সেই প্রপার্টি রিলেশন্স।

শ্বশুর শাশুড়িরা একজন গিয়ে তিন চারমাস গিয়ে থেকে আসতেন, তারপর যেতেন অন্যজন। বিষয়টাকে বাধা দিতে সে চায়না, হাজার হোক তাঁদের নিজেদের সংসার ফেলে রেখে তো তাঁরাও অনেকটা আত্মত্যাগ করছেন, তার পেটে থেকে পড়া সন্তানকে দেখার জন্যই। তা ছাড়া শুষ্ক, দায়সারা আয়া বা বাচ্চাধরার লোকের তুলনায়, একজন দাদু বা ঠাম্মার সঙ্গ পাওয়া , এটাও ত কত না জরুরি শিশুর জীবনে, সেটা তো সে স্বীকারই করে। তার নিজের মা-ও তো নেই।

মধ্যে মধ্যে তার বর আসত ছুটিতে। সে কটা দিন হীরকদ্যুতিময় ব দ্বীপের মত হাসি খেলা গানে কাটত, তারপর আবার  ডার্ক এজ। সে কটা দিন ঠারে ঠোরে বয়স্কদের দাপট ও “আত্মত্যাগের মহিমা”র গল্প শুনতে হত। তাঁরা উঠতে বসতে  শহর হিসেবে কলকাতার তুলনায় ভুবনেশ্বরের নিকৃষ্টতা জাহির করতেন, কেননা শহরটাকে বৌমার পোস্টিং এর ফলে ‘নিতে হচ্ছে’। বেড়াতে এলে অন্যরকম হত।

ততদিনে শিশু থপ থপ করে হাঁটছে, চলছে, ছড়া বলছে, ভাত খেতে খেতে কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখছে, ঠাকুমার সঙ্গেই ছড়ার বই বা ছবির বই শেষ করছে আর দাদু থাকাকালীন বাংলা অক্ষর পরিচয়ও হচ্ছে তার… খবরের কাগজ দেখে দেখে।

আসলের থেকে সুদ মিষ্টি, একথাও ওঁরা বলে থাকেন, অন্তত শ্বশুরমশাই। শাশুড়ি সদাই পাঁচের মত মুখ করে থাকেন, কারণ একটি আদিবাসী রমণীকে সে তার ভুবনেশ্বর হাউজহোল্ডের রান্নার দায়িত্বে রেখেছিল, আর সে কিছুই রাঁধতে পারেনা শাশুড়ির মনমত। সে এক শ্বাসরোধী পরিস্থিতি। রান্নার লোক আর শাশুড়ি সারাদিন ঝগড়া করে মুখ ভার করে বসে থাকত, আর তাকে সন্ধ্যাবেলা এসে সেই ঝগড়া মেটাতে হত, অথবা আসামাত্র আদিবাসী মেয়েটি এসে ফিরিস্তি দিতে থাকত, বাড়িতে কী কী নেই।

বাজারে যাওয়া বা কাউকে বাজারে পাঠানোর দায়িত্বটা ছিল তার, কারণ, ওই যে, আগেই বলা হয়েছে, ভুবনেশ্বরে আসার জন্য দায়ীটা কে, শুনি?

রোজ, রোজ সেই আলু নেহি হ্যায়, মুড়ি নেহি হ্যায়, দুধ খতম হো গিয়া হ্যায় শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরেই সে আবার বাজারে যেত। ইতিমিধ্যে তার বাড়িতে বাচ্চার মা-র ভূমিকায় একটা ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। কারণ ইতিহাস বইয়ের পাতায় মুহুর্মূহু লিখিত হয়েই চলেছে, যে সে একজন নন রেসিডেন্ট মা। সে বাচ্চাকে খাওয়ায় না ঘুম পাড়ায় না, হাগায় না ছোঁচায় না।

এক শীতের রাত্তিরে, ছেলেকে ছুঁচিয়ে দিতে বাথরুম যায় সে, পটিতে বসা ছেলের সঙ্গে ছড়া বলতে বলতে তাকে মহৎ কর্ম করতে সাহায্য করে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ,  সে, ওভারহিয়ার করে ( হিন্দি বা বাংলা সিনেমায় যা সচরাচর ঘটে থাকে , এবং নায়িকাদের এই ওভারহিয়ারের ফলে অনেক কাপ ডিশ সরবতের গেলাস ভেঙে থাকে), তার শাশুড়ি ছুটে গিয়ে কাজের মহিলাকে জিগ্যেস করছেন, ভাবী কোথায় রে? বাচ্চাকে বাথরুম থেকে পরিষ্কার করে নিয়ে গেছে?

হাঁ।

কী দিয়ে পরিষ্কার করল? ঠান্ডা জল দিয়ে?

( বাচ্চার হাগানো ছোঁচানোর জন্য গরম জল রাখা থাকত গিজারে, এবং একটি বালতিতে)

নেহি, গরম পানি সে।

তুই নিজে দেখেছিস, গরম জল দিয়েই করেছে তো?

 

এগুলো কোন বিচ্ছিন্ন কথোপকথন না, এগুলো সন্তান জন্মানোর পরবর্তী তার গোটা জীবনের এক একটি স্নিক পিক মাত্র। আসলে কনটিনুয়াস সারভেইলেন্স ব্যাপারটির সঙ্গে যারা পরিচিত না তারা এর মর্ম বুঝবেন না।

ব্যাপারটি হল, এটা একটা ডিকটমির জগত। হয় তুমি ভাল মা নয় তুমি ভাল চাকুরে। এখনো প্রাক্তন নামে ছবি হয় বাংলায়। যাতে ভাল বউ বনাম ভাল চাকুরে নিয়ে আলোচনা চলে। সেই একই ডিকটমিবশে, ভাল মা হতে হলে ভাল চাকুরে হওয়া যাবে না। আর একটা ওভার হিয়ার অথবা, থালা গেলাস ফেলে দেওয়ার মত শুনতে পাওয়া ডায়ালগ তার শাশুড়ির, বউ যদি কেরাণি হত তাহলেই ভাল হত , অফিসার হয়েই হয়েছে মুশকিল, একটা দিনও সাড়ে ছটা সাড়ে সাতটার আগে ফিরতে পারে না।

সে যেহেতু অফিসার, এবং অফিসে দরকার হলে শনিবার যেতে হয়, দরকারে অদরকারে দিল্লি ছুটতে হয়, ট্যুরে যেতে হয়,  দু বছরের বাচ্চাকে রেখে চার মাসের জন্য আমেরিকায় একটা অফিশিয়াল ট্রেনিং এও গেছে সে ( সত্যি কী করে পারে এরা, অ্যাঁ!!! এত কেরিয়ারিস্ট! ) … সে তো খারাপ মা হবেই। তাকে হতেই হবে এমন মা যে বাচ্চাকে খাওয়াতে পারে না, যে বাচ্চাকে ঠান্ডা জলে ছোঁচায়, ছেঁড়া জামা পরায়, একটাও কাজ পরিষ্কার করে করতে পারেনা। স্নানের টাবে বাচ্চা ফেলে চলে যায়, বাচ্চা ডুবে মরে যায়, এমন সব ভয়ঙ্কর হরার স্টোরি তো আছেই পৃথিবীতে… তাদের ডোমেনে এখন ওরকম সব গল্পরা ঘোরাঘুরি করে রাতবিরেতের রক্ত পিশাচের মত।

সেই শুধু বুঝতে পারে না, বাচ্চার কোন ক্ষতি হচ্ছে, সে তো বেশ ছড়া বলছে, খেলছে  , বেড়ে টেড়ে উঠছে… কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ি তো হাহুতাশ করেই চলছেন ভেতরে ভেতরে, যে বাচ্চাটা ঠিকঠাক মানুষ হল না। মাকে পেলনা।

এতটাই এসব করছেন যে ছেলে যখন ষোল বছরের, সে একদিন সত্যজিত রায়ের মহানগর দেখে চমকে উঠবে, ওই সিনটায়, যেখানে  মা চাকরি করতে যাচ্ছে , বাচ্চার জ্বরের দিনেও। মাধবী ফিরে এসে দেখছে সারাবাড়ি থমথমে, আর  বাচ্চা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে, আর অনুতপ্ত মাধবীকে তার শাশুড়ি বলছে, ছেলে তো সারাদিন বলে গেল,   মা খারাপ, মা পাজি, মা খালি অফিসে যায়। প্রত্যুত্তরে মাধবী ছেলের হাতে গুঁজে দিচ্ছে উপহার, যা আসলে, মেনস্ট্রিমের মতে, চাকুরে মায়ের দেওয়া ঘুষ। নিজের না-থাকার বিকল্পে দেওয়া পারিতোষিক।

তার ছেলে , এখন বড়, তার চোখ দপ করে জ্বলে উঠল ছবির ওই অংশটা দেখে, মায়ের দিকে তাকাল এমন চোখে, যে মা বুঝল, ওই ডায়ালগটা কত্তো চেনা চেনা লেগেছে তার। মা ছেলে দুজনেই তারপর হো হো করে হেসে ফেলল।

ইন্দ্রা নুয়ি নাকি রাত্তির অব্দি অফিস করে দেরিতে একবার বাড়ি ফিরে দেখেছিল বাড়িতে দুধ নেই, তার নিজের মা বলেছিল, বাড়িতে দুধ নেই, আনতে হবে। ইন্দ্রা বলেছিল আমার বর ত অনেক আগেই এসে গেছে মা, ওকে কেন বলনি? মা বলেছিল বেচারি খেটেখুটে এসেছে, ক্লান্ত।

মেয়েদের চাকরি করা মানে খেটেখুটে ক্লান্ত হয়ে এসেও তোমাকে চূড়ান্ত পারফর্মেন্স –এ বাজার হাট সব করে দেখাতে হবে, তুমি দুধ ময়দা চাল ডাল সবকিছুর কেমন খেয়াল রেখেছ। আর এসব অবলীলাক্রমে করার পরও, আসল হল একটা অপরাধী অপরাধী মুখ করে থাকা। একটা শহিদ শহিদ স্টাইল করে থাকা।  যদি তোমার মুখে এতটুকুও অপরাধবোধ না ফোটে ( যেমন আমাদের গল্পের এই সে-র মুখে কোনদিনই ফুটত না) তাহলে ধরে নেওয়া হবে তুমি খারাপ গৃহিণী ও খারাপ মা।

 

ছেলে বড় হতে থাকে এরপর। পর পর যা যা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে ঘটার সবই ঘটতে থাকে , যথা এরপর স্কুলিং নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হল। তালিকা তৈরি হল। লাইন লাগানোর জন্য অনুপ্রাণিত হল স্বামীটি।

স্কুলে যেতে গিয়ে শিশু কাঁদল না। সেটাও বিস্ময়ের। কেন কাঁদল না? শিশু স্কুলে কিছু শিখছিল কিনা, তা নিয়েও সংশয় ছিল। প্রশ্ন ধরা হত ওকে, বাইসাইকেলে কটা আই বলতো? গাজর দেখিয়ে জেঠিমা জিগ্যেস করত, এটা কি কালার শিশু? রেড বলেছিল বলে আ আ ছি ছি শুরু হল, সেকি,  ওকে অরেঞ্জ কালারটা চেনাও নি?

সবকিছুর শেষেও, ভাল মা হয়ে উঠতে পারল কি, সে? খুব সন্দেহ আছে তাতে।

শিশুর ক্লাস টু। একদিন অফিস থেকে ফিরে এসে সে দেখল শাশুড়ির মুখ হাঁড়ি। শিশুর ক্লাস টিচার ওর খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখে দিয়েছেন, হোম ওয়ার্ক নট ডান।

শাশুড়ি ঝাঁঝিয়ে উঠে সেকে জবাবদিহি চাইলেনঃ  হোমওয়ার্কটা  করল কিনা এটাও দেখতে পারো না?

ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ, মিশেল ফুকো নাকি লিখেছিল। একজন মা শুধু বায়োলজিকালি মা হয়ে ওঠেনা। পেট থেকে পড়লেই বাচ্চা পয়দা করা যায়না। মা হওয়া শিখে উঠতে হয়। কঠোর তপস্যা চাই।

আজকের দিনের মায়েদের কত না চাপ। তাকে সর্বংসহা ও সর্বকর্মা হতে হবে। কে যেন গোটা একটা বইই লিখে দিয়েছে, আমার মা সব জানে। তাই তাকে সেই বইটা কিনে পড়ে ফেলতে হবে ও শিশুর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

টিভির বিজ্ঞাপনে যেরকম দেখায়, মা কখনো বকবে না অধৈর্য হবে না বিরক্ত হবে না। নিজের সুখের কথা ভাববে না। সারাদিন ছেলের মুখে জলের গেলাস খাবারের থালা এবং কুলকুচি হয়ে গেলে গামছা তুলে দেবে। জামা বার করে রাখবে, পরিয়ে দেবে। জুতো পরিয়ে দেবে। স্কুলে র থেকে এলে গ্লুকন ডি গুলে দেবে। পরীক্ষায় ভাল করলে কিটক্যাট কিনে দেবে।

মা কখনো নিজের কাজ করবে না, বাড়িতে যতক্ষণ থাকবে ছেলের সঙ্গে খেলবে কথা বলবে, ছেলের পড়া দেখবে। অফিসে গেলে তো আরো বেশি অপরাধী হয়ে মাকে ফিরে আসতে হবে, আরো দ্বিগুণ উৎসাহে ছেলের সেবাযত্ন করতে হবে, সে সময়টা সে ছিল না সেই সময়টার অভাব পুষিয়ে দিতে হবে।

মাতৃত্ব কত আনকন্ডিশনাল তা নিয়ে অনেক ভাল ভাল কথা পড়া যাবে, বলা হবে অনেক সুন্দর কবিতা গান আর বাণী, মা হল সবার ওপরে।

এইভাবে , কন্ডিশনড হতে হতে, সে দেখেছে, সে এক রোবট মা এখন।

সারাদিন অফিস করে বাড়িতে ঢুকেই চুড়িদার কামিজের ওপর থেকে চুন্নিটা নামিয়ে রেখে সে রান্নাঘরে ঢুকে  ছেলের দাবি অনুসারে কোনদিন চাউমিন কোণদিন পাস্তা কোনদিন ভাত নেড়ে বিরিয়ানি করে দেবে। অনায়াসে তারপর  ছেলের হোমওয়ারক দেখবে, অনায়াসে তার প্রয়োজন হলে বেরিয়ে কিনে এনে দেবে সেলোফেন পেপার অথবা ফেভিকল, কলম পেন্সিল বা রুলটানা খাতা। যখন যেটা দরকার।

রাত এগারোটায় ঘুমে ঢুলে পড়তে পড়তেও, ছেলের দাঁত মাজা জামা পালটানো সুপারভাইজ করবে, বিছানা পাতবে।

স্বামী করে না এসব? না তা নয়। স্বামী অনেক কিছুই করেছে, করে হালকা করেছে গুরুভার সন্তানপালনের দায়। সে জুতো পরিয়ে দিয়ে চুল আঁচড়ে দিয়ে শার্ট পরিয়ে দিয়ে নিয়ে গেছে শিশুকে টিউশনে। কিন্তু জুতোটা কিনে এনেছে মা, চিরুনি হারিয়ে গেলে কথা শুনতে হয়েছে মাকে, শার্টের বোতাম না থাকলে মার সামনে ছুঁড়ে ফেলে বলা হয়েছে, দেখে রাখতে পারো না, আদ্ধেক শার্টের বোতাম নেই?

আসলে , একটাই তফাত থেকেছে। স্বামী যা যা করেছে, সেগুলো স্বামী স্বেচ্ছায় করেছে। ওর করার কথা ছিল না বাধ্যতা ছিল না তাও করেছে।

বাই ডিফল্ট ওগুলো সব মায়ের করার কথা ছিল। স্বামী করে, তাকে ধন্য করেছে, হেল্প করেছে। স্বামীর কাজ করাটা স্বামীর ক্রেডিট। আর স্ত্রীর না করাটা, স্ত্রীর গাফিলতি। ত্রুটি। তাকে চিরজীবন অপরাধী হয়ে থাকতে হয় এই তথ্যের জন্য, যে, সে যখন অফিসে থাকত তখন তার সন্তানকে শাশুড়ি দেখত, আয়া দেখত, অনেক সময় আগে ফিরে এসে স্বামীও দেখত।

অন্যেরা যে যা অবদান রেখেছে শিশুর জীবনে, কোনটাই বাই ডিফল্ট ছিল না। সেগুলো অবদান ছিল। আর সে যা করেছে? একজন মায়ের তো তা করারই কথা। সেজন্যে আলাদা করে কোন থ্যাঙ্কস প্রাপ্য আছে নাকি আবার? ওটাকে কোন কাজ বলতেই নারাজ তো, সমাজ। ওগুলো তো তার কর্তব্য।

পেট থেকে পড়েছে কার, বাচ্চাটা, শুনি?

করবে না মানে?

শিশু একদিন বড় হয়ে যাবে, শিগগিরি একদিন সে নিজের জীবন খুঁজে নেবে। তারপর অচিরেই নিজের জীবন সঙ্গিনীও।

তখন , সেই জীবন সঙ্গিনীও , সে কি চাইবে, করুক সব কাজ বাই ডিফল্ট?

 

এরপর বিদ্বজ্জনরা প্রশ্ন তুলবেন, আমাদের গল্পের মেয়েটি এত ন্যাকা কেন? তার এত এত অসুবিধের কথা সে এতদিন মুখ ফুটে বলেনি কেন? সে কেন শ্বশুরবাড়ির সংস্রব ত্যাগ করেনি। ভুবনেশ্বর থেকে টিকিট কেটে শ্বশুর শাশুড়িকে পত্রপাঠ বিদেয় করে দেয়নি এবং পরবর্তী জীবনে কেবলমাত্র আয়া বা কাজের লোকের হাতেই ছেলেকে মানুষ করেনি?

সে কেন নিজের এই বিশ্রি অসম সম্পর্কটা ভেঙে ফেলেনি?

সে যেহেতু বিবাহিত জীবনে আছে, প্রশ্ন উঠবে,  সে কেন আপোশ করেছে এত ? সে তো চাকরি করত, ইন ফ্যাক্ট নিজের বরের চেয়ে বেশি মাইনের চাকরিও ( যেটা নাকি আবার খুলে দেবে আরো এক বিশাল আলোচনার দরজা, এ নিয়ে বেশি মুখ না খোলাই ভাল)… তাহলে সে ছেড়ে চলে যায়নি কেন?

এত প্রেম, বাব্বা! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। নিশ্চই অন্য ধান্ধা ছিল , অন্য কোন হিসাব কিতাব, অন্য কোন হিডেন অ্যাজেন্ডা!

হ্যাঁ তার বরও তো বলেছে তাকে, আসলে তুমি অপরচুনিস্ট একটা, মারাত্মক চালু মাল, ম্যানেজ মাস্টার। নিজের ছেলেকে আমার বাবা মাকে দিয়ে বড় করিয়ে নিলে কনভিনিয়েন্টলি, পয়সা দিলেও এরকম আয়া তো পেতে না, এত নির্ভরশীল, শুভাকাঙ্ক্ষী। এখন তো লিখবেই, আমার বাবা মা কত খারাপ।  তোমার হাতে কলম আছে তো!

সে আসলে অপরচুনিস্ট। সে চায়নি তার নিজের এই সব টুকরো টাকরা অপমান  (যা সে বিশ্বাস করে এই সমাজ পরিবর্তন না হলে কোনদিন পরিবর্তিত হবে না এবং এই সমাজে থাকা অধিকাংশ মেয়েকে এসবের মধ্যে দিয়েই যেতে হয় ) গায়ে মাখতে। তবুও ডেটাবেস হিসেবে এগুলো তার মাথার মধ্যে রেজিস্টারড হয়েছে, থেকে গেছে, সে ভুলতে পারেনি, বা ৯০ শতাংশ ভুলে গেলেও ১০ শতাংশই তার মনে “থেকে গেছে”।

সে আসলে অপরচুনিস্ট, সে চেয়েছে তার ছেলে মানুষ হোক একটা আপাত স্বাভাবিক পরিসরে, পরিবারে, দাদু ঠাকুমার সঙ্গে।

তার মা ছিল না, বাবা অন্য বিয়ে করেছিল,  প্রথম জীবনে ঠাকুমার আদরে আর পরে ঠাকুমা মারা গেলে, কাকিমাদের হাত তোলা ও লাথি ঝ্যাঁটা খেয়ে সে নিজে মানুষ হয়েছিল। হয়ত সেজন্যেই, ব্রোকেন ফ্যামিলিতে বড় হওয়ার চাপ সে তার সন্তানকে দিতে চায়নি। সে জানে একা থাকার মহিমা, সে জানে কষ্ট কাকে বলে, সে জানে নিজের চাকরি তার নিজের অর্জন, মামা কাকাদের গালে পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়া পুরস্কার নয়, তাই নিজের চাকরি নিয়ে সে অন্যদের কাছে ফাটাতে চায়নি, ফুটানি মারতে চায়নি। নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সযত্নে আলাদাও রেখেছে আবার স্বামীর থেকে।

এগুলো তার আপোশ বইকি। যারা নিজেদের র‍্যাডিকাল বলে তাদের জীবনের যে প্রতিমুহূর্তে পেরেক ফোটা চাপ, সমাজ যা প্রতিনিয়ত দিতে থাকে , তার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সে চেয়েছে কারণ তার শৈশব আদৌ খুব একটা সুন্দর ছিল না। অন্তত যৌবন সুন্দর হোক সে চেয়েছিল।

আর এই আপোশের ফলে সে পেয়েওছে অনেকটা। সে পেয়েছে মন দিয়ে চাকরি করা এবং নিজের লেখালেখি করার পরিসর। আফটার অল সারাজীবন শুধু বিবিধ পুরুষের সঙ্গে এবং সেই পুরুষতন্ত্রের এজেন্ট নারী ( তার কাকিমারা, তার শাশুড়ি প্রমুখ) দের সঙ্গে লড়াই করে সময় নষ্ট না করে তাদের উপেক্ষা ও করুণা করতেই সে বেশি পছন্দ করেছে।

এই আপোশের পথ অনেকের নয়। অনেকেই ঝগড়া করে, প্রতিবাদ করে, বেরিয়ে যায় সংসার থেকে। হয়ত সে পারেনি এসব। কিন্তু পারেনি বলেই তার এই এই শোনাগুলো, ডেটাবেসের এই এই চড় থাপ্পড়গুলো, মিথ্যে হয়ে যায়না। সে কিন্তু টাকা দিয়ে অনেক কিছু কিনতে পারে। কিন্তু বহুকিছু কিনতে পারাটাই তো তার সবচেয়ে বড় ডিসকোয়ালিফিকেশন, কারণ তার শাশুড়ি তো সারাজীবন চাকরি করেন নি, আর এখনো ছেলেরা না খেলে খেতে বসেন না। রাত বারোটা একটা বাজলেও তবু না। এই সব না খাওয়া আর জেগে থাকা দিয়ে তো তিনি মাতৃত্বের পরীক্ষায় বৌমার থেকে বেশি নম্বর পেয়েছেন বলেই জানেন। তাই তো তাঁর কনফিডেন্স এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যায়না। মহিলাকে করুণা করতেও তাই আজকাল তার করুণা হয়।

বুদ্ধিজীবী ও র‍্যাডিকালরা এখনো বলে সে নাকি থ্রি এস, মানে সসসস্বামী সসসন্তান সসসসসংসার নিয়ে দিব্যি আছে।

চাকুরে মেয়েরা, অন্তত তার মহিলা কলিগেরা, অন্তত এটা বলে না, এটুকুই যা এক রিলিফ!

মেয়েদের রান্নাঘর

anise aroma art bazaar
Photo by Pixabay on Pexels.com

 

রান্নাঘরের সঙ্গে যেন অঙ্গাঙ্গী , আত্মিক সম্পর্ক আছে মেয়েদের। কে বলেছিল এই কথাটা? কে বলে দিয়েছিল? চোখ বুজলেই যেন আমরা দেখতে পাই আদিম গুহামানবী প্রথম জ্বালা আগুনের সামনে বসে আছে , শূল্যপক্ক মাংস বানাচ্ছে বা আদিম তাওয়াতে আদিম চাপাটি বানাচ্ছে গম জওয়ার যবের গুঁড়ো জল দিয়ে ঠেশে। আজও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ ওভাবেই উনুনের চারপাশে বসে আছে, মেয়েরা রুটি পাকাচ্ছে আর ছেলেকে উষ্ণতার দোল দিচ্ছে।

মেয়েদের সঙ্গে রান্নাঘরের ইকুয়েশন সব সময় মেলেনা, তবু আমাদের কাছে মেয়েরা আর রান্নাঘর প্রায় সমার্থক। সামাজিকীকরণ নামে একটা বস্তুই নাকি এইভাবে আমাদের শেখায় শিখতে বাধ্য করে। আমাদের মা দিদিমাদের জীবনের বড় একটা অংশ কেটেছে রান্নাঘরে। সেই রান্নাঘর, যা ঝুলকালিমাখা, অন্ধকার। সেই রান্নাঘর, যার দেওয়ালে কোন এক কালে হলুদ রং এর এলা-রঙের পোঁচ পড়েছিল। তারপর তার ওপর দিয়ে পরতে পরতে উনুনের , তেলের ধোঁয়া আস্তরণ চাপিয়েছে কালোর। দিনের বেলাতেও রাত সেই ঘরে, জানালায় একটা জাল লাগানো আছে বেড়াল আটকানোর জন্য, সে জালটিও চিটচিটে, তেলকালিতে। একটা বড় কয়লার উনুনে রান্না হয়, কাঠের উনুন ছিল তারো আগে, ঠেলাগাড়িতে করে কাঠ আসতে দেখেছি পেছনের দরজায় ( খিড়কি নামক সেই দরজাটি ছিল সবরকমের সাব অলটার্নদের বাড়িতে ঢোকার পথ, মেথর, মুচি, ভিস্তিওয়ালা, কয়লাওয়ালা , বেড়াল, ধুনুরি, কাজের মাসি ( ঠিকে) এবং বাজার করে পাকা কাজের লোক গোবিন্দদাকেও সেই পথ দিয়েই যাতায়াত করতে হত)।

সেই রান্নাঘর গেছে, এসেছে মায়ের রান্নাঘর, কেরোসিনে, গ্যাসে । নাকানি চোবানি কমেনি।

এসেছে আমার কিশোরীবেলার রান্নাঘর শেখা। বেগুন ভাজতে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা, আঁচ বাড়িয়ে দিয়ে ভুলে গিয়ে দুধ উথলে ফেলা থেকে শুরু করে আরো কত উত্তেজনাই না ছিল সে গল্পে। কিন্তু কোথাও ছিল অধিকার বোধও। মায়ের রান্নাঘরে  মেয়ের রান্না আর শাশুড়ির রান্নাঘরে বৌমার রান্নার ভেতর আকাশ পাতাল তফাৎ আছে, বুঝেছি পরবর্তী কালে। বুঝেছি রান্নাঘরের পলিটিক্স। মাংসের ঝোলের পলিটিক্স। বুঝেছি মেয়েদের সব নিয়ন্ত্রণ অধিকার কনট্রোল স্বাধীনতার বোধ , ক্ষমতার বোধ রান্নাঘর কেন্দ্রিক, কেননা অন্য কোথাও সেভাবে নিয়ন্ত্রণ নেই? নাকি, আদি অন্তহীন কাল ধরে নিজেদের হরমোনের ভেতরে তাঁরা বহন করেন রান্নাঘরকে?

