মায়ের কর্তব্য ভিন্ন কিছু নাই

molina

সে একজন মা। একজন কারুর স্ত্রী, একজন কারুর মেয়ে, একজন কারুর বোন। এবং মা। এইসব পরিচয় তৈরি হয় সমাজে। তারপর সারাজীবন সেই ছাপ্পা গুলো নিয়ে চলতেই হয়। সেটাই দস্তুর।

হ্যাঁ মাতৃত্বের আনন্দ আছেই । আনন্দটুকুকে এতটুকুও খাটো করছিনা। অনন্ত সুখের পিন্ড আছে সন্তানে। কিন্তু তারপরেও থাকে অনেক প্রশ্ন, অনেক কথা।

প্রথম যেদিন সে মাতৃত্বের রণডংকা বাজতে শুনেছিল, সেদিন ছিল তুমুল দুর্যোগের দিন। বিবাহিত জীবনের মোটে আট কি ন মাসের মাথায় সেই দিন।

তার আগে সে তার বরকে, যৌন সঙ্গমের সময়েও , নানা বিধিনিষেধের মধ্যে রেখে, নিজের গর্ভাধান আটকানোর চেষ্টা করেছে। তার বরও কিছু কম শিক্ষিত পরিশীলিত নয়। সে নিজেও চাইত না বিয়ের পরের রাত্তিরেই বউকে প্রেগনেন্ট করার মত “নীচকর্ম” করতে। যেটা তার অনেক বন্ধু করেছে, এবং আড়ালে খিঁকখিঁক হেসেছে তারা , এরা সব ফার্স্ট নাইট কেস।

শিক্ষিত স্বামী হবার নাতে, স্ত্রীর সঙ্গে বসে ক্যালেন্ডার দেখে সংসর্গ ঠিক করেছে। দু হাজারের দম্পতি তারা।

বহু স্ত্রীর এই সৌভাগ্য হয়না সে জানে। সে দিক থেকে তার কোন আপশোস অভিযোগ নেই স্বামীর প্রতি।

সেটা অন্য গল্প, যে তথাপি অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়া থাকে, এবং ঘটিলে তাহা “ঈশ্বরের দান” হিসাবে মানিয়া লইতে হয়।

অ্যাক্সিডেন্ট ঘটল এবং পিরিওড মিস হল। সে দেখল, মুহূর্তে পৃথিবীর রঙ পালটে পাটকিলে, ধোঁয়াটে এবং অসম্ভব ক্লান্তিকর হয়ে গেল তার কাছে। গুরুভার হয়ে উঠল জীবন।

কিন্তু সে তো তার নিজের কাছে। অফিসে একটা নতুন অ্যাসাইনমেন্ট। সেটাতে দক্ষতা দেখাতে পারবে না , ভেবে বসের কাছে কুঁকড়ে যাওয়া। শরীরের নানা আশ্চর্য নতুনত্বের ঝড় , তাকে বহন করার জন্য দক্ষতা অর্জন। সব ছিল কার্যক্রমে। প্রথম তিনমাসের অসম্ভব গা গুলনো এবং আর যা যা হয়ে থাকে।  সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘর থেকে আসা এমনকি সাদা পটল আলুর ছেঁচকির সেই সম্বর দেবার গন্ধেও অন্নপ্রাশনের ভাত উঠে আসতে থাকছিল তার।

এইসব পেরিয়ে সে দেখল, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যার পুরাতন, আদিম, প্রাচীনতম খেলা শুরু। শ্বশুর এবং শাশুড়ি আনন্দে আটখানা। অন্য সবকিছু গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা থাকলেও, সন্তানসম্ভাবনা একধরণের প্রোমোশন।

ভয়ানক পরিশীলিত এবং বাঙালি ভদ্রলোকের এপিটোম তার শ্বশুরমশাই হঠাৎ বসবার ঘরে সবার সামনে আবেগ থরথর কন্ঠে প্রায় আবৃত্তির ঢঙে বলে ফেললেন, প্রথমে সে তুমি ছিলে কন্যা। তারপর স্ত্রী হলে। এখন হবে মা। নারীত্বের সম্পূর্ণতাই তো মাতৃত্বে। তোমার পদোন্নতি হল। জীবনের সর্বোচ্চ ধাপে উঠে গেলে তুমি।

তার শাশুড়ি কেমন ভয়ানক গুরুত্ব দিতে শুরু করলেন তাঁকে। প্রায় যা পুলিশি খবরদারির মত দেখায়!

একমাত্র আনন্দ জন্মেছিল তিনমাসের মাথায় প্রথম সোনোগ্রাফির দিনে, অপরিচিত এক নতুন ধুকপুকুনির শব্দ ডাক্তার যখন শোনালেন, আর সোনোগ্রাফির স্ক্রিন তার দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন কী ভীষণ দৌড়চ্ছে আপনার বাচ্চা জলের ভেতর। মাছের মত ঘাই মারছিল একটি ছায়া। সেই ছায়াকেই ভালবাসল সে। মুখহীন এক শিশু।

সন্তানটির আসার আগে, সকলের ফুর্তি আর পুলক তাকে খুবই বিচলিত করলেও, সে মেনে নিল মাসে একবার করে ডাক্তার দেখিয়ে আসা।

তারপর, মেনে নিল সবার তার ওপরে নানা খবরদারি। এটা করবে না ওটা ধরবে না। এভাবে শোবে না, ওখানে বসবে না। কিচ্ছু বাইরের খাবে না।

ফুচকা চুরমুর চিকেন রোল আদি দীর্ঘ কয়েক মাসের জন্য বন্ধ হল।

তারপর সেই মহা মুহূর্ত। সে ঢুকে গেল ভীত চকিত এক স্ফীতোদর শরীর নিয়ে, নার্সিং হোমের গর্তে। সেই রাতেই তার যৌনকেশ ব্লেড দিয়ে শেভ করতে করতে বয়স্কা নার্স বললেন অমোঘ বাণীঃ মেয়েদের এই এক জ্বালা। যতই পড়ো আর যতই বড় চাকরি কর, এর থেকে নিস্তার নেই।

সাতদিনের নার্সিং হোম বসবাসে সে দেখে শুনে বুঝে ফেলল সন্তানজন্ম নিয়ে আয়াদের উল্লাস, নতুন শাড়ি পাওয়ার আশ্বাস। চোখে মুখে অশ্লীল ভঙ্গি করে কত না রসিকতা, সন্তানজন্মের গূঢ় তত্ত্ব নিয়ে। দাদার এবার একতলায় ঢোকা বন্ধ, দোতলায় নতুন ভাড়াটে এসেছে। হি হি।

স্বামী তো অদ্ভুত আচরণ করছে, সে দেখল।  অপারেশনের দিন দেখতে এল,  তারপর কেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে , অন্যমনস্ক হয়ে, কেমন যেন উদাসীন, বাড়ি চলে গেল, একটু মিষ্টি কথাও না বলে। গলা আটকে এল কান্নায় , মেয়েটির। বাচ্চাটা আমাদের দুজনের তো। তাহলে কেন আমাকেই শুধু থাকতে হবে ঠান্ডা সাদা এই নার্সিং হোমটায়। আর তুমি ভিতু আত্মীয়ের মত, অসুস্থা গিন্নিকে দেখে কাষ্ঠ হাসি হেসে চলে যাবে, তারপর পরদিন বলবে, সারা সন্ধে ছেলে বন্ধুরা তোমাকে ঘিরে রেখেছিল মালের আড্ডায় , কেননা, বাচ্চা হলেই গিন্নির প্রেম চলে যাবে, সব অ্যাটেনশন কেন্দ্রীভূত হবে বাচ্চার দিকে, তাই একলা হয়ে যাবে স্বামী, এই ভয়ে সে পারছিল না একা একা সন্ধেটা কাটাতে।

অপারেশনের দিনের সেই ধক করে নাকে আসা ক্লোরোফর্মের গন্ধ আর তার আগের মুহূর্ত অব্দি ডাক্তারদের হাসাহাসি, অ্যানেস্থেটিস্টের নানা টুকরো কথা, এ বাবা, পেশেন্ট অ্যাতো ফ্যাকাশে কেন, ব্লাড কাউন্ট দেখি তো!  আর গোটা ব্যাপারটার প্রবল শীত-করা প্রাইভেসিহীন নিশ্ছিদ্র নৈর্ব্যক্তিক একটা পরিবেশে দম আটকে এসেছিল তার। উলঙ্গ সে এক বিটকেল পিঠখোলা হাস্পাতাল সবুজ মোটা কাপড়ের জামার তলায়। এই বোধ এসেছিল। তলপেট উন্মুক্ত করে তাকে কেটেকুটে বাচ্চাকে বার করবে পুরুষ ডাক্তার, অন্তত আজকের জন্য স্বামীর চেয়ে সে বেশি প্রিভিলেজড, ভাবতে গিয়ে অসংখ্য গোল গোল জোরালো আলোর বৃত্ত দেখতে দেখতে সে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।

জ্ঞান ফিরেছিল চাপ চাপ অনির্দেশ্য ব্যথায়। অবশ হয়ে আছে সারাটা তলপেট অঞ্চল। কিছু জানে না। অথচ প্রচন্ড ব্যথা। চোখ খুলতে একটা ন্যাকড়ার পুটলি এনে তাকে দেখানো হয়েছিল। এই তো বাচ্চা, ছেলে হয়েছে, ছেলে।

বর এসে হাত ধরেছিল বিবর্ণ মুখে।

আবার কেবিনে ঢুকে ঘুম, ঘুম, ওষুধের ভেতর।

পরদিন থেকে ক্ষতচিহ্ন, ব্লিডিং, শিশুকে দুধ খাওয়ানোর নতুনত্ব, নার্সের বকুনি, আয়ার ধমক।

সবকিছুর মধ্যে ছোট একটা নতুন মাংসদলার ধুকপুক, ভয় আর আনন্দের জোট বাঁধা অদ্ভুত এক ফিলিং।

এই ডেটাবেসের প্রান্তে ছিল আবার বাড়ি ফিরে আসা। বালতি বা কোণ ভারি জিনিশ না তুলতে পারা ইত্যাদি ইত্যাদি, প্রায় দু মাস।

একটু ইনফেকশন, ব্লিডিং বন্ধ না হওয়ায় অনেকটা ওষুধ পালটানো, ভয় ডর। ক্যাথিটার লাগিয়ে রাখার পর যন্ত্রণা আর চুলকুনি তার যোনিদ্বারে। এই অস্বস্তিগুলি তো কিছুই নয়। তারপর যা আরম্ভ হল তা জীবনের নতুন দিক।

নার্সিং হোমেই শাশুড়ি গিয়ে নাতির মুখদর্শন করে, বউমাকে দেখে ফিকফিক করে হেসে বললেন, এবার দেখব কেমন অফিস গিয়ে ছটা সাড়ে ছটা অব্দি অফিস কর, চারটে বাজলেই বাড়ি ফিরে আসতে শুরু করবে ত! বাচ্চার টান, বাবা, হুঁ হুঁ!

কন্টিনুয়াস সারভেইলেন্সে বন্দিদশায় থাকা শুরু হল। শিশুটির জন্য আয়া আছে। তবু সে বই পড়ে শিখে নিয়ে তাকে স্নান করাতে চেষ্টা করত, জামা পরাত, হাগু পরিষ্কার করে দিত। হিসির কাঁথা পাল্টাত। কিন্তু যারা কিছুই করত না , সেই সব বাড়ির লোকেরা তার আশেপাশে ঘুরত। মা ছিল না বলে মায়ের বাড়িতে গিয়ে থাকা হয়নি তার। শ্বশুরবাড়ির লোকের পুলিসগিরি তার সহ্য হত না। সে যে বাচ্চা বিষয়ে কিছুই জানেনা, এটা নতুন মা-কে চোখে আঙুল দিয়ে বলার মধ্যে এক অদ্ভুত সুখ আছে সকলের, সে বুঝতে পারে।

বাচ্চা কাঁদলে অভিযোগের আঙুল উঠত, কাঁদছে কেন? খাওয়াচ্ছ না ঠিক করে?

খাওয়াতে গেলে বলা হত, মাথাটার তলায় হাত দাও ঠিক করে। পশ্চার ঠিক হয়নি।

শুইয়ে রাখলে শাশুড়ি এসে নাতির মুখচন্দ্রমা নিরীক্ষণ করতে করতেই ইম্যাজিনারি পিঁপড়ে খুঁজে পেতেন, অথবা ঠিক করে কাঁথা দিয়ে ঢাকা হয়নি ওকে, বলে তাকে এক প্রস্থ জ্ঞান দিয়ে যেতেন।

শিশু ছ মাস  হতে হতে অলটারনেটিভ খাবার দেওয়া শুরু। সেই সময়ে বোতল ঠিক ঠাক পনেরো মিনিট ধরে  না ফোটানোর অপকারিতা আর বুকের দুধ অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ানোর উপকারিতা নিয়ে লেকচার শোনানো হত তাকে। কে না এসে জ্ঞান দিয়ে যেত। কে না এসে বক্তব্য রাখত। যেখানে পৃথিবীতে যত মহিলা আছে যারা কখনো না কখনো বাচ্চা রেখেছে বা পেটে ধরেছে, তাদের বক্তব্য রাখার অধিকার জন্মে যায় কীভাবে যেন। আর নতুন মায়ের কাজ সবার কাছ থেকে তাদের নিজস্ব টিপস শুনে যাওয়া। জমা করা। ডেটাবেসে। শুধু শ্বশুর শাশুড়ি নয়, বাবা, কাকা, পিশি, পিশে, মাসি শাশুড়ি , কে নয় এই জ্ঞানদাতাদের দলে। এমনকি আয়া, বাড়ির ঘরমোছার লোক। এমনকি রাস্তার অপরিচিত মহিলা। ডাক্তারখানার হেল্পার।

ঠিক করে ধরুন। ধরা ঠিক না আপনার।

বাব্বা, ছেলেটাকে সামনে দিয়ে জামা পরিয়েছে দ্যাখো, হি হি , পেছনটা পুরো বেরিয়ে আছে…

কেন দাঁত উঠল না এখনো? আমার নাতনির তো ক—বে…

কেন শিশু কথা বলতে শিখল না আজো? আমার ছেলে তো কত আগে…

একবছর হয়ে গেছে বাচ্চাটার? এ মা, হাঁটতে পারে না? আমাদের টা তো এরই মধ্যে…

বাড়ির নানা পলিটিক্স তার এতদিনে গা সওয়া হয়ে গিয়েছে, বাচ্চার দৌলতে।

তার নিজের বাড়ি ছিল না কোন, বাপের বাড়ির লোক মানে তার মামিমা কাকিমারা এসে মুখ দেখে গেল শিশুর, ব্যাস তাদের কর্তব্য শেষ।

শ্বশুরবাড়ি তার সর্বেসর্বা হল। এর আগে, বিবাহের অব্যবহিত পরে, নিজে যখন তার বরের সঙ্গে দরজা বন্ধ করে থাকত, প্রাইভেসির দৌলতে, তখন মনে হত এঁরা যথেষ্টই লিবারাল এবং শিক্ষিত। কিন্তু সে ইতিপূর্বে যা যা দেখেনি, এখন শিশু সন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো নাটকের মত অভিনীত হতে শুরু করল।

তার জগত হয়ে গেল সচ্ছিদ্র, অন্যদের কথাবার্তা কাজ কর্ম এসে পৌঁছতে শুরু করল শিশুর হাত ধরে।

তখনই শুরু তার সহস্র হাতের পাশাপাশি সহস্র কানের জন্মের। সে শুনতে পায়, পাশের ঘরে আলোচনা চলছে তার শিশুর বাড়বৃদ্ধি নিয়ে, এবং তার উপরে তার মায়ের ভূমিকা নিয়ে।

সে দেখতে পায় , শিশুকে ঘিরেই বর্ণনা হয়, বিশেষত পুরুষ শিশু , প্রথম বংশরক্ষক। ছেলে কই, ছেলের মায়ের সঙ্গে বেরোচ্ছে। এরকম কথা শুনতে শুনতে সে স্তম্ভিত হয়ে টের পায়, তার নিজের একটি নাম ছিল , বেশ বড় নাম, বরবর্ণিনী রায় চট্টোপাধ্যায় গোছের ( চট্টোপাধ্যায়টি তার স্বামীর অবদান অবশ্যই) … সেটি বেবাক বেমালুম হাপিশ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমশ তার বিবরণ হয়ে যাচ্ছে “ছেলের মা” বা ‘পুটুশের মা’ বা ‘বিংগোর মা’।

আদি অকৃত্রিম সামাজিক প্রক্রিয়ায় কাজের লোকেদের জগতে যেভাবে পুঁটির মা বা ক্ষেন্তির মা জন্ম নেয় সেভাবেই হচ্ছে। বাড়িতে আসা লোক বলছে, বাড়ির কাজের লোক বলছে, এমনকি তার বাড়ির লোক, মানে শ্বশুর শাশুড়িও বলছেন, এমনকি তার বর ও বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলার সময় বলছে!

ইতিমধ্যে সে তার নিজের চাকরির জন্য বদলি হল অন্য প্রদেশে, ছোট এক শহরে। নিজের ব্যক্তিজীবনে সে একজন সরকারি চাকুরে। উইথ অল ইন্ডিয়া ট্রান্সফার লায়াবিলিটি । কথাটা লোকেরা ধীরে ধীরে হৃদয়ংগম করতে পারছে এখন, বিয়ের পর পর জোর গলায় ত আর বলা যায় না, কালই আমি দিল্লি বম্বে পোস্টিং নেব! সে সত্যের অভিঘাত ওদের সহ্য হত না বলেই বলা যায়না। কিন্তু স্লো লি ওদের মাথায় ঢুকল সেটাও। তখন প্রতিভাত হল, ম্যাটারটি বৌমার ইচ্ছাধীন, সে চাইলেই কেঁদে ককিয়ে তার হেডকোয়ার্টারস কে বলে বদলি ঠেকাতে পারে। কিন্তু করছেনা, তার মানে, “আমাদের সঙ্গে থাকতে চাইছে না”।

অ্যাজ ইফ তার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন দাম দিত তার হেডুরা। উলটে তারা ওকে পাঁচ বছর কলকাতায় থাকার পর বাইরে ঠেলবেই, এটা নিশ্চিত। তবে সেটা হলেই সে এ যাত্রা  এই কনটিনুয়াস সার্ভেলেন্স থেকে বেঁচে যাবে, এটা ভাবতেই নিজেকে বেশ অসভ্য আর সস্তা লাগছিল তার। মীন লাগছিল। মীনগণ হীন হয়ে রহে সরোবরে টাইপের।

তখনই কানে আসে বরের এক পিশি আর তার শাশুড়ির কথোপকথন :

শোন বৌদি, বৌমার তো বদলির চাকরি, তা সে যেখানে খুশি যায় যাক। বাচ্চাটাকে কিন্তু তুমি ছেড়ো না। বৌ ত পরের ঘরের মেয়ে, ছেলেটা তো তোমাদের। যাকে বলে বংশের বাতি। ওকে এখানেই কোন ইশকুলে ভর্তি করে রেখে যেতে বল। আমাদের ছেলে আমরা ছাড়ব কেন? মা যাক না গিয়ে যেখানে প্রাণ চায়?

আসলে সন্তান একটি প্রপার্টি। যেরকম স্ত্রী ও একটা প্রপার্টি, তবে কিনা আজকালকার দিন, দু পাত ইংরিজি পড়ে চাকরি করে সব বউগুলো নিজেদের ভেবে ফেলেছে মহা মাতব্বর, সে আর কী করা যাবে।

সন্তানটি তো বাবার পদবি ধারণ করে, মায়ের নয়! কাজেই তার ওপর একটা দখল থাকেই শ্বশুরবাড়ির।

এ ছাড়াও কথা আছে। বউ যেখানে যাবে, সেখানে বাচ্চাকে দেখবে কে? বউ তো সারাদিন অফিসে থাকবে। “আমাদের বাড়ির বাচ্চা”-র দেখভাল করবে মাইনে করা কাজের লোক? তা তো হতে পারে না। এমনিই তো চাকরি করা বৌয়ের হাতের অবহেলা আর উদাসীনতায় ছেলেটা রোগা হয়ে গেল।

সুতরাং সে যখন বদলি হয়ে ভুবনেশ্বর গেল, তার ছেলের দেখভাল করার কথা তুলে শাশুড়ি এবং শ্বশুর অলটারনেটিভলি যেতে লাগলেন সেখানে। একেবারে থাকতে লাগলেন। নজরবন্দী দশা ঘুচল না। ছেলেও বড়লোকের অওলাতের মত আহ্লাদে, আতুপুতু হল। একেবারেই সে যেভাবে তাকে মানুষ করবে ভেবেছিল সেভাবে “নিজের কাজ নিজে কর “ টাইপ সেলফ রিলায়েন্ট করে মানুষ করা গেল না।

ছেলে ক্রিকেট খেলতে শিখল, ছবি আঁকতে শিখল কিন্তু গান গাইতে শিখল না। তাকে নানারকম খেলনা কিনে দেবে ভেবেও দেখল, পুরুষোচিত র‍্যাট ট্যাট ট্যাট বন্দুক আর আর্মির ছাপ ছোপ মারা হেলিকপ্টার দেওয়া হচ্ছে তাকে, উপহারে। দেখল, বাড়ির কোন জিনিশ ভাঙ্গলে চুরলে তাকে বাহবা দিয়ে বলা হচ্ছে, মারো, মারো, তোমারই তো সব। এগুলো কিন্তু সব তোমার , বাবু, এই ফ্রিজ, এই টিভি। গেলে তোমার যাবে।

তাকে শেখান হচ্ছে অধিকার, আবার সেই প্রপার্টি রিলেশন্স।

শ্বশুর শাশুড়িরা একজন গিয়ে তিন চারমাস গিয়ে থেকে আসতেন, তারপর যেতেন অন্যজন। বিষয়টাকে বাধা দিতে সে চায়না, হাজার হোক তাঁদের নিজেদের সংসার ফেলে রেখে তো তাঁরাও অনেকটা আত্মত্যাগ করছেন, তার পেটে থেকে পড়া সন্তানকে দেখার জন্যই। তা ছাড়া শুষ্ক, দায়সারা আয়া বা বাচ্চাধরার লোকের তুলনায়, একজন দাদু বা ঠাম্মার সঙ্গ পাওয়া , এটাও ত কত না জরুরি শিশুর জীবনে, সেটা তো সে স্বীকারই করে। তার নিজের মা-ও তো নেই।

মধ্যে মধ্যে তার বর আসত ছুটিতে। সে কটা দিন হীরকদ্যুতিময় ব দ্বীপের মত হাসি খেলা গানে কাটত, তারপর আবার  ডার্ক এজ। সে কটা দিন ঠারে ঠোরে বয়স্কদের দাপট ও “আত্মত্যাগের মহিমা”র গল্প শুনতে হত। তাঁরা উঠতে বসতে  শহর হিসেবে কলকাতার তুলনায় ভুবনেশ্বরের নিকৃষ্টতা জাহির করতেন, কেননা শহরটাকে বৌমার পোস্টিং এর ফলে ‘নিতে হচ্ছে’। বেড়াতে এলে অন্যরকম হত।

ততদিনে শিশু থপ থপ করে হাঁটছে, চলছে, ছড়া বলছে, ভাত খেতে খেতে কার্টুন নেটওয়ার্ক দেখছে, ঠাকুমার সঙ্গেই ছড়ার বই বা ছবির বই শেষ করছে আর দাদু থাকাকালীন বাংলা অক্ষর পরিচয়ও হচ্ছে তার… খবরের কাগজ দেখে দেখে।

আসলের থেকে সুদ মিষ্টি, একথাও ওঁরা বলে থাকেন, অন্তত শ্বশুরমশাই। শাশুড়ি সদাই পাঁচের মত মুখ করে থাকেন, কারণ একটি আদিবাসী রমণীকে সে তার ভুবনেশ্বর হাউজহোল্ডের রান্নার দায়িত্বে রেখেছিল, আর সে কিছুই রাঁধতে পারেনা শাশুড়ির মনমত। সে এক শ্বাসরোধী পরিস্থিতি। রান্নার লোক আর শাশুড়ি সারাদিন ঝগড়া করে মুখ ভার করে বসে থাকত, আর তাকে সন্ধ্যাবেলা এসে সেই ঝগড়া মেটাতে হত, অথবা আসামাত্র আদিবাসী মেয়েটি এসে ফিরিস্তি দিতে থাকত, বাড়িতে কী কী নেই।

বাজারে যাওয়া বা কাউকে বাজারে পাঠানোর দায়িত্বটা ছিল তার, কারণ, ওই যে, আগেই বলা হয়েছে, ভুবনেশ্বরে আসার জন্য দায়ীটা কে, শুনি?