আমার পরের প্রজন্ম , আজকের আই টি প্রজন্ম, যে সব মেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং ডাক্তারি পড়েছে, বাবা মায়ের চোখের মণি যেসব মেয়েরা মায়ের বকা খায়নি “তেরো বছর বয়স হল, এখনো গ্যাস জ্বালাতে শিখলি না, কবে ঘরের কাজে লাগবি শুনি! “ ( তার আগের প্রজন্মের মেয়েরা শুনেছে, শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মুখ দেখাবি কি করে, বাপের বাড়ির নিন্দে হবে তো রান্না না পারলে )… তারা হয়ত রান্নাঘরের এই রাজনীতি নিয়ে কোনদিন মাথা ঘামাবে না। তাদের বাড়ির আন্টি/মাসি/কাজের মহিলা/আয়ারাই যা পারবে রেঁধে দেবে, তারা হোম ডেলিভারি আনাবে, ফাস্ট ফুড খাবে। সেও এক দুঃখ বটে। অন্তত নিজে ভাত ফুটিয়ে খেতে পারে না,এমন পুরুষ এমন মেয়ে কেউই সংসারে কাজের নয়। এ এক অদ্ভুত দাস্য, কাজের লোক বা রেস্তোরাঁর শেফের কাছে। নিজের খাবার নিজে করে নিতে পারার আত্ম-প্রত্যয় বা স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত। অন্তত তাই আমার মত। কিন্তু তা বলে রান্নাঘর নিয়ে যে অপরিসীম মানসিক জ্বালাযন্ত্রণা বাঁচামরা সমস্য আমার আছে, তা আমি চাইনা, অন্য কারুর থাকুক। চাই না, মেয়েদের সঙ্গে রান্নাঘরের সম্পর্ক হোক আদ্য, অন্তর্লীন। কেননা তা হয়ত মূলত চাপিয়ে দেওয়া।

সবচেয়ে বড় কন্ট্রাডিকশন অন্যত্র। যে কোন রেস্তোরারঁ ফাইন ডাইনিং হোটেলের শেফ বা বিখ্যাত রাঁধুনিরা সবাই পুরুষ। সেখানে এক গভীর পুরুষতন্ত্রের উপস্থিতি রয়েছে যেন। এমনকি শেফ দের ইন্টারভিউ পড়ে দেখেছি, তাঁরা নিজেদের এক অসামান্য শিল্পরীতির প্রতিভূ মেনেও মায়েদের, মেয়েদের কী সুন্দর ছোট করে দেখাতে পারেন। বলে ফেলতে পারেন অকাতরে, বাড়ির গিন্নিদের রান্না এটা নয়, এটা সূক্ষ্ম শিল্প।

অথচ আমাদের মা দিদাদের হাতের পিঠাপুলি অথবা লুচি তরকারি কচুরি ঘন্ট মাখা চচ্চড়ি ছ্যাঁচড়া লাবড়া মাংস পোলাও-এর যে অগুনতি রীতি, সূক্ষ্মতা এবং পরিণত চেতনা, তাকে ক্রমাগত এইসব অবহেলায় হারিয়ে যেতে দিচ্ছি আমরাই, তাঁদের পরের প্রজন্ম। এ প্রসঙ্গে মনে পরে স্বপ্নময় চক্রবর্তীর এক অনবদ্য লেখার কথা, সংবাদ প্রতিদিনের রোববারের পাতায়, বিষয়টি ছিল সাবেকি মহিলাদের নিরিমিষ রান্না। খাবারের শ্রেণীবিভাগ করে এক বিস্তারিত লেখায় রন্ধনশিল্পের খুঁটিনাটি মনে করে তুলে এনেছিলেন স্বপ্নময় কী মমতায়।

মেয়েরা গত পঞ্চাশ বছরে রান্নাঘর থেকে দূরে সরে এসেছে, এ কথা যারা বলি, তারাই আবার , এখনও, লিখে চলি রান্নাঘরের কাহিনি, আমাদের গল্পে, কবিতায়। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে চৈতালী চট্টোপাধ্যায় বা সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতার কথা।

সম্প্রতি, চমকে উঠলাম কোরিয়ার এক মহিলা কবির বছর দশেক আগেকার এক লেখার অনুবাদ পড়ে। অপরূপ সে লেখাঃ

স্বর্গীয় রন্ধনশালা

 

(মূল কবিতা – কিম হিয়ে সুন, দক্ষিণ কোরিয়া)

 

চাঁদ খেতে এল ওরা, ফের।

সে চন্দ্র হজম করে ফুলে উঠল মেয়েদের গর্ভ মাসে মাসে

স্তনদুগ্ধ নিংড়ে ঢেলে চাঁদমুখে, তারা

সতেজ পুদিনাগন্ধ ঢেলে দিল সেঁকাপোড়া চাঁদটির গায়ে

 

মেয়েটির রান্নাঘর একঝলক দেখেছি, সেখানে

সাদা পোশাকের যত রাঁধুনিরা সারাক্ষণ ফিসফাস করে

ঘূর্ণিঝড় উড়ে আসে,বুনো হাঁসেদের গলা ছিঁড়ে

শুইয়ে দেয় শয়ে শয়ে কাঠের চপিং বোর্ড পেতে

স্বর্গীয় রন্ধনশালা জুড়ে

 

এসেছে অতিথি এক, সঙ্গে বাচ্চা তার

“মা, মা, আমি এক গ্লাস টক টক তারা খেতে পারি?”

বর্ষণমেঘের কণা জলে গুলে মা-ও তাকে দিল সে সরবত

একটি বরফতারা ওপরে ভাসিয়ে।

 

মেয়েটির রান্নাঘর একঝলক দেখেছি, সেখানে

মাশরুম- মেঘের মতো ফুলে উঠছে ময়দার গুঁড়োরা

নর্দমায় বয়ে যাচ্ছে পশুরক্ত সমস্ত রকম

শব্দ উঠছে, ঠোকাঠুকি- চামচে ও চপস্টিকে, হাতে আর পায়ের আঙুলে,

মিশে যাচ্ছে ডিশপ্যানে, স্বর্গীয় রন্ধনশালা জুড়ে

 

এইবার মধ্যরাত, এবারে খাবার তৈরি হবে

সে মেয়ে ফ্রাইং প্যানে চাঁদটিকে ভাঙল, অতঃপর

গভীর নখের মতো তাতে এক ছিদ্র দেখা গেল।

সেই ছিদ্রপথ দিয়ে উঠে এল আশ্চর্য পাখিরা

সবার ছড়ানো ডানা, যে ডানা কড়াইয়ে ভাজা যায়,

তারা সেই কালো ডানা মেলে দিল অন্ধকার আকাশের গায়ে

মেয়েটি সমস্ত রাত পাখিদের ডানা ভেজে গেল।

 

জিভ থেকে লালা ঝরল। চিবাল। চুষল। চাটল। ঢেকুর তুলল। চিবাল, চিবাল। গিলল। খেল। গপ করে গিলে নিল। চিয়ার্স বলে চেঁচিয়ে উঠল। এসো, আরও খাও! আরেক বোতল! ঠোঁট মুছল। হিক্কা উঠল। বিষম লাগল।

 

যে ঠোঁট কখনও জোড়া লাগেনি, তাদের মতো এই

রাস্তার দুপাশে যত বাড়ি, অন্ধকারে

রাতের আকাশ খাচ্ছে ঘুলঘুলি ফাঁক করে

 

স্বর্গীয় রন্ধনশালা জুড়ে

( অনুবাদঃ রাকা দাশগুপ্ত)

ফেসবুকে বীতসত্য

( published in  aramva patrika )

 

download

ফেসবুকে বীতসত্য আমরা, হারিয়ে ফেলেছি স্বাভাবিক বুদ্ধি

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

ভার্চুয়ালের গুণগান করেছি অনেক। আজ একটু তাকানো যাক এর ক্ষতিকর দিকগুলির দিকে।

আসলে , যে কোন শক্তিশালী মাধ্যমের মতই, এই ফেসবুক একটি বড় মাধ্যম। আজ এই মাধ্যম প্রায় ঘুম কেড়ে নিয়েছে প্রথাগত সংবাদ মাধ্যমগুলির। কেননা তাদের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুততায় ফেসবুক পৌঁছে দিতে সক্ষম যে কোন সংবাদকে। মানুষের কাছে আগে কম্পিউটারের সুইচ অন করে বসবার অপেক্ষায় ছিল যা, এখন তা স্মার্টফোনের সহযোগিতায় চলে এসেছে আরো কাছে। হাতের মুঠোয় খবর। খবরের কাগজ দিনে একবার, সকালে , গলধঃকরণ করার মত রুটিন কর্মেরও আর সময় নেই তাই, সারাদিন ক্ষণে ক্ষণে আপডেট পেতে হবে। আর তা অনেকটাই সম্ভব করছে ফেসবুক।

কিন্তু অন্যদিকে, আমরা কে না জানি যে সত্যের জমানা থেকে আমরা সত্য পরবর্তী জমানায় এসে উপনীত হয়েছি, বলা যায় ‘বীতসত্য’ হয়েছি।  ট্রুথ এর দিন শেষ। এখন পোস্ট ট্রুথের জমানা। পোস্ট ট্রুথ কাকে বলে? সোস্যাল মিডিয়া ( ফেসবুক যার অন্যতম বাহন) তে প্রবাহিত ও প্রচারিত  ব্যক্তিগত ভাবনা-আবেগ-অনুভূতি থেকে সমষ্টি বা গোষ্ঠীর নানারকম প্রতিক্রিয়া-আবেগ-অনুভব যা ক্রমশ জনাদেশ এর আকার নিচ্ছে।  আনন্দ, শোক, উদ্‌যাপন, এইসব আবেগের ছড়াছড়ি এই নেট দুনিয়ায়। সবচেয়ে ক্ষমতাবান হল ঘৃণা । এই সব আবেগের মধ্যে প্রায় প্রধানতম বলাই যায় ঘৃণাকে।

ভুল হোক, ঠিক হোক, একটা খবর বা গুজব যখন এই নেট মাধ্যমে এসে পড়ল, বা তাকে সুচতুর ভাবে ছড়ানো হল, তখন যা হয় সে পরিস্থিতি দাবানলের মত । আনন্দের চেয়ে দুঃখের খবর বেশি বার শেয়ার হয়। সুস্থ নয়, অসুস্থ, কুৎসিত খবর বেশি বেশি ভাইরাল হয়।  মৃত্যু, ধর্ষণ, নগ্নতার ছবি বার বার ছড়িয়ে যায় এ দেওয়াল থেকে সে দেওয়ালে।

একটা খবর বা “প্রায়-খবর” ( ভাবনা, বিশ্বাস, জনশ্রুতি বা গুজব) মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় , ছড়িয়ে যায় এ ফোন থেকে ও ফোনে, এ ডিভাইস থেকে ও ডিভাইসে। যন্ত্রায়িত সামান্য এক ক্লিক  পারে যে কোন তথ্য বা তথ্যবিকৃতিকে পৌঁছে দিতে অসংখ্য মানুষের কাছে, এক যোগে।

এবং ক্রমশ অশিক্ষিত,  অর্ধশিক্ষিত,  না পড়া, কম পড়া অনেক মানুষের হাতে পড়ে এই শক্তিশালী মাধ্যম সুতরাং হয়ে উঠছে ভয়াল। বিকৃত মন্তব্য, তথ্য বা খবরের কারখানা। প্রচারের মাধ্যম।

এ তো গেল একটা দিক, এবার ধরা যাক আমরা কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি সোস্যাল মিডিয়ায়। এ আলোচনা  ভারতীয় প্রাচীন তর্কশাস্ত্রের বিতর্ক প্রতর্কের ধারায় ফেললে, ‘বাদ’ ‘বিবাদ’ ‘জল্প’, সব স্পর্শ করে শেষ অব্দি ‘বিতন্ডা’য় গিয়ে থামে। পরিভাষামতে বিতন্ডা শব্দের অর্থ, মূল আলোচনায় না থেকে, যেন তেন প্রকারেণ, উল্টোদিকের তার্কিক ব্যক্তিটিকে আক্রমণ করায় , হারিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর বুদ্ধিনাশ করার চেষ্টায় , উপনীত হয়। ব্যক্তিগত আক্রমণ হল সেই বিতন্ডার কুৎসিততম দিক। যেটা সবচেয়ে বেশি করে হয়ে থাকে ফেসবুকের পাতায়।

শুধু সেখানেই শেষ নয়। ধরা যাক ব্যক্তি ক এবং ব্যক্তি খ এর মধ্যে চলছে এই বাদবিতন্ডা। খানিক পরে দেখা যাবে, ক-এর চেলাচামুন্ডারাও আসরে নেমে পড়েছেন, এবং খ এর চরিত্র হনন করে করে একের পর এক মন্তব্য ও স্ট্যাটাস লিখছেন। মন্তব্য, মানে অন্যের স্ট্যাটাসের তলায় লেখা। আর নিজের স্ট্যাটাসে লেখা হল আরো গুরুত্ব দিয়ে একটি স্টেটমেন্ট দেওয়া। এসব ক্ষেত্রে দেখব, আজকাল সরাসরি আক্রমণ না করে, গা বাঁচানোর জন্য, নানাভাবে শ্লেষ ব্যঙ্গ ইত্যাদির ব্যবহার চলে, চলে খোঁচা দেওয়া। নাম উল্লেখ না করে, অন্যদের প্রতি মশকরা, মজা চলে। এই আমোদের পরিমন্ডলে আসল কথাটি ডুবে যায়। পড়ে থাকে শুধু আক্রমণ প্রতি আক্রমণের রক্ত ক্লেদ বসা।

উদাহরণ অনেক । তবে একটা ছোট্ট কথা বলেই শেষ করব।  যা ঘটেছে অমর্ত্য সেনকে নিয়ে। এক অদ্ভুত মন্তব্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন  রাজনীতিকের, যা নিজেই অগণতান্ত্রিক ও উদ্ভট। সেখানেই শেষ নয়। দায়বদ্ধ সকলেই, নীরবতা ভেঙে সোস্যাল নেটওয়ার্কে সে বিষয়ে পক্ষে বা বিপক্ষে মন্তব্য করতে।

ব্যাস, তারপর আর শেষ হয়না কথা।  ঢেউয়ের পর ঢেউ। পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য, মতামত। ক্রমশ হাতের বাইরে  চলে যায় এই ঢেউ। যে কোন ইস্যুতে, ক্রমশ “বিশ্বাসী” আর “অবিশ্বাসী” দুই দলে ভাগ হয়ে যায় ফেসবুক নিবাসীগণ, যারা কেউই একে অপরের কথা শুনছে না আর। চাইছেও না কোন গণতান্ত্রিক আলোচনায় যেতে।

 

fb cartoon

 

তথ্য বা সত্য কী? সত্য হল অমর্ত্য সেনের মত একজন অর্থনীতিবিদের কাজ ইশকুলের বাচ্চাদেরও জানার কথা। সেটা শুধু তিনি নোবেল জয়ী হিসেবেই নয়। সেটা শুধু তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বলেই না। সেটা এই জন্য, যে, তাঁর কাজের আধার কিন্তু ভারত এবং ভারতের দরিদ্র মানুষ। কেননা, যে কেন্দ্রীয় দলটির প্রতিভূ এই রাজনীতিক, সে কেন্দ্রীয় সরকারের ইশকুলের ইলেভেন টুয়েল্ভের ভূগোলের পাঠ্যপুস্তকেও উল্লিখিত আছে অমর্ত্যর কথা। বলা বাহুল্য,  অর্থনীতির বইতে তো আছেই। হিউম্যান ডেভেলাপমেন্ট ইন্ডেক্স কাকে বলে, এটা বোঝাতে গিয়ে  যখন ভূগোল বইতে অমর্ত্য সেনের কথা এসে পড়ে, দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের মাপক কাকে বলে সেটা বলতে গিয়ে যখন তাঁর কথা এসে পড়ে, তখন নিশ্চয় বুঝতেই হবে  যে সর্ব অর্থেই তাঁর কথা একটি বাচ্চাও জানে। কাজেই , উন্নাসিক যে সব তাত্ত্বিকরা দাবী করেন, যে “কমন সেন্স” বা “জি কে” দিয়ে অমর্ত্য সেনকে ধরা যায় না, অর্থনীতির অতি উচ্চস্তরের ছাত্র হতেই হবে তাঁকে বুঝতে গেলে, সে-কথাও যেমন ঠিক নয়, তেমনি এই বিখ্যাত রাজনীতিকের “উনি কী করেছেন? ওনার থিসিস কী নিয়ে? কেউ জানেনা, উনি নিজেও জানেন না” বলাটাও মূর্খতার পরিমাপক হিসেবে সোনার জলে বাঁধিয়ে রাখার মত। দুটি পক্ষেরই কথাগুলিও তাই অদ্ভুত… একেবারে বিচিত্র স্তরে পৌঁছে যায়।

দুই তীব্র মেরুকরণের মধ্যে গিয়ে ধাঁধিয়ে যাচ্ছে চোখ। আর ফেসবুকে গলা ফাটিয়ে “সত্য” আর “অসত্য”র মাঝাখানে বীত-সত্য বলে বলে, আমাদের কমন সেন্স সত্যিই আর কাজ করছে না! স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে আর কিছু নেই এখন আমাদের।

ক্লান্ত পাঠকের আত্মবীক্ষণ

 

download (1)( published in Presidency college alumni association magazine 2018)

 

 

ক্লান্ত পাঠকের আত্মবীক্ষণ

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

 

 

 

 

গত কয়েক মাসে ফেবু তে আস নাই বন্ধু! ইতিমধ্যে হেথায় মাথায় বালতি বালতি বরফ জল ঢালা , দশটি করিয়া প্রিয় বইয়ের নাম দিবার ছলে, গুচ্ছে গুচ্ছ রচনা সমগ্র, কবিতা সমগ্র, উপন্যাস সমগ্র ইত্যাদি ঢুকাইয়া  নিজ নিজ পান্ডিত্য প্রদর্শনের চিটিংবাজি, এবং আরো না জানি কী কী ফেসবুক ক্রীড়া হইয়া গিয়াছে। আঁচটুকু পাইয়াছ, সারটুকু বুঝিয়াছ।

.আজ এক কার্টুন দেখিয়াছি, চমৎকার, লাইকের দোকান খুলিয়া বসিয়াছে , যাহার প্রাণে বড় দুঃখ সে যতখুশি লাইক কিনিয়া বাড়ি ফিরিবে…সবই অনিত্য , সকলই মায়া!!! কাঁচকলা সিদ্ধ মাত্র সত্য।

যে যে মুহূর্তে নানাবিধ তরজায় আছ, নানা কূটকচালি, মন্তব্য , কটুকাটব্য করিয়া চলিয়াছ, সেই মুহূর্তে, খেয়াল রাখিবেন বন্ধুসকল, আপনি আসলে কিন্তু খুব তরল ও উপরিতলে কিছু মানুষের সঙ্গে মেলামেশাই করিতেছেন। খেয়াল রাখিবেন বন্ধুসকল, আপনার আশপাশের এই বন্ধুদের মধ্যে অনেকেই ভাল নাই। আমরা অনেকেই ভাল নাই। আমরা নিজেদের গোপন কথা, দুঃখের কথা, হতাশার কথা, অনেকসময় নিজেদের সমস্যার কথাও বলিতেছি না, শেয়ার করিতেছি না, কার্টুন আর জোকস ছাড়া কিছুই শেয়ার করিতেছি না। ইজ্রায়েল প্যালেস্টাইন সম্মুখসমর হইতেও  জরুরি এই কথাটি।

 

ইহাদের মধ্যে কোন কোন বন্ধুর ফেসবুক পেজ এখনো আছে। শুধু উহারা নাই। চলিয়া গিয়াছে অগম অঞ্চলে।

 

উহাদের আমরা ফ্রেন্ড লিস্টে দেখিতাম, কিন্তু জানিতাম না কী গভীর মানসিক অবসাদের ভেতর ধীরে ধীরে ডুবিয়া যাইতেছে তারা। বিষণ্ণ কোন কবিতা  পোস্ট করিতে দেখিয়াও  আমরা পাশ কাটাইয়া ভার্চুয়ালি আহা আহা অসাম করিয়া চলিয়া যাইতে পারি, যেভাবে পথে পড়িয়া থাকা অসুস্থ মানুষএর পাশ দিয়া চলিয়া যায় অজস্র চারচাকা দুচাকা।

এই একই আন্তরিক বিচ্ছিন্নতার আর একটা রূপ, ওয়াইট নয়েজ, অথবা সাদা আওয়াজ আনিয়া দিতেছে  এই প্রতি মুহূর্তে আমাদের মনের তটে আছড়ে পড়া এত এত খবর। ফলত আমাদের স্মৃতিশক্তি ক্রমক্ষীয়মান, ফলত আমাদের তীব্র অভিঘাতে বিদ্ধ হবার ক্ষমতা প্রায় শেষ।

 

আমরা হইতে না চাহিলেও ফেকু, ফেকু, ফেকু।

 

 

 

 

আশির দশকে হিন্দু কালেজে  অর্থাৎ কিনা প্রেসিডেন্সিতে পড়িবার সময়ে,আসল কবির পাশাপাশি ফেক বা ঝুঠা  কবিও অনেক  গজাইতে দেখিয়াছি কাছ হইতে।  সময়ের নিয়মে তাহারা ঝরিয়া পড়িয়া গিয়াছে, টেঁকে নাই।

 

সে উঠতি কবিদের কবিত্ব গজাইত যখন, তাহারা দাড়ি কামাইত না, প্রচুর চা খাইত, সে চা আবার তিনফুট হইত। তাহাতে চিনি ও দুগ্ধ থাকিলেও, চা কতটা থাকিত সন্দেহ। উঠতি কবিগণ ছিল আত্মপীড়নশীল। যথা , দিনের পর দিন সুস্থ ভাত ডাল না খাইয়া তিরিশ পয়সার চপ খাইয়া লিভারের বারোটা বাজাইতে, কালেজের পশ্চাত অংশে ডিরোজিওর কবর নামে কথিত নির্জন অগম্য স্থানে গাঁজা খাইতে এবং   নিজেই নিজের গাত্রে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিতে ভালবাসিত। তীব্র স্বরে তাহারা বিখ্যাত আত্মহত্যাকারী কবিদের তালিকা আওড়াইত। অকাল মৃত কবিদেরও খুব খাতির ছিল।

আর সারারাত্র হিন্দু হোস্টেলে সকলকার ঘুম নষ্ট করিয়া কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়িত, চীৎকার করিয়া।

প্রাতঃকৃত্যের বেগ যেমন প্রাতঃকালীন এক কাপ চা খাইলে আসে , বেশ কয় পাত জীবনানন্দ পড়িয়া  নিলেই তেমনই  তাহাদের কবিতা লেখার বেগ আসিত।

বস্তুত, অন্যের কবিতা পড়িতে পড়িতেই প্রতি কবির নিজস্ব লেখার পাঠ । তবে দ্রুত কাব্যলক্ষ্মীকে পকেটস্থ করিতে বিখ্যাত কবিদের কাব্য লইয়া সজোরে পাঠের দিন গিয়াছে। যেইরূপে      আমরা সবাই আমাদের ছোটবেলায় গাদা গাদা কবিদের বই কিনিয়া সেগুলি  পড়িতাম। আওড়াইতাম। ধ্যান জ্ঞান করিতাম।  যে যে নতুন কবি উঠিতেছেন, তাঁহাদের  লেখা পড়িয়াও  তুলকালাম আলোচনা হইত কলেজ ক্যান্টিনে।সে ইসব আর হয়না। এখন যত আলোচনা সকলই আত্মকেন্দ্রিক। সকলই নিজের ঢাক নিজে পিটাইবার  নিঃসঙ্গতাময় চর্চা।

 

ফেবুর ফেকুকবিরা কতটা আত্মপীড়নশীল জানি না। তাঁহারা ব্লু হোয়েল গেম খেলিতে বসা ছাড়া,  পূর্বের ন্যায় নিজ শরীরে ব্যথার পরীক্ষানিরীক্ষা করেন না, নিজেকে আতুর আর্তুর বা শীতল সিলভিয়া ভাবেন না।

 

ফেবুর ফেকুকবি বড়ই  একাকী।

 

তবে বলিতে গেলে, আমাদের পূর্ব প্রজন্মের তুলনায়, আমরাও একাকী ছিলাম। আমাদের আগের প্রজন্ম, পঞ্চাশ ও ষাটের কবিগণ যাহাই করিতেন সব গোষ্ঠীবদ্ধভাবে,  আড্ডায়, দল বাঁধিয়া। মধ্যরাতে ফুটপাত বদল করিয়া। । আমরা তাঁহাদের তুলনায় বিচ্ছিন্ন ছিলাম কিন্তু আমাদের ঘিরিয়া থাকিত  অনেক লেখক কবির বই ও মুখ… না দেখা কবিদের আত্মা আমার চারপাশে ঘুরঘুর করিত।

এই মুহূর্তে যে ফেবু কবিরা গজাইতেছে, তাহারাও কি এমন ডেড বা লিভিং পোয়েটস সোসাইটিতে থাকে? না কি তাহারা  বড় একা?
এতটাই একাকিত্ব যে বড় কবি, অগ্রজ কবি, না জানা কবি, সমসাময়িক কবিদের লাইন পড়িবার, মুখস্ত করিবার বা জোরে জোরে আওড়াইবার কোন অভ্যাস নাই।  সেই সঙ্গ জনিত মানসিক বন্ধুত্ব, মনোবল , ধারাবাহিকতার মধ্যে অবগাহন করিবার  আনন্দ নাই।  সমসাময়িকদের সহিত  স্বাস্থ্যকর রেষারেষি নাই।

 

অন্যকে পড়িয়া ভেতরে ভেতরে উদবুদ্ধ হওয়া, কখনো বা ভাবনা বা আদর্শটা  আবছা নকল করিবার মতও কোন প্রবণতা নাই। বরং কপি পেস্ট অথবা সরসরি চুরি ঘটিতেছে। নিজেকে জাহির করিবার, ফেরেব্বাজি করিবার অদ্ভুত প্রবণতা দ্রুত ছাইয়া গিয়াছে। যদিও কবিতা অন্তপ্রাণ বেশ কিছু তরুণ তরুণী তাহাদের লেখা লইয়া আবির্ভূত হইতেছে। পত্রিকাও বাহির করিতেছে। তবু যাহারা পূর্বে অদ্ভুতকর্মা, হাস্যকর ছিল, তাহাদের হাস্যকর মূর্তিগুলি ক্রমে আরো অবাস্তব ও ভার্চুয়াল হইয়া উঠিতেছে। আমি ইহাদের নাম দিলাম ফেকু।

 

কোন কোন ফেসবুককারী বলিয়াছেন, ফেসবুক সকলের জন্য এবং সাহিত্য সকলেই করিতে পারে… কোন কোন অ – ফেসবুক কারী বলিয়াছেন, ঈশ্বর যাহারা ফেসবুকে সাহিত্য করে তাহাদের ক্ষমা করিও… তাহারা জানে না তাহারা কী করিতেছে. কেহ আবার বলিয়া বসিলেন, যে, ফেবু হইল সেন্ট হেলেনা দ্বীপ, শুধু নির্বাসিতের স্থান। .এই নানাদলের লড়াইতে আসল কবিতার প্রাণ ওষ্ঠাগত!