রোজ, রোজ সেই আলু নেহি হ্যায়, মুড়ি নেহি হ্যায়, দুধ খতম হো গিয়া হ্যায় শুনতে শুনতে বাড়ি ফিরেই সে আবার বাজারে যেত। ইতিমিধ্যে তার বাড়িতে বাচ্চার মা-র ভূমিকায় একটা ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। কারণ ইতিহাস বইয়ের পাতায় মুহুর্মূহু লিখিত হয়েই চলেছে, যে সে একজন নন রেসিডেন্ট মা। সে বাচ্চাকে খাওয়ায় না ঘুম পাড়ায় না, হাগায় না ছোঁচায় না।

এক শীতের রাত্তিরে, ছেলেকে ছুঁচিয়ে দিতে বাথরুম যায় সে, পটিতে বসা ছেলের সঙ্গে ছড়া বলতে বলতে তাকে মহৎ কর্ম করতে সাহায্য করে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে ,  সে, ওভারহিয়ার করে ( হিন্দি বা বাংলা সিনেমায় যা সচরাচর ঘটে থাকে , এবং নায়িকাদের এই ওভারহিয়ারের ফলে অনেক কাপ ডিশ সরবতের গেলাস ভেঙে থাকে), তার শাশুড়ি ছুটে গিয়ে কাজের মহিলাকে জিগ্যেস করছেন, ভাবী কোথায় রে? বাচ্চাকে বাথরুম থেকে পরিষ্কার করে নিয়ে গেছে?

হাঁ।

কী দিয়ে পরিষ্কার করল? ঠান্ডা জল দিয়ে?

( বাচ্চার হাগানো ছোঁচানোর জন্য গরম জল রাখা থাকত গিজারে, এবং একটি বালতিতে)

নেহি, গরম পানি সে।

তুই নিজে দেখেছিস, গরম জল দিয়েই করেছে তো?

 

এগুলো কোন বিচ্ছিন্ন কথোপকথন না, এগুলো সন্তান জন্মানোর পরবর্তী তার গোটা জীবনের এক একটি স্নিক পিক মাত্র। আসলে কনটিনুয়াস সারভেইলেন্স ব্যাপারটির সঙ্গে যারা পরিচিত না তারা এর মর্ম বুঝবেন না।

ব্যাপারটি হল, এটা একটা ডিকটমির জগত। হয় তুমি ভাল মা নয় তুমি ভাল চাকুরে। এখনো প্রাক্তন নামে ছবি হয় বাংলায়। যাতে ভাল বউ বনাম ভাল চাকুরে নিয়ে আলোচনা চলে। সেই একই ডিকটমিবশে, ভাল মা হতে হলে ভাল চাকুরে হওয়া যাবে না। আর একটা ওভার হিয়ার অথবা, থালা গেলাস ফেলে দেওয়ার মত শুনতে পাওয়া ডায়ালগ তার শাশুড়ির, বউ যদি কেরাণি হত তাহলেই ভাল হত , অফিসার হয়েই হয়েছে মুশকিল, একটা দিনও সাড়ে ছটা সাড়ে সাতটার আগে ফিরতে পারে না।

সে যেহেতু অফিসার, এবং অফিসে দরকার হলে শনিবার যেতে হয়, দরকারে অদরকারে দিল্লি ছুটতে হয়, ট্যুরে যেতে হয়,  দু বছরের বাচ্চাকে রেখে চার মাসের জন্য আমেরিকায় একটা অফিশিয়াল ট্রেনিং এও গেছে সে ( সত্যি কী করে পারে এরা, অ্যাঁ!!! এত কেরিয়ারিস্ট! ) … সে তো খারাপ মা হবেই। তাকে হতেই হবে এমন মা যে বাচ্চাকে খাওয়াতে পারে না, যে বাচ্চাকে ঠান্ডা জলে ছোঁচায়, ছেঁড়া জামা পরায়, একটাও কাজ পরিষ্কার করে করতে পারেনা। স্নানের টাবে বাচ্চা ফেলে চলে যায়, বাচ্চা ডুবে মরে যায়, এমন সব ভয়ঙ্কর হরার স্টোরি তো আছেই পৃথিবীতে… তাদের ডোমেনে এখন ওরকম সব গল্পরা ঘোরাঘুরি করে রাতবিরেতের রক্ত পিশাচের মত।

সেই শুধু বুঝতে পারে না, বাচ্চার কোন ক্ষতি হচ্ছে, সে তো বেশ ছড়া বলছে, খেলছে  , বেড়ে টেড়ে উঠছে… কিন্তু শ্বশুর শাশুড়ি তো হাহুতাশ করেই চলছেন ভেতরে ভেতরে, যে বাচ্চাটা ঠিকঠাক মানুষ হল না। মাকে পেলনা।

এতটাই এসব করছেন যে ছেলে যখন ষোল বছরের, সে একদিন সত্যজিত রায়ের মহানগর দেখে চমকে উঠবে, ওই সিনটায়, যেখানে  মা চাকরি করতে যাচ্ছে , বাচ্চার জ্বরের দিনেও। মাধবী ফিরে এসে দেখছে সারাবাড়ি থমথমে, আর  বাচ্চা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে, আর অনুতপ্ত মাধবীকে তার শাশুড়ি বলছে, ছেলে তো সারাদিন বলে গেল,   মা খারাপ, মা পাজি, মা খালি অফিসে যায়। প্রত্যুত্তরে মাধবী ছেলের হাতে গুঁজে দিচ্ছে উপহার, যা আসলে, মেনস্ট্রিমের মতে, চাকুরে মায়ের দেওয়া ঘুষ। নিজের না-থাকার বিকল্পে দেওয়া পারিতোষিক।

তার ছেলে , এখন বড়, তার চোখ দপ করে জ্বলে উঠল ছবির ওই অংশটা দেখে, মায়ের দিকে তাকাল এমন চোখে, যে মা বুঝল, ওই ডায়ালগটা কত্তো চেনা চেনা লেগেছে তার। মা ছেলে দুজনেই তারপর হো হো করে হেসে ফেলল।

ইন্দ্রা নুয়ি নাকি রাত্তির অব্দি অফিস করে দেরিতে একবার বাড়ি ফিরে দেখেছিল বাড়িতে দুধ নেই, তার নিজের মা বলেছিল, বাড়িতে দুধ নেই, আনতে হবে। ইন্দ্রা বলেছিল আমার বর ত অনেক আগেই এসে গেছে মা, ওকে কেন বলনি? মা বলেছিল বেচারি খেটেখুটে এসেছে, ক্লান্ত।

মেয়েদের চাকরি করা মানে খেটেখুটে ক্লান্ত হয়ে এসেও তোমাকে চূড়ান্ত পারফর্মেন্স –এ বাজার হাট সব করে দেখাতে হবে, তুমি দুধ ময়দা চাল ডাল সবকিছুর কেমন খেয়াল রেখেছ। আর এসব অবলীলাক্রমে করার পরও, আসল হল একটা অপরাধী অপরাধী মুখ করে থাকা। একটা শহিদ শহিদ স্টাইল করে থাকা।  যদি তোমার মুখে এতটুকুও অপরাধবোধ না ফোটে ( যেমন আমাদের গল্পের এই সে-র মুখে কোনদিনই ফুটত না) তাহলে ধরে নেওয়া হবে তুমি খারাপ গৃহিণী ও খারাপ মা।

 

ছেলে বড় হতে থাকে এরপর। পর পর যা যা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারে ঘটার সবই ঘটতে থাকে , যথা এরপর স্কুলিং নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হল। তালিকা তৈরি হল। লাইন লাগানোর জন্য অনুপ্রাণিত হল স্বামীটি।

স্কুলে যেতে গিয়ে শিশু কাঁদল না। সেটাও বিস্ময়ের। কেন কাঁদল না? শিশু স্কুলে কিছু শিখছিল কিনা, তা নিয়েও সংশয় ছিল। প্রশ্ন ধরা হত ওকে, বাইসাইকেলে কটা আই বলতো? গাজর দেখিয়ে জেঠিমা জিগ্যেস করত, এটা কি কালার শিশু? রেড বলেছিল বলে আ আ ছি ছি শুরু হল, সেকি,  ওকে অরেঞ্জ কালারটা চেনাও নি?

সবকিছুর শেষেও, ভাল মা হয়ে উঠতে পারল কি, সে? খুব সন্দেহ আছে তাতে।

শিশুর ক্লাস টু। একদিন অফিস থেকে ফিরে এসে সে দেখল শাশুড়ির মুখ হাঁড়ি। শিশুর ক্লাস টিচার ওর খাতায় লাল কালি দিয়ে লিখে দিয়েছেন, হোম ওয়ার্ক নট ডান।

শাশুড়ি ঝাঁঝিয়ে উঠে সেকে জবাবদিহি চাইলেনঃ  হোমওয়ার্কটা  করল কিনা এটাও দেখতে পারো না?

ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ, মিশেল ফুকো নাকি লিখেছিল। একজন মা শুধু বায়োলজিকালি মা হয়ে ওঠেনা। পেট থেকে পড়লেই বাচ্চা পয়দা করা যায়না। মা হওয়া শিখে উঠতে হয়। কঠোর তপস্যা চাই।

আজকের দিনের মায়েদের কত না চাপ। তাকে সর্বংসহা ও সর্বকর্মা হতে হবে। কে যেন গোটা একটা বইই লিখে দিয়েছে, আমার মা সব জানে। তাই তাকে সেই বইটা কিনে পড়ে ফেলতে হবে ও শিশুর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

টিভির বিজ্ঞাপনে যেরকম দেখায়, মা কখনো বকবে না অধৈর্য হবে না বিরক্ত হবে না। নিজের সুখের কথা ভাববে না। সারাদিন ছেলের মুখে জলের গেলাস খাবারের থালা এবং কুলকুচি হয়ে গেলে গামছা তুলে দেবে। জামা বার করে রাখবে, পরিয়ে দেবে। জুতো পরিয়ে দেবে। স্কুলে র থেকে এলে গ্লুকন ডি গুলে দেবে। পরীক্ষায় ভাল করলে কিটক্যাট কিনে দেবে।

মা কখনো নিজের কাজ করবে না, বাড়িতে যতক্ষণ থাকবে ছেলের সঙ্গে খেলবে কথা বলবে, ছেলের পড়া দেখবে। অফিসে গেলে তো আরো বেশি অপরাধী হয়ে মাকে ফিরে আসতে হবে, আরো দ্বিগুণ উৎসাহে ছেলের সেবাযত্ন করতে হবে, সে সময়টা সে ছিল না সেই সময়টার অভাব পুষিয়ে দিতে হবে।

মাতৃত্ব কত আনকন্ডিশনাল তা নিয়ে অনেক ভাল ভাল কথা পড়া যাবে, বলা হবে অনেক সুন্দর কবিতা গান আর বাণী, মা হল সবার ওপরে।

এইভাবে , কন্ডিশনড হতে হতে, সে দেখেছে, সে এক রোবট মা এখন।

সারাদিন অফিস করে বাড়িতে ঢুকেই চুড়িদার কামিজের ওপর থেকে চুন্নিটা নামিয়ে রেখে সে রান্নাঘরে ঢুকে  ছেলের দাবি অনুসারে কোনদিন চাউমিন কোণদিন পাস্তা কোনদিন ভাত নেড়ে বিরিয়ানি করে দেবে। অনায়াসে তারপর  ছেলের হোমওয়ারক দেখবে, অনায়াসে তার প্রয়োজন হলে বেরিয়ে কিনে এনে দেবে সেলোফেন পেপার অথবা ফেভিকল, কলম পেন্সিল বা রুলটানা খাতা। যখন যেটা দরকার।

রাত এগারোটায় ঘুমে ঢুলে পড়তে পড়তেও, ছেলের দাঁত মাজা জামা পালটানো সুপারভাইজ করবে, বিছানা পাতবে।

স্বামী করে না এসব? না তা নয়। স্বামী অনেক কিছুই করেছে, করে হালকা করেছে গুরুভার সন্তানপালনের দায়। সে জুতো পরিয়ে দিয়ে চুল আঁচড়ে দিয়ে শার্ট পরিয়ে দিয়ে নিয়ে গেছে শিশুকে টিউশনে। কিন্তু জুতোটা কিনে এনেছে মা, চিরুনি হারিয়ে গেলে কথা শুনতে হয়েছে মাকে, শার্টের বোতাম না থাকলে মার সামনে ছুঁড়ে ফেলে বলা হয়েছে, দেখে রাখতে পারো না, আদ্ধেক শার্টের বোতাম নেই?

আসলে , একটাই তফাত থেকেছে। স্বামী যা যা করেছে, সেগুলো স্বামী স্বেচ্ছায় করেছে। ওর করার কথা ছিল না বাধ্যতা ছিল না তাও করেছে।

বাই ডিফল্ট ওগুলো সব মায়ের করার কথা ছিল। স্বামী করে, তাকে ধন্য করেছে, হেল্প করেছে। স্বামীর কাজ করাটা স্বামীর ক্রেডিট। আর স্ত্রীর না করাটা, স্ত্রীর গাফিলতি। ত্রুটি। তাকে চিরজীবন অপরাধী হয়ে থাকতে হয় এই তথ্যের জন্য, যে, সে যখন অফিসে থাকত তখন তার সন্তানকে শাশুড়ি দেখত, আয়া দেখত, অনেক সময় আগে ফিরে এসে স্বামীও দেখত।

অন্যেরা যে যা অবদান রেখেছে শিশুর জীবনে, কোনটাই বাই ডিফল্ট ছিল না। সেগুলো অবদান ছিল। আর সে যা করেছে? একজন মায়ের তো তা করারই কথা। সেজন্যে আলাদা করে কোন থ্যাঙ্কস প্রাপ্য আছে নাকি আবার? ওটাকে কোন কাজ বলতেই নারাজ তো, সমাজ। ওগুলো তো তার কর্তব্য।

পেট থেকে পড়েছে কার, বাচ্চাটা, শুনি?

করবে না মানে?

শিশু একদিন বড় হয়ে যাবে, শিগগিরি একদিন সে নিজের জীবন খুঁজে নেবে। তারপর অচিরেই নিজের জীবন সঙ্গিনীও।

তখন , সেই জীবন সঙ্গিনীও , সে কি চাইবে, করুক সব কাজ বাই ডিফল্ট?

 

এরপর বিদ্বজ্জনরা প্রশ্ন তুলবেন, আমাদের গল্পের মেয়েটি এত ন্যাকা কেন? তার এত এত অসুবিধের কথা সে এতদিন মুখ ফুটে বলেনি কেন? সে কেন শ্বশুরবাড়ির সংস্রব ত্যাগ করেনি। ভুবনেশ্বর থেকে টিকিট কেটে শ্বশুর শাশুড়িকে পত্রপাঠ বিদেয় করে দেয়নি এবং পরবর্তী জীবনে কেবলমাত্র আয়া বা কাজের লোকের হাতেই ছেলেকে মানুষ করেনি?

সে কেন নিজের এই বিশ্রি অসম সম্পর্কটা ভেঙে ফেলেনি?

সে যেহেতু বিবাহিত জীবনে আছে, প্রশ্ন উঠবে,  সে কেন আপোশ করেছে এত ? সে তো চাকরি করত, ইন ফ্যাক্ট নিজের বরের চেয়ে বেশি মাইনের চাকরিও ( যেটা নাকি আবার খুলে দেবে আরো এক বিশাল আলোচনার দরজা, এ নিয়ে বেশি মুখ না খোলাই ভাল)… তাহলে সে ছেড়ে চলে যায়নি কেন?

এত প্রেম, বাব্বা! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। নিশ্চই অন্য ধান্ধা ছিল , অন্য কোন হিসাব কিতাব, অন্য কোন হিডেন অ্যাজেন্ডা!

হ্যাঁ তার বরও তো বলেছে তাকে, আসলে তুমি অপরচুনিস্ট একটা, মারাত্মক চালু মাল, ম্যানেজ মাস্টার। নিজের ছেলেকে আমার বাবা মাকে দিয়ে বড় করিয়ে নিলে কনভিনিয়েন্টলি, পয়সা দিলেও এরকম আয়া তো পেতে না, এত নির্ভরশীল, শুভাকাঙ্ক্ষী। এখন তো লিখবেই, আমার বাবা মা কত খারাপ।  তোমার হাতে কলম আছে তো!

সে আসলে অপরচুনিস্ট। সে চায়নি তার নিজের এই সব টুকরো টাকরা অপমান  (যা সে বিশ্বাস করে এই সমাজ পরিবর্তন না হলে কোনদিন পরিবর্তিত হবে না এবং এই সমাজে থাকা অধিকাংশ মেয়েকে এসবের মধ্যে দিয়েই যেতে হয় ) গায়ে মাখতে। তবুও ডেটাবেস হিসেবে এগুলো তার মাথার মধ্যে রেজিস্টারড হয়েছে, থেকে গেছে, সে ভুলতে পারেনি, বা ৯০ শতাংশ ভুলে গেলেও ১০ শতাংশই তার মনে “থেকে গেছে”।

সে আসলে অপরচুনিস্ট, সে চেয়েছে তার ছেলে মানুষ হোক একটা আপাত স্বাভাবিক পরিসরে, পরিবারে, দাদু ঠাকুমার সঙ্গে।

তার মা ছিল না, বাবা অন্য বিয়ে করেছিল,  প্রথম জীবনে ঠাকুমার আদরে আর পরে ঠাকুমা মারা গেলে, কাকিমাদের হাত তোলা ও লাথি ঝ্যাঁটা খেয়ে সে নিজে মানুষ হয়েছিল। হয়ত সেজন্যেই, ব্রোকেন ফ্যামিলিতে বড় হওয়ার চাপ সে তার সন্তানকে দিতে চায়নি। সে জানে একা থাকার মহিমা, সে জানে কষ্ট কাকে বলে, সে জানে নিজের চাকরি তার নিজের অর্জন, মামা কাকাদের গালে পিঠে হাত বুলিয়ে দেওয়া পুরস্কার নয়, তাই নিজের চাকরি নিয়ে সে অন্যদের কাছে ফাটাতে চায়নি, ফুটানি মারতে চায়নি। নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সযত্নে আলাদাও রেখেছে আবার স্বামীর থেকে।

এগুলো তার আপোশ বইকি। যারা নিজেদের র‍্যাডিকাল বলে তাদের জীবনের যে প্রতিমুহূর্তে পেরেক ফোটা চাপ, সমাজ যা প্রতিনিয়ত দিতে থাকে , তার থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে সে চেয়েছে কারণ তার শৈশব আদৌ খুব একটা সুন্দর ছিল না। অন্তত যৌবন সুন্দর হোক সে চেয়েছিল।

আর এই আপোশের ফলে সে পেয়েওছে অনেকটা। সে পেয়েছে মন দিয়ে চাকরি করা এবং নিজের লেখালেখি করার পরিসর। আফটার অল সারাজীবন শুধু বিবিধ পুরুষের সঙ্গে এবং সেই পুরুষতন্ত্রের এজেন্ট নারী ( তার কাকিমারা, তার শাশুড়ি প্রমুখ) দের সঙ্গে লড়াই করে সময় নষ্ট না করে তাদের উপেক্ষা ও করুণা করতেই সে বেশি পছন্দ করেছে।

এই আপোশের পথ অনেকের নয়। অনেকেই ঝগড়া করে, প্রতিবাদ করে, বেরিয়ে যায় সংসার থেকে। হয়ত সে পারেনি এসব। কিন্তু পারেনি বলেই তার এই এই শোনাগুলো, ডেটাবেসের এই এই চড় থাপ্পড়গুলো, মিথ্যে হয়ে যায়না। সে কিন্তু টাকা দিয়ে অনেক কিছু কিনতে পারে। কিন্তু বহুকিছু কিনতে পারাটাই তো তার সবচেয়ে বড় ডিসকোয়ালিফিকেশন, কারণ তার শাশুড়ি তো সারাজীবন চাকরি করেন নি, আর এখনো ছেলেরা না খেলে খেতে বসেন না। রাত বারোটা একটা বাজলেও তবু না। এই সব না খাওয়া আর জেগে থাকা দিয়ে তো তিনি মাতৃত্বের পরীক্ষায় বৌমার থেকে বেশি নম্বর পেয়েছেন বলেই জানেন। তাই তো তাঁর কনফিডেন্স এর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া যায়না। মহিলাকে করুণা করতেও তাই আজকাল তার করুণা হয়।

বুদ্ধিজীবী ও র‍্যাডিকালরা এখনো বলে সে নাকি থ্রি এস, মানে সসসস্বামী সসসন্তান সসসসসংসার নিয়ে দিব্যি আছে।

চাকুরে মেয়েরা, অন্তত তার মহিলা কলিগেরা, অন্তত এটা বলে না, এটুকুই যা এক রিলিফ!

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কলমে মেয়েরা

সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়ের কলমে মেয়েরা

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

পঞ্চাশ পরবর্তী বাংলা কবিতায় প্রকট বা প্রচ্ছন্ন শারীরিক উল্লেখ শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে কৃত্তিবাস পর্বের আত্মজৈবনিক বা স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার ধাক্কায়।   সেই ধারাবাহিকতা ও পরম্পরা পরবর্তী সময়ের বাংলা কবিতাতেও প্রবাহিত হয়েছে । মানবী বিদ্যাচর্চার ধারাবাহিকতা  আমাদের এই সময়ের প্রাপ্তি । নারীকে নিয়ে নতুন করে ভাবনার ‘নতুনত্ব’  এখন কতটা তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে মেয়েদের দিকে নতুন করে তাকানোর একটা সর্বজনগ্রাহ্যতা বোধহয় নতুন সংযোজন।  বাঁধাধরা পড়াশুনোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে সাহিত্য শিল্পে নারী ও পুরুষের প্রতিনিধিত্ব বা রিপ্রেজেন্টেশনকে দেখে নেবার চল অধুনার ।  সাম্প্রতিক ঘটনা এ-ও যে , যে দ্বৈতবাদ থেকে নারী বনাম পুরুষ, প্রকৃতি বনাম সংস্কৃতি, বা জ্ঞাতা বনাম জ্ঞেয়র ধারনাগুলো  আসে, সেই দ্বৈতবাদই এখন প্রশ্নের মুখোমুখি  সারা বিশ্বের সব জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেই ।  পুরুষ বিষয়ী , নারী বিষয়, পুরুষ জ্ঞাতা , নারী  জ্ঞেয় (“ স্ত্রিয়াশ্চরিত্রাঃ /দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ” এই অতি জনপ্রিয় কথনের মূলেও সে ধারণা) , পুরুষ কর্ষণকারী , নারী প্রকৃতির মত, বসুন্ধরার মত, মৃত্তিকার মত ভোগ্যা ও কর্ষণযোগ্যা । এই প্রাচীন দ্বৈততা ভেঙে , অর্থাৎ এর ভেতরের ক্ষমতাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলারই প্রচেষ্টা নারীকে বিষয়ী করে তোলার মধ্যে ।

 

অথচ গোড়ার দিকে দ্বৈতবাদকে মেনে নিয়েই নারীবাদের প্রথম প্রণেতারা ভেবেছিলেন , নারীকে হতে হবে পুরুষের সমান ও সমকক্ষ । সেই হয়ে ওঠার তাগিদে এমনকি নিজের নারীত্বকে বিসর্জনও দিতে হতে পারে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তরঙ্গের নারীবাদীদের কাছে চিন্তাটা পাল্টেছে বলেই, নারীবাদী এখন আর নারীকে নির্‌যাতিত , পুরুষের শাসনের বলি হিসেবেই শুধু দেখাননা, বরঞ্চ নির্মাণ করতে চান নারীর নিজস্ব বিশ্ব ।  আর সেখানেই এসে পড়ে নারীকে বিষয়ী করে তোলার প্রচেষ্টা ।

বিষয় হিসেবেই  কিন্তু নারীকে দেখতে অভ্যস্ত আমরা।  জনপ্রিয় সাহিত্য শিল্পের কাছে সেটাই প্রশ্নচিহ্নহীন ধরে নেওয়া। উপভোক্তা নারী পুরুষ যে-ই হোন, তাঁকে আমোদ দেবে, বিনোদন দেবে নারীর এই বিষয়-মূর্তিই। এটাই পুরুষ শাসিত সমাজের সহজ ছক।  নারী পুরুষের মিউজ, তার প্রেরণা, তার আকাংক্ষার বিষয় , সম্ভোগের বস্তু, হাসিল করার পণ্য । সে একাধারে দেবী ও দানবী, অথবা হয় দেবী নয় দানবী। এই ব্যাপারের প্রতিফলন অবধারিতভাবে ঘটেছে কবিতাতেও।

‘নারীর কবিতা বিষয়ে ভাবতে গিয়ে তাই আগে বুঝে নিতে চাই নারীর সেই প্রতিমা, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় যা প্রতিফলিত। সে প্রতিমা পুরুষেরই কল্পনা … উর্বশী আর লক্ষ্মী, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় নারীর এই দুই স্টিরিওটাইপই সবচেয়ে প্রবল, পশ্চিমী আলোচনার ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে অ্যাঞ্জেল হোর ডিকটমি। …পুরুষতন্ত্রের সেই পরম্পরার মধ্যে থেকেই মেয়েরা লেখেন। …’(সুতপা ভট্টাচার্‌য, ‘কবিতায় নারী, নারীর কবিতা’, মেয়েলি পাঠ, পৃ ৪৪-৪৮)

ঠিক এই একই ব্যাখ্যায় উপনীত হয়েছিলেন সিনেমা চর্চার ক্ষেত্রে লরা মালভে, তাঁর ‘ভিজুয়াল অ্যান্ড আদার প্লেজারস ‘ প্রবন্ধে, ১৯৭৩ সালে।  যা থেকে উঠে এসেছিল নতুন এক তত্ত্ব ।  লাকাঁ ও ফ্রয়েডের ধারা থেকেই জন্ম নিয়েছিল জনপ্রিয় ছায়াছবির নারীবাদী বিশ্লেষণের নতুন ধারণাটি, ‘ মেল গেজ ‘ বা ব পুং দৃষ্টির তত্ব । সে তত্ত্বও বলছে একই কথা । মূলস্রোত ছায়াছবি , হলিউডের বিখ্যাত ছবিগুলিই ধরা যাক, নারীকে দেখায় বিষয় হিসেবে। দুভাবে বিষয় করা হয় নারীকে। হয় ভয়ারিস্টিক বিষয়। সে পুরুষচোখে নারী লালসাময় বেশ্যা । নতুবা ফেতিশিস্টিক বিষয় । সে পুরুষচোখে , পুরুষচাহনিতে নারী দেবী, ম্যাডোনা, মা। রিরংসা থেকে পবিত্রতা । সুতপা ভট্টাচার্যের ভাষায় ‘উর্বশী-ছবি”  আর ‘লক্ষ্মী-ছবি’।  সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে” থেকে শঙ্খ ঘোষের “পায়ে শুধু পড়ে থাক স্তব্ধ এলোচুল “ অব্দি।

মাটির তলায় চাপা পড়া উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তনের মতই, বাংলা কবিতার কর্ষণভূমি এর পরে আর কোনদিন পূর্ববৎ রইল না, থাকার কথাও নয়। পুরুষী কবিতার ট্র্যাডিশনে প্রোথিত ও প্রতিষ্ঠিত হল যৌনতাবিষয়ক অনবদমিত স্বীকারোক্তি। নতুন রক্তসঞ্চালন হতে শুরু করেছে বাংলা কবিতার ভাষা ও ভাবনায়।  “গুল্মলতা উদ্ভিদ অরণ্যঘন পর্ণমোচী বৃক্ষের সারি পাহাড় পর্বত সান্নুদেশে … আমি এক সুচতুর ব্যাধ নির্ভুল লক্ষ্যভেদে গাঁথি প্রভুর অসীম কৃপায় অলৌকিক আমার বর্শাফলকে তরল লাভাস্রোতে তাম্রখন্ডে বিম্বিত অতলান্ত গহবর তাক করে ।“ ( বেলাল চৌধুরী, ‘লক্ষ্যভেদ’।) লক্ষ্য করব, এক বা একাধিক ইমেজের সহায়তায়, অথবা সরাসরি, এক সচেতন যৌন ইশতেহার রচনার তীব্র ইচ্ছা এইসব লেখা তাঁদের দিয়ে লেখাচ্ছিল। ‘আমি ড্রামে কাঠি দেওয়ামাত্র ওর শরীর ওঠে দুলে / ড্রি রৃ ড্রাও স্ট্রোকেতে দেখি বন্যা জাগে চুলে/ তিন নম্বর স্ট্রোকের সঙ্গে নিতম্বেতে ঢেউ … আমি তখন ড্রাম বাজিয়ে নাচাই ওকে, মারি এবং বাঁচাই ওকে/ ড্রামের কাঠির স্ট্রোকে / যেন গালাই এবং ঢালাই করি  – “ ( তুষার রায় , ‘খুলে যায় তালা’) ।

অর্থৎ, এখানে প্রতিষ্ঠা দিতে চাইছি একটিই কথাকে, ১৯৫০ পরবর্তীতে যৌনতার সরাসরি উল্লেখ এবং যৌনক্রিয়ার বিবরণী একটি স্বাভাবিক ভাববস্তুতে পরিণত হল বাংলা কবিতায়। কিন্তু সেই লেখা মূলত পুরুষ কবিদের কলম থেকে। “শরীর ছাড়া শরীর যায় না চেনা… শরীর ছেনে শরীর দিয়েই অন্ধকারের/ নিবিড় শরীর গভীর করে দাঁতে কাটি/বুকে পিষি ঘামের শরীর – আঁষটে গন্ধ” ( বেলাল চৌধুরী , ‘শরীর দিয়েই শরীর”)  এর নতুনত্ব সেই সময়ে যতটাই থাক, পরে শরীরের আঁষটে গন্ধ বাঙ্গালির রান্নার মাছের মতই অনিবার্য হয়ে উঠবে বাংলা কবিতায় । ভুরু তুলে কানে হাত দিয়ে “আ ছি ছি” বলে ওঠার মত আর থাকবে না পুরুষের লেখায় “স্তন” “যোনি” “লিঙ্গ” এমনকি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বহুকথিত “নুংকুটি নতমুখ”এর মত প্রয়োগগুলিও।

এই প্রেক্ষিতটুকু না থাকলে আজকের আলোচনারও মানে থাকছে না কোন । কেননা, বারে বারেই নারীর এই ‘বিষয়’- মডেল যেহেতু সামনে, নারী যেহেতু পুরুষের শৈল্পিক আত্মপ্রকাশের এক বিশিষ্ট কেন্দ্রস্থল তাই সেটিকে আলাদা করে নজরে আনার প্রয়োজন আছে অবশ্যই।

বাঙালির রচিসংস্কৃতির অবদমিত যৌনবোধের প্রকাশ যখন কবিতার মানক, জীবনানন্দীয় কুয়াশায় যখন তরুণ কবিরা আচ্ছন্ন, তখনি কৃত্তিবাস আন্দোলন আনল ভাংচুরের পালা। মেধার সরণি ছেড়ে আত্মজৈবনিকের , স্বীকারোক্তির নতুন দিগন্ত খুললেন এই আন্দোলনের পুরোধা প্রধান পুরুষ কবিরা ।  সুনীল-শরৎ-শক্তি-তারাপদ… পাশাপাশি তুষার রায়, বেলাল চৌধুরী তন্ময় দত্তরা। সেই মুহূর্তের অ-প্রাতিষ্ঠানিকতার শেষ কথা এই কবিদের হাত থেকে বেরিয়ে আসা তাজা স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাগুলি। বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী এক প্রভাব। কবিতায় মেয়েদের পদচারণা তখন যথেষ্ট সীমিত।

রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, ব্যক্তিগত সব স্তরকে ছুঁয়ে গেছে স্বীকারোক্তি । অবধারিতভাবে এসে পড়েছে যৌন স্বীকারোক্তি। এবং সচেতনভাবে ।  সচেতন, কেননা, কলকাতায় এসে গেছেন গিন্সবার্গ। কৃত্তিবাসের ষোল নম্বর সংকলন সম্বন্ধে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ষোল নম্বর সংকলনে কৃত্তিবাস ফেটে বেরুল। তারিখ ১৩৬৯ চৈত্র। …কবিত্বের খোলস ছেড়ে একদল অতৃপ্ত যুবকের অকস্মাৎ বেরিয়ে পড়ার জন্যে যে প্রচন্ড অস্বস্তি ও বেগে-এর প্রয়োজন ছিল। অ্যালেনদের সাহচর্য তা জুগিয়েছিল আমাদের । সংখ্যাটি কলকাতা পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল অশ্লীলতা সম্পর্কে। …ঘামে নুন, যোনিদেশে চুল( পৃঃ ৫), দেখেছি সঙ্গম ঢের সোজা, এমনকি বেশ্যারও হৃদয়ে পথ আছে ( পৃঃ ২২)  , যোনির ঝিনুকে রাখা পোকাগুলি মুক্তা হয়ে গিয়েছে বিস্ময়ে ( পৃঃ ৪৫)…আসলে যে কান্ড ঘটেছিল সব কবিদের  বুকের মধ্যে তা হল প্রচন্ড বিরক্তি থেকে উদ্ভুত ধ্বংস করার ইচ্ছে – সৃষ্টির নামান্তর – যা কিছু পুরনো পচা, ভালমন্দ সোনারুপোর খনি, এমনকি নিজেদের শরীর ও অস্তিত্ব – সর্বস্বের সর্বনাশ। “ ( শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় , কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কৃত্তিবাস পঞ্চবিংশ সংকলন, ১৯৬৮)।

একটি স্পষ্ট কর্মসূচী নিয়েই এই কবিরা এসেছেন শরীরের অনুভবকে সাদা কাগজের বুকে বদলি করতে। “কিছুক্ষন ডুবেছিল যোনির ভিতরে জিভ লবণের স্বাদ ছাড়া আর/ কিছুই আনেনি তবু অসম্ভব ভালবাসাবাসি হল অসম্ভব / এই নিয়ে তোমাকে আমার/ একুশটা পুনর্জন্ম দেওয়া হল এত মৃত্যু মানুষেরও জানা ছিল ।“ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাস চৈত্র ১৩৬৯ –এর “কয়েক মুহূর্তে” শীর্ষক বিস্ফোরক কবিতাটির মধ্য দিয়ে এভাবেই প্রথাসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠে কবিতায় যৌনতার ব্যবহার। বকলমে যা নারীর উদযাপন। ১৯৫০ পরবর্তীতে যৌনতার সরাসরি উল্লেখ এবং যৌনক্রিয়ার বিবরণী একটি স্বাভাবিক ভাববস্তুতে পরিণত হল বাংলা কবিতায়, এই বস্তুই আসলে নারীর মুখধারণ করে এসেছিল। পুরুষ কবিদের কলম থেকে “শরীর ছাড়া শরীর যায় না চেনা… শরীর ছেনে শরীর দিয়েই অন্ধকারের/ নিবিড় শরীর গভীর করে দাঁতে কাটি/বুকে পিষি ঘামের শরীর – আঁষটে গন্ধ” ( বেলাল চৌধুরী , ‘শরীর দিয়েই শরীর”)  এর নতুনত্ব সেই সময়ে যতটাই থাক, পরে শরীরের আঁষটে গন্ধ বাঙ্গালির রান্নার মাছের মতই অনিবার্য হয়ে উঠবে বাংলা কবিতায় ।

পুরুষের কবিতায় এরপর কিছুদিন কেবলি শরীরী উদযাপন। নারীশরীরকে একটা আলাদা মর্যাদার জায়গায় স্থাপন করেছে এতদিনে এই সব কবিতা। যদিও কল্লোল যুগেও চেষ্টা হয়েছিল, বুদ্ধদেব বসুর কিছু গদ্য যেভাবে কবিতায় ব্যবহৃত শরীরী সংকেত বহনকারী শব্দদের পক্ষ নিয়ে লেখা হয়েছিল । তবু কৃত্তিবাসের পর্বটি নারীর বিষয়ায়নের একটা বড় ধাপ, জলবিভাজিকাও বলা চলে। সেইকারণেই এ দশকের উল্লেখ পরবর্তী যে কোন দশককে নিয়ে আলোচনায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

 

তবে শুধুই কিন্তু যৌনতা নয়। প্রেমের কবিতাতেও পুরুষ কিন্তু নারীকে অবিশ্রান্তভাবে বিষয় করে গেছেন, সেই পঞ্চাশ দশক থেকে পরবর্তী প্রতি দশকে।

বিখ্যাত নীরার কথা না হয় নাই বললাম। স্নিগ্ধ, লাবণ্যস্নাত নীরাকে অনেক বিভঙ্গে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে এক আলাদা সেন্টিমেন্ট তৈরি করেছিলেন সুনীল।

“বাস স্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল

স্বপ্নে বহুক্ষণ

দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে–দিকচিহ্নহীন–

বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে

তোমাকে দেখছি কাল স্বপ্নে, নীরা, ওষধি স্বপ্নের

নীল দুঃসময়ে।

দক্ষিণ সমুদ্রদ্বারে গিয়েছিলে কবে, কার সঙ্গে? তুমি

আজই কি ফিরেছো?

স্বপ্নের সমুদ্র সে কী ভয়ংকর, ঢেউহীন, শব্দহীন, যেন

তিনদিন পরেই আত্মঘাতী হবে, হারানো আঙটির মতো দূরে

তোমার দিগন্ত, দুই উরু ডুবে কোনো জুয়াড়ির সঙ্গিনীর মতো,

অথচ একলা ছিলে, ঘোরতর স্বপ্নের ভিতরে তুমি একা।“

( হঠাৎ নীরার জন্য)

 

তাকে অনেকে সত্যিকারের জীবনে খুঁজেছে, নানারকম গবেষণার কথা শুনি । নানা গসিপ, গালগল্প, কিংবদন্তী নীরাকে নিয়ে।

কিন্তু নীরা সত্যি করে থাকতে পারে নাকি? এরকম পালকের মত মেয়ে কি হয়, নরম আর সুন্দর? আবার একইসঙ্গে, অনেক অনেক মেয়ের মধ্যে কি তুমি নীরাকেই খুঁজে চলছ না, সুনীলের কবিতাগুলোর থেকে চুঁইয়ে পড়ছে না নীরাকে টুকরো টুকরো করে বের করে নেওয়ার ইতিহাস, নানা মেয়ের থেকে?

একইসঙ্গে, আসলে নিজের কিশোরসুলভ ভালবাসার আঁচ সারাজীবন একইরকম বাঁচিয়ে, একইরকম করে ভল্টে রেখে দিয়ে ভালবাসার মূলধন, আর সুদের মত একটু একটু করে তা থেকে আসা ওমটুকু, চেখে চেখে নেওয়া কষ্টমেশানো সুখটুকু, তাই দিয়ে তুমিই কি আসলে নির্মাণ করছ না নীরাকে?

চাঁদের নীলাভ রং , ওইখানে লেগে আছে নীরার বিষাদ

অথবা

অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানাল

আঁচলে বৃষ্টির শব্দ, ভুরুর বিভঙ্গে লতাপাতা

ও যে বহুদূর

পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর

কী করে ওখানে যাব, কী করে নীরাকে

খুঁজে পাব?

নীরা, তুমি কালের মন্দিরে

ঘন্টধ্বনি হয়ে খেলা করো, তুমি সহাস্য নদীর

জলের সবুজে মিশে থাকো, সে যে দূরত্বের চেয়ে বহুদূর

কখনো সুনীল নীরাকে দূর থেকে, দূরের করে করে দেখছেন । এই দূরত্ব কিসের? সত্যিকারের নীরা কী করে এত দূরে থাকবে। এ নিশ্চয়ই সুনীলের নিজের তৈরি নীরা। যে নীরা সবসময়েই বহুদূর হয়ে থাকে।

অথচ সে নীরার শরীর আছে ভীষণ রকম।  অথচ সেই নীরারই জ্বর হয়, সে শুয়ে থাকে, সে জানতেই পারেনা তার ঘুমের ভেতরে কখন সুনীল এসে তার মাথার পাশে বসেন, তার গায়ের পাশে রেখে যান নিজস্ব কবিতা। নীরা বোধ হয় দাঁতও মাজে, তার গালে আলো পিছলোয়, সে রুখু চুলে যখন এলোমেলো ঘরে পরার জামা পরে থাকে, তখন তো সেই নীরাকে বেশ মানুষ মানুষই মনে হয়, বেশ আমারই মত, আমারই কাছাকাছি মনে হয়।

আবার একইসঙ্গে বুঝতে পারি, এই কবিতার ভাষা সুষমা আসলে নীরাকে রোজকার জগত থেকে সজোরে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, একদম অন্য একটা ভুবনে নিয়ে ফেলছে…

এই কবিতার জন্য আর কেউ নেই, শুধু তুমি, নীরা

এ কবিতার মধ্যরাত্রে তোমার নিভৃত মুখ লক্ষ্য করে

 

ঘুমের ভিতরে তুমি আচমকা জেগে উঠে টিপয়ের

থেকে জল খেতে গিয়ে জিভ কামড়ে এক মুহুর্ত ভাববে

কে তোমায় মনে করছে এত রাত্রে — তখন আমার

এই কবিতার প্রতিটি লাইন শব্দ অক্ষর কমা ড্যাশ রেফ

ও রয়ের ফুটকি সমেত ছুটে যাচ্ছে তোমার দিকে, তোমার

আধো ঘুমন্ত নরম মুখের চারপাশে এলোমেলো চুলে ও

বিছানায় আমার নিঃশ্বাসের মতো নিঃশব্দ এই শব্দগুলো

এই কবিতার প্রত্যেকটি অক্ষর গুণিনের বাণের মতো শুধু

তোমার জন্য, এরা শুধু তোমাকে বিদ্ধ করতে জানে

 

তুমি ভয় পেয়ো না, তুমি ঘুমোও, আমি বহু দূরে আছি

আমার ভযংকর হাত তোমাকে ছোঁবে না, এই মধ্যরাত্রে

আমার অসম্ভব জেগে ওঠা, উষ্ণতা, তীব্র আকাঙ্খা ও

চাপা আর্তরব তোমাকে ভয় দেখাবে না — আমার সম্পূর্ণ আবেগ

শুধু মোমবাতির আলোর মতো ভদ্র হিম,

. শব্দ ও অক্ষরের কবিতায়

তোমার শিয়রের কাছে যাবে — এরা তোমাকে চুম্বন করলে

তুমি টের পাবে না, এরা তোমার সঙ্গে সারা রাত শুয়ে থাকবে

এক বিছানায় — তুমি জেগে উঠবে না, সকালবেলা তোমার পায়ের

কাছে মরা প্রজাপতির মতো লুটোবে | এদের আত্মা মিশে

থাকবে তোমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে, চিরজীবনের মতো

 

বহুদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলে ঝর্নার জলের মতো

হেসে উঠবে, কিছুই না জেনে | নীরা, আমি তোমার অমন

সুন্দর মুখে বাঁকা টিপের দিকে চেয়ে থাকবো | আমি অন্য কথা

বালার সময় তোমার প্রস্ফুটিত মুখখানি আদর করবো মনে-মনে

ঘর ভর্তি লোকের মধ্যেও আমি তোমার দিকে

. নিজস্ব চোখে তাকাবো |

তুমি জানতে পারবে না — তোমার সম্পূর্ণ শরীরে মিশে আছে |

আমার একটি অতি ব্যক্তিগত কবিতার প্রতিটি শব্দের আত্মা |

 

 

পড়তে পড়তে ঘোর লাগে। কবিতা তাত্ত্বিকেরা বলেছে, সুনীল কিশোর সুলভ কবিতা লিখে গেছ নাকি সারাজীবন। তাই সুনীলের কবিতা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হতেই পারে নি। শুধু আমাদের মত অনেক মেয়েই , এক বয়সে,  মিশে  গেছি সুনীলের তৈরি মেয়েদের সঙ্গে ।

সুনীলের শব্দরা আমার গোটা কৈশোর আর প্রথম যৌবনের দিনগুলোকে যে ভাবে নির্মাণ করেছিল, সেই ছাঁচটাকে ভেঙেচুরে আমি কোথায় হারিয়ে ফেলব ? আমার কাছে, চির যুবক নীললোহিতএর গদ্যেও এই একই কিশোর থেকে বড় না হয়ে উঠতে পারা যুবককে পাওয়া যায়। খ্যাপাটে বাউন্ডুলে এই যুবক ত তোলাই থাকবে, অক্ষত। নিজের নারী হয়ে ওঠার ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে, আমার একটুকরো অল্পবয়সের সঙ্গে।

নীল লোহিত আর নীরা এই দুই আলাদা অথবা কেন্দ্রস্থলে এক সত্তাকে নিয়ে মাতামাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারপর চলতেই থাকবে। প্রতি প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের কিশোর বয়সে নিজেকে নীরা ভাববেন আর নিজের প্রেমিককে নীললোহিত । এই ভাবনার ভেতরে আছে কবির রচিত  তীব্র নার্সিসিজম থেকে শুরু করে  শরীর বোধ, স্বীকারোক্তির আঁচ, এবং নারীকে দেখার পুরুষদৃষ্টির এক মোলায়েম উপস্থিতির যাদু। এই নারী নির্মাণ অন্যভাবে পরবর্তী অনেক গুলো প্রজন্মে আসবে। পুরুষ কলমে নারীর অভিজ্ঞানটি রচনা করে দিয়েছেন সুনীল এভাবেই… চিরতরে। এক দীর্ঘস্থায়ী মডেল।

 

 

 

 

পুরুষ দৃষ্টির এক বাহুল্য থেকে গেছেই তবু সুনীল গংগোপাধ্যায়ের লেখায়।

যে বিষয়ে বিশ্বজিত রায়ের বক্তব্যটি পুরোটাই তুলে দেবার মত :

আমার বহুবার মনে হয়েছে সুনীল সন্দীপনের আত্মজৈবনিক উপন্যাস প্রকাশ্য ও নিহিতার্থে নারী-বিদ্বেষী । কৃত্তিবাসের জীবন-যাপনে নারীবিদ্বেষের নানা চেহারা প্রকাশিত । তাঁরা হয়তো সে বিষয়ে সে সময় সচেতন ছিলেন না । সুনীলের নীরা বিষয়ক প্রেমের কবিতায় অবশ্য প্রেমের স্বভাবধর্মে সে বিদ্বেষ আর নেই । ভদ্রতা ও লাজুকতা, মায়াবী পুরুষ-পুরুষ বেদনা সেই প্রকাশ্য-নিহিত বিদ্বেষকে অনেকটাই ঢেকে দিয়েছে । কৃত্তিবাসের আদিপর্বের ভাবগত খামতি বুঝতে গেলে কবিতা সিংহের লেখা খুবই মন দিয়ে পড়া জরুরি বলে মনে হয় ।( ফেসবুকে ‘শীতে পুরুলিয়ায় আসুন’ নামের একটি বিজ্ঞাপন সংক্রান্ত নানা জনের মন্তব্য প্রতি মন্তব্যের সূত্রে আমার এই কথাগুলি আবার মনে হল ।)