 

আসলে কেবল কবি জগত নহে, সর্বত্রগামী এ ফেকুত্ব। যে কোন পেশায়, যে কোন নেশায় ফেকুবাজি চলিতেছে।

 

 

 

একের পর এক ফেকু ফেলিতেছি। মুহূর্তিক ফেকু কথাবার্তা, চেনাশোনা। বিতন্ডা। তর্ক । অনেক আদুরে চাহনি। প্রশংসা। প্রশংসার আয়ু মাত্র পনেরো সেকেন্ড। তাহার পর স্তুতি। শ্রদ্ধা। প্রণাম। নাম মাহাত্ম্য। তাহার পর ফেকু প্রেম ভালবাসা।  কিছুটা মাখোমাখো, কিছুটা অন্যমনস্ক।

এই সবকিছুর ভেতর দিয়ে চলিয়া যাইতেছে আয়ু।

আমার সমস্ত দিন কাটিয়া যাইতেছে,  ঘষঘষ। সে সময়ের অনেকটাই কাটিতেছে ফেসবুক, ওয়াটস্যাপ, তাহাদের সূক্ষ্মতম ছুরিকায়।

এই সময়যাপনের ভেতর কোন স্থিতুভাব নাই। নাই কোন দীর্ঘকালীন আরাম বা ক্ষান্তি। নূতন উত্তেজনা, নব নব ক্লান্তির উপাদান আছে।  নিজেদের ঘুমচোখকে বিস্ফারিত করিয়া দিবে এমন অশ্লীল কিছু, মজার কিছু। মজা, মজা, অনেক মজা চাহিয়া ফেকুগণ একেবারে আত্মহারা।

আজ মিস্টার ফেকুর জন্মদিন।  ফেকুর দেওয়ালে আজ অনেক হাতের ছাপ পড়িবে, HBD, MHROD । আজ ফেকুস্যার সাজিয়া গুজিয়া ছবি তুলিবেন । প্রোফাইল পিক পাল্টাইলে ১০০ আপ লাইক পড়িবে। কেহই জানিবে না, ফেকুর বয়স ৫৫ ছাড়াইয়াছে, চুলে কলপ তো দিয়াই থাকেন, তাহার সহিত অ্যাড হইবে ফোটোশপের কালির পোঁচ আর গালের ফ্যাট কিছুটা ছায়াচ্ছন্ন করিলেই বয়স কমিয়া ৪০ হইবে।

বুঝিলেন না সুধী পাঠক? আপনি বুঝি নেটধন্য নহেন? নাকি নাতি নাতনির হাত ধরিয়া ইঁদুর দৌড়, অর্থাৎ কিনা মাউজের দৌড়ে নামেন নাই? দেওয়াল মানে ফেসবুকের ওয়াল, হাতের ছাপ হইল পোস্ট। আর এইচ বি ডি হইল হ্যাপি বার্থ ডে। আর অন্যটা? মেনি হ্যাপি রিটার্ন্স অফ দ্য ডে। প্রোফাইল পিক হইল… যাক , আপনাকে আর বলিয়া কী হইবে। আপনি তো আর নিজের ছবি নিজের দেওয়ালে লটকাইয়া ধূপ ধুনা দিয়া পূজা করেন নাই। মিস্টার ফেকু, মিস ফেকুরা করেন।

পরদিবসেই ফেকুর জন্মদিন স্মৃতি একেবারেই গর্তে যায়। ডাস্টবিনে। মুহূর্তের ডাস্টবিন। সকলে ভুলিয়া যায়। দায়সারা ভালবাসা, মুসলমানের মুরগি পোষা।

 

 

আসলে ইহারা , অর্থাৎ ফেকুরা, এক নতুন প্রজাতির জীব। দেখিতে আমার আপনার মতই। ল্যাজ নাই, দুটা কান, দুটা চোখ, একটা ল্যাপটপ আছে। তবে, এক্ষণে বঙ্গভূষণ, বঙ্গবিভূষণ, বঙ্গ-অতিবিভূষণ যদি কেহই থাকিয়া থাকে তো সে ফেসবুক অর্থাত ফেবু নামক বিপুল বারিধিতে নৌকালীলা করা কলির কেষ্ট ফেকুগণ।

শুধু জন্মদিন কেন। সেলিব্রেশনের কিছু বাকি আছে নাকি?  যদি  পূজা পার্বণ মহোৎসব হয়, যদি বিজয়া রবীন্দ্রজয়ন্তী কি ঘনবরিষণ হয় তো সেলিব্রেশন করেন ফেকুগণ। ইহাদের হৃদয় ডাস্টবিনে সবার স্থান আছে। রবীন্দ্রনাথ হইতে মন্দিরা বেদী। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার হইতে দীপা কর্মকার। কিছু হইলেই হইল, জন্মদিন মৃত্যুদিন পুরস্কার প্রাপ্তি দৌড় লম্ফন হারা জেতা। কোন না কোনভাবে হৃদয় ডাস্টবিনেরে পূর্ণ করিতে হইবে।

আর মধ্যে মধ্যে ডিলিট বাটন টিপিতে হইবে। সব ঘড় ঘড় ঘড়াৎ যাইবে কালের গর্ভে।

যদি আজ বৎসরের শেষদিন হয় তো কথাই নাই, খাদ্যমদ্যে ফেকুদের মহোৎসব। মহোত্তম হৈহৈবৃন্দের লম্ফঝম্প। হুতোম বলিয়াছিলেন বৎসরের শেষ দিনে যুবত্বকালের এক বৎসর গেল দেখিয়া যুবক যুবতীরা বিষণ্ন হইলেন, ফেকুগণ দেখিলেন বড় মজা, সত্যকারের বয়স কাহাকেও দেখাইতে হয়না, ইহা ভার্চুয়াল জগত। এমনকি  যাহারা কেক বিস্কুট খাদ্যমদ্যাদির কাঙাল, অকেশন পাইলেই পার্টি করেন কিন্তু পয়সা খরচে বড় গাত্রে ব্যথা, তাঁহারাও দিনটির বড়ই আদর করিলেন।  কেননা আদতে ফেকু বলিয়া, আসলে ক্যাশবাক্সে হাত পড়িল না রাশি রাশি খাদ্যমদ্যের ফ্রি ডাউনলোড করিয়া পোস্ট করিতে লাগিলেন । কেহ জানিল না ট্যাঁকে কিছু নাই, বাড়িতে মুড়ি চিবাইয়া আছেন। নেট হইতে ভাল কেকটা, ভাল শ্যাম্পেনটা ,  ছবি হইয়া দেওয়ালে ঝুলিতে লাগিল।

এক্ষণে আমরা এজ অফ ইমেজেস এ আছি। ছবিসর্বস্ব জীবন। সেকালে বিছানার মাথার কাছে পয়ঁতাল্লিশ ডিগ্রি হেলানো অবস্থআয় মা কালী, পিতৃদেব, পিতামহ ও অন্য অন্য ঠাকুরগণের চিত্র ঝুলিত, সবুজ ছ্যাঁতলাপড়া দেওয়ালের গায়ে আহা কী শোভা দেখিতাম। আপাতত আমাদিগের ফোনে, ট্যাবে, ল্যাপটপে সর্বত্র ছবি ঝুলিতেছে। কালীপূজার কালী, দুর্গাপূজার দুর্গা, ফ্যাশনসপ্তাহের ঠ্যাংবাহির করা মডেল, গরমের আইসক্রিম, শীতের বনভোজনের আলুরদম, বর্ষার জলভরা ডাবের খোলা… সবই ছবি হইয়া ঝুলিতেছে।

আর আমরা ঝুলিতেছি, চীঈঈঈঈঈজ। অর্থাত ছবি তুলিবার পোজ, হাসি মুখ, দন্তবিকশিত মুখব্যাদানে জীবনের তাবত দুঃখ বাতিল , যেইভাবে টাকা না থাকিলেও, চকচকে জামা পরিলে টাকার অভাব খানিক পুরে, সেইরূপ আনন্দ না থাকিলেও, চকচকে হাসিলে , সে হাসিমুখ ওয়ালে, ওয়ালপেপারে লাগাইলে মনের দুঃখ খানিক পুরে। খানিক ঢাকা থাকে। বাহিরে প্যান্টুলুন, ভিতরে ছুঁচোর কেত্তনের ন্যায় ফেকুগণের সব দুঃখ, সব বেদনা, সব দারিদ্র্য চাপা পড়িয়া যায় কেবল এই ছবির দৌলতে।

ছবির মধ্যে বড় ছবি সেলফি। সেলফি একক, তুলিতে হইলে একা একা মুখব্যাদান করিয়া হাসিবে বা মুখ ছুঁচলো করিয়া অদ্ভুত চুম্বনোন্মুখ করিবে। সেলফির বহুবচন গ্রুপফি। অনেকে মিলিয়ে এক হইবে, এবং হাত গদখালির পেত্নির ন্যায় বাড়াইয়া ছবি তুলিবে। মুখমন্ডল সকল উদ্ভাসিত হইবে, গোলাপি চুণ পড়িবে আলোক উদ্ভাসের সহিত ফোনের নিজস্ব সেলফি মাস্টার অ্যাপ-এর কল্যাণে।

চকচকে যাহাকিছু তাহাই সোনা। বাকি সব ডিলিট বাটন। বাকি সব ডাস্ট বিন।

সেলফি তুলিতে তুলিতে মানুষ রেলব্রিজে উঠিয়া  ট্রেন চাপা পড়িল। গঙ্গার ধারের পাথরের উপর পা রাখিয়া পা পিছলাইয়া তাহাদের গঙ্গাপ্রাপ্তি হইল। সেলফি তোলা তবু থামিল না।

ছবিতেও ফেকু পর্ব আছে। সত্য ছবি চাইনা। মিথ্যা ছবি প্রয়োজন। গরমের ছুটিতে বেড়াইতে যাইতে রেস্তর অভাব? পকেট ঢু ঢু? তাহাতে কি? সার্চ করিয়া সুইজারল্যান্ডের চিত্র টাঙাও। গ্রীষ্মাবকাশের বদলে দৃশ্যাবকাশ রচিত হইল। মদ খাইবার টাকা নাই, মকটেল নামক ঝুঠা সবুজ রঙ পানীয় লম্বা গেলাসে লইয়া পোজ দিয়া ভাব করিতেছ, পৃথিবীর সবচাইতে মাতাল তুমি ও তোমার বয়ফ্রেন্ড?  তা বটে, আজিকালি মদালসা নারীর চাহিতে মজালসা নারী অধিক লাইক প্রাপ্তা হয়।

ফেকুগণ কথায় কথায় রাশি রাশি আমোদ করে, রাশি রাশি লাইকপ্রাপ্ত হইয়া দেখায়ঃ দ্যাখো আমি কত ভাল দেখতে। দ্যাখো আমি কী অপূর্ব শাড়ি কিনিয়াছি। দ্যাখো আমি কত ভাল সাজিতে পারি। দ্যাখো আমি কত সুন্দর পোজ দিতে পারি।

‘দ্যাখো আমি-‘ র কোন শেষ নাই। দ্যাখো আমি কী চমৎকার ফোটো তুলিতে পারি।  আমার তোলা ফোটোই না দেখিতেছ! দ্যাখো আমি কী ভাল রাঁধিতে পারি। এই তোমাদের পোলাও রাঁধিয়া ছবি ট্যাগ দিলাম। দ্যাখো আমি কত ভাল ঘর সাজাই। দ্যাখো আমার বইয়ের তাকে কত দেশ বিদেশের বই, আমি কত বিদ্বান।  দ্যাখো আমি দ্যাখো আমি দ্যাখো আমি।

হায়! কি দিনকাল পড়িল। ফেকুতে ফেকুতে ফেবু ছাইয়া গেল । ফেক আইডেন্টিটি, ফেক নাম, ফেক প্রোফাইল, ফেক ছবি। সব ফেক জানিতাম, এমনকি কলিযুগে ভালবাসা, প্রেম স্নেহ মমতা বন্ধুত্ব। কথার কথা বলিয়া দেশ উজাড় হইয়াছে ফেকু আবগে। তাও সহিতাম । শেষে দেখি, আর এক নতুন ফেকের ভেক। লেখক হইয়াছেন সব।

কাগজ নাই কলম নাই, শুধু মাউজ হাতে লইয়াই লেখক। টাকা চাইনা, কেবল ইন্টারনেট চাই। কীবোর্ড খুটখুটাইয়া লেখক বনিয়া যাইতেছে সদ্যোজাত বালকবালিকাগণ … বৃদ্ধ-প্রৌঢ়েরাও কম যায় না। সকল ফেকুগণ মহা মাতব্বর। লিখিলেই সারি সারি লাইক, বুড়া আঙুল উঁচাইয়া। আর ওয়াহ, অসাম, দারুণ , অসাধারণ, কী সুন্দর , আহা… ।  কমেন্টের বন্যা। ঝোপ বুঝিয়া কেবল কোপ মারনের অপেক্ষা। তক্কে তক্কে থাকিয়া মধ্যরাত্রে নোট পয়দা করিয়াছে। সকাল হইতা বার বার দেখিতেছে, কয়টা বুড়া আঙুল পড়িল। আহা, কী হাততালির আওয়াজ। সারি সারি অদৃশ্য সিটে ভর্তি জনতা … শ্রোতা ও দর্শক। অলীক , ভার্চুয়াল। তাহারা তালি মারিতেছে আর কবি লেখা পয়দা করিতেছে। পয়সা লাগে না। না লিখিতে, না তালি মারিতে। যদি প্রতি লেখা পোস্ট করিতে দু টাকা, আর প্রতি লাইক দিতে কুড়ি পয়সা ফাইন হইত তবে বুঝিতাম কত ধানে কত চাল!

ফেকুদের রাজনৈতিক চেতনার কথা আর কী বলিব, তাহাও অতি উন্নত। কে কী খাইল, কে কী রাঁধিল ইহা যেমন তাহাদের মনে খুবই গুরুত্বপূর্ন আন্দোলন উপস্থিত করিতে পারে, তেমনই, কোন রাজা, কোন রাজপুত্র চুরি করিল, কে মিথ্যা কথা বলিল, কোন নেত্রী কটা জুতা আলমারিতে আর কটা কঙ্কাল কাবার্ডে রাখিলেন তাহাও একে অপরের দেওয়াল হইতে শেয়ার করিয়া বসে আর মনে মনে বাহবা দেয়, আমি বড় প্রতিবাদী হইলাম, দ্যাখো সকলের জারিজুরি ফাঁক করিয়াছি।

সেদিন এক ফেকু দেখিলাম বড় বড় করিয়া লিখিয়াছেন, সব ব্যাটা চোর, সব ব্যাটা পকেটমার। সঙ্গে ডাউনলোড করা ছবি, কোন বিখ্যাত পত্রিকার নিউজ, চুরি হইয়াছে রাজকোষে। বুঝিলাম, প্রতিবাদ বড় বিষম বস্তু।

পরদিবসে দেখিলাম, মিশর বাংলাদেশের স্কোয়ারে স্কোয়ারে যত প্রতিবাদী সভা তাহার ছবি টাঙাইয়া প্রতিবাদ দেখানোর তুষ্টি পাইয়াছেন ফেকু রা। ইহাদের একবার যদি অগণতান্ত্রিক উপায়ে হাজতবাস করানো যাইত, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের নামে হুংকার ছাড়া বন্ধ করা যাইত।

ফেবুর  আর এক ফেকু হইল কথায় কথায় কংগো, কংগো, কনগ্রাচুলেশনের বন্যা। কুড়ি বৎসর পূর্বের বিবাহের ছবি পোস্টাইলেন, এই জমানায় কঙ্গো পড়িল বিস্তর। কেহ পুরস্কার পাইয়াছিলেন মান্ধাতার আমলে, ছবি সাঁটাইলেন, কঙ্গো পড়িল… হায়, কনগ্রাচুলেশনের মাথা নাই, ল্যাজা নাই।

তবে ফেসবুকের আমোদ শীঘ্র ফুরায়, অভিনন্দনের অকেশনও পরদিবসে বাসি পচা গলা ও ধসা হইয়া যায়, ক্রমে একই পোস্ট তেতো হইয়া পড়ে, টাটকা অকেশন টাটকা –টাটকা থাকাই ভাল।

নিচে দিলাম কয়েক ফেকুর কার্যকলাপের বিবরণ, পড়িয়া পাঠক হও অবধান, সাবধান।

এক ফেকু মহাশয় প্রথমে বড় মানুষের বাড়ির রবিবারের আড্ডায় স্রেফ হাজিরা দিতেন, বড় বড় পন্ডিতগণ সেখানে কথা বলিতেন, ফেকুবাবু শুধু হাঁ-টা হুঁ-টা দিতেন। বা, মুখে কিছু না বলিয়া, কেবলি ঘন ঘন মাথা নাড়িতেন। সেখানে পাত না পাইয়া এখন আর বাড়ি হইতে বাহিরান না। অনেক সহজ হইল , বাস ভাড়া নাই, পাটভাঙা জামাটি পরিবার কসরত নাই, হাঁটিয়া স্টপ হইতে বড়মানুষ দাদার বাড়ি যাওয়ার ঝামেলা নাই। বাড়ি বহিয়া গিয়া দুইচারিটা গালাগাল খাওয়া নাই। এখন ফেবুতে ঢুকিয়া মহাশয় সকাল সকাল বসিয়া পড়েন। আড্ডা মারেন, চ্যাটান। আর সাহিত্য গ্রুপ ভিজিট দ্যান।

আপাতত নানা গ্রুপে হাজিরা দিবার ফলে, বিশেষ কিছু কিছু অন্য অন্য ফেকুগণের লেখায় লাইক দিবার ফলে, আর অন্য গ্রুপের কারো কারো পোস্টে আগু বাড়াইয়া গালি দিয়া, সমালোচনার নামে ঝগড়া করিয়া আসিবার ফলে, গ্রুপ মডারেটরগণের সূক্ষ্ম বিবেচনায়, জনৈক ফেকু সম্পাদকের সুপারিসে ও জনৈক বড়দার কৃপায় নিজেই পন্ডিত হইয়া পড়েন।  এখন নিজে  তিনি গল্প, কবিতা ও মুক্তগদ্য লিখিয়া পোস্ট দেন যথাসম্ভব বেশি সংখ্যক লাইক পান, ছিপ ফেলিয়া সকাল হইতে ফেবুতেই বসিয়া থাকেন। কসরতের মধ্যে শুধু মাঝে মাঝে উঠিয়া গিয়া বইয়ের তাক হইতে এক আধখান কোটেশনের বই নামানো আর ঝাড়িয়া দেওয়া। ঐটুকু না করিলে ভয় আছে। শুনিয়াছেন কোন এক বাবু সারাদিন কম্পিউটারের সম্মুখে বসিয়া থাকিয়া থাকিয়া শেষ অবধি মহাপুরুষের ন্যায় হইয়া গিয়াচেন।  ধ্যানস্থ হয়ে ফেসবুক করেন, গায়ে বড় বড় অশোথগাছ ও উইয়ের ঢিপি হয়ে গিয়েছে!