লেখালিখির ক্ষেত্রে এ কথাটা বেশ চালু যে নিজের সঙ্গে ‘রিলেট’ করতে পারছি কি না । যদি পারি তবেই লিখি । এই নিজের সঙ্গে ‘রিলেট’ করতে চাওয়া ও পাওয়া কখনও কখনও বেশ বিপত্তিজনক । যেমন বেশ মনে পড়ছে সুনীলের কবিতায় ছিল কবির পক্ষে তিন নম্বর লাইন খুব গুরুত্বপূর্ণ । প্রথম লাইন প্রেরণা থেকে আসে, তারই সঙ্গে আসে অনায়াস দ্বিতীয় । তারপর তৃতীয় নিয়ে যত সমস্যা । সুনীলের উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন চরিত্র তখন দেখি রবীন্দ্রনাথও কবিতার তৃতীয় লাইনে আটকে যাচ্ছেন । সুনীলের রবীন্দ্রনাথ — সুনীল নিজেকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে ভাবছেন গড়ছেন । সুনীলের প্রথম আলো তে নিবেদিতার হাত মুছিয়ে দিচ্ছেন বিবেকানন্দ । তার দুদিন বাদে বিবেকানন্দের মৃত্যু হবে , নিবেদিতার চিঠিতে ও বিবেকানন্দ সম্পর্কিত স্মৃতিকথায় সে মুহূর্তের বিবরণ আছে । বিবেকানন্দের শরীর ভেঙে গেছে । বুঝতে পারছেন সময় আসন্ন । তাই যিশু যেমন তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন তেমনই বিবেকানন্দ নিবেদিতার হাত মুছিয়ে দিচ্ছেন । সুনীল তাঁর উপন্যাসের কথনে লিখেছিলেন বিবেকানন্দ নিবেদিতার চাঁপার কলির মতো আঙুল মুছিয়ে দিতে লাগলেন । এই চাঁপার কলির মতো আঙুল শুধু বহু ব্যবহৃত উপমাই নয় এক্ষেত্রে বেশ দুর্বল বলেই মনে হয় । এই যে নিজের মর্জি, প্রবণতা ঢুকে পড়ছে সৃষ্ট চরিত্রের মধ্যে, সত্যিকথা সেই ঢুকে পড়াটা অনেক সময়ই অনিবার্য, তার থেকেই যত বিপত্তি । ইংরেজ রোমান্টিক কবিরা লেখালিখির ক্ষেত্রে না-হওয়ার ক্ষমতাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন । আমি নিজের অহং ও প্রবণতাকে বাদ দিয়ে যাকে নিয়ে লিখছি তার মতো হয়ে উঠতে পারছি কি না ; তাকে তার জায়গা থেকে ভাবতে পারছি কি না এটাই না-হয়ে ওঠা। এর মধ্যে সমানুভূতি মিশে থাকে । পুরুষ লেখকদের আত্মকথনে, আত্মজৈবনিক উপন্যাসে অনেক সময় নিজের অহং হয়ে ওঠে বড়ো । তখন পার্শ্ববর্তী নারী চরিত্রগুলি সম্বন্ধে সমানুভূতির ছিটে-ফোঁটাও চোখে পড়ে না । এ কাণ্ড সন্দীপন, সুনীলের উপন্যাসে খেয়াল করেছি । আরও কারও কারও কথা বলা যায় । প্রায়ই মনে হয় সর্বগ্রাসী পুরুষ চরিত্র তাঁর যাবতীয় ইচ্ছে-অনিচ্ছে নিয়ে বক-বক করেই যাচ্ছেন । পাশের চরিত্রগুলির যে কোনও কথা থাকতে পারে তা ভাবার ইচ্ছেও নেই অবকাশও নেই । না-হওয়ার ইচ্ছে, ক্ষমতা, সমানুভূতি কথকের অধিগত নয় । আত্মকথা ক্রমশই আত্মরতি হয়ে উঠছে, জন্ম নিচ্ছে ক্ষমতার স্বর । এই আত্মরতিময় আত্মকথনের রীতি অবদমিত বাঙালি সমাজের পুরুষ পাঠককে বেশ নির্ভার মৌতাতময় করে তুলত । এই জাতীয় লেখা সে জন্যই বেশ জনপ্রিয় হত । এখন যখন সেই পুরনো লেখা ও পাঠকের প্রতিক্রিয়ার কথা ভাবি তখন এসব মাথায় ঘোরে । কাউকে আলাদা করে দোষ দিচ্ছি না, শুধু বাংলা সাহিত্যের নগণ্য পাঠক হিসেবে কী ও কেন বুঝতে চাইছি ।”

গদ্যে , উপন্যাসে নারী নির্মাণ , সেই পুরনো এঞ্জেল হোর ডিকটমিই বার বার সুনীলের লেখায়। সত্যি বলতে কি, এ ধারাও নতুন নয়। সেই রবীন্দ্রনাথ থেকে। সব পুজোর জন্য যে রবীন্দ্রনাথ গঙ্গাজল শুধুই।

 

রবি ঠাকুরের “শেষের কবিতা”  থেকেই নারীর নির্মাণ হচ্ছে দুই প্রান্ত ধরে। এক দিকে মাতৃমূর্তি, পবিত্রতার কল্যাণী মূর্তির লাবণ্য আর অন্য দিকে নব্যা, আধুনিকা সিসি আর লিসি… তরল , কেতাদুরস্ত কিন্তু “অকল্যাণময়ী” হয়ত বা!

“এ দিকে ওর দুই বোন, যাদের ডাকনাম সিসি এবং লিসি, যেন নতুন বাজারে অত্যন্ত হালের আমদানি– ফ্যাশানের পসরায় আপাদমস্তক যত্নে মোড়ক-করা পয়লা নম্বরের প্যাকেট-বিশেষ। উঁচু খুরওয়ালা জুতো, লেসওয়ালা বুক-কাটা জ্যাকেটের ফাঁকে প্রবালে অ্যাম্বারে মেশানো মালা, শাড়িটা গায়ে তির্যগ্‌ভঙ্গিতে আঁট করে ল্যাপ্‌টানো। এরা খুট খুট করে দ্রুত লয়ে চলে; উচ্চৈঃস্বরে বলে; স্তরে স্তরে তোলে সূক্ষ্মাগ্র হাসি; মুখ ঈষৎ বেঁকিয়ে স্মিতহাস্যে উঁচু কটাক্ষে চায়, জানে কাকে বলে ভাবগর্ভ চাউনি; গোলাপি রেশমের পাখা ক্ষণে ক্ষণে গালের কাছে ফুর ফুর করে সঞ্চালন করে, এবং পুরুষবন্ধুর চৌকির হাতার উপরে বসে সেই পাখার আঘাতে তাদের কৃত্রিম স্পর্ধার প্রতি কৃত্রিম তর্জন প্রকাশ করে থাকে।“

এর পরই পাঠক হিসেবে আমাদের তৃষিত অপেক্ষা হবে লাবণ্যের আবির্ভাবের জন্য। সেটা এইরকম…

“একটি মেয়ে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। সদ্য-মৃত্যু-আশঙ্কার কালো পটখানা তার পিছনে, তারই উপরে সে যেন ফুটে উঠল একটি বিদ্যুৎরেখায় আঁকা সুস্পষ্ট ছবি– চারি দিকের সমস্ত হতে স্বতন্ত্র। মন্দরপর্বতের নাড়া-খাওয়া ফেনিয়ে-ওঠা সমুদ্র থেকে এইমাত্র উঠে এলেন লক্ষ্মী, সমস্ত আন্দোলনের উপরে– মহাসাগরের বুক তখনো ফুলে ফুলে কেঁপে উঠছে। দুর্লভ অবসরে অমিত তাকে দেখলে। ড্রয়িংরুমে এ মেয়ে অন্য পাঁচজনের মাঝখানে পরিপূর্ণ আত্মস্বরূপে দেখা দিত না। পৃথিবীতে হয়তো দেখবার যোগ্য লোক পাওয়া যায়, তাকে দেখবার যোগ্য জায়গাটি পাওয়া যায় না। …মেয়েটির পরনে সরু-পাড়-দেওয়া সাদা আলোয়ানের শাড়ি, সেই আলোয়ানেরই জ্যাকেট, পায়ে সাদা চামড়ার দিশি ছাঁদের জুতো। তনু দীর্ঘ দেহটি, বর্ণ চিকন শ্যাম, টানা চোখ ঘন পক্ষ্মচ্ছায়ায় নিবিড় স্নিগ্ধ, প্রশস্ত ললাট অবারিত করে পিছু হটিয়ে চুল আঁট করে বাঁধা, চিবুক ঘিরে সুকুমার মুখের ডৌলটি একটি অনতিপক্ক ফলের মতো রমণীয়। জ্যাকেটের হাত কব্‌জি পর্যন্ত, দু-হাতে দুটি সরু প্লেন বালা। ব্রোচের-বন্ধনহীন কাঁধের কাপড় মাথায় উঠেছে, কটকি কাজ-করা রুপোর কাঁটা দিয়ে খোঁপার সঙ্গে বদ্ধ।“

আশ্চর্য হয়ে দেখব, প্রথম দিকের অনেক গুলি উপন্যাসে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও এই “নায়িকা” র নির্মাণ করেছেন, প্রেক্ষাপটে কয়েকটি  উগ্র আধুনিকাকে রেখেই। রবি ঠাকুরের মত পুংক্ষাণূপুংক্ষ না হলেও, তাতে স্পষ্ট লেখা থাকে একটা দ্বৈততার কথা, সিসি লিসি বনাম লাবণ্যে যে লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে। একদিকে আছে অতি চর্চিত, মহার্ঘ, অতি সচেতন সাজগোজের উগ্রতা ( পড়ুন = চরিত্রের উগ্রতা), যা নায়িকা নয়, প্রতিনায়িকা অথবা সরাসরি ভ্যাম্পের রোলে ঠেলে দেয় নারীচরিত্রগুলোকে, অন্য দিকে অসচেতন, ঢলোঢলো কাঁচা সৌন্দর্য, যা আত্মার বিশুদ্ধতাকে দেহসৌষ্ঠব ফুঁড়ে নায়কের চোখের সামনে হাজির করছে। নায়িকারা সর্বদাই কিছুটা সাজগোজে অন্যমনস্ক হবেন, এ যেন তারপর থেকে দাঁড়িয়ে গেল বাংলা আইডিওলজির সঙ্গে সমান্তরালে, সাহিত্য শিল্পেও।

দেখা যাক, সুনীলের প্রতিদ্বন্দ্বী-তে কীভাবে এসেছে এই সংজ্ঞায়ন।

“মেয়েদুটির নাম মালবিকা আর কেয়া। মালবিকা তার পায়ের জুতো, শাড়ির রং, আংটির পাথর, হাতব্যাগ, টিপ সব মিলিয়ে পরেছে। চুল বাঁধার ধরন দেখলেই বোঝা যায়, সে এক-একদিন এক-এক রকমভাবে চুল বাঁধে। নিজের রূপ সম্পর্কে মেয়েটি সজাগ। মুখে সেই হালকা অহংকারের ছায়া পড়েছে। কেয়া মেয়েটি খানিকটা এলোমেলো স্বভাবের, পোশাকের পারিপাট্য নেই, কিন্তু মুখখানি তার ভারী সুন্দর – বড় বড় চোখদুটিতে সরল সৌন্দর্য। “

এই বর্ণনা থেকে লেখকের বা তার নির্মিত নায়কের পক্ষপাত স্পষ্ট, বাংলায় এই পক্ষপাত কিন্তু চলবে, একেবারে কালবেলা-র মাধবীলতা পর্যন্ত।  বলা ভাল সমরেশ মজুমদারে এসে বাঙালি মেয়ের এই ইমেজ কালমিনেশনে পৌঁছবে। “মাধবীলতাকে সে চেনে না… শুধু এটুকুই মনে হয়েছে মেয়েটি নরম এবং বোকা নয়। …মাধবীলতার নিজস্ব চিন্তাভাবনা আছে, এবং সেটাকে গুছিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলার ক্ষমতা রাখে। এরক সতেজ ডাঁটো আত্মবিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে কোনও মেয়েকে অনিমেষ দেখেনি। কলকাতায় এসে নীলার সঙ্গে আলাপ হয়েছি। নীলা অবশ্যই খুব ডেসপারেট মেয়ে, কোনও রকম ভিজে ব্যাপার ওর নেই। কিন্তু নীলা কখনওই আকর্ষণ করে না, বুকের মধ্যে এমন করে কাঁপন আনে না। যে কোনও পুরুষবন্ধুর মতো নীলার সঙ্গে সময় কাটানো যায় …নীলার মানসিকতা বদ্ধ, মাধবীলতার মতো এমন দ্যুতি ছড়ায় না। “

রাবীন্দ্রিক লাবণ্যর থেকে আলাদা হয়েও আসলে কোথাও এক থেকে গেছে মাধবীলতা। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নারীচরিত্র, বহু কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ের মত আমারও কমবয়সের ফ্যান্টাসির উপাদান সে। সবচেয়ে বড় কথা , সে মেয়ে মেয়ে, সে নারী, অথচ নারীর যে অবয়বটি আরোপিত সেই তথাকথিত “ফ্যাশন”-সর্বস্ব নয়, আবার নীলার মত “পুরুষালি”-ও হলে তাকে চলবে না।

এখানেও বহাল রয়েছে পুরুষের দৃষ্টিকোণ, অবশ্যই। নির্মাণ যে করছেন একজনে পুরুষই!

 

কিন্তু এর আগে পরে এমন চরিত্র নির্মাণ অনায়াসেই করে ফেলবেন সুনীল, যে মেয়েরা আত্মস্থ, স্বাধীন, পুরুষনিরপেক্ষভাবে থাকতে চায় ও ভালবাসে, এবং তাদের রূপ এই সহজ , ফর্মুলার মত দ্বৈততা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। একে কি বলব, সময়ের সঙ্গে এগিয়ে চলা? মানিয়ে নেওয়া?

ধরা যাক প্রতিদ্বন্দ্বীর মেয়ে সুতপা । সুনীলের বর্ননায়, মূল উপন্যাসে যে মেয়েটি এইরকম : “সুতপা এক হাত দিয়ে শাড়িটা একটু উঁচু করে পা টিপে টিপে হাঁটছে। একটা ময়ূরকন্ঠী রঙের ছাপা শাড়ি পরেছে সুতপা, হাতে একটা সাদা রঙের ব্যাগ। …তাকে এখন একজনে পুরোপুরি মহিলা বলা যায়। ।। সুতপার বুক দুটি ভরাট সুগোল, হাঁটার ভঙ্গিতে খানিকটা মাদকতা মাখানো, ফরসা মুখটাতে একটা অন্যরকম আভা।“ পুরুষের নির্মিতি হলেও , নিজের অজান্তেই সুনীল কিন্তু ভেঙে ফেলেছেন ছাঁচ, ব্যবহারহীন একরকমের আত্ম-পরিতৃপ্ত চরিত্র হিসেবে সৃষ্টি করে ফেলেছেন সুতপাকে।

সিনেমায়, সেই অবিস্মরণীয় ক্যালকাটা ট্রিলজির একটি, প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিতে,  সত্যজিৎ যাকে আরো একধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছেন, ছাতে , একলা একলাই, কাল্পনিক পুরুষ সংগীর কাঁধে হাত রেখে নেচে চলতে।খুঁজে নিয়েছে অফিসে বসের মনোরঞ্জন ও পার্টিতে বল ডান্স করার উপযোগী শরীর কামড়ে থাকা ভয়েলের শাড়ির চটুলতা, যা তার মডেলিং-কামনার সঙ্গে একেবারে মানানসই।

অবজেক্টিভ বা তন্ময়ভাবে দেখা মেয়েদের চরিত্রায়ণ একদিকে, অন্যদিকে আপন মনের মাধুরী মেশানো , কল্পিত স্টিরিওটাইপ নারীর আদল… এই দুই মেরুর মাঝামাঝি অসংখ্য নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন সুনীল। তাঁর লেখার ব্যক্তিত্বময়ী মায়েদের পাই সেই সময়ের মেয়েদের মধ্যে। আবার পূর্ব পশ্চিমে বেশ কিছু স্বাধীনতা উত্তর স্বাধীনচেতা মেয়ের চরিত্র সৃষ্টি করেছেন তিনি। তবু, পুরুষদৃষ্টির প্রাবল্য ভাসিয়ে নিয়েছে সব চরিত্রকেই । কোথাও যেন অপেক্ষা থেকেই গেছে গোটা বাংলা সাহিত্য জুড়েই, মেয়েদের কথার। ঠিক যেমন, মেয়েদের কলমের ও।

 

লক্ষ্মীর পাঁচালি ডিকোড করার বিপদ ও সম্পদ

laxmi

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

 

দুর্গাপুজোর পর পর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আসে। দুটো পুজোর মধ্যে মিল বলতে এইটুকুই, যে দুটো পুজো পরস্পর জড়িয়ে থাকে, আসে পর পর। একটার বিশালতা , জাঁকজমক, তিনদিন ব্যাপী উৎসবের আদল, গোটা বাঙালি সংস্কৃতির  প্রতীক হয়ে ওঠা, নতুন জামাকাপড় কেনার বাধ্যতা ইত্যাদি নিয়ে বিপুলকায়। প্রায় দুমাস আগে থেকে   দুর্গাপুজো আসি আসি করতে করতে আসে। চলে যাবার পর বিজয়ার মিষ্টি মুখ আর কোলাকুলি প্রণাম ও গুরজনদের চিঠি লেখা এইসব সহই তার জের চলে আরো দু সপ্তাহ। আজকাল ত কার্নিভালের জাঁক দুর্গাপুজাকে দিয়েছে আরো  এক বিশাল বড় প্রেক্ষিত। চালচিত্র। পারিবারিক আনন্দের , সামাজিক ব্যাপ্তির এক উপন্যাস লেখা হয়ে চলে যেন প্রায় দু মাস ধরেই। সর্বভারতীয় ক্যালেন্ডারে বাঙালির দুর্গাপুজা অহংকারের আলো।

 

পাশাপাশিই টুকুস করে আসা আর সেরে নেওয়া কোজাগরী পূর্ণিমার  লক্ষ্মীপুজোট, ঘরোয়া আর লাবণ্যময়, নারীকুলের বুকের কাছের লক্ষ্মীপুজো যেন ছোট গল্প। বড় প্যান্ডেলের মা দুর্গার বিসর্জনের পর খালি প্যান্ডেলে ছোট লক্ষ্মীপুজো হেলাফেলার মধ্যেই পূজিত হন দায়সারা ভাবে। কিন্তু তারো চেয়ে অনেক বেশি কদর ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজোর। প্রতি বেস্পতিবারের লক্ষ্মীপুজো করেন  বেশ কিছু পুজোপ্রবণ বাঙালি হিন্দু মহিলারা নিষ্ঠা ভক্তি ও অভ্যাসে। তার চেয়েও বেশি ব্যাপ্তিতে,  প্রতি গৃহে বাঙালি হিন্দুর  কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো প্রায় যেন প্রশ্নহীন আনুগত্যে আমরা সাদরে গ্রহণ করি। প্যান্ডেলের দাঁড়ানো লক্ষ্মী সরস্বতীর সঙ্গে কম্পিটিশনে নামেন, মা উমার পাশটিতে। কিন্তু কোজাগরীর বসে থাকা লক্ষ্মী যাঁর কাঁখে টাকার ঝাঁপি আর হাতে ধানের ছড়া, একাই একশো। জিতে যান তিনি কয়েক মাইল এগিয়ে থেকে সরস্বতীর।

 

লক্ষ্মী নাকি ধনদাত্রী দেবী, কিন্তু বাঙালির চির দুর্ভিক্ষপ্রপীড়িত কালেকটিভ আনকনশাসের  অন্তরে, ধনদাত্রীকে আমরা অন্নদাত্রী  বলেই দেখতে শিখেছি। আর তাই, শরতের নতুন ফসলের সঙ্গে লক্ষ্মীপুজোর পুজোর ভোগ বা নৈবেদ্যর একটা নিবিড় সম্পর্ক লক্ষ্য করেছি।

 

কেন কেউ জানিনা আমরা, ইতিহাস হারিয়েছি, কিন্তু ধর্মের থেকে সাংস্কৃতিক কারণ বেশি হয়ে উঠেছে এই ঘরোয়া লক্ষ্মীপুজো।  কমিউনিস্ট হোন অথবা লিবারাল, বাড়িতে মা বৌদি বা গিন্নি যেন এই  লক্ষ্মীপুজো করবেনই। আর অধিকাংশ পুজোর মূল আকর্ষণ থাকে ছোট্ট মাটির মূর্তি, ফুলের মালা, আর চারিদিক থেকে জুটিয়ে আনা একরাশ সুখাদ্য, যার মধ্যে মূলত নারকেল নাড়ু, মোয়া নিমকি গজা , চিনির মঠ ও চিনির বাতাসা, নকুলদানা, কদমা, খেজুর আখ পানিফল শশা আপেল বাতাবি লেবু ইত্যাদি ফল, মাখা  নারকেল কোরানো ও মুগ ডাল ভেজানো, আতপ চাল ভেজানো, কলার অপরূপ এক নৈবিদ্যি , খিচুড়ি ও ভাজাভুজি, লুচি ও মোহনভোগ প্রায় অনিবার্যভাবে উপস্থিত। অনেক বাড়িতে পুরোহিত আসেন,  অনে ক বাড়িতে বাড়ির মহিলারাই পূজা করেন বই দেখে।  অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সারাদিন উপোশ করে সামগ্রী জড়ো করা হয়। পুজো হয় বিকেলের দিকে সূর্য পড়ে এলে। কেননা পূর্ণিমার সঙ্গে অখন্ড যোগ আছে এ পুজোর। যেমন আছে শ্বেত প্যাঁচাটির সঙ্গে।

 

নানা ঘরে নানা  মাপের, কম বেশি জাঁকজমকের পুজোয়  অন্নদাত্রীই হোন আর ধনদাত্রীই হোন, মা লক্ষ্মীর নানা রকমভাবে পুজো হলেও, একটি আশ্চর্য বিষয় হল, প্রতি পুজোতেই লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ হয়ে থাকে। আশ্চর্য কারণ দুর্গার পাঁচালি নেই। সরস্বতীর পাঁচালি নেই। আছে লক্ষ্মীর শুধু। আশ্চর্য কারণ ‘ লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়া’ নামক ঐতিহ্যবাহী ও  কৌম বস্তুটি বাঙ্গালার  সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক আচরণের মত উবে যায়নি… অন্য সব পুজো আচ্চা আচার আচরণ, নানা ধরনের তিথি ও ব্রত পালন, এটা ওটা লোক উৎসব ও পার্বণের বিলোপ ঘটেছে, নানা ধরণের মন্ত্র-ছড়া-পাঁচালি পড়া আর হয়না অন্তত শহুরে মেয়েদের মধ্যে এমন কোন অভ্যাস নেই দেখা যায়। কিন্তু লক্ষ্মীপুজোয় লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়া এখনো কনস্ট্যান্ট।

 

কে লেখেন বা লিখেছিলেন এই  পাঁচালি ? কীভাবে কিনি আমরা পাঁচালি? কেন পড়ি আমরা পাঁচালি? কবে থেকে শুরু হল হাতে লেখা পুঁথির বদলে এই ছাপা পাঁচালি কেনা ও পড়া?