এক একজন ছিলেন,  রোজ সকালে বঙ্গভাষার ব্যাকরণের গুষ্টির তুষ্টি করিয়া কবিতায় স্ট্যাটাস দিতেন। সবাই বাহা বাহা করিতে। একদিন খেয়াল করিলেন, স্ট্যাটাস তো দিনগত পাপক্ষয়ের ন্যায় ক্ষয় পাইয়া যায়। ফেবু-র স্ট্যাটাস দুইদিনেই বাসি। দীর্ঘ আয়ু লাভ হইবার সম্ভাবনা নাই। সময়ের ডাস্টবিনে যতই ঢাল, সবই ত লয়প্রাপ্ত হইবে।

তাই, সব ফেকু মিলিয়া বুদ্ধি বাহির করিলেন। সব ফেকু ঠিক করিলেন, তাঁহাদের সব স্ট্যাটাস একত্র করিয়া বই করিবেন, এই মানসে “ স্ট্যাটাস-সমগ্র” বাহির করিবেন ভাবিতেছেন। ইহাই তাঁহার জীবনের হাই পয়েন্ট হইবে।

বিল গেটস সায়েবের কথা অমৃতসমান, তিনি নাকি বলিয়াছেন শুনিলাম, এই বিশ্বগ্রামের কেন্দ্রীয় প্লাজা ইন্টারনেট। আমি বলি, ফেকুদের রাজত্বে বিশ্বগ্রামের চন্ডীমন্ডপ হইল ফেবু, অর্থাৎ ফেসবুক। চন্ডীমন্ডপে সারা পাড়ার কেচ্ছা ঘাঁটিয়া আসিয়া বসিলাম, দুদন্ড জুড়াইলাম, গায়ের ঝাল ঝাড়িয়া গালি দিলাম বড় বড় মানুষকে, নিজের কবিতা আউড়াইলাম, তাহার পর বাড়ি গিয়া ঘুমাইলাম। আহা! বড় সুখ, বড় আনন্দ।

 

এদিকে ত ঘুম উড়িয়াছে  প্রথাগত সংবাদ মাধ্যমগুলির। কেননা তাহাদের চাইতে অনেক বেশি দ্রুততায় ফেসবুক পৌঁছাইয়া  দিতে সক্ষম যে কোন সংবাদকে মানুষের কাছে । আগে কম্পিউটারের সুইচ অন করিয়া  বসিবার অপেক্ষায় ছিল যা, এখন তা স্মার্টফোনের সহযোগিতায় চলিয়া আসিয়াছে আরো কাছে। হাতের মুঠোয় খবর। খবরের কাগজ দিনে একবার, সকালে , গলধঃকরণ করার মত রুটিন কর্মেরও আর সময় নাই তাই, সারাদিন ক্ষণে ক্ষণে আপডেট পাইতে হইবে।

 

 

অন্যদিকে,  সকল সংবাদ , সকল সত্য, ঘেঁষিয়া আরো কিছু অর্ধসত্য ও অসত্য মানুষের জটিল কুটিল মনের গতির সহিত যুক্ত হইতেছে। আমাদের কাছে প্রতিভাত হইতেছে। তাহারা আমাদের বিশ্বাসকে, অন্ধতাকে, ভক্তিকে, অজ্ঞানতাকে, অবলম্বন করিয়া বাড়িয়া উঠিতেছে। ফেসবুকে বীতসত্য আমরা, হারাইয়া ফেলিতেছি  স্বাভাবিক বুদ্ধি। আমরা কে না জানি যে সত্যের জমানা হইতে আমরা সত্য পরবর্তী জমানায় উপনীত হইয়াছি, বলা যায় ‘বীতসত্য’ হইয়াছি।  ট্রুথ এর দিন শেষ। এখন পোস্ট ট্রুথের জমানা। পোস্ট ট্রুথ কাহাকে বলে? সোস্যাল মিডিয়া ( ফেসবুক যার অন্যতম বাহন) তে প্রবাহিত ও প্রচারিত  ব্যক্তিগত ভাবনা-আবেগ-অনুভূতি থেকে সমষ্টি বা গোষ্ঠীর নানারকম প্রতিক্রিয়া-আবেগ-অনুভব যা ক্রমশ জনাদেশ এর আকার লইতেছে ।  আনন্দ, শোক, উদ্‌যাপন, এইসব আবেগের ছড়াছড়ি এই নেট দুনিয়ায়। সর্বাধিক ক্ষমতাবান হইল ঘৃণা । এই সব আবেগের মধ্যে প্রায় প্রধানতম বলাই যায় ঘৃণাকে।

ভুল হোউক, ঠিক হোউক, একটা খবর বা গুজব যখন এই নেট মাধ্যমে আসিয়া পড়িল, বা তাহাকে সুচতুর ভাবে ছড়ানো হইল, তখন যা হয় সে পরিস্থিতি দাবানলের মত । আনন্দের তুলনায় দুঃখের খবর বেশি বার শেয়ার হয়। সুস্থ নহে, অসুস্থ, কুৎসিত খবর বেশি বেশি ভাইরাল হয়।  মৃত্যু, ধর্ষণ, নগ্নতার ছবি বার বার ছড়াইয়া যায় এ দেওয়াল হইতে সে দেওয়ালে।

একটা খবর বা “প্রায়-খবর” ( ভাবনা, বিশ্বাস, জনশ্রুতি বা গুজব) মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হইয়া যায় , ছড়াইয়া যায় এ ফোন হইতে ও ফোনে, এ ডিভাইস হইতে ও ডিভাইসে। যন্ত্রায়িত সামান্য এক ক্লিক  পারে যে কোন তথ্য বা তথ্যবিকৃতিকে পৌঁছাইয়া দিতে অসংখ্য মানুষের কাছে, এক যোগে।

এবং ক্রমশ অশিক্ষিত,  অর্ধশিক্ষিত,  না পড়া, কম পড়া অনেক মানুষের হাতে পড়িয়া এই শক্তিশালী মাধ্যম সুতরাং হয়ে উঠিতেছে ভয়াল। বিকৃত মন্তব্য, তথ্য বা খবরের কারখানা। প্রচারের মাধ্যম।

ভারতীয় প্রাচীন তর্কশাস্ত্রের বিতর্ক প্রতর্কের ধারায় ফেলিলে, ‘বাদ’ ‘বিবাদ’ ‘জল্প’, সব স্পর্শ করিয়া সর্বাধিক নিচু স্তরের  ‘বিতন্ডা’ই যেন এর পরিণতি। পরিভাষামতে বিতন্ডা শব্দের অর্থ, মূল আলোচনায় না থাকিয়া, যেন তেন প্রকারেণ, উল্টোদিকের তার্কিক ব্যক্তিটিকে আক্রমণ করার , হারাইবার চেষ্টা।  বুদ্ধিনাশ করিবার চেষ্টা।  ব্যক্তিগত আক্রমণ হইল সেই বিতন্ডার কুৎসিততম দিক। ইহাই সবচাইতে বেশি করিয়া হইয়া থাকে ফেসবুকের পাতায়।

শুধু সেখানেই শেষ নহে। ধরা যাক ব্যক্তি ক এবং ব্যক্তি খ এর মধ্যে চলিতেছে এই বাদবিতন্ডা। খানিক পরে দেখা যাইবে, ক-এর চেলাচামুন্ডারাও আসরে নামিয়া পড়িয়াছেন, এবং খ এর চরিত্র হনন করিয়া  একের পর এক মন্তব্য ও স্ট্যাটাস লিখিতেছেন। নানাভাবে শ্লেষ ব্যঙ্গ ইত্যাদির ব্যবহার চলে, চলে খোঁচা দেওয়া। নাম উল্লেখ না করিয়া, অন্যদের প্রতি মশকরা, মজা চলে। এই আমোদের পরিমন্ডলে আসল কথাটি ডুবিয়া যায়। পড়িয়া থাকে শুধু আক্রমণ প্রতি আক্রমণের রক্ত ক্লেদ বসা।

তাহা হইলে উপায় কী?

কী করিব?

ফেবু স্থল অনতিবিলম্বে ত্যাগ করিব? স্মার্টফোনগুলি গঙ্গায় বিসর্জন দিব? দ্রুত আবার ফিরিয়া যাইব আনস্মার্ট যুগে? দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর বলিয়া ক্রন্দন করিব?

পারিব কি?

আজ জোড়াসাঁকোর ফ্লাইওভার ভাঙিলে ফেবুতে পাঁচ মিনিটে চিত্র দেখিয়া ফেলিতেছি। প্রিয় কোন কবি সাহিত্যিক বা চিত্রতারকার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সে খবর দাবানলের ন্যায় ভাইরাল হইয়া জানিয়া যাইতেছে সকলে। দ্রুত খবর আদান প্রদানের সহিত, দ্রুততায় দূরতর স্থল গুলির যোগাযোগ, দূরস্থ মানুষের যোগাযোগ, বার্তার প্রেরণ, ইহাকেই আমরা  পৃথিবীর যাবতীয় উন্নয়নের  কারণ জানি। দ্রুততাই প্রগতির সমানুপাতিক ভাবি।  যদি আজ সমস্ত ঘটনা মুছিয়া প্রাচীন যুগে ফিরিতে চাই, পায়ে পায়ে বাধা পাইব।

সুতরাং হংস যেমত জলমিশ্রিত দুগ্ধ হইতে বাছিয়া লইতে থাকে সার পদার্থ, সেই ভাবে আমাকেও বাছিতে হইবে। ফেকু মুহূর্ত ফেলিয়া আসল মুহূর্ত লইব। ফেকু কবিতা ফেলিয়া আসল কবিতা লইব। ফেকু মানুষ ছাড়িয়া আসল মানুষের কাছে হাত পাতিব। এ শিক্ষা করিতেই হইবে।

 

আর , হয়ত , মাঝে মাঝে সকল ডিভাইস হইতে লগ আউট করিয়া, সকল যন্ত্র আনপ্লাগ করিয়া , ফিরিয়া যাইতে হইবে পুরাতন কোন বৃক্ষ, কোন সমাধি, কোন প্রস্তরগাত্রে উৎকীর্ণ বাক্য অথবা, কোন বইয়ের নিকটে।  প্রাচীন, প্রায় অবলুপ্ত ভাষায় লিখিত এমন কোন বই, যা আজো আমাদের আলোকবর্তিকার ন্যায় পথ দেখায়। সে সুসমাচার খুঁজিয়া লইবে ত আমার আপনার মত ক্লান্ত পাঠকই।

 

উত্তমপুরুষ

uttam purush

(প্রকাশিত, সংবাদ প্রতিদিন রোব্বার, ২৩ জুলাই ২০১৭)

উত্তমকুমারের প্রজন্মের সঙ্গে আমার প্রজন্মের তফাত একটা ধাপ। আমার মায়ের হার্টথ্রব উত্তমকুমার। মা যখন ১৯৫০ এর আশ পাশে পঞ্চদশী বিনুনিকরা সদ্য ডুরেশাড়ি ধরা ক্লাস নাইনের ব্রাহ্মবালিকা শিক্ষালয়ের কন্যা , তখন উত্তমকুমারের পদচারণার শুরু।
দাদা বা মেশো, মাসি বা কাকিমার সঙ্গে দল বেঁধে সিনেমা হল যাবার দিনকাল তখন। দেশ স্বাধীন হবার পর পর পার্টিশনের বেদনার তীক্ষ্ণতা , দলে দলে মধ্যবিত্তের রাস্তায় নেমে আসার কাতরতা, অনিশ্চিতির আবহে, সিনেমার রুপোলি পর্দা থেকে একটি সাদা ফতুয়া পরা যুবকের লড়াই ঝাঁপিয়ে পড়ছে তরুণ তরুণীদের মনে। শোনো বন্ধু, শোনো, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা।
এক তরুণ হেমন্তকুমারের কন্ঠ থেকে ঝরে পড়ছে গান। দীর্ঘদেহী হেমন্তকুমারের সাদা পাঞ্জাবি শার্টের সঙ্গে উত্তমকুমারের পর্দা উপস্থিতির শার্টের খুব তফাত নেই। বাঙালির আর্কিটাইপ তৈরি হয়ে উঠছে।
সিনেমাহলের থেকে বেরিয়ে মুগ্ধতার রেশ আর কাটছেই না মায়েদের। বাড়ি ফিরেই কোমরে আঁচল জড়িয়ে মায়ের সঙ্গে ভাত বা ডালের হাঁড়ি নাড়াচাড়া করছে আমার কিশোরী মা তখন।
তাইই, সুচিত্রা সেনের সিল্কের ব্লাউজের পিঠজোড়া কলকা, গায়ের সঙ্গে সেঁটে থাকা হাতার সেই ব্লাউজ, দেখে আমার মায়ের প্রথম “বিয়ের জন্য স্টুডিওতে গিয়ে তোলা ছবি”টা মনে পড়ে। অথবা উল্টোটা। মায়ের ছবিটা দেখলেই আমার উত্তম সুচিত্রা মনে পড়ে।
পঞ্চাশ দশকের সেই দিনগুলোয় আমি যেহেতু ছিলাম না, তাই আমি যেন আরো বেশি করে ছিলাম। আকাশে বাতাসে লীন হয়ে হয়ে বাবা আর মাকে অনুসরণ করছিলাম। বাবা তখন বহরমপুরের কলেজে কেমিস্ট্রি পড়া শেষ করে বৈজ্ঞানিক হয়ে উঠবে বলে হিজলিতে আসাযাওয়া করে। পি এইচ ডি করার জন্য। হিজলিতে জেলখানাকে আই আই টিতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে তখন।
এসব সময়কে রোমান্টিক সময় ভাবি আমি। এসব সময়কে উত্তম সুচিত্রা সময় বলি। আমার কমফর্ট জোন এই সময়।
কাট টু ১৯৮০। হঠাৎ মৃত্যূ হল উত্তমকুমারের। ওগো বধূ সুন্দরীর সেটে অসুস্থ হলেন । মৃত্যুর পরদিন কলকাতা উত্তাল। ভবানীপুর অঞ্চলের মাসি পিশি কাকিদের দেখলাম ছুটে ছুটে রাস্তায় যেতে, উত্তমের শবদেহ দেখতে। মজা করে বলা হল, অর্ধেক বাঙালি মহিলা বিধবা হলেন।
আমাদের দুর্ভাগ্য যে উত্তমকুমার চলে গেলেন। অথবা আমাদের সৌভাগ্য, যে , উত্তমকুমার তখনই চলে গেলেন। বাংলা ছবির ভয়াবহ দুর্দশার দিন তখন।ক্রমাগত কমে আসছে হলে গিয়ে বাঙালির ছবি দেখার আকর্ষণ। ভাল লাগার গ্রাফে উঁচু স্থান নিচ্ছে হিন্দি ছবিরা। একটি দাদার কীর্তি অবশ্য বহুদিন পর মানুষের মন কেড়েছে। কিন্তু সেটা একটা ব্যতিক্রম। অমিতাভ বচ্চনের বয়স বেড়েছে তবু আওয়ারার মত ছবিও লোক টানে। বাংলা ছবি কম। সে জায়গা বরঞ্চ নিচ্ছে দূরদর্শনের প্রোগ্রাম। কিন্তু বাহান্ন সপ্তাহের সিরিয়াল আসেনি।
তারই ভেতরে সপ্তাহের পর সপ্তাহ চলতে লাগল অগ্নিপরীক্ষা, সপ্তপদী, হারানো সুর, পথে হল দেরী, সাগরিকা, শিল্পী, এইসব ছবি। ‘মিনার- বিজলী -ছবিঘর’, ‘রাধা -পূর্ণ- প্রাচী’, ‘রূপবাণী -অরুণা- ভারতী’র মত চেন সিনেমা হল অনেক দিন পর দারুণ লাভের মুখ দেখল। রীতিমত রমরমিয়ে শুরু হল আমাদের উত্তম নস্টালজিয়ার দিনকাল। ‘
যদিও শুরুর দিকে আমার মত অষ্টাদশীর কাছে লিপস্টিক পরা উত্তমকুমার হাস্যকর। যদিও আমাদের মধ্য থেকে তখনো যায়নি তীব্র প্রতিক্রিয়া, অতি রোমান্টিকপনার প্রতি। আমাদের বাংলাভাষায় দক্ষ বান্ধবী বলেছে, এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত, এরকম গ্রামার ভুল লিরিক কেন। আর কয়েকদিন পর এই গান দিয়ে বিস্কুটের বিজ্ঞাপন হবে, আর এই আইকনিক গান ঢুকে যাবে আমাদের সমবেত অবচেতনে। আমরা জাগ্রতাবস্থায়, পলাশশিমুলের গাছের নিচে সুচিত্রার কোলে মাথা রেখে শয়ান উত্তমের ঢুলুঢুলু চোখ, আর সেই “তুমি যে আমার” গানের মধ্যে ঢেলে দেওয়া সার্বিক আত্ম নিবেদন নিয়ে হাসাহাসি করেও , স্বপ্নে বহুক্ষণ দেখি…
কিছুদিনের মধ্যে ‘ তুমি যে আমার “ হয়ে ওঠে আমার প্রিয়তম গান। গীতা দত্তের কন্ঠ আমাকে নিয়ে যায় দূর কোন পরবাসে, যেখানে তৈলাক্ত দু বিনুনির , টাইট রঙিন ব্লাউজের, সাদা ডুরে শাড়ির আমার মা, আর বুশশার্ট পরা আমার বাবা ঘুরে বেড়ায়।
কাট টু ২০০৫। আমাদের সিডি যুগ। ভিসিডি বা ডিভিডিতে পুরনো সাদাকালো বাংলা ছবি কিনে বাড়ি ভরাচ্ছি। দেখছি ডিভিডি প্লেয়ারে বা কম্পুটারে। আমার পাঁচ বছরের মেয়ে, কে জানে কেন, অই জুড়িটিকে খুব ভালবেসে ফেলেছে। উত্তমকাকু সুচিত্রাকাকিমা বলে ডাকে। দু প্রজন্মের বদলে ও এক প্রজন্মে ঠেলেছে ওদের। চিনেছে পাহাড়ি সান্যাল ছবি বিশ্বাস বিকাশ রায়কে, ওর বাবা মার হাত ধরে।

নস্টালজিয়ার ট্রিপে , আমার মেয়ের প্রজন্ম এখন এতটুকুও কষ্ট করতে হয়না, মোটা ঠোঁট থ্যাবড়া নাক, কপালে কেশদামের হামলে পড়া , সাদা মেকাপের তলায় ঢাকা “ঘরোয়া” দক্ষিণ কলকাতার ছেলেটিকে নায়ক ভাবতে। চুঁইয়ে পড়া গ্ল্যামারের ক্রম উত্তরণ দেখতে। নায়ক ছবির নায়ককে বুঝতে। বলা হয়ে থাকে, ব্র্যান্ড গড়ে ওঠে সংযোগ বা কমিউনিকেশনের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে উত্তম ব্র্যান্ড যে কতটা হটকেক, তা এতেই স্বতঃপ্রমাণ! কারণ, ঐ, সহজে বোঝা যায় তাকে। নেই তার কোন “ইন্টেলেকচুয়াল” দূরত্ব। আর বাইনারিতে বিশ্বাসী আমাদের মধ্য-বর্তী প্রজন্ম যেভাবে সৌমিত্রকে কাছে টানতে গিয়ে উত্তমকে দূরে ঠেলতে চাইতাম নানা অজুহাতে, আমাদের পরের প্রজন্মের সেরকম কোন “আদর্শবাদী” দায় ঠেকেনি। তারা নির্মোহভাবে স্বীকার করে , উত্তমকুমারের কোন বিকল্প নেই প্রেমের দৃশ্যে।

 

uttam purush 2.jpg

 

উত্তমকুমার বহুদিন ধরেই, বলতে কি, তাঁর জীবিত কালেই, একটি ব্র্যান্ড। তপন সিং হের ‘ গল্প হলেও সত্যি’ ছবিতে , উল্টোরথে প্রকাশিত উত্তমকুমারের সাক্ষাৎকারের অংশ পড়ে শোনাচ্ছে ধনঞ্জয় ( রবি ঘোষ) বড়মা মেজমাকে। ছায়াদেবী বলছেন, আমাদের সময়ে ছিল দুর্গাদাস ছায়া দেবী। তপন সিং হের তীক্ষ্ণ মেধা খেলা খেলিয়ে নিয়েছে বাঙালি আম দর্শকের মাথা দিয়ে। যখন, ছায়াদেবীর বৌমা “কী যে বলেন না মা, উত্তমকুমারের মত কেউ কোনদিন হবে না” বলে রেগে উল্টোরথ কেড়ে নিয়ে ওপরে চলে যায়, তখন সেই প্রজন্মের তরুণী বধূদের উত্তম অভিপ্রায়টুকু দেগে দেন পরিচালক। কীভাবে ব্র্যান্ড ভ্যালু তৈরি হয়েছে নেহাতই পঞ্চাশ দশক থেকে শুরু করে এই অভিনেতার, স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই ছবি ১৯৬৬ র । এই বছরই সত্যজিৎ রায় তৈরি করেছেন “নায়ক”। উত্তম নামক ব্র্যান্ড ভ্যালুকে পর্যবেক্ষণের আতশকাঁচ।
এর আগের দশকে, সদ্য স্বাধীন ভারতের পীড়িত, আশা নিরাশায় স্পন্দিত বাঙালিকুলের মনের মত একটা মাধ্যম রমরমিয়ে উঠেছিল উত্তম কুমারের মত অভিনেতাদের সম্বল করে, অগ্রদূর অগ্রগামী র মত পরিচালকগোষ্ঠীর হাত ধরে, বিনোদন শিল্পের ক্রম অগ্রগতি বার বার ছুঁতে চাইছিল সমসাময়িক বাস্তবতার উতরোল অবস্থাকে। পৃথিবী আমারে চায়-এর বেকার যুবক যুবতী অথবা ইন্দ্রাণী-র নারী পুরুষের কাজের ক্ষেত্র থেকে শহর গ্রামে কাজের পরিসরের প্রশ্ন তোলা , সবটাই খুব স্পর্শকাতর, ছুঁয়ে দেখার মত।
এমনকি গণতন্ত্রের প্রকল্পনার কথাও সাড়ে চুয়াত্তর –এর রামপ্রীতিরূপী উত্তমের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে নিপুণভাবে বলে দেন বিজন ভট্টাচার্যের মত লেখক। জমিদারের ছেলে হয়েও শহরের মেসে এসে সে থাকে, সবার সঙ্গে সু সম্পর্ক, লিডার গোছের ব্যক্তিত্ব। কিন্তু পুরুষদের মেসে মহিলাদের এসে থাকা নিয়ে তার আপত্তি উড়ে যায় সমবেত ভোটের ভিত্তিতে। তার মত না নেওয়া নিয়ে চটজলদি জবাব দেয় কেদাররূপী ভানু, তারে আমরা সেক্রেটারি করসি, তাই না সে আমাগো লিডার হইসে। অর্থাৎ ক্ষণে ক্ষ্ণে অন্যদের মন জুগিয়ে চলাই লিডারের কাজ। এবং নিজের প্রেমকে গোপন রাখতেও চায় উত্তম সে কারণেই। অর্থাৎ জনগণেশকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগতকে সে অন্যদের ওপরে চাপিয়ে দিতে পারে না।
গণতন্ত্র, গ্রাম শহর, শহরভিত্তিক অজ্ঞাতকুলশীলের হঠাৎ সাফল্য, ধনী দরিদ্র, এইসব সমীকরণ ফিরে ফিরে আসে উত্তমকুমার অভিনীত সিনেমার চিত্রনাট্যে। নানা ছবি খুঁজলেই আমরা এসব প্রশ্ন পাই। নবীণ প্রবীণের সংঘাত, বদলে যাওয়া প্রজন্মের আশা আকাঙ্ক্ষা, এবং, হ্যাঁ অবশ্যই , জেন্ডার প্রশ্ন।


আমাদের ছোটবেলাটা কেটেছে এইসব নানা বাইনারি বা দুই প্রান্তের টানাপোড়েনে। আমরা দেখেছি বাড়িতে, নরম সন্ধ্যারাণী মডেলের মা আর কড়া কমল মিত্র প্যাটার্নের বাবাদের।
আমরা দেখেছি ছায়াদেবী প্যাটার্নের রাগি মায়েদেরও । রাজকুমারী ছবির তনুজাকে উদ্ধার করতে অবশ্যই একটি উত্তমকুমার লেগেছিল। আমাদের উদ্ধার করত কে যে?
উত্তমকুমার নামক ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠান টেক্সট বা বয়ান, যাই বলুন আর তাই বলুন, আমাদের মধ্যবিত্ত চেতনার টানাপোড়েনের সুতো এখন। ওঁকে ছাড়া আমরা? ভাবাই যায়না।

ভালোবাসার গল্প : একটি কথোপকথন

সানন্দায় প্রকাশিত

অগ্নি রায়ের সংগে যশোধরা রায়চৌধুরীর কথাবার্তা ( sananda online magazine  6 july 2019) bhalo

 

 

 

ডিসেম্বর ২০১৮  তে প্রকাশের পর পরই, অগ্নি রায়ের হাতে আসে যশোধরা রায়চৌধুরীর “ভালবাসার গল্প” বইটি। সোপান প্রকাশনের ২৫ টি গল্পের এক সংকলন। এক বসন্তের দুপুরে হঠাৎই অগ্নি রায় ফোন হাতে নেন আর ওয়াটস্যাপে কথা বলতে শুরু করেন যশোধরার সঙ্গে। যে কথোপকথনটি হয়ে ওঠে তা হয়ত ঠিক বই সংক্রান্তই নয়। সাহিত্য ও নস্টালজিয়া থেকে প্রেম ও শরীর, অনেক কথাই উঠে এসেছে এই স্বতঃস্ফূর্ত কথোপকথনে।

 

 

অগ্নি:  বাবু সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় একবার অপূর্ব বলেছিলেন। মাঝখানে যে টলটলে নীল জল, তা হল পদ্য। আর তাকে যে চারদিক থেকে ভালবেসে বেড় দিয়ে রাখে ঘিরে রাখে সেই ডাঙাটি গদ্য!  তোমার ‘ভালবাসার গল্প’ গ্রন্থটির সঙ্গে বসবাস করছি বেশ কিছুদিন ধরেই তুমি জানো। আর সেটা করতে গিয়ে প্রথমেই যেটা মনে হয়েছিল, এই গদ্য এবং পদ্যের সিমবায়োসিস এবং তারতম্যের আলো আঁধারি  এই বইয়ে অপূর্ব খেলা করেছে। যে তুমি কবিতা লেখো সেই সত্ত্বার সঙ্গে তোমার গদ্যকার মনের একটা দারুন মিলমিশ এই অন্যরকম ভালবাসার গল্পগুলিতে। যদিও পাটিগণিতের মত এর একমাত্রিক উত্তর হয় না, তবুও জানতে চাইবো, এই গ্রন্থের গল্পগুলি যে ভাষা ধারণ করে আছে তার সঙ্গে তোমার কবিতা- মনন কতটা  সম্পর্কিত ? প্রথমে  শুধু ফর্মের দিক থেকেই যদি ধরি।

 

 

যশোধারা :   যখন কোন কবিকে বলা হয় তোমার গদ্য কাব্যপ্রতিম, আমার মনে হয় তাকে যেন একটা কড়া সমালোচনা করা হল। কেন মনে হয় জানিনা। একজন গদ্যকার কখনো কবিতা লিখলে তাঁকে কি শুনতে হয় তোমার কবিতা একেবারে গদ্যের মত? কিন্তু উল্টোটা হরহামেশাই শুনতে হয় কবিদের। কবিরা গদ্য লিখলেই প্রত্যাশা এই যে তিনি কাব্যিক ভাষা ব্যবহার করবেন।

 

এই যে গদ্য পদ্যের সিমবায়োসিসের প্রশংসা করলে অগ্নি, সেটাকে তাই খুব ভয় আমার। মনে হয় যেন ছদ্ম অনুযোগ করছ।  তাছাড়া, আমার নিজের কাব্যভাষাও যথেষ্ট সো কলড কাব্যিক কিনা আমার সন্দেহ আছে। কারণ ৯০ দশক থেকে আজ অব্দি, আমার কবিতা বোধ হয় তথাকথিত কাব্যভাষা থেকে সরতেই চেয়েছে। মানে যাকে আমরা কাব্যিক ভাষা বলি, লিরিকাল … সেটা থেকে সরে আসা বলতে, কাব্যভাষাটাকে আমি যেন দৈনন্দিন কথ্য ভাষার দিকে, তুচ্ছাতিতুচ্ছ অনুষঙ্গের দিকে, এক কথায় গদ্যে যা যা থাকে তার দিকেই ঠেলে দিতে থেকেছি গত ২৫ বছর ধরে।

 