 

কোন প্রশ্নেরই সদুত্তর নেই আমার কাছে। বহু লোক শিল্প বা লোক ব্যবহারের মতই এ নিয়ে।গবেষণারচিহ্ন খুঁজতে বসলে খড়ের গাদায় সূচ খোঁজা হবে। গৌতম ভদ্র মশায়ের আকর গ্রন্থে খোঁজা যেতে পারে।

 

সহস্র অজ্ঞান পেরিয়ে এটুকু বলতেই পারি যে বইয়ের দোকানে গিয়ে কেউ পাঁচালি কিনেছেন বলে শোনা যায় নি। অর্থাৎ মান্য বা স্ট্যান্ডার্ড বই এর সম্মান পায়নি বলেই মনে হয় এই পাঁচালি। যেন অনেকটাই ব্রাত্য অথচ অনিবার্য। আর তাই হয়ত এর কনটেন্ট সম্পর্কে আমাদের এত ঔদাসিন্য।

 

সচরাচর দশ কর্ম ভাণ্ডারে নানা পূজা সামগ্রীর সঙ্গে সঙ্গে আসে পাঁচালিটি। একটি পাতলা ফিরফিরে কাগজে , সাদা বা ঘিয়ে রঙের ওপর লাল অক্ষরে ছাপা পাঁচালি, সচরাচর সেইসব  প্রেসে বা প্রকাশকের ঘরে ছাপা হয় যাকে কথ্যবাংলায় বটতলা বলি। না আছে সম্মান না আছে অর্থবল, এইসব বইয়ের সামান্য দাম হয়, তেমনই এর লেখকরাও  নাম না জানা, অজ্ঞানের অন্ধকারে ডুবে থাকা কোন কোন পাঁচালি কবি। লেখক বলতে , পাঁচালির কোন আদি বা মূল লেখক আমরা পাইনা। কিন্তু এও আশ্চর্যের, যে একটিই পাঁচালির অন্য অনেক গুলি ভার্শান বা ভাষ্য পাওয়া যায়। মূল কাঠামো এক থাকে, তা বাদে ছোট ছোট ডিটেলে নানা তফাত থাকে।

 

 

কেউ কেউ ভাবছেন এই পাঁচালির উৎপত্তি ১৯৪২ এর আগে পরে। কেননা নিজেরা চরকা কাটার কথা আছে। কেউ বলতেও পারেন তেতাল্লিশের মন্বন্তরের পরের লেখা কেননা বার বার দুর্ভিক্ষে র কথা আছে।

 

 

 

 

 

lakshmi_broto_1

যাইহোক না মূলত মেয়েদের পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এই বইটিকে নিয়ে আমরা কেন পড়লাম তা বলি। মুদি দোকান বা দশকর্ম ভান্ডার থেকে এর চোরাগোপ্তা আক্রমণ জারি আছে এত এত বছর,  অন্তত একশো বছর ধরে বদলে গেছে বাঙালি মেয়ের মুখের ভাষা বদলে গেছে ব্রত পালন আর পুজো করার রীত।  পাল্টায়নি শুধু লক্ষ্মীর পাঁচালির মূল সুর। যে সুর এখনো ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ।  কী কী করলে লক্ষ্মী কুপিতা হন আর কী কী করতে থাকলে লক্ষ্মীকে ঘরে ধরে রাখা যাবে সেই তালিকায় কোন পরিবর্তন চোখেই পড়েনা। মোটের ওপর, বলাই যায় লক্ষ্মীর পাঁচালি এত বছর ধরে ইভলভ করেনি, তার কোন উন্নয়ন হয়নি।

 

এবং প্রায় পুরো ক্ষেত্রেই পাঁচালিটিতে যতকিছু অনাচার বা অসুবিধা সবকিছুর  দায় বা ওনাস মেয়েদের ওপরে। মেয়েরাই সংসারকে ধরে রাখবেন আর তাই সংসার রসাতলে যেতে বসলে মেয়েরাই ভুলচুকের শাস্তি মাথা পেতে নেবেন। নারী কেন্দ্রিক এই বয়ান সোজা কথায় রীতিমত নারীস্বাধীনতা ও লিবারাল মূল্যবোধ বিরোধী। আর তাই আপত্তি।

 

কোন এক কাল্পনিক অবন্তীনগরের এক ব্যবসায়ীর বৃহৎ সংসারে গোলমাল লাগা ও তার সমাধান হবে প্রতি পাঁচালিতেই, তবে উনিশ বিশ বাদ দিলে, শুরুর দিকটা প্রায় সব পাঁচালিতেই একইরকম ।

………………….

দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ ।

ধীরে ধীরে বহিছে মলয় বাতাস ।।

বৈকুন্ঠেতে একাসনে লক্ষ্মী নারায়ণ ।

করিতেছেন কত কথা হইয়া মগন ।।

সৃষ্টিতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব কত কথা হয় ।

শুনিয়া আনন্দিত দেবীর হৃদয় ।।

অকস্মাৎ দেবর্ষি নারয়ান নাম স্মরে ।

আসিলেন বীনা হস্তে বৈকুন্ঠ নগরে ।।

প্রনাম করি দেবর্ষি কহেন বচন ।

মর্তে সদাই দুর্ভিক্ষ অনল ভীষন ।।

 

এখানে লক্ষ্য করব, দুর্ভিক্ষের কথাটি বার বার ঘুরে ফিরে আসছে। আগেই বলছিলাম, ধনদাত্রীর চেয়েও লক্ষ্মী যেন আমাদের কালেকটিভ আনকনশাসে দরিদ্র অন্নহীন দুর্ভিক্ষপ্রপীড়িত বাঙালির অন্নদাত্রী। মাঠে মাঠে ধানের ক্ষেতের সবুজে হাওয়ার দোল দেওয়ার ছবি বাঙালি ভুলতে পারেনা, তাই ত অনিল বিকম্পিত শ্যামল অঞ্চলের কথাও এসেই পড়ে বার বার দেশ মাতৃকার কথা এলেই।

 

যাই হোক, নারদ এসে প্রবলেমেটিক টি লক্ষ্মীর কাছে স্থাপন করবেন, এটাই দস্তুর।

 

ঋষি বলে মা তুমি চঞ্চলা মন ।

সর্বদা স্থিত এভবন ও ভবন ।।

অন্নাভাবে মর্তবাসী কষ্ট পেয়ে ভোগে ।

মরিছে অনাহারে কৃশকায় রোগে ।।

ধর্মাধর্ম লোকে সবি ত্যাগ করি দেয় ।

স্ত্রী কন্যা বিক্রি করে ক্ষুধার জ্বালায় ।।

দুর্ভিক্ষে হইলো শেষ মরে মনুষ্যগণ ।

দয়া করি মা তুমি করো নিবারন ।।

 

 

এই অব্দি ঠিক ছিল। এর পর যেটা হয়, সেটাকেই ডিকোড করতে গিয়ে আমাদের গলদঘর্ম হতে হয়। যেহেতু আমরা জানি যে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়বেন মূলত মহিলারাই, এটা একটা ঘরোয়া পুজো, এবং সবাই তামা তুলসি হাতে নিয়ে পাঁচালি শুনবেন এমত কৌম প্রথায় আবদ্ধ আমাদের পাঁচালি পাঠের নিয়তিটুকু, এই “সকলের” প্রায় প্রত্যেকেই নারী, ঘরের লক্ষ্মী বলতে যা বোঝায়…তাই মনে হয় যেন প্রব্লেমেটিকের প্রতি লক্ষ্মী যেই মুহূর্তে নজর করেন এবং অন্নহীনতার কারণ দর্শাতে শুরু করেন, সেটা হয়ে যায় প্রায় নারীদের একটি কোড অফ কনডাক্ট বা টু ডু লিস্ট। কী কী বিধি ও নিষেধ তার তালিকা। যেন মেয়েদের আচার আচরণের ওপরেই নির্ভরশীল দেশের অর্থনীতি, অন্ন শস্যের বাড়বৃদ্ধি।

 

 

নারদের বাক্য শুনি কহেন নারায়নী ।

বিশ্বমাতৃকা আমি জগৎের জননী ।।

কারো প্রতি নাই আমরা ক্রোধানল ।

ভুগিছে মর্তবাসী নিজ নিজ কর্মফল ।।

মহামায়ার স্বরূপে নারী সত্য বচন ।

মর্তবাসী না মানে এই কথন ।।

নারীর পরমগতি স্বামী ভিন্ন কেবা ।

ভুলেও না করে নারী স্বামী পদসেবা ।।

যথায় স্বেচ্ছায় ঘুরিয়া বেরায় ।

গুরুজনে অকারনে মন্দ বাক্য কয় ।।

যে নারী সকালে না দেয় ছড়া ।

করি তার সংসার আমি লক্ষ্মীছাড়া ।।

অতিথি যদি উপস্থিত হয় দ্বারে ।

দূর দূর করে বিতারিত করে তারে ।।

গুরুদেবের প্রতি ভক্তি নাহি করে ।

আমি যে থাকি না তাহার ঘরে ।।

এঁয়োতি নারী সিঁদুর না দেয় কপালে ।

মলিন বস্ত্রে যথা ইচ্ছা তথা ঘোরে ।।

নিত্য যে না করে অবগাহন ।

তারে ছাড়ি করি অন্যত্র গমন ।।

দেব দ্বিজে কদাপি ভক্তি না করে।

সকলের সাথে মত্ত সদা কলহে ।।

তিথি ভেদে নিষিদ্ধ বস্তু যে বা খায় ।

হই না কভু তার ওপর সহায় ।।

যে মনুষ্য ভক্তি ভরে একাদশী না করে।

নাহি হই প্রসন্ন তাহার ওপরে ।।

উচ্চ হাসি হাসিয়া যে নারী ঘোরে ।

ঘোমটা না টানে মস্তক উপরে ।।

গুরুজন দেখি যারা প্রনাম নাহি করে।

সন্ধ্যাকালে ধূপ দীপ নাহি জালে ঘরে ।।

এমন নারী যে গৃহেতে করে অবস্থান ।

কভু নাহি পায় তারা লক্ষ্মীর বরদান ।।

 

 

এই একই বিধান বা নিদান যাই বলুন, পালটে পালটে যায় এক পাঁচালি থেকে আর এক পাঁচালিতে। দেখা যাক একবার আরেক পাঁচালির এই অংশঃ

 

 

নারদের বাক্য শুনি কহেন হরিপ্রিয়া ।

বিশ্বমাতা আমি দেবী বিষ্ণুজায়া ।।

যে যেমন করে সে তেমন পায় ।

সে দোষে কর্মফল, করে হায় হায় ।।

মহামায়ার স্বরূপে নারী সত্যবচন ।

মর্ত্যবাসী না মানে এই কথন ।।

সদাচার কুল শীল দিয়া বিসর্জন ।

ঘরের লক্ষ্মীকে করে সদা বর্জন ।।

এমন মনুষ্যজাতি মহাপাপ করে ।

কর্ম দোষে লক্ষ্মী ত্যাজে তাহারে ।।

নারীর পরম গতি স্বামী ভিন্ন কেবা ।

ভুলেও না করে নারী পতি পদসেবা ।।

যথায় স্বেচ্ছায় ঘুরিয়া বেড়ায় ।

গুরুজনে নানা কটুবাক্য শোনায় ।।

সর্বদা হিংসা করে না মানে আচার ।

হিংসাতে তার মজে সংসার ।।

ছড়া নাহি দেয়, প্রভাতকালে ।

লক্ষ্মী সে স্থান ছাড়িয়া চলে ।।

অতিথি যদি উপস্থিত হয় দ্বারে ।

দূর দূর করি তারায় তাহাড়ে ।।

যেবা গুরু, ব্রাহ্মণ দেখি ভক্তি নাহি করে।

মম নিবাস কভু নহে সেই ঘরে ।।

এঁয়োতির চিহ্ন সিঁদুর শাখা না দেয় ।

বাসী কাপড়ে যথা তথা বেড়ায় ।।

স্নান নিত্য নাহি করে যে মনুষ্য গণ ।

ত্যাজিয়া তাহারে, করি অন্যত্র গমন ।।

তিথি ভেদে যেবা নিষিদ্ধ দ্রব্য খায় ।

হই না কভু তার ওপর সহায় ।।

যে মনুষ্য ভক্তিভাবে একদশী না করে ।

কদাপি নাহি থাকি তাহার ঘরে ।।

উচ্চহাসি হাসিয়া যে নারী ঘোরে ।

গুরুজন দেখি ঘোমটা না টানে ।।

বয়োজ্যেষ্ঠ দেখি যারা প্রনাম না করে ।

সন্ধ্যাকালে ধূপ দীপ নাহি দেয় ঘরে ।।

ঠাকুর দেবতা আদি কভু না পূজে ।

সাধু সন্ন্যাসী দেখি হাসাহাসি করে ।।

এমন নারী যে গৃহেতে বসতি রয় ।

লক্ষ্মী ত্যাজে তাহাকে জানিবে নিশ্চয় ।।

 

এই ভাষ্যের শুরুতে তাও পুরুষকেও খানিক দোষ দেওয়া হয়েছে এই বলে যে, সদাচার কুল শীল দিয়া বিসর্জন ।/ঘরের লক্ষ্মীকে করে সদা বর্জন ।।… তা বাদে বাকিটা আবার সেই ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ।

 

 

আমার মত অনেক মেয়ের স্মৃতিতেই , ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠার পর্বে, দিদিমা বা জ্যেঠিমা বা মায়ের পড়া পাঁচালির এই সব অংশে এসে ঠোক্কর খাওয়া যেন অনিবার্য ছিল। আমরা এসব শুনতাম ও হাসতাম , পুজো আচ্চাকে বর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীর পাঁচালিকেও বর্জন করতাম। মানসিকভাবে অন্তত। আমাদের কাছে একটা হাস্যকর রিগ্রেসিভ বিষয় থেকে গেছে লক্ষ্মীর পাঁচালি।

 

কিন্তু আজও , ২০১৮ তেও ঘরে ঘরে আমাদের ই মত বয়সিনীরাই , পারিবারিক প্রথাকে মান্যতা দিয়ে, যত টা না ধর্মীয় কারণে তারও চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক চিহ্ন হিসেবে লক্ষ্মীপুজো করছি । এবং সঙ্গে পাঁচালিটাকেও ফেলতে পারছি না। এই জায়গা থেকেই উঠছে একটা দাবি অথবা প্রশ্ন।

 

পাঁচালির নবীকরণ করা যায়না? আনা যায় না একটা নিউ অ্যান্ড ইমপ্রুভড পাঁচালি? এই চিন্তা আমাদের মধ্যে কিছু বছর ধরে চারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে অবহেলা করা হচ্ছে লক্ষ্মীর পাঁচালিকে ছোট করে দেখে।  কেননা কথাগুলি নয় নয় করেও আমাদের কৌম স্মৃতিতে বা অবচেতনে থেকেই যাচ্ছে। তথাকথিত এগিয়ে যাওয়া মেয়েরা বছরের এক দিনে এই বই পড়ছেন দায়সারাভাবে। এতে ডাবল স্ট্যান্ডার্ডই গেড়ে বসছে।

 

নারীবাদী মেয়েদের বেশ কয়েকজন অন্য লেখালেখি ফেলে, লক্ষ্মীর পাঁচালি পুনর্লিখন করেন যদি? সমসাময়িক সার্বিক সমস্যা বা মেয়ে কেন্দ্রিক সমস্যাগুলোর দিকে নজর দিই যদি?

 

কতগুলো সেকশন ভাবছিলাম। সামাজিক, স্বাস্থ্য,প্রকৃতি-পরিবেশ সচেতনতা, মেয়েদের প্রতি অত্যাচার, গৃহকর্ম ভাগ করে নেওয়া এইসব। ম্যানুয়ালের মত হোক নতুন পাঁচালি। কোন ডাক্তার যদি স্বাস্থয নিয়ে পাঁচালি লেখেন, , মেনস্ট্রুয়াল হেলথ, প্রজনন,  বোন হেলথ এগুলোর ভুল ধরান বা মিথ ভাঙানো যায়। ডোমেস্টিক  অ্যাবিউজের ক্ষেত্রে কিছু আইনের কথা ও এই ছলে বলা যায়। এভাবে। সত্যি কাজের কাজ হয় তবে। গ্রামে গঞ্জেও প্রোমোট করা যাবে তা, কেননা পাঁচালির মাধ্যমেই লোকশিক্ষেও হয়।

 

যেহেতু এ পাঁচালি কোন একজনের লেখা না, তাই এর ভাষ্য বদল করাও সম্ভব , এরকমই মনে হয়।

 

 

এইসব ভাবতে ভাবতেই বেশ কিছু আপ টু ডেট পাঁচালি হাতে আসে এই সোস্যাল মিডিয়ার হাত ধরাধরি করেই। কয়েকটা এখানে রাখা গেল।

 

প্রথমেই চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের লেখা শ্লেষাত্মক প্যারডি আকারের পাঁচালি। বের হয়েছিল আনন্দবাজার পত্রিকায়।

 

বসন্ত ঋতুর নিশি, নির্মল আকাশ

ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস

বলিলেন নারায়ন, কহ দেখি প্রিয়া

কী বা অসন্তোষ তব, কাঁদে কেন হিয়ে।

 

অনেক কুটিল কীট, বাহির ও ঘর

ওড়ে আর বসে যায় পুরুষ অন্তর।

তখন বৈকুন্ঠ হতে লক্ষ্মী নারায়ণ

মানুষের যত খেলা দেখেন দিয়া মন।

কমলা কহেন ‘দেব , এ কেমন লীলা?

ধরাধামে নারী জাতি সত্য অবলা’।

 

স্বামী কন, ‘শুন দেবী তোমার আদেশে

নারীগণ সুগৃহিণী, সতী সাধ্বী বেশে

ঘরে ও আপিসে , তবু যত বেটাছেলে

ফুর্তি লুটিছে নিত্য কর্ম অবহেলে।’

 

লক্ষ্মী বলিলেন, ‘প্রভু, অভিধানে কয়

সতী ও অসতী-বাস নারীতেই রয়।

তাই তো বিধান লিখি, নারী শান্ত হলে,

লক্ষ্মীও অচঞ্চলা, থাকি তেলে জলে। ‘

 

হেনকালে নারদ আসি ঘর্ম মুছিল

চংক্রমণের শেষে ঢেঁকিটি নামিল।

কমলা কহিলেন, প্রতি বৃহস্পতিবারে

চিত্ত আকুল শংখ ধ্বনি শুনিবারে।

কাষ্ঠহাসি নারদের, ‘দেবী, ঘরে-ঘরে

লক্ষ্মীমতি রমণীরা ক্রন্দন করে।

বাংলা ব্যান্ডে আমার বীণা বিক্রি করেছি

এই তো সংবাদপত্র , মর্তে কিনেছি।’

 

লক্ষ্মী নারায়ণ তামা তুলসী লয়ে হাতে,

শুনিতে বসেন তাহা, খবর আছে যাতে।

মর্ত্যলোকে, আইনত, পুলিশ সুরক্ষায়,

কিন্তু  তরুণী পুলিশ হলে তাঁরও বাঁচা দায়।

স্বামীরা স্বেচ্ছায় করে একাধিক বিয়ে

অরাজি প্রথমাকে মারে বালিশ চাপা দিয়ে।

একা মেয়ে রাত অনেক, যাতায়াতকাল

শেয়াল কুকুর সম পুরুষের পাল

ছিঁড়ে খায়। ছোট ভাই আসি, বাধা দেন

কী ফল হইল? তার অবাধ নিধন

অসুস্থ পুত্র সহ জননী হাঁটেন,

তাকেও  মদ্যপ যৌন লালসায় কাটে।

যে নারী ভিন্ন জাতের কারও গাড়িতে চাপে

বিবস্ত্রা ঘোরান হয় অমন পাপে

প্রথমে ধর্ষণ আর তার পরে খুন

মর্তের আকাশে সদা চিল ও শকুন।

আরো আছে নিগ্রহের নানা প্রকরণ।

আগুনে পোড়ানো, বিষ, অ্যাসিডে জ্বলন। ‘

 

জলে ভাসে লক্ষ্মী সরা , ব্ল্যাক অ্যান্ড ওয়াইট

ছবি দেখে শুধোন বিষ্ণু, ‘হোয়াট ইজ ইট?’

নারদ মুনি দীর্ঘশ্বাসে , অস্ফুটে কন

সদ্যোজাত শিশুকন্যা, হত্যা আয়োজন।

 

এ পর্যন্ত শুনে লক্ষ্মী কানে হাত দিয়া

কহেন , ‘ পাঁচালি গাই, নতুন করিয়া।

যে সংসারে লক্ষ্মীমন্ত পুরুষ না রবে

সেই ঘর ধনে জনে নির্বংশ হবে।

নারী নিগ্রহ ধোও, লয়ে ঝাঁটা ও বুরুষ

লক্ষ্মীর প্রদীপ জ্বালো যতেক পুরুষ।

শংখ বাজাইবে, স্বাদু রন্ধন করিবে

আপিস ফেরত গৃহিণীকে পত্নীসেবা দিবে

এই মত চলো ‘ – বাধা দেন নারায়ণ

‘থাক দেবী , এখন তব ঘরে প্রয়োজন’

 

কমলা শুধোন , এ কি পিতৃতান্ত্রিকতা?

জিভ কাটিলেন দেব, ‘সে ত মর্ত কথা’!

 

অকস্মাৎ মূর্তিমান নারদ প্রবেশ

একটি রসের কেচ্ছা ছাড়ি অবশেষ

যদ্যপি নারীর অসম্মানই রেওয়াজ

তথাপি নারীদিবস, জেনো, আটই মার্চ।

 

 

চমৎকার শ্লেষ সত্ত্বেও এ পাঁচালি মূলত প্যারডি । এখানে মেয়েদের জীবনের দুঃখ দুর্দশার বাইরে যাওয়া হয়নি, সেটা করেছেন আর এক লেখিকা। অনুরাধা কুন্ডা। এখন ওয়াটস্যাপে তুমুল হিট তাঁর এই পাঁচালি।

 

ক্যাফেতে বসিয়া যবে লক্ষী নারায়ণ
মৃদুস্বরে কফি যোগে করে আলাপন।
হরি কহে কেন নারী নহে ভক্তিমতী?
কেন বা পতিসেবাতে নাহি আর মতি?
লক্ষী হাসি উঠি কহে ,শুন নারায়ণ
অতীব বিরক্ত হইয়া পাল্টাইয়াছি মন।
বলো তুমি কেন নারী মার খেয়ে মরে?
কেন বা মনের দুঃখে আত্মহত্যা করে?
কেনই বা বিবাহতে পণ দিতে হয়?
উচিত জবাব তুমি দাও মহাশয়!
হরি কহে এসব হল জগতের নীতি
পতি হল রমণীর অগতির গতি!
জগতে হতেছে আজি যত অনাচার
নারীর অধোগতিতে করিব বিচার।
শুনিয়া লক্ষীদেবী আঁচল বাঁধিয়া
বলিলেন শুন হরি শুন মন দিয়া।
নারী আর না সহিবে কোনো অত্যাচার
কাঁদিবে না গৃহকোণে বহি দুঃখভার।
জনম লগনে শুনো কেহ কম নয়
কর্মের বিচারে হবে বাকি পরিচয়।
বিদ্যা শিক্ষা করি নারী অর্থ উপার্জিবে
পরজীবী হইয়া আর নারী না রহিবে।
প্রথমত গৃহশ্রমে দিতে হবে দাম
বিনা অর্থে নারী আর করিবে না কাম।
হরি বলে লক্ষী তুমি এ কি কথা বলো?
“লেবার অফ লাভ” তবে হইবে কি বিকল?
হাসি লক্ষী বলে শুনো ধূর্ত শিরোমণি!
“লেবার অফ লাভ”কে আমি খুরে খুরে নমি!
মিষ্টি মুখে ভুলাইয়া করাইবে কাজ
কাজ শেষে বলি দিবে গৃহে যাও আজ!
নারী তো জানে না কোনটি নিজ গৃহ তার
এইসব বাড়াবাড়ি চলিবে না আর!
করিবে চাকুরি নারী ,বানাইবে বাড়ি
দেখিয়া ছিঁড়িতে পারো নিজ চুল দাড়ি ।
কর্মে রহিয়াছে নারীর পূর্ণ অধিকার
বেতনেও কারচুপি চলিবে না আর।
কন্যাভ্রূণ হননেতে চাহি সুবিচার
জগতে নারীরও আছে অধিকার বাঁচার ।
অর্থ নিয়ন্ত্রণ হল সর্ব সেরা বল
সভা করিবার লাগি খুঁজিতেছি হল।
বিষন্নবদনে হরি বলিল হে  প্রিয়ে
“স্বামী”ডাক তব মুখে জুড়াইত হিয়ে।
আজ তুমি নাম ধরি কেন ডাক মোরে?
লক্ষী কহে সাতটি কান্ড রামায়ণ পড়ে
না হইল আক্কেল, না হইল  শিক্ষা
পদতলে বসি আর করিব না ভিক্ষা ।
নাম ধরি ডাকিবো  হে প্রিয়তম মোর
ফিনান্স আমার হাতে ,ছাড়িব না ডোর
তুমি আমি এক বৃন্তে দুইটি  গোলাপ
কেহ কারো প্রভু নহে,কোরো না বিলাপ।
বাড়ি গিয়া করি আনো এক কাপ চা
চন্চলা বলিয়া আমার ব্যথা হইল পা।
আমি যদি আটা মাখি তুমি সেঁকো রুটি
হিট হইবে আমাদের নব্যযুগ জুটি।
রাঁধিয়া রাঁধিয়া আমার লাগিতেছে বোর
এবার হেঁশেল তুমি দেখো প্রিয় মোর।
বাজার করিবো আমি,রাঁধিও খিচুড়ি
রন্ধনেতে প্রাণ দিয়া হইবো না বুড়ি।
মর্তলোকে নারী ফলো করিবে আমারে
লক্ষী পূজা এইরূপে প্রতি ঘরে ঘরে
ছড়াইবে কৃতী নারী ,স্বাবলম্বী নর
লক্ষী লক্ষী বলো সবে বিশ্বচরাচর।