এবার এই গদ্যের বইতে যদি বল, ফর্মের দিক থেকে কাব্যভাষার  অনুপ্রবেশটি হয়ত কিছুটা দেখা যায় কেননা বিষয়গুলো প্রেম। কিছু গল্পে সচেতনেই সে কাজ করেছি। কিছু গল্পে ইচ্ছে করে আমি ছেড়ে দিতে চেয়েছি গদ্যকথনের রীতি  বা গোলগাল প্লটের ভেতর গল্প বলতে চাওয়াকে ( প্রথম গল্প ভালোবাসা), চেয়েছি হট করে গল্পকে মাঝপথে ছেড়ে দিতে, বা গল্পকে গড়েই তুলেছি অণু-কবিতার ঢঙে ( একেবারে শেষের লেখাটি , তরিবৎ যেমন) , অথবা পুষ্কর দাশগুপ্ত রমানাথ রায়েদের শ্রুতি আন্দোলনের স্টাইলকে কিছুটা অনুকরণ করেছি “প্রেমের গল্প ছাড়া হয়না” গল্পে।

 

ফর্ম নিয়ে মজা করতে আসলে ভালই লাগে। তা গদ্য পদ্য যাই বল না কেন।

 

অগ্নি : কাব্যিক ভাষা অথবা গদ্যে কাব্যিক ভাব বলতে যে ধারণা বহুপ্রচলিত, আমি তার মধ্যে কিন্তু যেতে চাইছি না। কাব্যভাষা বলতে শুধুমাত্র ল্যাংগুয়েজ মিন করছি না এক্ষেত্রে।, বরং  মেটা ল্যাংগুয়েজ বা বিভিন্ন সারপ্লাস মিনিং, উদ্বৃত্ত অর্থ বা মায়া বা ম্যাজিক যা আসলে কবিতার শরীর তৈরি করে, তোমার এই গ্রন্থে সেই  দিবারাত্রির কাব্যচরিত্র বা চিহ্ন খুঁজে পেয়েছি। এটা আমার পাঠ অভিজ্ঞতা। উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে হয়তো।  যেরকম ‘যেতে হবে’ গল্পটি।  যেখানে আমরা অসমবয়সী দুই নারীর মধ্যে মালা গাঁথার ছবি দেখতে পাচ্ছি। মুখ্যচরিত্রটি তার শৈশবের একটি স্পেসে ফিরে যাচ্ছে। তার বড়পিসিমার পুরনো কাগজপত্রের ভিতর তাঁর লেখা পুরনো পান্ডুলিপি খুঁজছে তন্ময়ভাবে। এরই সাবপ্লটে আসে মুখ্যচরিত্রটির শাশুড়ি, যাকে সে আগাগোড়া পলিটিকালি নেগোশিয়েট করে এসেছে সতর্ক হয়ে, (কিচেন পলিটিক্সও যার অন্তর্গত)। যে বৃদ্ধা রান্নার প্রশংসা ছাড়া তেমনভাবে নন্দিত নন বিশ্বসংসারে। গীতা ঘটকের মৃত্যুর খবর সেই তাঁরই মধ্যে এক অন্য আলো ফেলল হঠাৎ। যে আলোতে সবিস্ময়ে তাঁর বৌমা অর্থাৎ মুখ্যচরিত্রটি দেখতে পাচ্ছে  ‘ওঁর মুখেও তো তখন মাখানো ছিল মৃত্যুচেতনা। সে মৃত্যুচেতনা কি খানিকটা নিজের গান, নিজের কুমারীজীবন……বা নিজের ছেড়ে আসা সঙ্গীতজীবনেরই একটা টুকরোর মৃত্যুরই ?’  এই জায়গাটি, যশোধারা, আমার কবিতা বলে মনে হয়েছে। হ্যাঁ গদ্যের নিয়ম সিনট্যাক্স এবং মেজাজ বহাল রেখেই তিনি যখন বি়ডবিড় করছেন  নিজের গান গাওয়ার পুড়ে যাওয়া স্মৃতি-কথা। সমস্ত তুচ্ছতাচ্ছিল্য তিনি অতিক্রম করে গেলেন নিমেষে। অথবা ‘টেক টু’ গল্পে  মীনাক্ষীদিকে নিয়ে, তাঁর জীবনের জটিলতা আর আলো-অন্ধকারকে নিয়ে তৈরি হওয়া একটা টেনশন তৈরির পর যখন তা খানখান হয়ে যাচ্ছে, তখন, একদম শেষে, ‘সারা লিন্ডসে স্ট্রিট নীরবতায় থমথম করছে তখন। হঠাৎ দেখলাম, প্রতিটি মানুষ সাইন ল্যাগুয়েজে কথা বলছে। আর দুপুরটা সুরের মূর্ছনার মত এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মীনাক্ষীদির ওপর।’

 

কবিতা এবং গদ্য এই গল্পের শেষে এসে এবং এই বইয়ের অনেক গল্পেই এভাবে হাতধরাধরি করেছে বলে মনে হয়েছে আমার। ভিতরের দিক থেকে যদি দেখি।

 

যশোধরা : এবার তোমার পাঠের কাছে আমাকে নতজানু হতেই হল। পাঠকের কাছে টেক্সট রচয়িতাদের বার বার যেভাবে নতজানু হতে হয়। হ্যাঁ বুঝেছি। এটা ঠিক লেখার কথা না, মানে গল্পে ‘ সে শুল সে উঠল সে খেল’ ধরণের বিবরণধর্মিতা র কথা তুমি বলছ না বোধ হয়।

আসলে আমাদের দেখাটা কীভাবে চলে একটা লেখা তারই মূর্ত রূপ। সে অর্থে, আমার কাছে প্রাক যৌবনের প্রেম কল্প,  যৌন সংবেদনশীলতা ধীরে ধীরে বয়সের সংগে অনেকটা পাল্টেছিল। এখন যৌন বাসনা বা প্রেমবাসনা বা সোজা কথায় ভালবাসা অনেকটাই বিতত, বিস্তৃত, স্বপ্ন কল্পনার অন্তর্ভুক্ত। কেননা সমাজ বাস্তবত আমাদের যা যা অ্যালাউ করেনা, তা স্বপ্ন বা ফ্যান্টাসিতে হাসিল হয়। পুরুষ নারী নির্বিশেষেই। এক মধ্যবয়সী বা এক অক্ষম বা বৃদ্ধা বা বেকার যুবকের ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল বা ফ্যান্টাসি অনেক বেশি পাওয়ারফুল বা পোটেন্ট।

 

বাবু সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের যে কথাটি তুমি উল্লেখ করেছ, এই স্বপ্নকল্পনাফ্যান্টাসির কোর বা হৃদয়স্থলটিকেই তুমি বলতে পার সে টলটল পুকুর। কেননা বার বার চরিত্ররা তাদের জীবনের মোটা ঘটনাগুলোর ভেতরে থাকতে থাকতে  ওই পুকুরের দিকে ঝাঁপ দিতে চাইছে , বা লেখক তাদের সেই পরিসরটা খুলে দিতে প্রশ্রয় দিচ্ছে। আমার ক্ষেত্রে এটা প্রায় একটা অবসেশন বলা যেতেই পারে।

 

অগ্নি– একদমই তাই। ওই পুকুরের দিকে ঝাঁপ দেওয়া অথবা সেই পরিসরটি খুলে দেওয়া। তারপর লেখকের আর কিছু করার থাকে না, চরিত্রগুলি নিজেরাই ডুবতে থাকে, ভেসে ওঠে, দম নেয়, সাঁতার কাটে। এই বইয়ে অনেকক্ষেত্রেই এরকমটা ঘটতে দেখছি বারবার। প্রাক্‌যৌবনের প্রেমকল্প, যৌন সংবেদনশীলতা যা তুমি বলছ বা আমি যদি আর একটু এগিয়ে বলি ওই সময়কার শরীর চেতনা তাকে আজ  পাখির চোখে দেখা যাচ্ছে ‘মাপ’ গল্পে। এটি একটি অসাধারণ আথ্যান অন্য কারণেও। একজন পুরুষ পাঠক হিসাবে এই লেখাটি শুরু থেকেই আমায় এক অজানা অভিজ্ঞতার শরিক করতে করতে এগোচ্ছে। ব্লাউজের মাপ নেওয়া এবং তার ক্রমবির্তন এক রুদ্ধশ্বাস ডিসকোর্স  তৈরি করছে যা এই বয়সে এসে প্রথমবার পড়ছিই শুধু না, রীতিমতো সেবনই করছি বলা যায়। কিন্তু এটাই তো নয় শুধু। গল্পটি অন্য একটা ফ্লাইট পাচ্ছে একদম শেষাংশে এসে। যেখানে পুরনো পাড়া ভেঙে যাওয়ার হাহাকার এক শ্বাসরুদ্ধকারী সিচুয়েশন তৈরি করছে। দর্জিচাচার ঘর ভেঙে গিয়েছে। সে নেই। একা যায়নি। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছে বাঁকামতো ঝুলবারান্দা, বাবার অন্যমনস্ক বসে চার্মিনার ফোঁকার ছবিটিকেও। তার জায়গা নিচ্ছে নাগরিক অসুখ, যে কিনা প্রোমোটার পূর্ব পাড়ার সেনোটাফ লিখছে।

আমরা সবাই নিজের বুকের মধ্যে আমাদের পুরনো পাড়াকে নিয়ে চলি। পুরনো ক্লাবঘর, ওই সেই রাস্তার মোড়, পুকুরের পাড় , ফুটবল মাঠ এবং হ্যাঁ এখন জানলাম, ওই দর্জি চাচার দোকানও। এখনও সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে নিজের ছায়াকে লম্বা হতে দেখতে পাই যেন। ,

তোমার সঙ্গে কথা যখন হচ্ছেই, সেই সুযোগে একটু জানতে চাই এই গল্পটির প্রেক্ষিত নিয়ে। কীভাবে এল ভাবনায় যদি বল।

10271242_10152240794518551_475642869452877060_o

যশোধরা : গল্পটা কীভাবে এসেছে সত্যি মনে নেই। তবে এই চরিত্র যে বাস্তব দর্জির ওপর আধারিত তিনি আমার চেনা ত বটেই। এবং ওই পাড়াটা ভবানীপুরে আমার পুরনো পাড়াই।  শুধু দর্জিচাচা নয়। এরকম ভাবে ডাক্তারজেঠুও এসেছিল। আসলে বয়ঃসন্ধির আগে শিশুর স্মৃতিও খুব আশ্লেষময়। ওরাল ফেজে সবকিছুতেই তার আসক্তি যাকিছু ধরা ও ছোঁয়া যায়। তারপর বড় হওয়ার বোধ। নিজেকে ও নিজের শরীরকে ঘিরে একটা মেয়ের বোধ জেগে ওঠা। কিছুটা অচেনা, ভয় শংকা সমাজের সংগে তার তীব্র সংঘাত। এইসব লিখে রাখতে চেয়ে, একটা প্রজেক্টের মত করে আমার ইচ্ছে হয়েছিল আশৈশবের  কিছু চেনা চরিত্রের প্রতি আমার প্রি অকুপেশনকে গল্পে তুলে আনি। এবং সত্যি আমার মনে হয় এইসব ছোট ছোট দক্ষ-কর্মীদের হাতে ম্যাজিক আছে বা ছিল। এদের স্পর্শ এক ধরণের বিশেষ কথা বলে, কমিউনিকেট করে। আমার ছোটবেলায় দেখা দেওয়াললিখনের শিল্পী যেভাবে তুলি ঘোরাতেন বা মাস্টারমশাইরা যেভাবে ভালবেসে বোর্ডে চক দিয়ে এঁকে পড়াতেন, দর্জির মাপ নেওয়াও সেই রকমই। একটা ভীষণ বিস্ময় ও মুগ্ধতা  কাজ করে এদের নিয়ে। এরা ত পুরুষ। এক মেয়ের চোখ দিয়ে কিশোরীর চোখ দিয়ে দেখা… যেন ফিমেল গেজ। যেভাবে বৃক্ষপুরুষের মেয়েটি গাছটাকে পুরুষ হিসেবে দেখে আশ্লেষ নিয়ে। আসলে শেষ মেশ আশ্লেষটাকেই আমি আলটিমেট করে দেখতে চেয়েছি। হ্যাঁ বাবা, আমাদের হারিয়ে যাওয়া বাবারাও  সেই আশ্লেষের অংশ। আর নস্টালজিয়ার পাড়া-পুরনো বাড়ি সবের সঙ্গে যুক্ত। সবের প্রতিই আমার ফিমেল গেজ আশ্লিষ্ট হয়। একটা বড় বড় আর্চ দেওয়া দরজার জানালার বাড়ি দেখলে এক সময় আমার ভয়ানক টান , আকর্ষণ হত। হরিশ মুখার্জি রোডে অমন দু চার খানা বাড়ি আজো দেখতে পাবে। গাছে ভরা বাগান পেরিয়ে। একটা ছোট গাড়ি বারান্দা সহ। কী যে প্রেম আমার এইসব বাড়ির প্রতি। সারা কলকাতায় এমন বাড়ি এখন হাতে গোণা। আর ওইসব বাড়ির মানুষেরা। তাদের মায়া মমতা ক্রোধ নিষ্ঠুরতা স্নেহ প্রেম সহ।

 

 

অগ্নি– হ্যাঁ ডাক্তার জেঠু, দর্জি চাচা এই সহ হারিয়ে যাওয়া পাড়া, সেই সব বাড়িগুলি। গ্রিক নাটকের ট্রাজিক চরিত্র হয়ে গিয়েছে যেন সব। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে বলে এই স্মৃতিকাতরতা প্রায় অসুখের পর্যায়ে চলে গিয়েছে আমার ক্ষেত্রে। অন্য স্পেস এবং টাইম সাই ফাই ছবির মত ফিরে এসে বর্তমান বেঁচে থাকার পরিসরটিকে নিয়ে কানামাছি খেলছে।    ‘ভালবাসার গল্প’ তাই আমার কাছে একটা জার্নির মত। উল্টোরথের। এ তো শুধু একটি পাড়া বা জনপদের কিস্যা নয়, একটা চিহ্নও বটে যা একটা সময়কে ধারণ করে রয়েছে। সংকলনটির প্রথম গল্প ‘ভালবাসা’-য় যে টুকরাকে আমরা দেখি তা বোধহয় প্রত্যেক পাড়াতেই একআধজন করে ছিল বা আছে। ততোটা বুদ্ধি বাড়েনি অথচ শরীর বেড়ে গিয়েছে আর নানাভাবে সে সিস্টেমের কাছে এক্সপ্লয়েটেড হচ্ছে। হওয়ারই কথা। তোমার গল্পে একটা উত্তরণ এটাই যে, সেই এক্সপ্লয়েটশন থেকে টুকরাও ভালবাসা পাচ্ছে, কেয়ার পাচ্ছে। তারও একটা ভরকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। এই গল্পটি নিয়েই যখন কথা তখন আরও একটি বিষয় এখানে বলে নিতে চাই। এই গল্পে তো বটেই এবং সংকলনের বেশিরভাগ গল্পেই সরলরৈখিক চলন নেই। বিভিন্ন স্তর বা সাবপ্লটের মধ্যে একটা অভিযোজন যেন। এক একবার ঝাঁকালে এককরকম নকশা। ডিপেন্ড করছে তুমি কীভাবে দেখছো তার উপর। সেই ছেলেবেলার ক্যালাইডোস্কোপের মতন আর কি!  ওই ভালবাসা গল্পেই পল্টুর প্রতি তার কাকিমার প্রবল টান (যাকে তুমি আশ্লেষ বলছো) আসলে বহু দশটা-পাঁচটা দাম্পত্যের শূন্যতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আবার তার থেকে অন্য এক নির্ভরতায় পৌঁছানোর কথাও বলে। এই গল্পটি যদি টুকরার হয়, তবে পল্টুর কাকিমার আশ্লেষেরও, আবার সাদা মাসিমার অসহায়তারও। সব মিলিয়ে এক কোলাজ তৈরি করা স্বল্প পরিসরে মনে হয় তোমার উদ্দেশ্য ছিল।

 

 

যশোধরা : তোমার পাঠ প্রতিক্রিয়ায় আমি খুবই আপ্লুত কিন্তু সেটা কথা না। আসলে আমার ও তোমার পাঠের ইতিবৃত্ত যদি খানিক বলা যায় তাহলে হয়ত কয়েকটা পয়েন্ট কে কমন পাব, কয়েকটা মিল থাকবে। তাই হয়ত কমিউনিকেশন ঘটছে, পাঠককে ছোঁয়া যাচ্ছে। আমরা তো সমসাময়িক।

 

অগ্নি : হ্যাঁ তা তো বটেই। তোমার পাঠবিশ্ব আর আমার,  তোমার বিশ্ববীক্ষণ আর আমার, কিছুটা তো মিলবেই। সেই পাঠবিশ্বের বাসিন্দা কারা?

 

যশোধরা : আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে বিভূতিভূষণ যেমন আছেন শরদিন্দুও আছেন। আবার মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায় যখন প্রেমের কথা লিখেছেন যে তিক্ততাসমাকুল রস এসেছে তাও ত আমাদের কম অধিগ্রহণ করেনি। তেমনি দেবেশ রায়  , অসীম রায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে পড়েছি আমরা।  জগদীশ গুপ্ত-জ্যোতিরিন্দ নন্দীর পাঠও খানিকটা আমার নিজের লেখার ভুবনকে গঠন করেছে।  গল্প কাকে বলে কীভাবে গল্প লেখা হয় অত খোলনলচে হাতুড়ি রেঞ্চ স্ক্রু ড্রাইভারের আলাদা আলাদা হিসেব না রেখেও, আমাদের মাথায় তাই একটা খাঁচা তৈরি হয়েই আছে । বাংলা ছোটগল্পের সমৃদ্ধ ধারা যেটা। একইসঙ্গে আমার সাংঘাতিক দুর্বলতা মিলান কুন্দেরার লাফেবল লাভস থেকে শুরু করে আন বেয়ারেবল লাইটনেস অফ বিইং বা অন্যান্য লেখার প্রতি। লাফেবল লাভস এর প্রথম গল্পটা রাত জেগে পড়ে পুরো থম মেরে গেছিলাম। সারারাত ঘুমোই নি। যে বয়সে এসব পড়া, সে বয়সে এক একটা লেখাই ত কেমন করে জানি জীবন বদলে দিতে পারত।

49709874_10156728646975761_3833172751636496384_o

অগ্নি- হ্যাঁ আমাদের মাথার ভিতর ছোটবেলা থেকেই একটা খাঁচা তৈরি হয়েই রয়েছে। এটা বাস্তব। দ্যাখো একটা কথা আমার মনে হয়, বাংলাসাহিত্যের একজন পাঠক হিসাবেই মনে হয়, যে আজকের মার্কেজ, কুন্দেরারা যে ভাষা-আবহাওয়াতে নিঃশ্বাস নেন তার অনেকটা ঋণই তো ফ্ল্যবেয়ার-এর কাছে রয়ে গিয়েছে। অথচ একজন গুস্তভ ফ্ল্যবেয়ারকে পেতে  গোটা ইউরোপকে তার প্রথমদিককার উপন্যাসের থেকে প্রায় ২০০ বছর বা তারও বেশি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। গর্ব হয় ভেবে যে বাংলা এমন এক সাহিত্যভাষা যেখানে প্রথমদিককার প্রজন্মের ঔপন্যাসিক বঙ্গিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেখা দিলেন ভাষার কবচকুন্ডল সঙ্গে নিয়ে। কোনও দেশের সাহিত্যে একেবারে গোড়ার দিকেই উপন্যাসের মাধ্যমে এই মাপের ভাষা বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা–  খুবই গর্বের ব্যাপার। আজকের বাংলা ছোট গল্প এবং উপন্যাসে সেই ঐতিহ্য শতধারায় বিকশিত। আলাদা করে আর কত নাম করব।

 

যশোধরা : হ্যাঁ একদম। ফরাসি সাহিত্য, হ্যাঁ,  খুব ভুল হবে এখানে যদি ফরাসি সাহিত্যের কথা না তুলি এবং হ্যাঁ অবশ্যই রুশ সাহিত্য। ছোটবেলায় অনুবাদে রুশ সাহিত্য পড়া আমার পঠনবিশ্বের অন্যতম সম্পদ। ননী ভৌমিক প্রমুখের অনুবাদের সেই বাংলা আমার কানে ও প্রাণে আজো বাজে। সেসব অনুবাদে শেখভের কুকুর সংগী মহিলা পড়া। গোগোলের গল্প পড়া। এসব আমাদের মাথার মধ্যের আকাশ বানিয়েছিল। যেমন বানিয়েছে মোপাসঁ-র ছোটগল্প বা ফ্লব্যের এর মাদাম বোভারি।  লেখা কেমন হতে হয়, হতে হবে, তার মান নির্ধারণ করে দেয় যে অদৃশ্য বিচারক, তিনি আমাদের প্রতি খুবই সদয় ছিলেন। এত এত লেখা পড়বার সুযোগ করে দিয়েছিলেন তিনি। গল্পগুচ্ছ থেকে সাম্প্রতিক ইউরোপিয় ছোট গল্প অব্দি।

 

নিজেকে তাই সারাক্ষণ খুব খাটো আর অপদার্থ মনে হয়। অশক্ত মনে হয়। কিছুই ত লিখতে পারলাম না শুধু হাত মকশো করার একটা দুটো ছেঁড়া চিরকুট ছাড়া।

 

 

ডাইনি! ডাইনি!

dakiniসংবাদ প্রতিদিন রোববারে প্রকাশিত

 

চুলগুলো তার শনের নুড়ি

চোখদুটো তার বেরিয়ে আসা

দুহাতে ছিঁড়ছে পুরুষের হৃদয়

নালে ঝোলে সর্বনাশা…

 

কামনা বাসনা ক্ষমতা আর ইচ্ছা… এইসব শব্দগুলো খুব ডেঞ্জারাস। এগুলোই ডাকিনী বলে চিহ্নিত করে কোন মেয়েকে। আর সেখানেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব।

 

দুর্গা ঠাকুরের নাকি জয়া বিজয়া। আর কালীর,ডাকিনী যোগিনী, পিশাচ, ব্রহ্মদত্যি, ভূত প্রেত। আসলে দুর্গা পুজোর ভাসানের পর, জল থেকে অর্ধগলিত কাঠামোগুলো তুলে আনত দেখতাম আমাদের পাড়ার রতন, খোকনরা। । তারপর লোকের ফেলে দেওয়া কাপড় চোপড় থেকে কেটেকুটে ন্যাতাকানির পোশাক পরাতো, আর শনের নুড়ির চুল, বিকৃত ঠেলে বেরিয়ে আসা চোখ আর জিভ আর বড় বড় কান মাটির দলা ঠুশে বানিয়ে, খুব চমৎকার রঙ করে  সেই সব ভূতেরা রেডি হয়ে যেত, মা কালীর সাঙ্গোপাঙ্গো হয়ে প্যান্ডেলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য। সেদিন কাগজে দেখলাম, সেই সব ভূত এখনো হয়। যে মাঠটা চৌধুরী বাড়ির মাঠ বলে খ্যাত ছিল, যেখানে কালীপুজোর আগে রাক্ষস খোক্কস বানিয়ে হাত পাকিয়েছিল রোগা ডিগডিগে রতন, শুধু সেই মাঠটা আর মাঠ নেই। গ্যারেজ হয়ে গিয়েছে। আর রতন রীতিমত বড়বড় মূর্তি বানায় আজকাল।

 

ডাকিনী যোগিনীর কথা বলতেই মনে পড়ল সলিল চৌধুরীর ‘গাঁয়ের বধূ’ গানটির কথা। গল্প দিয়ে গান। এমন উদাহরণ বাংলায় আর কটা! সেই শোন এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোন রূপকথা নয় সে নয়। হেমন্তের গলা।

সে গানের একটা জায়গা, আমরা ছোটরা , ভাল করে না বুঝলেও, আমাদের একটা দুর্দান্ত গায়ে কাঁটা দেওয়া ফিলিং হত। হঠাৎ সুর তাল আবহ পালটে সেই জায়গাটায় কেমন যুদ্ধং দেহি পরিস্থিতি তৈরি হত। মা বলেছিল, ওটা মন্বন্তরের কথা। আমার শুধু ভাল লাগত ওই লাইনগুলোঃ ডাকিনী যোগিনী এল শত নাগিনী এল পিশাচেরা এল রে। শত পাকে পা দিয়া নাচে তা তা তা থৈয়া নাচে তা তা তা থৈয়া রে।

আসলে কালীপুজো, ডাকিনী যোগিনী, হেমন্তকালের সন্ধে, কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় অনেক ছাতিম গাছ থেকে বিকীর্ণ কড়া ছাতিম ফুলের মাতাল গন্ধ, বিকেল থেকে ঝুপ করে সন্ধে নেমে আসার হৈমন্তিক অনিবার্যতা, লক্ষ্মীপুজোর পর থেকেই অ্যানুয়াল পরীক্ষার পড়া তৈরির ভীষণ তেতো অনুভূতি…  ফাঁকে ফাঁকে ঐ কালীপুজোর জন্য কেনা বাজিগুলো রোদে দেবার ছুতোয় ছাতে ওঠা আর উঁকি দিয়ে রতনের ডাকিনী যোগিনী তৈরি দেখা। ব্যাস, ভূত চতুর্দশীর গা ছমছমে চোদ্দ পিদিম, তারপর কালীপুজোর বাজি ফোটানো, তারপরই ভাই ফোঁটা, শেষ হলেও ইশকুল খুলে যাবে আর পরীক্ষা শুরু হবে, বুকের ভেতর হাতুড়ির ঘা পড়ত যেন। আর , এখন ভাবলে অবাক লাগে, একটা পূর্ণিমা থেকে একটা অমাবস্যার এই পনেরোটা দিন এত যে কিছু ধরে থাকত!

হ্যাঁ, এর মধ্যেই কোন একটা দিন আমার জন্মদিনও পড়বে, যেটা আবার বিদিশিদের হ্যালোউইন উৎসব, মানে সেই ভূতেরই দিন, মৃত প্রিয়জনদের জন্য বিষাদের সঙ্গে মজামাখানো উৎসব পালনের দিন, হেমন্তে জন্ম বলেই কি আমার এত হেমন্ত ভাল লাগে? তখন পনেরো পেরোয় নি, তাই মনে হয়নি পড়া হয়নি জীবনানন্দ, সেই ধানকাটা হয়ে যাওয়া মাঠের ছবি, হেমন্তের ওশলাগা খড়ের বিষাদ, প্যাঁচার উড়ে যাওয়া আর ইঁদুরের খুঁদকুড়ো কুড়িয়ে নেবার আশ্চর্য ছবি মাথার মধ্যে এসে ঢোকেনি। তবু, হেমন্ত আমাকে চিরদিন আক্রান্ত করেছে। আরো বছর দশেক পরে আমি তো পিশাচিনীই ভাবব নিজেকে। আজও ভাবি, আমার মেয়ে যখন হলিউডি ছবির ভৌতিক রমরমার যুগে বসে বসে ট্রল, নোম, পিক্সি, ফেয়ারি, গবলিনদের গপ্পো গেলে, আমাদের জীবন থেকে কেমন “ওটা কুসংস্কার, ওটা বিচ্ছির, জঘন্য, ওটাকে ফেলে দাও” এমনি এক ডেটল-ফিনাইল অভ্যাসে অভ্যাসে হারিয়েই গেল ডাকিনীযোগিনী পিশাচব্রহ্মদত্যিরা, একসময় যা ছিল গ্রাম-মফস্বল শহরের গা ছমছমে দিনকালের নিত্য সহচর।

 

ডাকিনী আর পিশাচিনী কিন্তু আমাকে ছেড়ে গেল না। আরো বছর দশেক পরে আমি তো পিশাচিনীই ভাবব নিজেকে। লিখতে থাকব এইসব লেখাও…

সে তার মাদুর পেতে শুয়েছিল। অচ্ছুৎ মাদুর

না আমি শোব না এত অচ্ছুৎ মাদুরে, এত কালো

ও ছেঁড়া, ও দীর্ঘস্থায়ী, ও নিঃসঙ্গতাজাত

তাপবিকিরণকারী দুর্বল মাদুরে।

 

আমার মাদুর হবে সাদা সাদা সাদা , তৃপ্তিময়ী।

 

এই নাও, হাড়ের মতন সাদা মাদুর তোমার।

এই নাও, পঙ্খের মতন শুদ্ধ মাদুর তোমার।

এই নাও, চতুর্ভুজের মত চারদিক সমান, সোজা, অকলঙ্ক মাদুর তোমার

 

এবার খুশি তো? কল্প? নাকি ফের ঘোর রাতে জেতে

“কোথায় সাদা মাদুর?” চীৎকারে জাগাবে শোয়া ঘর?

 

পিশাচিনী মহাসুখে তার চির অন্ধকার মাদুরে ঘুমাবে, শান্তিমত।

 

এ যদি হয় পিশাচিনীর  ম্যানিফেস্টো, তবে “একলা শুয়েও বেঁচে ত আছির” ম্যানিফেস্টোর এক সার্বিক প্রসারণ হিসেবে যে কেউ একে দেখতেই পারেন। শুধু মাদুর তাকে এক মেয়ের বিশ্বের অংশ করে দিয়েছিল বলেই তা ছিল নিজস্ব। পিশাচ বা ডাক-এর চেয়ে পিশাচিনী বা ডাকিনীর আবেদন চিরকালই বিপজ্জনকভাবে বেশি ছিল ত বটেই!

 

ডাকিনীতন্ত্র আর পিশাচিনী ধর্ম ছেড়ে দিতে হয় যদি, এইভয়ে ভাল মেয়ে হয়ে বিয়েথা করে সংসারী হতেই চাইনি কতদিন । সেসব ও এক পর্ব। তারপর দেখা গেল, বাহিরে বাহিরে আমরা যারা ভাল মেয়ে ছিলাম তারা ভাল বউমা ভাল মা হবার চক্করটা কীভাবে যে টুক করে গলা দিয়ে গলিয়ে নিয়েছি। তবু ওই যাকে বলে অন্তরের অন্তঃস্থলের পিশাচিনী বা ডাকিনী মেজাজটা কীভাবে যেন চিরতরে রয়ে গেল। চুল খোলা অবস্থায় সন্ধেবেলা ছাতে ওঠের অভ্যাসের মত আরও কত না মানতে চাওয়া রয়ে গেল। রয়ে গেল একা একা ঘুরে বেড়াবার অভ্যাস। ক্ষমতায়িত হতে চাওয়ার বাসনার দুর্মর টান… যা ঘরে বসে থাকতে দেয়নি শেষ মেশ।

 

সমাজ যখনই মেয়েদের সামলাতে পারেনি তখনই ডাইনি বলে দাগিয়ে দিয়েছে। এই দাগিয়ে দেওয়ার ভয় আমাদের শিকল পরিয়ে রাখে। রেখেছে। কোন কোন সমাজ মধ্যযুগে যেভাবে গ্রাম বা শহরের কেন্দ্রস্থলে সর্বসমক্ষে পুড়িয়ে মেরেছে ডাইনি মেয়েদের , অর্থাৎ যারা সমাজপিতাদের চোখ রাঙানি না শুনে নিজের মত চলতে সাহস ও ইচ্ছে করেছিল… এখনো বহু সমাজ সেভাবেই ছুঁড়ে দিচ্ছে কাদার তাল, নর্দমার ময়লা… অথবা মূল্যবোধের ইঁটের চারিদিকে মোড়া নীতিকথনের টুকরো … কপাল কেটে যাচ্ছে আজকের ডাকিনীদের। ক্ষমতা আর শক্তির ব্যবহারে স্বাধীন হতে চাওয়া ডাকিনীদের।

 

স্ট্রেস! কেন?

BLink_Idols made by Alpana Palসংবাদ প্রতিদিন রোববার পত্রিকায় প্রকাশিত ২০১৮

 

প্রায়শই প্রশ্ন আসে, বাড়ি আর অফিস… আবার লেখালেখিও, ব্যালান্স কর কীভাবে? প্রশ্নটা কেমন যেন থতমত করে দেয়। আসলে সত্যিগুলো বলাই হয়না। অনেক ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার মনের ভেতর সত্যিগুলো থাকে। দুঃখেরাও। বাইরে থাকে অস্বীকার, কই , ব্যালেন্স করছি নাকি ? ওই আর কি, ম্যানেজ হয়ে যাচ্ছে।

 

আজকের কর্মরতা মায়েদের স্ট্রেস নিয়ে কথা বলতে বসলেই নিজেকে যেন স্বাস্থ্য দপ্তরের লোক মনে হয়। সদ্য গর্ভ হওয়া মায়েদের যেভাবে বিলি করা হয়  ক্যালসিয়াম আয়রন, ফলিক অ্যাসিডের গুলি, সেভাবে যদি কর্মরতা মায়েদের কিছু একটা পিল বানানো যেত, যাতে সব ব্যালান্স অনায়াসে হয়, আর দিনান্তে, সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, একা একা, একলা একলা কোন চাকরি করা মাকে অকূল পাথারে পড়া নৌকোর মত বেপথু হয়ে নিঃসীম অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়, অথবা সাংঘাতিক টেনশনে কাঁদতে কাঁদতে বাথরুমের আড়াল খুঁজতে না হয়, জলের পাইপের কাঁধে মাথা রাখতে না হয়… অথবা অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্টের খোঁজে কাউন্সেলিং এর খোঁজে ছুটতে না হয়।

 

নিজের জীবনের দুঃখগুলোর কথা লিখে রাখব ভাবি। ভাবি লিখি কত খারাপ আছি। পারিনা! ভিক্টিম কার্ড খেলতেই পারিনা।

উল্টে, যা লিখি সব কেমন যেন হাস্যকর হয়ে যায় , দেখি। অনেকটা ওয়াটস্যাপে ঘুরে বেড়ানো বর বউ সংক্রান্ত মেয়েদের , থুড়ি বউয়েদের, বা মায়েদের, অবান্তর হাস্যকর উদ্ভট প্রতিপন্ন করা জোকস গুলোর মত।

বদলির কথাই ধরা যাক। বদলি হতে গিয়ে কতবার তুবড়ে গেল থালাবাসন , কতবার ভেঙে গেল আলমারির কাচ… এসব ত দুঃখ না আসলে। আসল দুঃখ,   গত কুড়ি বছরে ছ থেকে সাত বার বাড়ি বসিয়েছি, কখনো মনে হয়নি নিজের বাড়ি… । কখনো সপরিবারে, কখনো একা। সবটাই চাকরির জন্য। তবু চাকরির পাশাপাশি সংসার থেমে যায়নি তাই প্রতিবার নতুন করে গ্যাসের লাইন নিয়েছি,  উনুন সাজিয়েছি, উনুনের চারধারে নুন, হলুদের কৌটো, ধনে জিরেমৌরির কৌটো। ক্লান্তিহীন। তেলের শিশির তলে খবরের কাগজ পেতে দিতে দিতে ভেবেছি, খুব ক্লান্ত আমি, আর পারছি না, আর পারছি না। তবু, পেরেছি।

 

এখন আমি একা, এখানে। বাকি সংসার, ওখানে। তবু , ওটাই ত আসল সংসার। এইটা, খেলা খেলা। এর কি চাপ নেই নাকি?

মেয়ের কলেজ, ফি জমা করা, পরীক্ষার শিডিউল, পরীক্ষার সময়ে ছুটি নিতে গিয়ে বসের মুখঝামটা। এসব ত মোটা মোটা ব্যাপার। আর না দেখতে পাওয়া, কাব্যে উপেক্ষিত, সূক্ষ্ম চাপগুলো? বরকে, মেয়েকে ফোনে বলেছি কোথায় রাখা আছে কিনে তুলে রাখা একস্ট্রা গ্লিসারিন সাবান, নারকেলের তেল। শীতের মুখে মুখে দুদিনের জন্য বাড়ি গিয়ে উইকেন্ডে আলমারি খুলেছি নামিয়েছি উইন্টার ওয়ার্ডরোব। শখ করে বলতে নামটা সুন্দর,  বেশ গালভরা। প্রতি শীতের শুরুতে একবার করে সব নামিয়ে ইতিমধ্যেই জিনিসে জিনিসে ছয়লাপ, জামাকাপড়ে জমঘট হয়ে থাকা আলনা ও খোলা কাবার্ডগুলোতে ঠুশে ঠুশে গরম জামা রাখা… তারপর ও উইকডেজ এ কত্তার ফোন, আমার খাদির জ্যাকেটটা পাচ্ছি না, কোথায় রেখে গেছ?

 

নালিশ করতে ভুলে গেছি কারণ নালিশটা বেশ ন্যাকা শোনায়। চিরদিন ভিক্টিমহুড থেকে দূরে থাকতে চেয়েছি, ভালই ত বাপু চাকরি টাকরি কর, আবার অত ঘ্যানঘ্যান কর কেন, এই কথাটা শুনতে হবে বলে কমপ্লেন করা থেকেও দূরে থাকতে চেয়েছি। কমপ্ল্যান খেয়ে নিয়েছি, বলেছি, দ্যাখো আমি বাড়ছি মাম্মি! আমার অদৃশ্য মামি ওদিক থেকে হাই ফাইভ দেখিয়ে দিয়েছেন। চালিয়ে যা! আমিও  ছাতার মত বেলুনের মত বিশাল তাঁবুর মত স্নেহ যত্ন ভালবাসা সবটার ফানুশ যেন , ফুলেই চলেছি। জিওগ্রাফিকে অস্বীকার করেছি । আদর্শ স্ত্রী ও মায়ের মত ফুটো সেলাই করেছি মোজার আর খেয়াল রেখেছি বরের ওষুধপত্রের। সমাজ ত সেটাই চেয়েছে চিরদিন। মা-স্ত্রী-গৃহিণীর অনন্ত সুপার উওম্যানসুলভ প্রসারণশীল যত্ন-বেলুন!

 

নীরবে হিসেব রাখি, কবে ফুরোবে ও বাড়ির চাল ডাল, কবে কিনতে হবে ন্যাপথলিন… মার্চ মাসে আবার এক পর্ব আসবে সব গরম জামা কাচিয়ে তুলে রাখার… মেয়ের কাবার্ডে না পরা জামাগুলো দান করতে হবে, কাজের মহিলাকে তুষ্ট রাখার জন্য মাঝে মাঝে নিয়ে যেতে হবে উপহার… কেননা ওই ত আমার ‘অ্যাবসেন্সে’ বাড়িটাকে দেখছে।

 

অ্যাবসেন্স! হ্যাঁ এই শব্দটা চেপে বসেছে আমার ওপর। আমার কিচ্ছু হয়নি, নিজেকে ডিনায়ালে রেখে আর কদিন? প্রেশার বেড়ে যাবে, ওষুধ খেতে হবে তবু আমি বলব আমার ত কিছু হয়নি, এটা ত আমার সংসার। আমার সংসার খালি বার বার মনে করিয়ে দেবে সে  আমার অ্যাবসেন্সে আছে  !  বার বার বলবে, তুমি ত নেই, তুমি ত থাক না, তুমি ত আপন খেয়ালে আপন আনন্দে আছ। ওই ত বেশ ওখানেও সিনেমা দেখছ কলিগের সঙ্গে। ফুচকার ছবি ফেসবুকে আপলোড করছ।

 

আমার বান্ধবী রাঁচি থেকে প্রতি শনিরবিবার হাতিয়া এক্সপ্রেসে আসত… একটা সময় শরীর খারাপ হয়ে গেল… তবু সন্তানদের মুখ চেয়ে এভাবেই যাতায়াত করে যেতে হয়েছে ওকে। আবার একসঙ্গে থাকলেও কি জ্বালা কিছু কম? দুই শহরে না থাকলেও, এমন চাপ থাকে।

 

ট্যুরে যাবার দিনগুলোয় স্বামীর মুখ ভার, হবেই হবে। অফিসে রাত হবে ভেবে আগে থেকে অপরাধবোধে ভোগা, হবেই হবে। বাড়ির অণু কোটি কাজ নিখুঁত নিপুণতার সঙ্গে সম্পন্ন হতে হবে। না হলে অপরাধবোধ। হবেই হবে।

 

এ এক একাদশীর উপবাসের মত কর্তব্য। করলে পুণ্য নেই।  না করলে দোষাবহ। পাপের। আর এখানেই তফাতটা পুরুষ পার্টনারের সঙ্গে। তিনি যা করেন সংসারের জন্য, সবই পুণ্য… মঙ্গলময়। কী ভাল ছেলে , সোনার টুকরো জামাই। কত ভাল বাবা।

 

 

 

 

 

 

মানবীজার্নাল নামে একটি কবিতায় চৈতালী চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন সারাদিনের চব্বিশ ঘন্টার বিবরণ। বাচ্চার টিফিন ভরে আপিস যাচ্ছে মেয়েটি। সন্ধেতে স্বামীর বন্ধুকে রেঁধে খাওয়াচ্ছে। ছুটি নেই। অফিস থেকে বাড়ি এসেই শাড়ি বদলে বা সালোয়ারের হাতা গুটিয়ে চুন্নিটা হাতব্যাগের সঙ্গে চেয়ারের পিঠে ঝুলিয়ে রেখে রান্নাঘরে ঢোকে অসংখ্য মেয়ে। এখনো। এই ২০১৮ তেও। কেন করে? কেন ? তারা অর্থনীতির দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে কিন্তু হাউজহোল্ড কর্ম থেকে মুক্তি পায়নি। যদি বা হাত বাঁটতে কাজের লোক রেখেছে, সেই কাজের লোকের যাবতীয় সমস্যা, তাদের ছুটি নেওয়া, ফাঁকি দেওয়া সবকিছুর জন্যই মেয়েটিকে দায়ী থাকতে হচ্ছে। এখনো ভারতের এটাই ছবি।

 

অঞ্চলভেদে ছবির মধ্যের লাল বেগুনি কালো পোঁচগুলোর গাঢ়ত্ব কমে বাড়ে। কোন বাড়িতে বৌমা কাজে যাবার আগে চোদ্দপদ রেঁধে শাশুড়ি শ্বশুরকে ওষুধ জল দিয়ে যায়। কোন বাড়িতে বৌমার চাকরির মাইনের টাকা কড়ায় গন্ডায় শ্বশুরমশাইকে বুঝিয়ে দিতে হয়। কোন বাড়িতে আবার স্বামী বাজার করে, ছেলেকে হোমওয়ার্ক করায়। ড্রাইভ করে কেনাকাটার সময় সঙ্গ দেয়, উদাসীন থাকেনা, ময়লা ফেলতে নীচে যায়, প্লাম্বারকে নিজেই ফোন করে। তবু, তবু। কোথাও যেন গৃহকর্মের বেসিক , মূল গল্পটা মেয়েদের জন্য একই থেকে যায়।

 

 

আপনি বদলাতে পারেন না ছবিটা? আপনি প্রতিবাদ করতে পারেন না? যেটা মেনে নিচ্ছেন সেটা মেনে নিচ্ছেনই যদি, অভিযোগ করছেন কেন?

 

মেয়েদের ক্ষেত্রে ত এটা লেবার অফ লাভ। “নিজের সংসার” একটা বড় ব্যাপার। এটাই সংসার করার স্যাটিসফ্যাকশন। কোথায় কোন জিনিসটা রেখেছ, অন্যদের বলনি, মানে তুমি ত আসলে নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাও আমাদের ওপরে। আমাদের গতিবিধি রেস্ট্রিক্ট করেছ তুমিই। ওই যে আমি একবার মাছ এনেছিলাম, পচা বেরিয়েছিল , তারপর থেকে তুমি ত আর বাজারটা আমার ওপর ছাড়তেই পারলে না। এসব অভিযোগের, প্রতি-প্রশ্ন, প্রতি-উত্তরের তির আসবেই আসবে এবার আমার দিকে। আমাদের দিকে।

 

হ্যাঁ, সেইজন্যই ত! সেই কারণেই ত, স্ট্রেস কথাটাকে ডিকশনারি থেকে দূরে ফেলে দিয়েছি । ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি। স্ট্রেসকে মাছির মত হাত নেরে উড়িয়ে দিই। কেননা স্ট্রেস থাকতে নেই। কী করে থাকবে, স্ট্রেস? এতো কাজ, এত্তো দায়িত্বের পর? ওসব ভাবতে নেই। বরং ভাবি এটা ত আমার জীবনের একদম কেন্দ্রে। সংসার না থাকলে আমি কি থাকতাম? ভালবাসা, আদর, মাখোমাখো করে বেঁচে থাকার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভেবেছি এইসব কাজ, দায়িত্বকে। না ভাবলে, বাঁচতাম না।

 

যখন অফিসের মিটিং এর মাঝখানে হঠাৎ মনে পড়ে যায় রান্নার মাসিকে রান্না বুঝিয়ে দিতে হবে, অথবা মেয়ের ইশকুলের পেরেন্ট টিচার মিটিং এ যেতেই হবে কিন্তু ঠিক ঐ সময়টাই একটা জরুরি কেজো ফোন করার দরকার?

 

এসব কারণে ই মোবাইল ফোন নামক উদ্ভাবনটিকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারিনা। ইশকুলগামী শিশুর মায়েদের জন্য যেমন আবিষ্কার হয়েছে ওয়াটস্যাপ নামক বস্তুটি, অফিস থেকে ফিরতে দেরি হওয়া মহিলাদের জন্য হোম ডেলিভারি আর আমাজন প্যানট্রি অথবা big basket , grofers….আমার এক বান্ধবী বেড়াতে এসেছে আমাদের সঙ্গে। বেড়াতে বেড়াতেই ফোনে খড়্গপুরে বরের জন্য কী মাছ আনা হবে সেটা ইনস্ট্রাকশন দিলে মাছওয়ালার মোবাইল ফোনে। মাছওয়ালা বাড়ি বয়ে এসে মাছটা দিয়ে যাবে, আসার পথে মাংসের দোকান থেকে দু কিলো মাংসও কিনে দেবে সেটাও মিষ্টি করে বৌদি বলে দিলেন শুনলাম। পরের ফোনটাই বাড়ির বিশ্বস্ত কাজের মেয়েকে, ওই মাংস রেঁধে এক কিলো যেন হট বক্সে ভরে সে অমুককে দিয়ে দেয়, সে কলকাতার ট্রেনে তমুককে সেটা হ্যান্ড ওভার করবে, কলকাতায় আমার বান্ধবীর মায়ের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া আছে তাইতে লাগবে। রিমোট কন্ট্রোলের সীমা পরিসীমা ক্রস করে গেছে মেয়েরা আজকের। সংসার করার হদ্দ করে চলেছে। দু তিনটে রোলে ফিট করে চলেছে নিজেকে। এর কোন স্ট্রেস নেই ? এর ফলে দুদিকে আগুন দেওয়া মোমবাতির মত ক্ষয় পেয়ে চলেছে কি, তার মনন ও মেধা, মগজ ও শরীরের পেশিসমূহ?

কে তার খবর রাখে?

 

 

সবচেয়ে দুঃখের হল, এসব ঘটে চলেছে সমাজের মেনস্ট্রিমের বিপরীতেই যেন। এখনো এত এত চাকুরে মেয়ের কাজের ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত হয়নি কোন সিনেমার সিলেবাসে। অমুক প্রসাদ তমুক বিনিন্দিতারা এখনো গোল গোল গল্প বানাচ্ছেন যেখানে কেরিয়ার করা মেয়েরা অসংসারী আর মন্দ… ঘরে থাকা ঘরেলু মেয়েরা সব্বাই ভাল… বছরের পর বছর স্বামীর কাছে টেকেন ফর গ্রান্টেড মেয়েদের দেবীর পদে উত্তরণের গল্পগুলোই গিলছে বাংলা সমাজ। কোথাও টোল খাচ্ছে না এই আইডিয়া যে চাকরি করলেই মেয়েরা সংসারকে উপেক্ষা করে। তথাকথিত লক্ষ্মী শ্রী টাল খায়।

 

চাকুরিরতাদের বেশ কিছু স্টিরিওটাইপ আছে। সবকটাই আশ্চর্য ধরণে। এক , তারা নুন তেল কাপড় চোপড়ের হিসেব রাখেনা। দুই, তারা স্বামীকে সময় দেয়না, বসের সঙ্গে ফ্লার্ট করে বেড়ায়। তিন, তারা সন্তানকে উপেক্ষা করে, হোমওয়ার্ক করে দেয়না। জ্বর হলে ছুটি  নেয়না। সেই কবে মহানগর ছবিতে, মাধবী বাড়ি ফিরতেই জ্বরগ্রস্ত তার সন্তানের ভার মুখ দেখে সে অপরাধবোধে মাটিতে মিশে যাচ্ছিল যখন আর শাশুড়ি বলছিলেন, সারাদিন কেঁদেছে, বলেছে মা দুষ্টু, মা আপিস গেছে…। আমার কন্যা প্রাপ্তে তু ষোড়শবর্ষে যখন আমার বান্ধবী হয়ে গিয়েছে, সিনেমার এই অংশে এসে চোখ গোল্লা গোল্লা করে আমাকে বলে, মা-আ -আ … এ ত একদম আমার গল্প। ঠাম্মা ঠিক এটাই বলত, আমার যখন জ্বর হত।

 

পড়শি বলেন, মেয়েটা ত বিয়ে করেও  দেখি পায়ের তলায় সর্ষে লাগিয়ে ভোর থেকে রাত্তির অফিসেই থাকে আর হিল্লি দিল্লি চরকি কেটে বেড়ায়। অন্যান্য আত্মীয়ারা ফোন করে বলেন, বৌমা নিশ্চয়ই বাড়িতে নেই?  বয়োজ্যেষ্ঠরা  সবাই বলেন, ওর বাচ্চার হোমওয়ার্ক কে করাবে, ও ত কেবল ট্যুরে যায়। স্বামী বলেন, তুমি ত বাড়িতেই থাক না!

 

হুবহু বাংলা সিনেমার মত, সরবতের গেলাস পিরিচে বসিয়ে ঘরের দিকে আসতে আসতে সে শুনে ফেলে তার শাশুড়ি তার পিসিশাশুড়িকে বলছেন,  বউটা অফিসার না হয়ে কেরানি হলে ভাল হত, বিকেল চারটের মধ্যে পাত্তাড়ি গুটিয়ে বাড়ি ফিরে আসত।

 

অবশ্য সে পিরিচ সরবত ফেলে দিয়ে চৌচির করেনা কিছুই। দৃঢ় পদক্ষেপে সে এখন উপেক্ষা শিখে গেছে।

 

যাবতীয় স্টিরিও টাইপ উড়িয়ে দিয়ে তবু, কর্মরতা মেয়েরা আপিস আর বাড়ি ব্যালেন্স করে যান ক্রমাগত। করে যান দুবেলার ঝিগিরি। আমার এক বান্ধবীর ভাষায়  “এবলা ওবলার” কাজ।  ডাবল শিফট।

 

আপিসে পুরুষ বসেরা কাজের চাপ ইচ্ছে করে কমিয়ে দিতে চেষ্টা করেন এই অভিযোগে, যে, ক্রমাগত বাচ্চার অসুখের জন্য যে ছুটি নেয় তাকে আর দায়িত্বের কাজ কীভাবে দেওয়া যেতে পারে… পুরুষ সহকর্মীদের মধ্যে সূক্ষ্ম থেকে স্থূল নানা রসিকতা চলে একটি মেয়ের চাকরি নিয়ে… কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রমাণের জন্য এক অদৃশ্য দড়ি পেরোতে ক্রমাগত লাফ দিতে থাকি আমরা মেয়েরা। দড়িটা ক্রমশই আরো উঁচুতে উঠতে থাকে… সেই সব স্ট্রেসের গল্প না হয় আরেকদিন হবে!!!!