 

শুনো শুনো নারীগণ, হইয়া সবলা

ঘুচাও মনের খেদ,নহ তো অবলা।

সচলা হইয়া করো আপিস গমন

সর্বাগ্রে কর্ম,রাখো নিজের মনন।

যদিবা সংকট আসে,ধীর ধরো মনে

জানিও অনেক বাঁধা পাইবে জীবনে।

যে শ্রম দিতেছেো গৃহে তাহা অতি দামী

মিটি মিটি হাসে দেখো ঐ অন্তর্যামী।

কাজেই নিজের স্বাস্থ্য না করিও হেলা

নচেৎ সময়মতো পেতে হবে ঠেলা।

সকালে উঠিয়া কোরো প্রাতঃভ্রমন

খাইয়ো মনের সুখে যা করিবে রন্ধন।

খাইয়ো না শেষ পাতে সকলের পরে

নিজের যত্নটুকু করিবার পরে

সকলের দেখাশোনা করিয়া যতনে

দেখিবে রতন শুধু চিনেছে রতনে।

নিজস্ব সঞ্চয়টুকু বড় দরকারি

অসময়ে কাজে দেবে,আসিবে না হরি।

গাছের খুঁড়িয়া গোড়া জল দিও তাতে

ঐ গাছই ছায়া দিবে বিজনবেলাতে।

দিনক্ষণ দেখিও না,দেখিও মানুষ

নতুবা যতই করো হইবে ফানুস।

জিন্স,শর্টস, লং স্কার্ট না করিও ঘৃণা

শাড়িও পরিও, জেনো ইয়েহি হ্যায় জিনা।

পোশাক অধিক কোরো মনের যতন

পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন।

অপরেরে বল দিও,নিজেরে শকতি

দেবতা অধিক করো কাজেরে ভকতি।

নিজের কাজের দাম করিও না কম

দেখিবে প্রবল জোরে বেড়ে যাবে দম।

লক্ষীমতী নারী ,যারা এই রূপ করে

প্রবলা হইয়া রাজে এই সংসারে ।

 

 

তৃতীয় পাঁচালির লেখক একটি তরুণ যুবা, মঞ্জিস রায়। এটি দিয়েই শেষ করি। রিয়েল লাইফ স্টোরি এই , যে, সে তার মা’কে পুজো করতে অনুরোধ করে, তার মা বলে, পাঁচালীর কথা তাঁর ভালোলাগে না। সে বলে, আমি যদি লিখি? মা বলে, লিখবি? আচ্ছা, লেখ তো আগে?

“আমার কল্পনায় লক্ষ্মী এবং নারায়ণের কথোপকথন। পাঁচালীর ফর্মে লেখা।-

মঞ্জিস রায়।

কত গ্রীষ্ম বর্ষা যায় মনেতে ভাবনা।
কেমনে রচনা করি লক্ষ্মীর বর্ণনা।।
দেখিতে দেখিতে আসে আশ্বিন বেলা।
নদীকূলে দোলা দেয় কাশফুল মেলা ।।
মর্তেতে হিংসার অগ্নিবরষণ।
তাহা হেরি কাঁদে দোহে লক্ষ্মীনারায়ণ।।
নারায়ণ কহে আজও কাটেনি আঁধার ।
অযোগ্য পুরুষ যতেক করে অহঙ্কার ।।
কমলা কহিলা কথা মৃদু মৃদু হেসে ।
আমারে পূজিছে নারী আজও ভালোবেসে ।।
নারীর গুণের কথা হয়নাত শেষ ।
তাদের আলোতে আজ আলোকিত দেশ ।।
শুন তবে নারায়ণ শুন দিয়া মন ।
আজই আমি সে নারীর করিব বর্ণন ।।
নারায়ণ কহে আজও কাটেনি আঁধার ।
অযোগ্য পুরুষ যতেক করে অহঙ্কার ।।
কমলা কহিলা কথা মৃদু মৃদু হেসে ।
আমারে পূজিছে নারী আজও ভালোবেসে ।।

নারীর গুণের কথা হয়নাত শেষ ।
তাদের আলোতে আজ আলোকিত দেশ ।।
শুন তবে নারায়ণ শুন দিয়া মন ।
আজই আমি সে নারীর করিব বর্ণন ।।
বাংলার উত্তরে তুমি যদি কভু যাও ।
সে নারীর দেখা তুমি নিশ্চয় পাও ।।
স্বর্ণপদক আনে স্বপ্নের মেয়ে ।
ছেলেবেলা কাটে তার আধপেটা খেয়ে ।।
নারীদের কাছে ধরা দিল মহাকাশ ।
পূর্ণ হয়েছে আজ নারীর আকাশ ।।
কত নারী গান গেয়ে মাতালো ভুবন ।
কত জনা লেখনীতে আনিল জীবন ।।
ম্লানমুখে শ্বাস ছাড়ি কহে নারায়ণ ।
বন্ধ রহিল আজও কত বাতায়ন ।।
দক্ষিণ ভারতে আছে এক দেবালয় ।
দেবতা সেখানে বড় সঙ্কীর্ণ হয় ।।
প্রবেশিতে নাহি পারে ঋতুমতী নারী ।
পূজা করিবার তারা নহে অধিকারী ।।
লক্ষ্মী বলে দেব তুমি ত্যজ দুঃখশোক।
বিচিত্র মানুষে ভরা এই মর্তলোক ।।
নদীকূলে ছিল এক শান্তিকুটির ।
থাকিত মানবী সেথা মতি তার স্থির ।।
পুতুল বানায়ে নিয়ে বেচিত সে হাটে ।
মনের সুখেতে সে যে সারাদিন খাটে ।।
কভুও সে ছলনার না লয় আশ্রয় ।
সকলের সনে সে যে মিষ্ট কথা কয় ।।
দেবালয় যাইবার কিবা প্রয়োজন ।
থাকে যদি এইরূপ বড় তার মন ।।
তবুও কহিব আমি শুন নারায়ণ ।
দেবালয় নহে কারও আপনার ধন ।।
নারীর প্রবেশপথ রুধিবে যাহারা।
কদাপি শান্তি যেন না পাবে তাহারা ।।
দেবতার  বেশে কত শত নরগণ ।
শিকলে যে বাঁধে তারে যখন তখন ।।
কভু আমি চাহি নাই নারীর বন্ধন ।
পুরুষেরা ভালোবাসে তাহার ক্রন্দন ।।
নারায়ণ কহিলা আর বিলম্ব নয় ।
মর্তবাসীরা তব পথ চেয়ে রয় ।।
হেনকালে লক্ষ্মী চলে মর্তের পানে ।
মঞ্জিস আবাহন করে গানে গানে ।।”

মৃত্যুচেতনার সঙ্গে আমার অদ্ভুত সম্পর্কগুলি

 

 

 

মৃত্যুচেতনার সঙ্গে আমার অদ্ভুত সম্পর্কগুলি

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ ছবিটির কথা মনে আছে? গোটা ছবিতে কোথাও রবীন্দ্র প্রসঙ্গ ছিল কি? মৃত্যুবিষাদ, কর্মহীনতা, কষ্ট, পঙ্গুত্ব, প্রেম, অসহায়তা , কত কীই না ছিল সেই জ্ঞানেশ-মাধবী অভিনীত ছবিটিতে, যে বয়সে দেখেছিলাম এক অদ্ভুত বিধুরতা আর বিস্ময় নিয়ে হল থেকে বেরিয়েছিলাম। আরে! এর সঙ্গে বাইশে শ্রাবণের সম্পর্ক কী? আর এই না বোঝা থেকে অনেকটা খুঁড়ে খুঁড়ে এগিয়ে যাওয়া… অনেক দূর।

আমার এ লেখাতেও মৃত্যুচেতনার কথাই বলব। বা, বলা ভাল, মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অপরাধবোধের কথা।

১।

 

অত          চুপি চুপি কেন কথা কও

ওগো   মরণ, হে মোর মরণ।

অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও,

ওগো   একি প্রণয়েরি ধরন। ( রবীন্দ্রনাথ)

 

 

আমার বাবা। দিলীপকুমার রায়চৌধুরী।

১৯৬৫ সালে আমার জন্ম আর ১৯৬৬ তে চলে গেলেন ধরাধাম ছেড়ে, দুদিনের এনসেফেলাইটিসে, ৩৭ বছর বয়সে।  কাজেই অপরাধবোধ আমার নয়, ওনারই হওয়া উচিত। বাবার দায়িত্ব তিনি পালন করেন নি। সেটা করেছেন আমার বিধবা মা। হ্যাঁ তখন বিধবা শব্দটা তার সামূহিক অভিঘাত নিয়েই আমাদের উপরে ঝাঁপাত। নিঃসন্দেহে মহিলাদের জীবনে ‘বিধবা’ নামক তকমাটি একটা শ্বেত-সন্ত্রাসের মত এসে আছড়ে পড়ত। আমার মা বিয়েবাড়িতে গেলে একঘন্টা লাগত তাঁর নিরিমিষ খাওয়ার অঞ্চল খুঁজে পেতে, বিশাল হলঘরের একেবারে কোণায় বা খাওয়ার হলের বাইরে বারান্দার ধারে সেই ল্যাকপেকে কাঠের বেঞ্চি টেবিলে সাদা হ্যান্ডমেড পেপারের তা-থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে পাতা … তার একটি অতি করুণ সংস্করণ। কোমরে তোয়ালে বাঁধা পরিবেশকরা সেখানে অমিল। এবং নেহাতই দায়সারা ভাবে রাঁধা কিছু কপি বা ছানার ডালনা ধোঁকা ইত্যাদি পরিবেশিত হত সেই “লাইনে”। আমাকে ও দিদিকে বসতে অবশ্যই বলা হত আমিষের লাইনে, আর আমি নিজে মাছের কাঁটা বেছে খেতে তখনো  পারিনা বলে মা নেওটা হয়ে নিরিমিষের লাইনে বসতে চাইতাম… তাতে সমস্ত আত্মীয় স্বজনের মুখের অদ্ভুত বিস্ময়বিরক্তিকুটিল অভিব্যক্তি আমার এখনো মনে আছে। তারা ভাবত, বাড়িতে অস্বচ্ছলতার কারণে, মা আমাদেরও নিরিমিষ খাইয়ে রাখেন, তাই আমি মাছ খেতে শিখিনি। তারা ভাবত, বিলো ডিগনিটি অথবা হ্যাতচ্ছেদ্দার জিনিশ নিরিমিষ খেতে চাওয়া বা ভালবাসা।

এমন কত কত টানাপোড়েন একেবারে ছোট্টবেলা থেকেই দেখে ফেললাম। অস্থির , অদ্ভুত এক ষাট –সত্তর দশক জুড়ে। আমার মা সত্যিই কোনদিন সাদা শাড়ি ছাড়া পরেন নি। তবে বাড়িতে মাছ মাংস খেতেন, গোপনে।

তো আমার অনুপস্থিত বাবা এইভাবেই আমাদের জীবনে এক বিশাল ঘটনা হিসেবে রয়ে গেছেন। ওই দুই দশকেই, আবার, অর্থাৎ, আমার শৈশব থেকেই আমি আমার বাবাকে কল্পনার কাঠামোয় মাটি দিয়ে দিয়ে তৈরি করে চলেছিলাম। মায়ের মুখে শোনা গল্পে প্রথম কয়েক বছর। সে গল্প একটু আধটু নয়, সর্বগ্রাসী ও প্রাণবন্ত। মা সততই বলেছিলেন, বাবার হাস্যোজ্জ্বল সাদা কালো ছবি দেখিয়ে, ওই যে তোমার বাবা, তোমাকে দেখছেন। এবং সেই বাবার অসংখ্য গল্পে গল্পে রঙিন করে তুলেছিলেন আমার ও আমার দিদির শৈশব। ইনফ্যাক্ট, আমার কল্পনার চোখে গল্প শুনে শুনে গোটা পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের প্রথমার্ধই একটা রঙিন ও রোমান্টিক জগত।

টিনেজে পৌঁছে আমি আমার বাবাকে নিজের বোধ বুদ্ধি দিয়ে কিছুটা বানিয়ে তুলে শরীর দান করার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিই। বাড়ির প্রতিটি লফটে রাখা তাঁর অসংখ্য বই থেকে। বাংলা কবিতার বইয়ের প্রাথমিক উত্তরাধিকার বাবার সংগ্রহ থেকে পাওয়া। আর কিছুটা দূরের ছিল প্রচুর  ইংরিজি বই । সে বইগুলি থেকে আমি চেষ্টা করি বাবাকে নির্মাণ করতে।

এই বাবাহীনতা, বা বাবা –শূন্যতা থেকে জাঁ পল সার্ত্রে পেয়েছিলেন এক চূড়ান্ত স্বাধীন মনন, তাঁর আত্মজীবনী ওয়ার্ডস এ তিনি লিখেছিলেন। আর, সার্ত্রেই বলেছিলেন, কিছু থাকার মত না থাকাও একটি বিষয়। অধিগ্রহণের, মননের, দেখার বিষয় “নেই”। ( বিইং অ্যান্ড নাথিংনেস) কাফেতে পল আসবে বলেছিল কিন্তু আসেনি। পলের না থাকাও একটা ঘটনা। সেরকমই আমার বাবা না থাকার শূন্যতা, একটি ঘটনা, আমাকে তা নানাভাবে আবৃত করেছে, বানিয়েছে, দিয়েছে, পুরস্কৃত করেছে।

চমকাবেন না। পুরস্কৃত করেছে। শূন্যতা দিয়ে, অভাব বোধ দিয়ে, মন খারাপের অধিকার দিয়ে। অনেক অনেক অনেক বড় একটা আকাশ দিয়ে।

পিতৃহীনতা তাই আমার কাছে এক সম্পদ।

অপরাধবোধের গল্পটা বলি, আমার বাবাকে ওই ছোট্ট বয়সেও আমি কীভাবে নিজের ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিং অথবা ম্যানিপুলেশনের বিষয় করে তুলেছিলাম। মা খুব কড়া মহিলা, এবং খাবার শেষ দানা অব্দি শেষ করা থেকে শুরু করে, তেরোর ঘরের নামতা নিখুঁত বলতে পারা বা কোন শব্দে মূর্ধন্য ণ হবে বা কোন শব্দে  স-শ- ষ কীভাবে আসবে এসব সঠিক বলতে পারার বিষয়ে ছিলেন ক্ষমাহীন , পারফেকশনিস্ট, অসম্ভবরকমের খুঁতখুঁতে।

তো এই মা তাড়না করলে, বকলে, মারলে, যা প্রায়শই জুটত আমার কপালে, আমার অস্ত্র ছিল একটাই… একটাই ছিল আমার ঢাল… কাঁদতে কাঁদতে বলা, “আমি বাবার কাছে চলে যাব।“

এখনো আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, সোফার উপরে কুশনে মুখ গুঁজে আমি ফুলে ফুলে কাঁদছি আর বলছি আমি বাবার কাছে চলে যাব। আর মা বিন্দুমাত্র ব্যতিব্যস্ত না হয়ে , আমার সমস্ত চেষ্টাকে উপেক্ষা করে পাশের ঘরে চলে গেলেন।

ওটা ছিল আমার নাটক , বাবাকে ব্যবহার করার চেষ্টা। সে চেষ্টায় সফল না হলেও, নিজের এই ৬-৭ বছর বয়সের চেষ্টাটুকু এখনো আমাকে লজ্জা দেয়।

২।

জীবন যখন শুকায়ে যায়

করুণাধারায় এসো।

সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,

গীতসুধারসে এসো।

কর্ম যখন প্রবল-আকার

গরজি উঠিয়া ঢাকে চারি ধার,

হৃদয়প্রান্তে হে জীবননাথ,

শান্তচরণে এসো। ( রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

 

 

আমার দিদা। দিদাকে , আমি তাঁর ৯৭ বয়স অব্দি পেয়েছি। অকাল প্রয়াত তো ননই, তিনি আমার জীবন জগতের অনেকটা জুড়ে বিশাল এক ভূমিকায় ছিলেন। জীবন গড়েদেওয়া ভূমিকায়।

শোভা ঘোষ। বাংলা সিনেমার সন্ধ্যারাণী অথবা সন্ধ্যা রায়ের মডেলে নন, বরং চন্দ্রাবতী দেবী বা ভারতী দেবীর মডেলে, দাপুটে সুন্দরী আর তেমনি ব্যক্তিত্ব।  ঢাকার মেয়ে । বাবা ছিলেন প্রবল পরাক্রান্ত ডাক্তার বাবু, নবাব  বাড়িতে ডাক্তারি করতেন। শোভা ছোটবেলায় মেম ইস্কুল ইডেন স্কুলে পড়েছিলেন , অর্গ্যান বাজাতে , ইংরিজি বলতে লিখতে শিখেছিলেন। জন্ম ১৯০৩ সালে।  শোভা ঘোষ ষোল বছর বয়সে বিবাহিত, একুশ বছর বয়সে প্রথম মা। বিয়ে হয়েছিল বরিশালের দাপুটে শিক্ষত অশ্বিনীকুমার দত্তের মন্ত্রশিষ্য দেবপ্রসাদ ঘোষের সঙ্গে, সেই দেবপ্রসাদ যিনি জীবনে কখনো “দ্বিতীয় হননি”। সুগম্ভীর, অতি পন্ডিত, চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বলে খ্যাত দেবপ্রসাদ গুণে গুণে দশ বছরের বড় শোভারানীর থেকে।

 

কিন্তু অধ্যাপক। উপরন্তু সিটি কলেজে বা  রংপুর কারমাইকেল কলেজে কর্মরত অবস্থায় যদি বা, স্বাধীনতা পূর্ব সমাজে, বরিশাল-ঢাকা-কলকাতার ত্রিকোণবিন্দুর ভেতরে স্বচ্ছ ও স্বচ্ছল ছিল ঘোরা ফেরা, দেশ ভাগের পর কলকাতায় পাকাপাকিভাবে এসে চূড়ান্ত অনিশ্চিতি, ব্যথা বেদনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল বহু আশ্রিত, একান্নবর্তী পরিবার চালানোর অর্থকষ্ট, নানারকম বিপদ, বেদনা, বিচ্ছেদকষ্ট। সব মিলিয়ে এই একটা জীবনের মধ্যে দিয়ে আমি পড়ে নিতেও পারি, চাইলে গোটা বাংলার মায়ের দরদ।

 

আমার যখন জন্ম ততদিনে দিদা তেষট্টি বছরের প্রৌঢ়া। সেই মাতৃত্বময় মূর্তি আমাকে চিরটাকাল আশ্রয়ের বোধ শিখিয়েছে। ভালবাসা, স্নেহ , আদর, যত্ন, সম্মান, আত্মসম্মান, প্রকৃত মনুষ্যত্ব, সব শিখিয়েছে।

আমার দিদাকে যতটা ভালবেসেছি, আর যতটা স্নেহ পেয়েছি, যার কিছুই ফেরত দিতে পারিনি, কেননা স্নেহ নিম্নগামী…, তা এক একটা জীবন তৈরি করে দিতে পারে। সেই দুর্গামূর্তি, আমাকে শক্তি শব্দটির মানে শিখিয়েছে। বুদ্ধি মেধা আর প্রবল স্থিতধী নারীত্বের ছবি দেখিয়েছে। আজকের দিনে যখন ঘ্যানঘ্যানে প্যানপ্যানে, ক্রন্দনপরায়ণা, অত্যাচারিতা, অপমানিতা নারী , নয়ত প্রেমক্ষুধার্ত, ছয়েল ছবিলা, যৌনতায় চোবানো, দাঁত নখ বের করা রূপসী নারী এই দুটি মাত্র ছদ্ম মডেলের পেছনে বার বার মেয়েদের ঠেলে দিতে চাইছে মিডিয়া, মেনস্ট্রিম বিনোদন, তখন বুঝি, আসলে আশি শতাংশ নারীর লড়াকু, ব্যক্তিত্বময়, অত্যন্ত দক্ষ সাংসারিক উপস্থিতির জোরালো মডেলটি কেন পছন্দ নয় পুরুষতন্ত্রের। অথচ আমাদের প্রতিটি পরিবারে এইরকম মেয়েরা ছিলেন , আছেন , থাকবেন। কাছিয়ে গুছিয়ে সংসার করবেন, আবার চূড়ান্ত অস্থিতির সময়ে সংসারের নৌকোর হাল ধরবেন, স্বামীকে মানবেন, শ্রদ্ধা করবেন, আবার সংসারে পুরুষের করা ছোটখাট অপমান, ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতা দেখে মুখ টিপে হেসে ন্যাতা দিয়ে ময়লা মুছে নেবার মত অবলীলায় অস্বীকার করে এক অন্য, সাবভার্সিভ বয়ান তৈরি করবেন।

দিদাকে যখন থেকে দেখেছি, সুরের প্রেক্ষাপটে। প্রথম অর্গ্যান বাজাতে দেখেছি, পরে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেও দেখেছি।

সেইসব গান কবে মনের ভেতরমহলে ঢুকে গেছে।

কিন্তু যে ঘরে দিদার বিয়ে, সে ঘরে অভাব অনটন ছিল। দাদুর বাবা, ক্ষেত্রনাথ ঘোষ বরিশালের গাভার ———-। রীতিমত সাদাসিধে, সচেতনেই খানিক সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং-এর চর্চা আর চররযা। কলকাতা সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াতে আসা  তরুণ গণিত অধ্যাপক দাদুর দায়দায়িত্ব ছিল বিস্তর। তা ছাড়া সামাজিক-বৌদ্ধিক পরিমন্ডলে দেশের কাজে আত্মনিয়োগের ভাবনাটাও বড় হয়ে থাকায়, বিলাস ব্যসনের কথা ভাবতেই পারতেন না অশ্বিনীকুমার দত্তের সাক্ষাত ছাত্রটি, ব্রজমোহন স্কুল ও কলেজের হিরের টুকরো স্কলারটি। দিদা যে গানবাজনার পেছনে লেগে থাকবেন, বা সৌখিনতা করবেন গান নিয়ে, এমন কোন সম্ভাবনাই নেই ।  বাড়িতে দাদুই বড় ভাই। সব ভাই বোন বরিশাল থেকে এসে এসে কলকাতায় দাদার বাড়িতে যখন খুশি থাকবেন এটাই দস্তুর। শুধু নিজের ভাই নয়, গ্রামের যে কোন পরিবারের জ্ঞাতিগুষ্টির যে কোন যুবক, কলকাতায় পড়তে এলে দেবপ্রসাদের বাসায় উঠবেন এটাই তো স্বতঃসিদ্ধ। আমার মায়েদের মুখ অমুকদা তমুকদা, অমুক কাকা তমুক মামার অসংখ্য গল্প শুনেছি। একটি সমাজ, একটি গ্রাম, একটি পরিবার… এগুলোর সীমারেখা তখন এতটা সচ্ছিদ্র, এতটাই মেদুর ছায়াচ্ছন্ন ও কোমল যে কোথায় পরিবার শেষ হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা নেই, সুতরাং প্রত্যেকেই সেই বৃহৎ পরিবারের অংশ। যেভাবে যে সন্তানেরা আসছে তাদেরও আলাদা করে ছাড়পত্র লাগত না, ঠাঁই হয়ে যেত এই বিপুল মাতৃক্রোড়ে। এভাবেই সন্তান ও সন্তানপ্রতিম পুষ্যির সংখ্যা বাড়ছে। তারপর বয়স্ক বাবা মাও চলে আসবেন বরিশাল ছেড়ে কলকাতায়, সে দায়িত্বও দাদুর, অতএব দিদার। এ ছাড়া সংসারে নানা অঘটন দুর্ঘটন, নানা উত্থানপতন চলতেই থাকবে, কেউ রুগ্ন, কেউ বিদ্রোহী, কারুর জন্য ডাক্তার ডাকতে হলে কারুর জন্য পুলিশ সামলাতে হবে। এরকম একটা ঘটনাবহুল দায়িত্ববলয়ে থেকে, উদয়াস্ত বিরাট সংসারের খাওয়া-শোওয়া-সুস্থতা-স্বস্থতার দিকে নজর রেখে, আট সবল সুস্থ আত্মজ সন্তানের এবং অগণ্য পাতানো সন্তানের মা, আমার দিদু, নিজের ভালবাসার জিনিশগুলিকে কীভাবে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখবেন, ঝড়ের হাওয়ার সামনে প্রদীপের শিখার মত?