 

যশোধরা রায়চৌধুরী

শরীর তুমি কার?

প্রকাশিত সংবাদ প্রতিদিন ২০১৮

 

shree reddy

এ এক আশ্চর্য সমাপতন যেন। হায়দ্রাবাদের  তরুণী অভিনেত্রী শ্রী রেড্ডিকে নিয়ে  খবর পড়ছি যখন, ইশ ছি ছি আর হো হো হেসে তুচ্ছ করে দেওয়া তার অর্ধেক ব্লক আউট করা নগ্নতার ভিডিওটিকে উপেক্ষা করতে চাইছি কিন্তু পারছি না, একে একে লেগিংস , টি শার্ট ও ব্রা খুলে ফেলার প্রচেষ্টার মধ্যে প্রতিবাদ কতটা আর উপহসনীয় লোক দেখানেপনা কতটা তা নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ যখন শুরু হব হব, তখন মনে হল কেউ যেন আবার মনে পড়িয়ে দিচ্ছে আমায়, কাচের জানালায় টোকা দিয়ে দিয়ে, ও মেয়ে, তোর শরীর কি তোর? তুই যে শরীরে বাস করিস, সে শরীরের ওপর আদৌ অধিকার আছে না কি নিজের? নইলে, নিজের শরীরকে অনাবৃত করাটা এত বড় ধৃষ্টতা বলে কীভাবে প্রতিপন্ন হয়? কেন সমাজ পথ আগলে থাকে আর মেয়েদের বলে দেয়, তার শরীর তার নয় আসলে?

 

ঠিক,যে, তার আগের আটচল্লিশ ঘন্টা আমার কেটে গেছে তীব্রভাবে অস্বস্তিকর একটা বই পড়তে পড়তে। সে উপন্যাসের  কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার কাছে এটাই।  মেয়েদের শরীরের সংগে তাদের নিজেদের সম্পর্ক। মুখোমুখি সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র কীভাবে মেয়েদের শরীরকে ব্যবহার করে, নিয়ন্ত্রণ করে।  যে বইটি পড়ছি এবং তলিয়ে যাচ্ছি এক ছটফটে বদ্ধতার কুয়োয়, সে বই মার্গারেট অ্যাট উডের লেখা আমেরিকান উপন্যাস, ১৯৮৪ তে লেখা দ্য হ্যান্ড মেইড’স টেল। যাকে তুলনা করা হয় জর্জ অরওয়েল লিখিত ১৯৮৪ উপন্যাসের সংগেই।  বীভৎস এক ডিসটোপিয়া, দুঃস্বপ্নের দেশ হয়ে গিয়েছে সে গল্পে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী আমেরিকা নামক দেশটি, হঠাৎ উলটে গেছে সমাজ-রাষ্ট্রের বিধিবিধান।  আচমকা, পাশ্চাত্যীকৃত বা ওয়েস্টার্নাইজড, তথাকথিতভাবে লিবারেটেড ( পড়ুন বেহায়া, বে -আব্রু) মেয়ে শরীরের ওপর নেমে এসেছে ফতোয়া, ধর্মীয় কানুন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।  গল্পে,   সে দেশ পরিণত হয়েছে খ্রীষ্টান ধর্মীয় মৌলবাদের এক আখড়ায়। রাষ্ট্র মেয়েদের “সুরক্ষা দিতে” সম্পূর্ণ এক শো আশি ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে আবার মেয়েদের  লেখা পড়া,  কাজ করা, ভোট দেওয়া, সব ধরণের কর্তৃত্ব নিষিদ্ধ করেছে, পর্দানশিন করেছে। আর পরিণত করেছে এক শরীরে যার কাজ শুধু সন্তানের জন্ম দেওয়া।   যেন ইতিমধ্যে, নারীমুক্তির পূর্বেকার ধারণা সব মিথ্যে প্রমাণিত, আসলে ত, মেয়েরা স্বাধীনতাকে নিয়ে কি করবে বুঝতেই পারেনা, নিজেদের শরীরকে সঠিক ব্যবহার না করে নষ্ট করে ফেলে, তাই তাদের সুরক্ষা দিতে আনতেই হয় ঘোমটা পর্দা। নিষিদ্ধ হয় তাদের নিজের শরীরের ওপর নিজেদের অধিকারের স্পর্ধাপ্রদর্শন।  তাদের শরীর তাদের সম্পত্তি থাকে না আর, থাকেনা আর তা নিয়ে যা খুশি করার অধিকার ।

 

“এই যে চাদ্দিকে এত অবাধে নারী ধর্ষণ, এ তো আসলে মেয়েদেরই দায়, তাদেরই দোষ, নিজের শরীর কে ক্রমাগত দেখিয়ে দেখিয়ে, নিজেদের শরীরের প্রদর্শনে পুরুষের লোভ জাগিয়ে জাগিয়েই মেয়েরা নিজেদের এই ক্ষতি ডেকে আনেনি কি?” এমন কাল্পনিক সংলাপ রাষ্ট্রযন্ত্রের মুখে, অ্যাটউডের গপ্পে।  অন্ধকার সেই বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী দিনে,  মেয়েদের পরিণত করা হয়েছে যন্ত্রে। জরায়ুযন্ত্রে। কারণ জনসংখ্যা কমে গিয়েছে তাই জন্ম দিয়ে যেতে হবে তাদের। প্রেমহীন, এমনকি যৌনতারও আনন্দহীন, কেবলমাত্র সন্তানজন্মের ধারকে পরিণত হতে হয়েছে তাদের।

 

সেই চাপা বদ্ধ, ভয়ংকর দম আটকানো বিবরণ পড়তে পড়তেই দেখি শ্রী নাম্নী এই তেলুগু অভিনেত্রীর ধৃষ্টতা, নিজের শরীরকে নিজের হাতে নেওয়া, মানুষকে ধমকাতে চমকাতে প্রকাশ্যে পোশাক ছেড়ে উর্ধাঙ্গ অনাবৃত করার সাঙ্ঘাতিক “স্বাধীনতা”র ঘটনা। সে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছে কাস্টিং কাউচের বহুলব্যবহারের দিকে।  সিনেমায় নামতে হলে, যত গুণী অভিনেত্রীই হোক না কেন, যত রূপসী নিখুঁত শরীরের অধিকারিণীই হোক না কেন একটি মেয়েকে পুরুষ পরিচালক-প্রযোজকের অঙ্কশায়িনী হতেই হয় আজো। অর্থাৎ আসলে প্রতি পদে তার শরীরকে অন্যের ব্যবহার্য বা নিয়ন্ত্রিতই রাখতে হয় তাকে।  এই তথ্যের প্রতি সকলের চোখকে ঘুরিয়ে দিতে, নাম তুলে তুলে সেসব পরিচালক প্রযোজককে অস্বস্তিতে ফেলতে, নেমিং শেমিং করতে যখন চেয়েছেন শ্রী, তাতে বাধা পেয়েই নাকি তাঁর এই পরবর্তী পদক্ষেপ, নিজের হাতে তুলে নেওয়া নিজের শরীরের আব্রু, শালীনতা। ঠুনকো আর মিথ্যে সেই শালীনতা যা শুধু বলবার কথা মেয়েদের। সেটা প্রমাণের তাগিদেই কি তার,  ক্যামেরার সামনেই টপ খুলে ফেলা। নিজের গোপনীয় শরীরকে অনাবৃত করার অসভ্যতা করে চমকে দেওয়া।

মনে পড়ে যায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিনের ওপর পোস্টার লেখার কথা, এই ত সেদিন । কী ভীষণ আ ছি ছি ! মনে পড়ে যায় মনোরমার ধর্ষণ ও মৃত্যুর প্রতিবাদে মণিপুরের মায়েদের উলঙ্গ হয়ে প্রতিবাদ। আয় সেনাবাহিনী, আমাদের ধর্ষণ কর, আমরা ত মা, আমাদের ক্ষতবিক্ষত কর। এই আহবানের বীভৎসতা আছড়ে পড়েছিল যেদিন গোটা ধর্ষকদর্শক সমাজের চোখের ওপরে। বিঁধে গিয়েছিল আমাদের সবার পুরুষদৃষ্টিতে( মেল গেজ) অভ্যস্ত চোখের মধ্যে।

 

আজ শ্রী যেভাবে বিঁধিয়ে দিলেন। আ ছি ছি বলে আমরা চোখ বুজছি, আবার আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখেও নিচ্ছি সব্বাই। মেয়েটা কী বেহায়া দেখ। বলছি সবাই।

মেয়েদের শরীর আসলে মেয়েদের নয়, এ কথা আজন্ম শিখতে শিখতে শেখাতে শেখাতে আমাদের চুল পেকে গেল। আজো , যখনই মেয়েরা নিজের শরীরকে নিজের ইচ্ছেমত ব্যবহার করে, আমরা চমকাই।

 

প্রশ্ন এইখানেই ঘুরপাক খেতে থাকে। সমাজের উদ্দেশে, রাষ্ট্রের উদ্দেশে, মেয়েদের শরীরকে কেন যে নিবেদিত , উৎসর্গীকৃত হতে হয়।  যুগ যুগ ধরেই কেন যে ‘মহৎ’ ‘পবিত্র’ থাকতে হয়। এবং মাতৃত্ব অথবা সেবা বা মনোরঞ্জন বা পুরুষের বিনোদন এইসব নানা পূর্ব পরিকল্পিত ভূমিকায় লিপ্ত হতে হয়। কেন যে মেয়েদের শরীর তার ইচ্ছেমত যা খুশি করার নয়। কেন যে গরমের দিনে, ছেলেদের মত মেয়েরা গা খুলে ঘুরে বেড়াতে পারে না সর্বসমক্ষে।

অ্যাটউড যখন পড়ে পাওয়া , খেটে পাওয়া, লড়ে পাওয়া নারী স্বাধীনতার ক্ষেত্র হিসেবে শরীরকে দেখার বিষয় নিয়ে  দুঃস্বপ্নের জগত কল্পনা করেন যেখানে মেয়েদের মুখ ঢাকা, চুল ঢাকা, সর্বশরীর দীর্ঘ গাউনে ঢাকা, সে দুঃস্বপ্ন আজো একটা ভারতে একটা পাকিস্তানে একটা বাংলাদেশে কতটা জীবন্ত, ভেবে শিউরে উঠতে হয়। আর অবাক করতে থাকেন শ্রী রেড্ডি -র মত এক দুজন ব্যতিক্রম। যারা খেলাটা ঘোরাতে চেয়েছে কখনো না কখনো।

 

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

নাদিয়া মুরাদ , যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ঘুরে দাঁড়ানো মেয়ে

nadia-murad-nobel-prize( প্রকাশিত, সংবাদ প্রতিদিন, ২০১৮ অক্টোবর)

যশোধরা রায়চৌধুরী

পঁচিশ বছর বয়সী নাদিয়া মুরাদ। ইরাকের এক মেয়ে। পাতলা ঠোঁট, রোগা মুখখানি, বাদামি চুলে ঘেরা, চোখে শুধু অতলান্ত বিষাদ ও আগুন পাশাপাশি। কারণ  নাদিয়া সেই ইরাকের ইয়েজিদি গোষ্ঠীর মেয়ে, যারা ছিল আইসিসের আক্রমণের লক্ষ্য। এ এক রক্তাক্ত ও নিষ্ঠুরতম জাতিযুদ্ধ। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে পুরুষদের হত্যা,  মেয়েদের ধর্ষণ করার পবিত্র কর্তব্যখানি পালন করেছেন গত চার পাঁচ বছর আইসিস জঙ্গিরা। সিরিয়া বর্ডারের কাছে একদা শান্ত ভূস্বর্গের মত পাহাড়ি অঞ্চলের, ইয়েজিদিদের বাসভূমি সিঞ্জর এলাকার কোচো গ্রামের বাসিন্দা নাদিয়া। ২০১৪ সালে আইসিস ইরাক ও সিরিয়ার ওপর ঝড় বইয়ে দিয়েছিল হত্যালীলার। নাদিয়ার শান্ত সুখের জীবনের সেখানেই ইতি। দুঃস্বপ্নের দেশে প্রবেশ। বন্দিনী নাদিয়া আইসিস ক্যাম্পে চলে যান তারপর। যৌন অত্যাচারের দিন শুরু হয় । তিন মাস মোসুলে থাকাকালীন বারে বারে গণধর্ষিত, অত্যাচারিত, মার খাওয়া নাদিয়া দেখেন তাঁদের জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে এবং বেচে দেওয়া হচ্ছে খোলা বাজারে দাস ব্যবসায়ীদের হাতে। নাদিয়া ভুয়ো কাগজপত্র নিয়ে আরো কয়েকজনের সঙ্গে পালিয়ে কুর্দিস্তানে আসেন, ইয়েজিদি ক্যাম্পে থাকেন, জানতে পারেন তাঁর ছয় ভাই আর মা আইসিসের হাতে নিহত। পরে সেখান থেকে জার্মানিতে গিয়ে ঠাঁই পান বোনের কাছে, ২০১৬ তে। ২০১৭ তে আত্মকথা লেখেন নাদিয়া, দ্য লাস্ট গার্ল। সে আত্মকথায় মুখবন্ধ লিখেছিলেন লেবানিজ ব্রিটিশ উকিল আমাল ক্লুনি, মানবাধিকার আন্দোলনের  অন্যতম মুখ। নাদিয়া শুরু করেন “আওয়ার পিপলস ফাইট” নামের আন্দোলন, মি টু হ্যাশট্যাগের ও অনেক আগে।

নাদিয়া সেই সাক্ষী, নিজের ও তার গোষ্ঠীর অন্য মেয়েদের শরীরের ওপর বয়ে যাওয়া যুদ্ধঝড়ের , যিনি চুপ থাকেন নি। থেমে যান নি। ঘুরে দাঁড়াও , মেয়ে! বলো, নীরব থেকো না। নাদিয়া বলতে শুরু করেছিলেন। আজকের নাদিয়া, অগ্নিময়ী নাদিয়া। আর এই লড়াই, এই উঠে দাঁড়ানো, নির্ভয় জোরালো কন্ঠে বলা বিভীষিকার ইতিবৃত্ত, এবং আক্রান্ত মেয়েদের পাশে দাঁড়ানো,  এটাই নাদিয়াকে এনে দিল ২০১৮ র নোবেল শান্তি পুরস্কার।

শুনে গল্পকথা মনে হয়। এর আগে সংযুক্ত রাষ্ট্র তাঁকে দিয়েছে মানব পাচারের শিকারদের লড়াইয়ের মুখ বা অ্যাম্বাসাডরের সম্মান। এবার,  মনে হয় নোবেল পুরস্কারই যেন নাদিয়াকে পেয়ে, সম্মানিত হল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অথবা ভারতের কৈলাশ সত্যার্থী, বাংলাদেশের মহম্মদ ইউনুস ও এই পুরস্কার প্রাপক। কিন্তু এতখানি মাটির কাছাকাছি এ পুরস্কার যে নামতে পেরেছে সেজন্যেই আজ অহংকার আমাদের। এ তো  যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে আসা রক্তাক্ত , অথচ লড়তে থাকা, না হার মানা এক মানুষকে, এক লাঞ্ছিত মেয়ের লড়াইকে সারা পৃথিবীর দরবারে পেশ করার কাজ । তার সঙ্গে পুরস্কার ভাগ করা কংগোর ডাক্তার ডেনিস মুক ওয়েগেও ধর্ষিত মেয়েদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কাজে অগ্রণী। যেন বহুযুগের চাপা পড়া বিষয়,  যৌন অত্যাচারের দিকে এবার আলো ফেলল নোবেল শান্তি পুরস্কার। প্রায়শ্চিত্ত করল যুগযুগান্ত বাহিত অবহেলার।

নারীর শরীর কেন হবে যুদ্ধক্ষেত্র? এই প্রশ্ন তুলে আজ বিশ্বের সেরা শিরোপা তাঁর মাথায়। আসলে ত, বিশ্ব শান্তির নোবেল যতটা বড়, ঠিক ততটাই বা তার চেয়েও বেশি যোগ্য নাদিয়া।

পরিবারের সবাইকে প্রায় হারিয়ে আজ  নাদিয়া মুরাদ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন  হারিয়ে যাওয়া, আইসিসের হাতে যৌনবন্দিনী প্রায় ৩০০০ ইয়েজিদি মেয়েকে খুঁজে বার করার কাজে । বেশ কিছু ইয়েজিদি কর্মীর সঙ্গে মিলে প্রমাণ ও বয়ান সংগ্রহ করছেন,  চেষ্টা করছেন ওঁদের ভাষায় “দায়েশ” বা আইসিস -কে আন্তর্জাতিক অপরাধের আদালতে তোলার।

সাহস, উৎসাহ, উৎসর্গ, লড়াই। এসব গালভরা কথা। শুনতে বড় ভাল। সকলেই জানে যে গাল ভরা কথারা বস্তুত পোশাক পরা মিথ্যে হয়। কিন্তু এই একটি বারের জন্য, বিশ্বাস করুন,  অত্যাচারিত মেয়েদের জন্য, পাচার হওয়া, দাসীবৃত্তি করতে, যৌনদাসী হতে বাধ্য হওয়া অগণিত মেয়ের প্রতিভূ হয়ে তাদের খুঁজে আনতে, বাঁচাতে , তাদের কথা বলতে এগিয়ে আসা , তাদের লড়াইয়ের অগ্রণী হিসেবে এই তারকা  নাদিয়ার কথা লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে এসব শব্দও আসলে বার বার হেরে যাচ্ছে, সেই সত্যের কাছাকাছি পৌঁছতেই পারছে না যার নাম নাদিয়া মুরাদ।

দুঃস্বপ্নের মত অত্যাচারের কাহিনি তিনি যখন শোনান ব্যথাহত অথচ কঠোর মুখে, অবিশ্বাস্য মনে হয়। আরো আশ্চর্য মনে হয়, তাঁর বেঁচে ফেরার ও লড়াইয়ের কাহিনিটি।

মিথের মত, গল্পকাহিনির মত, পরম আশ্চর্যের মত এই কাহিনি আসলে মানবতার শুভ ক্ষমতার ওপর আমাদের বিশ্বাসকেই দৃঢ় করে। মনে হয় সব শেষ হয়ে যায়নি।

এক অকেলা ইস শহর মেঁ

devdasএক অকেলা ইস শহর মেঁ – দেশ পত্রিকা ২০১৭ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সংখ্যায় প্রকাশিত

 

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

 

 

 

এক অকেলা ইস শহর মেঁ

রাত মেঁ আউর দো পহর মেঁ

আব –ও –দানা ঢুঁঢতা হ্যায়

আশিয়ানা ঢুঁঢতা হ্যায়।

প্রিয় গায়ক ভূপিন্দর সিং হের কন্ঠে শোনা এই গানটি প্রবলভাবে আমার প্রজন্মকে অধিগ্রহণ করেছিল সত্তরের শেষ থেকে আশির দশক অব্দি। ঘরোন্দা এক হিন্দি ছবি। নায়ক অমল পালেকর  এ গানের চিত্রায়ণে একা একা মুম্বই শহরের পথেঘাটে ঘুরে বেড়ান। স্পষ্টত বেগানা দিওয়ানা, প্রেমে  হতাশ ।  উশকো খুশকো  চুল, কোটরে বসা চোখ, বিষণ্ণ হাঁটাচলা। তীব্র সংক্ষোভে ঝুঁকে আসা পিঠ।

 

এই সেদিন আবার এ ছবি গোটাটাই দেখি ইন্টারনেটের কল্যাণে। আর দেখার পর থেকে মাথায় ঘুরছে এ ছবির অদ্ভুত চলন। জারিনা ওয়াহাব, এ ছবির নায়িকা ,এক বয়স্ক ভদ্রলোককে বিবাহ করতে বাধ্য হয় । আর্থিক কারণ ত ছিলই, মূল কারণ প্রেমিকের প্রতি অভিমান। তারা বিয়ে করতে চেয়েও পারেনি বাড়ির অভাবে। ফ্ল্যাট “বুক” করলেও টাকা নিয়ে চম্পট দেয় মুম্বই শহরের অসাধু ব্যবসায়ী।  পাকেচক্রে পর্যুদস্ত অমল পালেকর টাকার ক্ষতি সহ্য করতে পারেনা।  জারিনাকে তীব্র আক্রোশে বলে ফেলে, তোমার বস তোমাকে বিয়ে করতে চাইছে, করে নাও, বুড়ো আর কদিন বাঁচবে, সে মরলে টাকাগুলো ত আমরাই পাব।

অভিমানের তীব্র দহনে জারিনা অমলকে দূরে সরিয়ে দিয়ে বিয়ে করে ফেলে প্রৌঢ় উর্ধতনকেই। মুম্বই শহরে একটা মনের মত ছোট ফ্ল্যাট পাবার অসম্ভাব্যতা দুই কেরাণির, মেসবাড়িতে প্রাইভেসিহীন প্রেম, সত্তরের উত্তাল সময়ের ছিন্নভিন্ন নানা  অভিঘাতের মত আছড়ে পড়া এসবের পর, এই বাঁক থেকে গল্পটা হয়ে যায় এক প্রৌঢ় শ্রীরাম লাগু, তার বৈধ স্ত্রী জারিনা ও তার প্রাক্তন প্রেমিক অমলের ত্রিকোণে।  ব্যক্তি ট্র্যাজেডির নাটকের ঘুর্নিপাকে আটকে  যায় দর্শক। চিরন্তন ত্রিকোণ প্রেমের এক মডেল, টানটান জড়িয়ে রাখা। আর সেখানেই , উপরোক্ত গানের অনুষঙগে আমরা দেখি , নিজেই নিজের পায়ে কুড়ুল মারা অমল দেবদাস হয়ে পথে পথে ঘোরে।

‘দেবদাস হয়ে গেল’। শব্দ বন্ধ আমাদের জীবিত কালে বার বার পুনরুক্ত। কারুর প্রেমে বঞ্চিত বা প্রত্যাখ্যাত দেখলে, অস্বীকারে ভেঙ্গে পড়তে দেখলে, আমরা বলি দেবদাস। কেউ দুঃখ ভুলতে মদ্যপ বা অন্য নেশাসক্ত? দেবদাস। রিবাউন্ড খেয়ে অন্য নারীতে আসক্ত বা একাধিক নারীর সঙ্গে নটঘট করছে?  পরদারগমন বা বারাঙ্গনাগৃহে গমনের প্রবণতা , ডিউ টু রিফিউজাল? দেবদাস।

দেবদাস  চরিত্রটি, এবং সেই নামের উপন্যাসটি, লেখা হয়েছিল ১৯০০ সাল নাগাদ এবং প্রকাশ পায়  ১৯১৭ তে।  তাই বলাই চলে যে  গত একশো বছর এই মডেল শাসন করেছে ভারতীয়ের মনন।

 

বাঙালি না বলে ভারতীয়ই বললাম। সারা ভারতের নানা ভাষায়  এ বইটি অনূদিতই শুধু নয়, অন্তত ১৪ বার চলচ্চিত্রায়িত । প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্রে ১৯২৭ সালে পরিচালক নরেশ মিত্রের পরিচালনায়। সর্বশেষ ২০০৯ সালের দেব ডি নামক নিরীক্ষামূলক চলচ্চিত্র অনুরাগ কাশ্যপের হাতে। মধ্যবর্তীতে, প্রমথেশ বড়ুয়ার কৃত দেবদাস হিন্দি বাংলা অসমিয়ায় অতি বিখ্যাত।

আছে উর্দু তেলুগু ও মালয়ালম ভাষায় চলচ্চিত্রায়িত দেবদাস। মাঝারি সময়ে রঙিন যুগে দিলীপ রায় পরিচালিত  সৌমিত্র সুমিত্রা সুপ্রিয়া উত্তম অভিনীত দেবদাস( ১৯৭৯) বেশ খানিক ফ্লপ ।  সঞ্জয় লীলা ভনশালী  তারপর আনলেন ব্লকবাস্টার দেবদাস। শাহরুখ ঐশ্বর্য মাধুরীর তিরংগা ( ২০০২) ।

ঝাঁ চকচকে প্রোডাক্ট। শেষ দৃশ্য নাটকে টানটান। উপন্যাস থেকে অনেকটাই সরে আসা সে পরিণতি।

 

এই এতগুলো চলচ্চিত্র থেকে তো  যে কোন ব্যক্তি যে কোন পছন্দসই দেবদাসকে বেছে নিতেই পারেন। নিজ নিজ অভিরুচি। কিন্তু তবুও , আজো অম্লান বইতে পড়া দেবদাসের স্মৃতি, শুধু আমার নয়, আরো অনেক ভারতীয়ের। প্যান ইন্ডিয়ান আইকন দেবদাস। এমনকি যাঁরা হিন্দিভাষায় অপটু অনুবাদে পড়েছেন, তাঁরাও।

 

কেন হিন্দি বাংলা ছবির ক্ষেত্রে দেবদাসের এই অমোঘ আকর্ষণ? এই রহস্য কোথায়, জানতে ইচ্ছে করে। এ কি শরৎচন্দ্রের নিজস্ব ম্যাজিক। যা পরিণীতা বা রামের সুমতি/  বিন্দুর ছেলের মত গল্প নিয়ে  ছবিকেও ব্লকবাস্টার করে দেয়। লক্ষ্য করব, এই পুনঃ পুনঃ নির্মিত দেবদাস বাদ দিলেও অসংখ্য ছবির প্লটে শিরদাঁড়া হিসেবে কাজ করেছে দেবদাস। যেমন আমি যে ঘরোন্দা ছবিটির উল্লেখ করলাম, তার শেষার্ধে স্পষ্টত ইন্ধন দিয়েছে পার্বতীর শ্বশুরালয়ে নিজের স্থান করে নেওয়ার অগাধ পরিশ্রম ও সংযম। খেয়াল করলে বোঝা যায় সেটা।

 

অথবা মিলি ছবিতে গোড়ার দিকে, অমিতাভ বচ্চনের নিঃসঙ্গ ক্রুদ্ধ উপস্থিতি। পরের দিকের হিন্দি ছবিতে  অ্যাংরি ইয়াং ম্যানের আদর্শটিও খানিকটা দেবদাস  উদ্‌বুদ্ধ নয় কি?