দিদা সংস্কৃত সাহিত্য পড়েছিলেন, বিয়ের পর দাদুরই মদতে , বেথুন কলেজে।  সেই সে সময়ে, ১৯২০-র দশকে। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয় । ঘোড়ার গাড়িতে চেপে যেতেন কলেজ। সে সময়ে যা যা পড়েছিলেন, পরবর্তী জীবনে , আটটি সন্তানকে জন্ম দেওয়া ,বড় করে তোলার মধ্যে মধ্যে সে চর্চা ভোলেন তো নিই, উপরন্তু, সপ্রেমে বহাল রেখেছিলেন। ডায়েরির পর ডায়েরিতে মুক্তোর মত অক্ষরে লিখে লিখে রাখতেন সে সব স্তব স্তোত্র মন্ত্র, শ্লোক, সাহিত্যের পুঁজি। আমার কাছে এখনো সযত্নে রাখা ডায়েরিগুলো।

দিদা মুখস্ত রেখেছিলেন অধিকাংশ সংস্কৃত শ্লোক। বলতেন, সারা জীবনে এত ঝড় ঝাপটা, বই হারাবে খাতা হারাবে… যখন নিঃসঙ্গ সময় আসবে , একাকী, নিঃসম্বল, তখন হাতের কাছে কিচ্ছু না থাকলেও, স্মৃতি থেকে এই সব বলবি, উচ্চারণ করবি, আবৃত্তি করবি। মুখস্তের মত জিনিস আর কিছু আছে?

এই সমস্তর ভেতর দিয়ে এক জামাইয়ের মৃত্যু, এক পুত্রবধূর মৃত্যু, কয়েকটি নাতি নাতনির দুর্ভাগ্য, সন্তানদের প্রবাসজীবন, শেষবয়সের একাকিত্ব সব গ্রহণ করেছেন। জীবন রস এতটুকু মরেনি। শেষ বয়সে স্মৃতি কথা লিখেছেন, যেন ভুলে না যাই।  বরিশাল সেবা সমিতি থেকে প্রকাশিত হয় সে বই, অত্যন্ত সাদরে গৃহীত হয়েছিল মানবী বিদ্যা চর্চার অঙ্গনে।

দিদা চলে যান একশোর কাছাকাছি বয়সে। ২০০১ সালে। ৯৮ বছর বয়স। আমাদের কাছে একটা লাইটহাউজ, একটা ধ্রুবনক্ষত্রের মত তিনি। দাদুর মত পন্ডিত মানুষকে দূর থেকে দেখেছি, ভয় পেয়েছি, শেষ বয়সে ডিমেনশিয়া হয়ে গিয়েছিল দাদুর, তখন শুধু শিশুর মত , এলোমেলো, অসুস্থ দাদুর দিকে সম্ভ্রমে অথবা করুণায় দেখেছি। কিন্তু দিদা তো আমার কাছের জিনিস, আমার নারী অস্তিত্বের ভেতরকার জিনিশ। দিদা আমার সত্ত্বার অংশ। পিঠে সুরসুরি দেওয়া দিদা। গল্প বলা দিদা। হঠাত রেগে অগ্নিমূর্তি , রণচন্ডী দিদা। ইংরিজি ফরাসি পড়া সফিস্টিকেটেড আমার দিদা। সাদা খোলের লাল পাড় শাড়িতে, আর গোল মুখে সোনালি ফ্রেমের চশমার দিদা। সকাল বিকেল অসাধারণ খাদ্যসম্ভার জোগানো দিদা, প্রচুর পিঠে পায়েস পোলাও কালিয়ার অনুষংগে আমার দিদা। সবকিছুর ওপরে, এক স্থির শান্ত গঙ্গার মত, সারা জীবনের সব উত্থানপতনে অবিচলিত, একান্নবর্তী পরিবারের মাথায় ছাতার মত দিদা। ৯৬-৯৭ অব্দি মানসিকভাবে জাগ্রত তৎপর অত্যন্ত সজাগ থেকে যাওয়া, এক অসামান্য রমণী।

একটাই ক্ষোভ, দিদু যখন সংস্কৃত পড়াতে চাইতেন, আমি অনেক সময়েই মন দিয়ে পড়িনি। পালিয়ে গেছি, স্কুলের বন্ধু বা কলেজের আড্ডার লোভে, বসিনি। দিদু দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন আমাকে, তাঁর শিক্ষার উপহার। কয়েকটি খাতা ছাড়া আর কিছু নেই আমার কাছে।

৩।

তোমার অলৌকিক কন্টেন্ট মুছে যাচ্ছে। আজ

জীবন, প্রাত্যহিক, সাদামাটা হয়ে আসে। আর

সমুদ্র গর্জন করে ছুটে আসছে, ঢেউ , ফেনা, ঢেউ

খড়ের প্রতিমা গেছে, চালাঘর একা, বালুতটে। – মাতৃভূমি সিরিজ , যশোধরা রায়চৌধুরী

 

আমার মা। অরুন্ধতী রায়চৌধুরী

চিত্রশিল্পী ছিলেন। সঙ্গীতশিল্পীও। পরের দিকে মা নিজেকে নিবেদন করেছিলেন পরলোক চর্চা এবং বেদ উপনিষদ চর্চায়। রামকৃষ্ণ সারদা, শ্রী অরবিন্দ শ্রীমা এঁদের বিষয়েও গভীর অভিনিবেশে চর্চা করেছেন।

মা ছিলেন অসংখ্য গুণের মানুষ।  জীবন তাকে যে আঘাত দিয়েছে, তা অস্বীকার করে প্রত্যাঘাত করতে চেয়েছিলেন তাই।  সে কারণেই মা তো ব্যক্তিত্বে বিশাল করে গড়েছেন নিজেকে, প্রচন্ড দাপুটে, মেজাজি, বেজায় ভীতিকর অনেকের কাছে। সেই মা, যিনি পক্ষবিস্তার করে আমার আর দিদির সবটা জগত ঘিরে রেখেছিলেন। নিশ্ছিদ্র বলয়ে ঢেকেছিলেন আমাদের শৈশব কৈশোর। কন্যাসন্তানদের আড়াল দিতে চেয়েছিলেন প্রায় যোদ্ধার মত। নিজেও জীবনযুদ্ধে হারেননি। শুধু ক্লান্ত হয়ে পড়লেন, ডায়াবেটিসের  ডায়েট মানলেন না, কিডনি খারাপ করে ফেললেন। ক্রমে, দুদিকে আগুন দেওয়া মোমবাতির মত, ক্ষয়ে গেলেন।

মা অপেক্ষাকৃত অকালে গেছেন, ৭৩ বছর বয়সে মায়ের মৃত্যু এল।

সে মৃত্যুর অপরাধবোধ থেকে আজো আমি মুক্তি পাইনি। পায়না কেউ, ছেলে মেয়েরা, যারা বাবা মাকে নিজেরা হাসপাতালে ভর্তি করে, ডাক্তারদের দুয়োরে দুয়োরে মাথা কোটে, আর শেষ অব্দি হেরে যায়।  নিজেরাই তার শেষ কৃত্য করে…আগুনের ভেতর সঁপে দেয় বাবা অথবা মাকে।

আমার মায়ের বইয়ের ফাঁকে রাখা চশমা, টেবিলের ওপর জমিয়ে রাখা আমার কবিতা যে কটিতে প্রকাশিত সেই সবকটি দেশ পত্রিকা, একটা বিশাল স্তূপে, দশ বছরের!

এ এক আগ্নেয় স্তূপ যেন! আমার মায়ের টেবিল একটা আগ্নেয় স্তূপ, মায়ের আলমারিও। সে আলমারিতে হাত দিতে গিয়ে দেখেছি অসংখ্য উইপোকার স্তূপের তলায় মায়ের রাশি রাশি শাড়ি। মা কতদিন সে সব শাড়িতে হাত দেননি। ছুঁয়ে দেখেন নি, কে জানে! ব্যাঙ্কের কাগজগুলো প্লাস্টিকে মুড়িয়ে রেখেছিলেন তাই নষ্ট হয়নি। আর সব কিছু গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে।

সেভাবেই, মায়ের নোটবই পেয়েছি , তাতে দীর্ঘ দীর্ঘ তালিকা করে রেখেছিলেন, জীবনের শেষ পাঁচ বছর, নিজের প্রিয় ও পরিচিত জন কে কে পরলোকগত, তার। বুক ভেঙে যাওয়া সেই তালিকা দেখে মনে হয়েছিল একটু একটু করে মা শরীরের অসুখগুলোকে বাড়িয়ে তুলছিলেন, শুধু ইচ্ছামৃত্যু নেবেন বলে।

মৃত্যু মায়ের এত প্রিয় হয়ে উঠেছিল? আমি বিয়ে করে মাকে ছেড়ে আসা ইশতক ( আমার দিদি আগেই বিদেশে গিয়েছে, সে আমার থেকেও অনেক টা বড় , তাই… সেটা তো স্বাভাবিক, কিন্তু আমি কী করে পারলাম, আমি কেন মাকে ছেড়ে গেলাম? ) মা শুধু মৃত্যুর দিন গুণছিলেন, শুধু মৃত্যুমুখী হয়ে বেঁচেছিলেন, তাহলে? মৃতদের তালিকা বানিয়ে, বেদ উপনিষদের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে, সবরকমের ভোগ, আনন্দ, সুখ, ছোট বড় উপভোগ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে।

৪।

সমুখে শান্তি পারাবার। ভাসাও তরণী হে কর্ণধার।

তুমি হবে চিরসাথি, লও লও হে ক্রোড় পাতি–. অসীমের পথে জ্বলিবে জ্যোতি ধ্রুবতারকার ।

  • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

আমার ছোট্টবেলার দিদিমণি, অণিমা মাসি, অণিমা দেবরায়।

আমার মায়েরই আর্ট কলেজের বন্ধু অণিমা মাসি। আমার প্রথম ইশকুল মাল্টিপারপাসের জুনিয়র বেসিকের আর্ট টিচার তিনি। অণিমা মাসি ছিলেন বলেই আমরা ওই ইশকুলে ভর্তি হতে পেরেছিলাম পরে জেনেছি। মায়ের পক্ষে তখন মেয়েদের নিজের উদ্যোগে ভাল ইশকুলে ভর্তি করা কঠিন। মা কী ভাবে এগোবেন , জানা নেই। শখ সৌখিনতা কিছুই নেই।

সরকারি ইশকুলে আমি ও আমার দিদি পড়লাম। আর ক্লাস ওয়ানের  ক্লাস টিচার অণিমাদি, তথা আমার অণিমামাসি, আমাদের মাতিয়ে রাখলেন ছড়া কবিতা পড়িয়ে, রবি ঠাকুরের “ওরে গৃহবাসী” “এদিন আজি কোন ঘরে গো খুলে দিল দ্বার” শিখিয়ে, আর লাল নীল মার্বেল পেপার কাটাকুটি করে গঁদের আঠা দিয়ে খাতায় চিপকোতে শিখিয়ে । জীবনে প্রথম কলম পেনসিল তুলি আর সবচেয়ে বড় কথা, কাঁচি ধরতে শিখিয়েছিলেন অণিমা মাসিই।

গত জুনে, ২০১৬ তে,  অশীতিপর হয়ে অণিমামাসি চলে গেলেন ঠিক এক মাসের অসুস্থতায়।

ওঁর মৃত্যুর দিন পনেরো আগে আমাকে ফোন করেছিলেন। নাম্বার জমানো থাকত। প্রায় দিন পনেরো পর পরই ফোন করতেন অণিমামাসি। আমার খবর নিতেন, আমার স্বামী সন্তানের খবর, কাজের খবর নিতেন।  আর হা হুতাশ করতেন , অরুন্ধতী নেই , এটা ভাবতেই পারিনা। অরুন্ধতী কে তোর মধ্যে পাই।

অণিমা মাসির ফোন। অফিসে, কাজে, মিটিং এ আছি, তখন ফোন। দেখে অনেক সময় ধরতাম না।  মিসড কলে চলে যেত। মনে হত, কী আর বলব, সেই একই তো কথা।

আজ কানে বাজে সেই কন্ঠ। কীরে , কেমন আছিস? আমার শরীরটা বেশ খারাপ , বুঝলি তো।

গভীর অপরাধবোধ । আমি তো বুঝিনি এই শরীর খারাপটা অন্য সব শরীর খারাপের থেকে আলাদা । ক্রমশ মৃত্যুর দিকে চলে যাচ্ছিলেন অণিমা মাসি।

৫।

তুমি নেই—তখনো প্রকৃতি
সবুজ পেশমে কাজ করে…
জেগে ওঠে বনের শিখরে
লতা, পাতা, দোয়েলের গান–

তুমি যাকে মনে কর কৃতি,
বাড়ি-ঘর দু-কাঠা বাগান…
সব ঝরে, ছায়ার ভিতরে
ভেঙে পড়ে পুজোর দালান।

ক্রমশ হারিয়ে যায় স্মৃতি:
সাপের খোলস কিছু নড়ে,
ঢেকে যায় ধুলো বালি খড়ে
ভাঙা সিঁড়ি, উঠোনের শান।
থাকে জল বাতাস প্রভৃতি
কোন এক গভীর শিকড়ে:
তুমি নেই–তখনো প্রকৃতি
কুরুশ-কাঠিতে রাখে টান–

( শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়, কুরুশ কাঠি)

 

আমার বান্ধবী, কলিগ অনিন্দিতা রায়। আমার চেয়ে এক দুবছরের বড়। টি বোর্ডে ওর সঙ্গে কাজ করেছি। কবে যেন কলিগের প্রতিযোগিতামূলক ব্যবহার, সামান্য ঈর্ষ্যাকাতরতা, সব ছাপিয়ে বন্ধু হয়ে গেছিল। আমার ঘরে এসে অনেকক্ষণ নিজের কথা বলত। ওর জীবন খুলে দিয়েছিল আমাকে, বইয়ের মত, পড়ার জন্য।

ওর মেয়ে আমার মেয়ের থেকে সামান্যই বড়। ওর নিজের প্যাশন কত্থক নাচ। ওর কাজের ক্ষেত্রে প্রচন্ড খুঁতখুঁতে ভাব। অসম্ভব কেরিয়ারিস্ট এক মহিলার চাবুক উপস্থিতি।

সফল প্রফেশনাল, ম্যানেজমেন্ট এ ডিগ্রি করা অনিন্দিতা হাসতে হাসতে অপারেশনে গেল। নানা ছোট বড় সমস্যা নিয়ে পরিকল্পনা করেই হাস্পাতালে গেল। নিজের মা ডাক্তার। অ্যানেস্থেটিস্ট। তিনিও থাকবেন ওটিতে।

আমাকে এস এম এস করল, গোইং ইন অন অমুক ডেট। যেন বেড়াতে যাচ্ছে, যেন কেবল একটা ফান ট্রিপ করতে যাচ্ছে।

দু তিনদিন পর অনিন্দিতার মেল বক্স থেকে মেল এল। “আমি অনিন্দিতার বন্ধু, অমুক। দুঃখিত। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে গতকাল , সার্থক এবং সফল অস্ত্রোপচারের পরেও, ও রিকাভার করতে পারেনি। শি পাসড অ্যাওয়ে”

আমি পড়ে স্তম্ভিত। বসে আছি। আমি ভাবছি এ সেই নাইজিরিয়ায় হারিয়ে গেছি আমাকে ২০০০ ডলার পাঠাও গোছের কোন হোক্স মেল। অনিন্দিতার ইমেল হ্যাক করে কে বা কারা পাঠিয়েছে।

ভাবছি এ এক অদ্ভুত প্র্যাক্টিকাল জোক। কে করল এটা।

ওর ফোন থেকে একটা ফোন এল। বুকের মধ্যে ধড়ফড় করে উঠল। ওর স্বামী ফোনটা করেছেন। যশোধরা, একে একে অনিন্দিতার কল লিস্ট থেকে ওর পরিচিত আর বন্ধুদের ফোন নম্বর বার করে করে সবাইকে জানাচ্ছি। ও আর নেই।

ফোন রেখে সেই যে কাঁদতে শুরু করলাম , অফিসে বসেই। তখন আমি গৌহাটিতে পোস্টেড। কলকাতা আসার কোন কথা নেই শিজ্ঞির।  অফিসে কে ঢুকল কে বেরোল, কে দেখল  না দেখল না ভেবেই, আমি শুধু কাঁদছি। ঝর ঝর করে চোখের জল পড়ে যাচ্ছে আমার বুক ভিজিয়ে।

অনিন্দিতার মৃত্যুতে আমার মনে হয়েছিল আমরা পর পর সরু একটা রাস্তা ধরে যাচ্ছি, একদিকে খাড়া পাহাড়, অন্যদিকে খাদ। সামনে একজন টুপ করে খাদে পড়ে গেল।

তার সমস্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, আনন্দ, অহংকার, গর্ব, এমনকি ঈর্ষ্যা, খুঁতখুঁতানি, বকাঝকা সহ।

আমিও পড়ে যেতে পারি যে কোন দিন।

সমস্ত জীবন জুড়ে আমরা মৃত্যুর মালা গাঁথি।

 

পরিশেষঃ

পৃথিবীর মানুষকে মানুষের মত

ভালবাসা দিতে গিয়ে তবু

দেখেছি আমারি হাতে হয়ত নিহত

ভাই বোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে… ( জীবনানন্দ দাশ, সুচেতনা)

 

মনে পড়ে যায় সেই সিদ্ধার্থদাকে, আমাদের দূর সম্পর্কের দাদা। কবিতা পড়ত, পড়াত। পরে যে আত্মহত্যা করেছিল। হয়ত আমরাও তার মৃত্যুর জন্য দায়ী। কেননা সে আমার দিদির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল বলে, আমার মা আর তাকে বাড়িতে আসতে দিতে চাননি।

 

মনে পড়ে সেই দূর সম্পর্কের মামাতো দিদির কথা, যে ১২০০ টাকা দিয়ে ২০০০ সালে এক জ্যোতিষীর কাছে গিয়ে শুনে এসেছিল, তার জীবনে শীঘ্র এক পরিবর্তন আসতে চলেছে। সে আমাকে এসে বলেছিল, বোধ হয় তোর জামাইবাবু মারা যাবেন, জানিস?

জামাইবাবু দিদিকে মারত ধরত। বয়সে অন্তত পনেরো বছরের বড়।

বছর দুয়েক পরে দিদিই মারা গেলেন। কী বলব! জ্যোতিষীর জয়লাভ? জীবনের আইরনি? নিয়তি?

আমার দেখা সব মৃত্যু আসলে ভয়ানক তাজা, জ্যান্ত, প্রচন্ড সব নাটুকেপনায় ভরভরাট।

বাইশে শ্রাবণ যে বছরে রবি ঠাকুর নামের ঠাকুর চলে গেলেন, সে বছরের ছবিটার মত। কালো সাদা ছবিতে কেবলি গুঁড়ো গুঁড়ো কালো কালো মানুষের মাথা মাথা মাথা…এত নাটকীয় প্রয়াণ আর কারোর হয়েছে কখনো? আকাশে সেদিন নাকি মেঘ উঠেছিল হুবহু রবীন্দ্র প্রোফাইলের!

 

সুপার উওম্যান

 

super woman

এ নারীর বিউটি ব্রেন ও ব্রন আছে। অর্থাৎ রূপ-বুদ্ধি-সাহসের এক তুখোড় মিশেল ইনি। তা হোন, তবে রূপের ভাগটাই আসল । কেননা তাঁকে যে মেয়েদের রোল মডেল হতে হবে, হতে হবে পুরুষের বুদ্ধি ছিনিয়ে নেওয়ার উপযোগী মার মার কাট কাট সুন্দরীও। সে সময়ের তুলনায় বেশি সাহসি পোশাকেই এর সাহসের বেশিটা খরচ হয়েছিল। তাই অতি ক্ষুদ্র ও আঁটসাঁট পোশাক। অসংখ্য টি শার্টের ওপর ইনি শোভিতাও বটে। সুতরাং এঁকে রীতিমত গড়েপিটে তৈরি করতে হয়েছে।

সুপারম্যানের জুড়ি । সুপার উওম্যান। নাকি, সুপারগার্ল? সুপারগার্ল কেন? সুপার উওম্যান নামটি কি বড্ড বহেনজি প্যাটার্নের ? সুপারম্যানের গৃহিনী নাকি সে? ও নাম চলবে কেন? ম্যান যতটা স্মার্ট, হ্যাপেনিং, ততটা ঘটমান বর্তমান নয় উওম্যান। কে না জানে শাস্ত্রে বলা আছে “ উও” মানে হল গিয়ে দুঃখ, মানুষকে ঈশ্বর যেই দুঃখী করলেন তখনই সে নারী হল, মতান্তরে পুরুষদের জীবনে দুঃখ আনয়ন করার জন্যই উওম্যানের সৃষ্টি হল। পুরুষদের আবার একটা দুঃখে হয়না, একাধিক দুঃখ চাই, তাই তো , কে না জানে, উদ্ভব হল, পতি, পত্নী আউর উও!