 

 

খুব বড় নয় উপন্যাসটি।  আমি আবার পড়ি। আজি হতে শতবর্ষ আগে লেখা এই কাহিনি আবার আমাকে ধরে রাখে। তার টান শুরু থেকে শেষ অব্দি পড়িয়ে নেয়। গল্পের গুণে পড়িয়ে নেয়। শুরুর নরম নস্টালজিয়া, শৈশবকাহিনির আর্তি থেকে টেনে ধরে।

 

আমাদের আত্মিক যোগাযোগ, ভাবি আমি, ছিন্ন হয়ে গিয়েছে এ গল্পে বর্ণিত সমাজ অর্থনীতির সঙ্গে। তবু মূলধারার যে কোন সফল সাহিত্যের মতই, গল্পের টানে এ আমাকে পড়িয়ে নেয়। এর ভেতরকার টানাপোড়েন, আদি অন্তহীন প্যাশন প্লে, নাটকীয়তা, আমাকে রক্তাক্ত করে। কাহিনির হাই পয়েন্টগুলি, আজো সমান বিধুর করে। যেমন পার্বতী দেবদাসের মান অভিমান পর্ব। পার্বতীর ঝলসে ওঠা অভিমান।

স্থানে স্থানে আমার অবাস্তব মনে হয় কিছু কিছু ঘটনা। মূলত চন্দ্রমুখীর সামাজিক পরিসর। তার “ভ্রষ্টা স্ত্রীলোক” এর অবিতাড়নীয় দুর্ভোগ দুর্ভাগ্য, এগুলো আমাদের সময়ের সঙ্গে খাপ খায় না।

 

কিন্তু এহ বাহ্য । মূল ব্যাপার হল এ গল্পে যেন, দেবদাসের মনস্তত্বকেই আমি ঠিক বুঝিনা।

 

আশ্চর্য হয়ে দেখলাম, সুকুমার সেন তাঁর বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস -এর পাতায় শরৎচন্দ্রের প্রতি প্রবল নির্দয়। আসলে লেখক হিসেবে বাংলাবাজারে ( শব্দবন্ধ ব্যবহার করার জন্য দুঃখিত কিন্তু এর চেয়ে বেশি অর্থপ্রকাশক শব্দ আমাদের মনে পড়ল না) যতটাই জনপ্রিয় তিনি, বৌদ্ধিক মহলে তাঁকে সমালোচকদের কাছে ততটাই বিব্রত হয়েছে বলে মনে হয় সুকুমার সেনের লেখার ভাষা দেখে।

কী লেখেন সুকুমার সেন? “ প্রধান পাত্রপাত্রীর কঠিন পীড়া কিংবা মৃত্যু দ্বারা কাহিনীর সঙ্কটমোচন অথবা গ্রন্থিচ্ছেদ শরৎচন্দ্রের প্লট -পরিকল্পনার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য…দেবদাস ইত্যাদিতে কাহিনীর জট ছাড়ানো হইয়াছে মুখ্যপাত্রের মৃত্যুতে। এইখানে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব জাগ্রত। … দেবদাস শরৎচন্দ্রের প্রথমতম উপন্যাস যদিও না হয় প্রথম উপন্যাসগুলির অন্যতম নিশ্চয়ই।  ইহার রচনা সমাপ্তিকাল সেপ্টেম্বর ১৯০০ ( আগেই বলেছি বই হিসেবে প্রকাশকাল ১৯১৭- নিবন্ধলেখক) । তখনো রবীন্দ্রনাথের চোখের বালি বাহির হয় নাই; সুতরাং উপন্যাস -কাহিনীতে বঙ্কিমচন্দ্রেরই প্রভাব জাগ্রত। পার্ব্বতী দেবদাসের বাল্যসৌহার্দ্দ্যলীলায় শৈবলিনী প্রতাপের প্রণয়লীলার অনুসরণ আছে; পার্ব্বতী -ভুবনবাবুর দাম্পত্য ব্যবহারে লবঙ্গ-রামসদয়ের দাম্পত্যলীলার অনুকরণও দুর্লক্ষ্য নয়। … রঙ অত্যন্ত চড়িয়া গিয়া দেবদাসের শোচনীয় পরিণতি পাঠকের অশ্রু আকর্ষণ করিতে সমর্থ হইলেও শিল্পের হানি করিয়াছে। দেবদাসের প্রথম অংশে যে সরল সুন্দর স্বাভাবিকতা দেখি তাহা শেষাংশের সেন্টিমেন্টালিটিতে একেবারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে।” ( সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, তৃতীয় খন্ড, বানান অপরিবর্তিত)

 

এখানে লক্ষ করার মত ব্যাপার হল এই যে, সুকুমার সেন তাঁর ইতিহাসে শরৎচন্দ্রের জন্য আঠাশ পাতা বরাদ্দ করেছেন, আর তার মধ্যে মাত্র আধপাতা দেবদাসের জন্য বরাদ্দ হয়েছে।

 

আরো লক্ষ্য করার, যে, এই শেষের সেন্টিমেন্টালিটিই চলচ্চিত্রে “পাবলিক খায় ভাল”। মৃতপ্রায় দেবদাসকে দেখতে পার্বতীর ছুট, দেউড়ি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ দৃশ্যের মেলোড্রামা কিন্তু শরৎচন্দ্র রাখেন নি। মূল গল্পে ছিল, দেবদাসের অন্ত্যেষ্টি যেমন তেমন করে হয়ে যাবার পর পার্বতী জানতে পারছে।

 

বন্ধুবান্ধব সবাই বলেছে ( যদিও যারা বলেছে  তারা অধিকাংশই মহিলা!)  বইটা পড়তে পড়তে দেবদাসের ওপর রাগে গা জ্বলে যায়। আসলে , দেবদাসের জন্মমুহূর্ত থেকে সে নারীচরিত্রদের কাছে হেরে যাবার জন্য তৈরি হয়ে বসে আছে। আজকের ভাষায় লুজার বলতে যা বোঝায় আর কি।

কিন্তু   দেবদাসের কনট্রাস্টে  দুই আশ্চর্য মহনীয় উদার ও দেবীতুল্য নারীচরিত্রকে তৈরি করেন শরৎ। তাদের গড়ে তুলতে গিয়েই কি  দেবদাসকে অতি হীন চরিত্র করে গড়তে হল শরৎচন্দ্রকে?

যাইহোক, এ সূত্রে শরৎচন্দ্রের নারী চরিত্রদের নিয়ে দুচার কথা উঠেই পড়ে, আর এ উল্লেখে জড়িয়ে যায় তাঁর সমাজবীক্ষাও । সুকুমার সেন বলছেন, অনেক উপন্যাস ও গল্পে, “মৃতপ্রায় সমাজে নারী সম্পর্কে অযথা উৎপীড়নের চিত্র প্রাধান্য লাভ করিয়াছে। পূর্ব্ব বর্তী লেখকেরা এমন অবস্থায় সমাজ-ব্যবস্থাকে অকরুণ মানিয়াছেন, তবে অন্যায় বলেন নাই এবং অমান্যও করেন নাই। শরৎচন্দ্রও অমান্য করিতে সাহস করেন নাই, তবে অন্যায় বলিয়াছেন মুক্তকন্ঠে ।”

 

শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন, সমাজ জিনিশটাকে আমি মানি, কিন্তু দেবতা বলে মানিনে।

 

শরৎচন্দ্রের আমাদের সাহিত্যে যে অবদান সবচেয়ে বড় সেটা পতিতার প্রেম ও একনিষ্ঠতার ধারণা। ( পরবর্তী ছায়াছবির দুনিয়ায় এই  মডেল খুব প্রচল হবে) কিন্তু সুকুমার সেনের বক্তব্য, টেক্সট বুক মরালিটি বা পুথিগত নীতিবোধের বাইরে বৃহত্তর চারিত্র্য নীতির ধারণা এবং সমাজের অনুবীক্ষণে যারা পতিতা তাদের মহত্বের এই ধারণা, এগুলো রবীন্দ্রনাথের হাতফেরতা হয়েই নাকি শরৎচন্দ্র পেয়েছেন। তবে তিনি অস্বীকার করেননি  যে শরৎচন্দ্র একনিষ্ঠ প্রেমকে সতীত্বধারণার খাঁচা থেকে বের করে এনেছিলেন।  শরৎ এর মতে, “সতীত্বের ধারণা চিরদিন এক নয়। পূর্ব্বেও ছিল না, পরেও হয়ত একদিন থাকবে না একনিষ্ঠ প্রেম ও সতীত্ব যে ঠিক একই বস্তু নয়, এ কথা সাহিত্যের মধ্যেও যদি স্থান না পায়, ত এ সত্য বেঁচে থাকবে কোথায়?”

 

তার চেয়েও গুরত্বপূর্ণ উল্লেখ সুকুমার সেনের লেখায় আছে। সেটা হল এই যে এক সময় শরৎচন্দ্র বাঙলা দেশের কুলত্যাগিনী বঙ্গরমণীর ইতিহাস সংগ্রহ করেছিলেন। তাতে বিভিন্ন জেলার সহস্রাধিক হতভাগিনীর নাম, ধাম, বয়স , জাতি, পরিচয় ও কুলত্যাগের সংক্ষিপ্ত কৈফিয়ৎ লিপিবদ্ধ ছিল। শরৎচন্দ্র হিসেব করে দেখেন, এই হতভাগিনীদের শতকরা সত্তরজন সধবা। বাকি ত্রিশটি মাত্র বিধবা। প্রায় সকলেরই হেতু লেখা ছিল, অসহ্য দারিদ্র্য ও স্বামী প্রভৃতির অসহনীয় অত্যাচার – উৎপীড়ন।

 

শরৎচন্দ্র লিখেছিলেন,  “সমাজসংস্কারের কোন দুরভিসন্ধি আমার নাই। তাই বইয়ের মধ্যে আমার মানুষের দুঃখ বেদনার বিবরণ আছে, সমস্যাও হয়ত আছে, কিন্তু সমাধান নেই। ও কাজ অপরের, আমি শুধু গল্পলেখক, তা ছাড়া আর কিছুই নই। “

 

পার্বতীর বেদনার উৎস দেবদাসের কাপুরুষতা, না সমাজের অদ্ভুত ব্যবস্থা? যে ব্যবস্থা দুটি শিশুকে এক সঙ্গে থাকতে দেয়, কিন্তু বিবাহিত হতে দেয়না সামাজিক কিছু তুচ্ছ বিধিনিষেধের কারণে? ্সামাজিক দিকেই পাল্লা ভারি। কিন্তু পার্বতীর চরিত্রকে অবাস্তব বলা যায় না একেবারেই, বরং তার বৃদ্ধ স্বামী ও নতুন সংসারের সঙ্গে ব্যবহারের ভেতরে অনেক ভাবনার রসদ জড়ো হয়। আত্মত্যাগের মাহাত্ম্য ইত্যাদি ইত্যাদির পরেও ,আমি দেখি শান্ত সজাগ বুদ্ধিমতী ও “প্র্যাকটিকাল” পার্বতীকে, যে নিজের গায়ের গয়না সৎ মেয়েকে খুলে দিয়ে একধরণের যুদ্ধবিরতি ও শান্তিস্থাপনের চমৎকার কূটবুদ্ধির পরিচয় দেয়।

 

একইভাবে , চন্দ্রমুখী ক্ষমতায়িত নয়, কিন্তু ক্ষমতার প্রতিভাস তার আছে। যে মুহূর্তে পুরুষ এসে তার পায়ে লুটোচ্ছে, মেয়েটি নিজেকে ভুবনেশ্বরী বোধ করছে। তার সৌন্দর্য এবং তার আপাত স্বাধীন জীবনচর্যার ফলেই সে গ্রামে ফিরে গিয়ে থাকতে পারে। পাড়ার মুদির সঙ্গে টাকাপয়সার হিসেব কষে ও বাড়ি কেনাবেচা, ভাড়া করা ইত্যাদির  সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সব বাস্তব, তবে দেবদাসের প্রতি তার প্রেম একটু অবাস্তব।

চন্দ্রমুখীর  গৃহ ত্যাগ বা পতনের কারণ বিবৃত হয়নি। তার ব্যাকগ্রাউন্ড এর অভাব লেখাটাকে অবাস্তব করছে । আর , সবচেয়ে অদ্ভুত একবার দেখা হতেই দেবদাসের ঘৃণায় মুগ্ধ হয়ে তার প্রতি গজিয়ে ওঠা প্রেম ও  আনুগত্য । কিন্তু সেটাই শরৎচন্দ্রের নির্মাণ, দেখাবার বিষয়, তাঁর অভিপ্রেত।

 

চন্দ্রমুখী সম্বন্ধে একটি বক্তব্য পাওয়া গেল এক লেখকের কাছে যিনি নিজে হিন্দি অনুবাদে পড়েছেন দেবদাস।  ইংরেজি ভাষায় উর্ণাভি উপন্যাসে্র লেখক সুমেধা ভার্মা ওঝা। মৌর্য যুগের এক চৌষট্টি কলায় পারদর্শিনী নায়িকাকেন্দ্রিক উপন্যাস লিখেছেন  সুমেধা।  রাঁচির মেয়ে। ওঁর দিদিমা ও মা বাংলায় পড়েছিলেন শরৎচন্দ্র,  কারণ দিদিমা শান্তিনিকেতন এর ছাত্রী ছিলেন, আর রাঁচির সব লাইব্রেরিতে বাংলা বইয়ের সম্ভার ছিল ঈর্ষা করার মত।

 

তো, এই শরৎ অনুরাগিনীর মতে, চন্দ্রমুখী হল সংস্কৃত নাটকের বসন্তসেনা থেকে প্রসাদের আম্রপালী হয়ে বাহিত রাজকীয় গণিকা ট্রাডিশনের প্রতিভূ।  অর্থাৎ,  শরতের নির্মাণে গণিকার যে পুন:প্রতিষ্ঠা তা যেন ভারতীয় সংস্কৃতির অতীত গরিমার দিকেও এক পা দিয়ে রাখে।

 

সুতরাং নির্মাণ ও অভিপ্রায়ের দিক থেকে, নারীদের নাড়ীনক্ষত্র জেনে,  মেয়েদের মন জয় করায় শরৎচন্দ্র সেযুগেও একশোয় একশো, এ যুগেও।

 

 

তবুও, আমার বিভ্রান্তি যায়না।  সামাজিক পালা না গ্রিক বা শেক্ষপীরীয় ট্রাজেডি, কোন দলে ফেলব দেবদাসকে , তাও বুঝি না।

 

শুধু সামাজিক কাহিনি ত দেবদাস নয়। শরৎচন্দ্র এইক্ষেত্রে বেশ উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কারণ তাঁর কাছে কেন্দ্রীয় চরিত্র দেবদাস। নামভূমিকায় সেই । তবে কি তিনি,   দেবদাসকে “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ট্রাজিক হিরো” করেই গড়তে চাইলেন? ( আইরনির বিষয় এই, যে সেই তকমাটা এক ধরণের রসিকতার ছাপ্পা হয়ে গিয়েছে।

 

ট্রাজিক হিরোর সংজ্ঞা হল পতন। দেবদাসের একটাই পতন মুহূর্ত, যে রাতে পার্বতী তার ঘরে গিয়ে পায়ে মাথা খুঁড়েছিল। সে হ্যাঁ বলতে পারেনি। বাবার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার সাহস দেখাতে পারেনি। একটা চিঠি দিয়ে পার্বতীকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। পরে পার্বতী অভিমানে তাকে প্রত্যাঘাত করে এবং সে আরো বড় মূঢ়মতির মত পার্বতীকে শারীরিকভাবে আঘাত করে। যতই পরবর্তীকালে তার দেওয়া ক্ষতচিহ্নকে পার্বতী আদর করুক, চেরিশ করুক। বস্তুত বিষয়টা প্যাশন ঘটিত দুর্বলতাই।

 

তারপর একে একে পতনের নানা ধাপ। যথা,  তার মদ্যপান। আজকের এ সময়ে এসব শুনতে যতই হাস্যকর হোক, মদ্যপান যে “পতন” তা শরতের লেখাতেই অধিষ্ঠিত … আর এই কান্ডের যুক্তি হল সে বেশ্যাদের ঘৃণা করে তাই সচেতন মননে সেখানে যেতে পারবে না। তাই মদ্যপান করে নিজের যুক্তি ব্যবস্থাকে তছনছ করে তবেই তার চন্দ্রমুখীর কাছে যাওয়া। এখানে কোন পতন নেই। জীবনের শুরুতেই  নিজের পাকে নিজে জড়িয়ে গিয়েছে সে। পার্বতী প্রেম তার প্রথম ও শেষ প্রেম। চন্দ্রমুখী বোধ হয় রিবাউন্ড।

 

লেখক  তাকে রাখলেন আত্মমোহের গর্তে। কারোকে দোষ দিতে পারবে না তাই একা কষ্ট পাবে সে। কষ্ট দেবে আর কষ্ট পাবে। মর্ত্যধামের ট্রাজেডি।

 

“সতর্ক এবং অভিজ্ঞ লোকদিগের স্বভাব এই যে, তাহারা চক্ষুর নিমিষে কোন দ্রব্যের দোষগুণ সম্বন্ধে দৃঢ় মতামত প্রকাশ করে না—সবটুকুর বিচার না করিয়া, সবটুকুর ধারণা করিয়া লয় না; দুটো দিক দেখিয়া চারিদিকের কথা কহে না। কিন্তু আর একরকমের লোক আছে, যাহারা ঠিক ইহার উলটা। কোন জিনিস বেশীক্ষণ ধরিয়া চিন্তা করার ধৈর্য ইহাদের নাই, কোন-কিছু হাতে পড়িবামাত্র স্থির করিয়া ফেলে—ইহা ভাল কিংবা মন্দ; তলাইয়া দেখিবার পরিশ্রমটুকু ইহারা বিশ্বাসের জোরে চালাইয়া লয়। এ-সকল লোক যে জগতে কাজ করিতে পারে না তাহা নহে, বরঞ্চ অনেক সময় বেশী কাজ করে। অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন হইলে ইহাদিগকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে দেখিতে পাওয়া যায়। আর না হইলে অবনতির গভীর কন্দরে চিরদিনের জন্য শুইয়া পড়ে; আর উঠিতে পারে না, আর বসিতে পারে না, আর আলোকের পানে চাহিয়া দেখে না; নিশ্চল, মৃত জড়পিণ্ডের মতো পড়িয়া থাকে। এই শ্রেণীর মানুষ দেবদাস।“

দেবদাসের মনস্তত্বকে লেখার শুরুর দিকেই খুব খানিকটা স্পষ্ট করে লিখে, নিজের অভিসন্ধি বা অভিপ্রায় পরিষ্কার করে দিলেন শরৎ। মহৎ হিরো বা নায়ক, ধীরোদাত্ত করে গড়তে গড়তেও তাকে গড়লেন সুস্পষ্ট ভাবেই ট্রাজিক ও ডিপ্রেশনের শিকার, হেরো বা লুজার হিসেবে। আজকের ভাষায় এভাবেই ত বিবৃত হবে দেবদাস। আজকের প্রজন্ম দেবদাসে পাবে শুধু মজার খোরাক।

 

চন্দ্রমুখীর মুখ দিয়ে বলিয়েছেন দেবদাসের অবর্ণনীয় ট্রাজেডি শরৎচন্দ্র। “আমি নিশ্চয় জানি, পার্বতী তোমাকে একবিন্দুও ঠকায়নি, তুমি আপনাকেই ঠকিয়েচ”।

 

আমি বিভ্রান্ত বোধ করি। বলা হয়ে থাকে দেবদাস নাকি ভারতীয় হ্যামলেট। কিন্তু না, হ্যামলেটের  রাজনৈতিক ব্যাপ্তি আমি দেবদাসে পাইনা। আমি পাই প্রেমের তীব্র হাহাকার, বিভ্রান্তি, সংবেদন।

তার ট্রাজিক ফ্ল ঠিক কী? তার মৃত্যুতে কি আমাদের হয় সেই আরিস্টটল কথিত ক্যাথার্সিস বা মোক্ষণ? তার মৃত্যু কি পাপের শাস্তি না বিধির বিধান না পার্বতীর জীবনের বিশাল ক্রেটারের মত এক শূন্যতা? ঠিক বোঝা যায়না।

 

মনে হয় হ্যামলেট বা ম্যাকবেথের মত ট্রাজিক হিরো হয়ে উঠতে পারেনি দেবদাস। ম্যাকবেথ নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে তিন ডাইনির ভবিষ্যদ্‌বাণী দিয়ে শুদ্ধ করে নিয়ে পা বাড়িয়েছিল ডানকানকে হত্যা করার দিকে। এ ক্ষেত্রে দেবদাসের নিষ্ক্রিয়তাই তার পতন, কোন “ক্রিয়াশীলতা”র দায়িত্বও সে নিচ্ছে না। এ হেনে নিষ্ক্রিয়তা থেকে আরো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার ছন্নমতি, তথাকথিত ধনী জমিদারপুত্রেরই মানায়। আর দেবদাসের সঙ্গে আমাদের কারুর তাই সেরকম সখ্য গড়ে ওঠে না। আমরা বুঝতে পারি না তাকে।

 

আজকের এই বিংশ শতক যখন রোজ সকালের কাগজে আরো নানা রঙের নানা সুরের ট্র্যাজেডি উপহার দিচ্ছে , তখন দেবদাসীয় ট্র্যাজেডি খানিক দূরস্থ , খানিক অবাস্তব, ঐ হাসি মজার বস্তুই হয়ে ওঠে যেন। ঠিক বোঝা যায়না তাকে।

 

 

 

 

এই না বোঝার দূরত্ব ঠেলে ঠেলে, শরৎচন্দ্রকে  কুর্নিশ করতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হয়। এই কথকঠাকুরকে শিরোপা তো দিয়েইছিলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৬ সালে (  ২৫ আশ্বিন, ১৩৪৩)  শরৎচন্দ্রের জন্মদিবসের সম্বর্ধনায় । অনুজ লেখককে যে ভাষায়  সেখানে বিবরণ করলেন তা উল্লেখযোগ্য বটেই।

 

“জ্যোতিষী অসীম আকাশে ডুব মেরে সন্ধান করে বের করেন নানা জগৎ, নানা রশ্মিসমবায়ে গড়া, নানা কক্ষপথে নানা বেগে আবর্তিত। শরৎচন্দ্রের দৃষ্টি ডুব দিয়েছে বাঙালির হৃদয়রহস্যে। সুখে দুঃখে মিলনে বিচ্ছেদে সংঘটিত বিচিত্র সৃষ্টির তিনি এমন করে পরিচয় দিয়েছেন বাঙালি যাতে আপনাকে প্রত্যক্ষ জানাতে পেরেছে। তার প্রমাণ পাই তার অফুরান আনন্দে। যেমন অন্তরের সঙ্গে তারা খুশি হয়েছে এমন আর কারো লেখায় তারা হয় নি। অন্য লেখকেরা অনেকে প্রশংসা পেয়েছে কিন্তু সর্বজনীন হৃদয়ের এমন আতিথ্য পায় নি। এ বিস্ময়ের চমক নয়, এ প্রীতি। অনায়াসে যে প্রচুর সফলতা তিনি পেয়েছেন তাতে তিনি আমাদের ঈর্ষাভাজন। “

ঈর্ষাভাজন শব্দটির তুখোড়তম ব্যবহারে বিশ্বকবি তাঁকে যে উচ্চতায় তুলে দিলেন, তা থেকে সত্যিই আর কখনো নেমে আসেননি শরৎচন্দ্র। মুকুটহীন সম্রাট তিনি ভারতীয় সাহিত্যের। এই কথা বলছি তার কারণ আছে।

সমসময় দিয়েই শরৎচন্দ্রকে বোঝা যায় , তা শুধু নয়, তাঁকে দেখতে হয় অনেক বড় এক ক্যানভাসে। তাঁকে জানতে হয়  সর্বভারতের প্রেক্ষিতেও।

 

শরৎচন্দ্রের কথা আমি নিজে যত না বুঝেছি, আমাকে বার বার বুঝিয়েছে আমার অবাঙালি বন্ধুরা। যারা শরৎপ্রেমী। হিন্দি অনুবাদে, ( তা যতই আড়ষ্ট বা অক্ষম অনুবাদ হোক না) স্কুল জীবন থেকে আমার বান্ধবীরা শরৎচন্দ্র পড়েছে। শ্রীকান্তর প্রেমে পড়েছে। দেবদাসকে ঘৃণা করেছে। পার্বতীর জন্য কেঁদে ভাসিয়েছে। এই মারাঠি বা বিহারি বান্ধবীদের চোখ দিয়ে আমি শরৎচন্দ্রকে   দেখতে পাই। তাঁকে কতই না বিতর্ক , সমালোচনা ঠেলে চলতে হয়েছিল। কিন্তু শেষ পুরস্কার ত সেই জনপ্রিয়তা। মানুষের হৃদয়ে জায়গা করার অসামান্য অবিশ্বাস্য যাদুটি তিনি ঠিক করে ফেলেছেন।