যাহোক, সুপার উওম্যানকে তাই হতে হয় সুপারগার্ল। মেয়েরা তো কোনদিন বড় হয়না। তারা চিরদিন পিতা, স্বামী বা পুত্রের অধীন, মেন্টাল এজ বাও কি তেও থেকেই যায়। তাই গার্ল উপাধিই ঠিক।

ওয়ান্ডার শব্দটি দিলে অবশ্য শ্রুতিমাধুর্যে উওম্যানের দোষ কেটে যায়। তাই কমিক সিরিজ ওয়ান্ডার উওম্যানের অবতারণাউনিশশো একচল্লিশে ডি সি কমিক্স ইনকর্পোরেটেড মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে এলেন এই নারীকে, শক্তিময়ী সুপারহিরোইন। এঁকে নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছে কিন্তু মার্কিন সংস্কৃতিতে। এঁর স্রষ্টা এক মনস্তত্ত্ববিদ মার্সটন ও তাঁর স্ত্রী। এবং কথিত আছে ওয়ান্ডার উওম্যান আসলে প্রথম যুগের নারীবাদী সাফ্রাজিস্টদের দ্বারা উদবুদ্ধ। পরে পিছিয়ে পড়েন। কে না জানে, যে, নিজেকে ক্রমাগত আপডেট করতে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়। নারীবাদীরাই ওয়ান্ডার উওম্যানের সমস্ত গুণাবলী খতিয়ে দেখে বিধান দেন, ইনি সেক্সিস্ট পুরুষ কল্পনার ফসল। এঁর পোশাক পরিচ্ছদে প্রকট পুরুষভজনাই।

কিন্তু শুরুর দিকে কাহিনি যেভাবে গড়া হয়েছিল, তাতে পুরুষবন্ধুকে আসন্ন বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন এই প্রিন্সেস ডায়ান। হুবহু যেভাবে সুপারম্যান রক্ষা করেন তাঁর বান্ধবীকে। ডেমিগডেস বা অর্ধদেবী ইনি। তাছাড়া  শেকড়ে ইনি আদতে আমাজনিয়ান কন্যাসভ্য জগতে ইনি ডায়ানা প্রিন্স নামে বিচরণ করিয়া থাকেন। জাস্টিস লিগ এর প্রতিষ্ঠাত্রীও বটেন ইনি। সুতরাং আপনি না জানলেও এঁর কথা আপনার বারো বছরের ছেলে বা মেয়ের বিলক্ষণ জানা আছে । মার্কিন মুলুকের কার্টুন ও ছায়াছবির একনিষ্ঠ ভক্তকুলের কাছে ওয়ান্ডার উওম্যান খুবই পরিচিত।

অন্যদিকে সুপারগার্ল কিন্তু সুপারম্যানের তুতো বোন হিসেবেই সৃষ্ট। ভাল নাম কারা জোর-এল। অতটা বৃদ্ধা নন। জন্মসাল উনিশশো উনষাটমানে বছর কুড়ির ছোট। তবে বারে বারে নবজন্ম ঘটেছে। একবার তাকে মেরেই ফেলা হয়,  গল্পে সুপারম্যানকে একক সম্মান দেখাতে। আবার জন্ম হয় দুহাজার চারে। পোশাকে সে অনেক বেশি সংযত। দু হাজার পনেরো-তে সুপারগার্লের এক টিভি সিরিজ জনপ্রিয় হয়েছিল খুবই।

এখন এই সুপারগার্ল অথবা ওয়ান্ডার উওম্যান যে যেভাবেই কাটতি পাক না কেন, প্রশ্ন দাঁড়ায় এই, যে, খাট থেকে লাফিয়ে পড়া ছেলেদের যেভাবে সুপারম্যানের আনুগত্য করতে দেখা যায়, আদৌ কি ছোট ছোট মেয়েগুলি পুতুলখেলা আর গোলাপি পরির পোশাকের মোহ ছেড়ে এই এঁদের শরণাপন্ন হয়েছে? কোন প্রজন্মেই , টি শার্টের বক্ষলগ্ন স্টিকারের বেশি কোন প্রভাবশালী ভূমিকায় এদের দেখা গেল না কিন্তু। গত পঞ্চাশ বছরের আমেরিকার সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতেও দেখা গেল না এঁদের। এঁরা আটকে রইলেন সেই কমিক স্ট্রিপের দুনিয়ার পঞ্চাশোর্ধ বছরের সংস্কৃতিতেই। নারী পুরুষ বৈষম্যের ফের থেকে বেরলো না তাই এসব চরিত্রও। যে কমিকবুকগুলি চিরকালই খুব একপেশে। অতি কাতর মহিলাদের দস্যু বা এলিয়েনের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজন পড়ে পেশীবহুল পুরুষ সুপারহিরোর।

একেবারে শুরুতেই মার্সটন যখন ওয়ান্ডার উওম্যানকে সৃষ্টি করেন, তিনি নাকি সমান ভাবেননি পুরুষ নারীকে, বরং ভেবেছিলেন মাতৃস্বরূপা মেয়েরাই হল উন্নততর ও প্রকৃষ্টতর মানব। এঁরাই যুদ্ধকাতর পৃথিবীতলে শান্তি ও স্থিতি আনার একমাত্র উপায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াল পটভূমিতে দাঁড়িয়ে, তিনি ভেবে নিয়েছিলেন, পুরুষহীন হয়ে যাচ্ছে যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজ, তা আবার মাতৃতান্ত্রিক হয়ে উঠবে। তাই, তাঁর কল্পনায়, একটা ইউটোপিয়া ছিল। সুখস্বর্গ । সে প্রমীলারাজ্য থেকে আসুক ওয়ান্ডার উওম্যান। এবং মেয়েরা ত বটেই, এই কমিক স্ট্রিপ পড়া ছেলেরাও এমনকি, তাতে প্রস্তুত হয়ে উঠবে আগামী মাতৃতান্ত্রিক দিনগুলির জন্য, এমনটাই নাকি ভেবেছিলেন স্রষ্টা … জানাচ্ছেন এ বিষয়ের গবেষক ও কমিক বই বিশেষজ্ঞ টিম হেনলি।

সত্তর বছর আগে মার্সটন যে নারীবাদী ও প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছিলেন, তার পাশাপাশিই কিন্তু তিনি পরিচয় দিয়েছিলেন ্কিছু পশ্চাৎপদ ব্যাপারের। তিনি কিছু বদ্ধ প্রতিমা গড়েছিলেন, ওয়ান্ডার উওম্যানকে বেঁধে ফেলেছিলেন এমন সব খাঁচায়, যা থেকে পরে আর বেরিয়ে আসতে পারেনি সে। কমিক জগতের মেয়েদের হীনম্মন্যতা কাটাতে যে ওয়ান্ডার উওম্যানের আমদানি, সে নিজেই হয়ে পড়ল এক পেশে কিছু ধারণার শিকার।

এবং সাতচল্লিশে মার্সটনের মৃত্যুর পর  এ চরিত্রটির সমস্যা বেড়েই চলল। উল্টে কমিক বইয়ের জগতের যত কারবারিদের হাতে পড়ে তছনছ হয়ে গেল ওয়ান্ডার উওম্যানের আপাত নারীবাদী চরিত্র। পাশাপাশি মার্কিন দুনিয়ায় তখন চলেছে গৃহবধূ থেকে মেয়েদের কাজের জগতে পা রাখার ও পেশাদারিত্ব দেখাবার পালাবদল। বেটি ফ্রিডান থেকে শুরু করে রবিন মর্গ্যান শুলামিথ ফায়ারস্টোন কেট উইনস্লেট প্রমুখের হাত ধরে। সত্তরের সেই সব লড়াকু দিনে, কমিক বইয়ের মেয়েরা খুবই পিছিয়ে পড়া। ওয়ান্ডার উওম্যানের ছেলেবন্ধু স্টিভ ট্রেভর, যাকে সে বিপদের মুখ থেকে রক্ষা করেছিল একদা, তার সঙ্গে শহুরে ফ্যাশনদুরস্ত জীবনযাপন করাটাই একমাত্র কাজ তার।

তবু তারই মধ্যে র‍্যাডিকাল নারীবাদী গ্লোরিয়া স্টেইনেম, ১৯৭২ এ,  ওয়ান্ডার উওম্যানকে তুলে এনেছিলেন এম এস নামে নারীবাদীদের মুখপাত্র পত্রিকার প্রচ্ছদে। বিরল সম্মান। তবু, নারীবাদের “পুরুষ আর নারী সমান সমান” আইডিয়া আসলে ওয়ান্ডার উওম্যানের নিহিত ভাবনা নয়, একথা বলতেই হবে। অন্যদিকে , যতটাই এ চরিত্রকে করে তোলা হল সব মেয়ের চেয়ে পৃথক ও শক্তিশালী, ততটাই সে সরে আসে মেয়েদের দৈনন্দিন লড়াইয়ের থেকে। সুতরাং সেখানেও আসলে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়না । মার্সটন চেয়েছিলেন, প্রতি মেয়ের ভেতরেই ওয়ান্ডার উওম্যানের সম্ভাবনা সূচিত করতে, আর নারীর উৎকর্ষ দেখাতে।

এ এক জটিল খেলা। আমাদের নিজ সংস্কৃতির ওয়ান্ডার উওম্যানদের দেখলেই ত তা বুঝি। একে ত বাঙালি আমরা , তায় একইসঙ্গে বিজয়ায় সন্দেশ খাওয়াই মা দুর্গার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাহন সিং হকে যেমন , অসুরকেও তেমনই! দুর্গাকে সুপার উওম্যান ভাবলে আগে কোন সমস্যাই ছিল না, ছোটবেলায় ভবানীপুরের মুক্তদল পুজোপ্যান্ডেলে ত আমাদের সেরকমই মনে হত, যখন টিউবলাইট সজ্জিতা মায়ের হাত থেকে আলোর তির ছুটে যেত অসুরের বুকে! কিন্তু এখন এসব সমীকরণ করলে,  সমস্যা আছে। কোন না কোন ক্ষেত্র থেকে আক্রমণ আসতেই পারে, ভক্তদের তরফে। আমাদের দুর্গা কালী নারী নন, দেবী । পূজ্যা। সুতরাং কোন ইয়ার্কি বা চালাকি চলবে না। তবু এ কথা তো মানতেই হয় যে, আদলটা তো নারীরই, আর সেই নারীর কল্পনায় কিছু কিছু অস্ত্র শস্ত্র জুগিয়েছেন যেমন দেবাদিদেব মহাদেব , বিষ্ণু ও ব্রহ্মা, বা বাকিরা, তেমনি আমরাও কম জোগাইনি তাঁর উপচার। তাঁকে ঘরের মেয়ে করে নিয়েছি দিব্যি।

কালী ও দুর্গার কমিক স্ট্রিপও শৈশবে পড়িনি তা নয়, সেই অমর চিত্র কথার পাতলা অপ্রতিরোধ্য বইগুলির সময়ে এত ভক্তসংখ্যা বোধ হয় ছিলনা, তবে আমি যে কমিক স্ট্রিপের কথা বলব তা ছোট লাল বই, আমার দাদু বাড়িতেই পড়তেন প্রতি আশ্বিনমাসের শুক্লপক্ষে,  অকালবোধনের পর। মার্কন্ডেয় পুরাণের কাহিনি, ভাগে ভাগে পড়তেন, সপ্তমী অষ্টমী নবমী। সংস্কৃতর সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গানুবাদ। আমরা বুঁদ হয়ে শুনতাম। “হে দেবি, তুমি বিষ্ণুর শক্তি , অনন্ত বীর্যের অধিকারিণী । তুমি এ বিশ্বের বীজ অর্থাৎ সৃষ্টির কারণ। তুমি মহামায়া । তোমার মায়াতেই সকল মোহিত । তুমি প্রসন্না হলে পৃথিবীতে মুক্তির কারণ হয়।  তুমিই বিভিন্ন বিদ্যারূপে রয়েছ । সকল নারীর মধ্যেও তুমিই । যে মা তুমি একাই সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছ, কি আর শ্রেষ্ঠভাষায় তোমার স্তুতি করা যায় ? আশ্রয়পার্থী দীন ও আর্তকে আপনি রক্ষা করেন। আপনি সকলে দুঃখ দূর করে থাকেন । হে নারায়ণি , হে দেবি, আপনাকে নমস্কার করি।“

এ কিন্তু শুধুই ভক্তিগদ্‌গদ ব্যাপার নয়। রীতিমত অ্যাডভেঞ্চার মেজাজের একাধিক গল্প। প্রতি গল্পে ক্রমশ আরো ভয়ঙ্করী হয়ে উঠছেন সুপার হিরোইন। তাঁর চেহারা, সাজসজ্জা , অস্ত্র পালটে যাচ্ছে। মধুকৈটভ, শুম্ভ নিশুম্ভ, মহিষাসুর এবং রক্তবীজ  বধের কাহিনি। লাল বইয়ের পাতায় পাতায় অস্ত্রের ঝনঝনানি, রক্তের ফোয়ারা। হা হা অট্টরবে দেবী কীভাবে লাঞ্ছিত করছেন অসুরদের,কীভাবে মদ্যপান করে নিজের মনকে শক্ত করে নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছেন যুদ্ধের জন্য।   অসুরকে বলছেন, গর্জ গর্জ ক্ষণং মূঢ়! ওরে মূঢ়, ক্ষণকাল গর্জন কর, তারপরই তো আমার হাতে নাশ হবি, কীভাবে টক্কর দিচ্ছেন প্রতি বিকটাকার মায়াবী অসুরের সঙ্গে, নিজেও মায়া সৃষ্টি করে। যাদের দ্বারা দেবতারা তাড়িত এবং মনুষ্যলোক উৎপীড়িত… সেসব শুনতে শুনতে আমরা কল্পচক্ষে ছবিগুলো দেখতে পেতাম যেন।

দুঃখ এই যে, এই নারীশক্তির জয়জয়কার, চিরটাকাল বইতেই থেকে গেল।

 

হেরে যাওয়া মানুষ

হেরে যাওয়া মানুষ

যশোধরা রায়চৌধুরী

যখন সবাই সুখের কথা বলছে

তখন কাউকে না কাউকে তো মনখারাপের কথাও বলতে হবে।

মানুষ বিশেষ ভাল নেই, এই কথাটাও ত কারুকে চেঁচিয়ে বলতে হবে।

কারুকে তো বলতে হবে  সত্যি সত্যি কী ঘটছে, আমরা কেউ বলব না যখন।

যে বলছে, সে ্বিশাল কিছু নয়।

কোন আন্দোলন করছে না, স্লোগান দিচ্ছে না, শুধু একনাগাড়ে

সত্যিটা বলে যাচ্ছে।

আমাদের চোখে এই লোকটাই পাগল। এই লোকটাই সেই লোক, যাকে ভয় পেতে শিখেছি ।

যখন কেউ মিথ্যে লিখছে, এই লোকটা তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

বগল চুলকোয়, মাথা থেকে উকুন বের করে নেয়।

মিথ্যে লেখকের কলম দ্বিধাগ্রস্ত হয়, আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়

মিথ্যে লেখক একটু ঘাবড়ে গিয়ে কলম বন্ধ করে,

আবার ভাবতে বসে।

যখন কেউ এই লোকটাকে নিয়ে লিখছে

“এই লোকটা সত্যিটা বলে। আমাদের চোখে এই লোকটাই পাগল”…

তখন লোকটা তার সামনেও গিয়ে দাঁড়ায়

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকোয়, পা ঘষে।

যে লোকটা লিখছিল, তার লেখা থেমে যায়।

এই লোকটাকে নিয়ে লেখা যায় না তাই। এর কাছে,

আমাদের প্রতিটা ছেনালির ফুটো

ছেঁড়া খবরের কাগজ দিয়ে বন্ধ করা আছে।

(এই লোকটা, বিপজ্জনক, মদীয়)

প্রতিদিন এই গল্পগুলো ঘটে চলেছে। আমরা যখন এসব কবিতা লিখি, তখনো আমরা একটা জিতে যাওয়াসমাজেই বাঁচি। জিতে যাওয়া আর হেরে যাওয়ার দুটো ধারণার মধ্যে দড়ি টানাটানি করতে করতে বাঁচে আমার সমাজ। রোজ দেখি অটোতে, বা বাসে যে মাকে, যে নাকি বুভুক্ষু অবস্থায় নিজের ছেলের মুখে দুধ পাউঁরুটি তুলে দিয়ে সক্কাল সক্কাল বেরিয়েছে তাকে শিক্ষিত করে সফল করতে, সে কিন্তু বাসে উঠেও ছেলেকে জিতিয়ে দেবার পরিকল্পনা করছে, শেখাচ্ছে অন্যের পা মাড়িয়ে ছেলেকে ফাঁকা সিটটার দিকে দৌড়ে যেতে, ঠেলে দিচ্ছে বন্ধুদের টিফিনের ভাগ না দিয়ে নিজে বেশি খাবার খেতে শেখার দিকে, ভাবছে কবে তার এই ইনভেস্টমেন্টছেলে তুলে আনবে চাকরির ফর্মে, মাইনের ফর্মেহয়ত বিবাহের পণের ফর্মেও , ভবিষ্যতে। ফেরত আনবে তার এই আত্মত্যাগের মহিমার চতুর্গুণ জিতে যাওয়া!

আমাদের জিতে যাওয়া সমাজ প্রতিবার, প্রতি অবস্থায় জানে, যে, এই জিতে যাওয়ার রাশিতত্ত্বগত সম্ভাবনা কত কম। আমরা জানি, ৯৯ জন হারলে তবে একজন জেতে। তবু এই জেতার প্রতি আস্থাবান আমরা , আমরা বিশ্বাস করি যে জেতেনি সে কিছুই করেনি। তাই আমাদের ছায়াছবিরা জিতে যাবার স্বপ্ন দেখায়। বলে, দ্যাখো , যতই শুরুর দিকে হার দেখাই আমরা, শেষ দৃশ্যে জয় না থাকলে পাবলিক খাবেনা, জনতা জনার্দন মজবে না। কারুর পরিতৃপ্তি লাভ হবে না।

তাই তারেঁ জমীন পরএর মত রাজনৈতিকভাবে সঠিক ছবিতেও দেখাতে হয়, বার বার নানা কাজে হেরে যাওয়া, ডিসলেক্সিয়ার শিকার, ছোট ছেলেটি, অন্তত আর কিছুতে না হোক, আঁকার কম্পিটিশনে ফার্স্ট প্রাইজ পায়। প্রতি ছায়াছবি প্রথমে একজন হেরে যাওয়া মানুষের গল্প দেখাতে শুরু করেও, শেষ মেশ তাকে জিতিয়ে না দিলে দর্শকের মন শান্তি পায় না।

হেরে যাওয়া মানুষ? কী তার মানে?

আমরা প্রতিজন, প্রতি মুহূর্তেই কোন না কোনভাবে হেরে যাওয়া। তবু , নিজেকে সেভাবে দেখার অভ্যাস আমাদের নেই। সেভাবে নিজের দিকে তাকালে যে প্রতিটি দিন আরো দুর্ভার, দুর্বহ হয়ে উঠবে। অথচ সত্যবাদী, সত্যদ্রষ্টারা আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি ভুলবোঝা লোক, সবচেয়ে বেশি তাঁদের এড়িয়ে চলি আমরা। তাঁদের মনোভাবকে, নৈরাশ্যবাদী, ডিপ্রেসিভ বলে দাগিয়ে দিই।

আমার মনে হয়, হেরে যাওয়া মানুষদের আর কোথাও ঠাঁই হোক চাই নাই হোক, তাঁদের ঠাঁই ঠিকই আছে সাহিত্যে। কারণ সাহিত্যই সেই জায়গা, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী হেজিমনি ( শব্দটা খুব চলছে আজকাল, সবাই মানে জানেন , তবু সহজপাচ্য করে হেজিমনি বোঝাতে গেলে এটাই বলব, মৌরশিপাট্টা কথাটা, বাংলার , খুব কাছাকাছি আসে হেজিমনির। আর হেঁজিপেঁজি নয়এমন লোকই হেজিমনির ধারক বাহক, হেজিমনি অনেক রকম , গোটা বিশ্বের রাজনীতিতে যদি আমেরিকার হেজিমনি চলে, তো, পাড়ায় দাদামামাকাকাদেরক্লাসে পড়াশুনোয় ভাল ছেলেদের অথবা খেলার মাঠে লম্বাচওড়াদের…) গুলোকেই লেখক ক্রমাগত টার্গেট করে চলবেন। লেখক ক্রমাগত তছনছ করতে চাইবেন ক্ষমতার কাঠামো। এই প্রক্রিয়ায় তিনি বেছে নেবেন কাহিনির কেন্দ্র হিসেবে নায়কোচিত মানুষকে নয়, বরং তথাকথিতভাবে সামাজিক হেরে যাওয়া মানুষদেরই।

অবশ্য সেদিক থেকে দেখলে পৃথিবীর বিশাল ক্ল্যাসিক যেভাবে হেরে যাওয়ার গল্প বলেছে, অথবা নিরীহ, শিশু, অনাথদেরএবং জনপ্রিয় হয়েছে, সেভাবেই ছায়াছবির পর্দায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে চোর বদমাশ বেশ্যা ভিখারি সাধুরা

মনে করব চার্লস ডিকেন্স এর অনাথাশ্রমের শিশুদের, অথবা টলস্টয়ের সমাজপরিত্যক্ত চরিত্রদের। কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টোর অবাস্তব উত্থানও তো হেরে যাওয়া মানুষেরই ঘুরে দাঁড়াবার গল্পই। হালের হিন্দি ছবির কথা আগেই বলেছি, শোলের মত ছবিও তো সমাজবহির্ভূতদের গল্প।

সমাজ অন্যথা যাদের দিকে ফিরেও তাকায় না, তাদেরই গল্পবইতে বা রূপালি পর্দায় দেখে বিগলিত হয়, এই এক বৈপরিত্যও তাই চোখ এড়ায় না আমাদের। ভেতরে  ভেতরে কি তবে মানুষ নিজেকেও আসলে হেরো ভাবে? হেরে যাওয়ার কষ্ট অনুভব করে প্রতিমুহূর্তে, আর বাইরে দেখায়, দ্যাখো আমি জিতে গেছি? দ্যাখো আমি বাড়ছি মাম্মি!

দুহাজার পরবর্তী বাংলা কবিতাতেও , হেরোদের প্রতিভূ, হেরো মানুষবেশ্যাবেঘরবেসাহারা মানুষের ঢল নেমেছে।

নব্বই আর দুহাজার পরবর্তী সময়টাই আসলে বেশ্যা আর হেরো মানুষর, ভবঘুরের আর ভিখিরির, ভিখিরির আর গৃহহীনের। এই সব মানুষের মুখ মিলেমিশে যায় থিকথিকে শেয়ালদা স্টেশন চত্বরে, শপিং মলে, মেটিয়াবুরুজের অন্ধকার বন্দর এলাকায় আর জনাকীর্ণ পার্ক স্ট্রিট অথবা  লোক উপচে পড়া লোকাল ট্রেনের কামরায়।

এই দুই দশকের কবিদের কবিতায় এখন পিছলে পড়া লুব্রিকেন্ট, অবধারিত যৌনতার প্রতীক যেমন, তেমনই পথ আর পথের ভেঙে যাওয়া, জীবনের সবচেয়ে বড় মাইল স্টোনহীনতার হু হু হাইওয়েতে রূপান্তরিত।

চিরদিনের প্রান্তবাসী এই সমাজের ঐসব নামহীন মুখহীন চরিত্রের মত, কবিও। কবির সত্তা কোথায় থাকে? আসলে থাকে না, গড়ে ওঠে, আবার ভাঙ্গে, আবার গড়ে তুলি আমরা।

আমাদের ভেতরের সত্তাটিকে আমরা ধ্বংস করতে চেয়েছি ক্রমাগতই , এইভাবে। এই দুই দশক, নব্বই আর দু হাজার দশকের কবি যারা, আমাদের কাছে বাইবেল যদি হয় জয় গোস্বামীর উন্মাদের পাঠক্রম,  তাহলে মসিহা নবারুণ ভট্টাচার্যের ফ্যাতাড়ু, ..এই সময়খন্ডের প্রতিটি কবিই তাই, নিজের সত্তাকে ছেতরে ফেলেছে তার কবিতার নানা লাইনে

এ বাড়ি আমার। তবু, এ ঠিক আমার বাড়ি নয়।

কত সহজেই লেখা এসব সরলরেখা তোমার মাথায় ঢুকে পড়ে।

যেমন সিঁদুর দূরে দিগন্ত নামায়, দূরে জল ও আকাশ

আশ্চর্য সম্পর্ক। এক ছাড়া ছাড়া ভালবাসা, লোক দেখানোর

সমগ্র বৃষ্টির ধারা আমার এই আজীবন পর হয়ে থাকা

সে এক সরল বাক্য ক্রমশ জটিল জামাকাপড়

তোমার কাছেই আমি কল্পনাপ্রবণ হাতেখড়ি

( তাপস কুমার লায়েক, নাও)

দুটি বাক্যাংশে জোর দিতে চেয়েছি যা মূলত বেঘর কবিকে চিহ্নিত করে। তাপস কুমার লায়েকও নব্বই দশকের কবি।

কবিতার কাজ আড়ালে থাকা, লুকিয়ে থাকা কথাগুলোকে বার করে আনা। অথবা, আরো খটমট করে বললে, কবিতা গোপনকে উন্মুক্ত করে, ছেৎরে খুলে দেয় ভেতরের অন্ধকার, পাপ,অন্যায় ও নিজস্ব অন্ধতা।

কবিতা বোমার মত বিস্ফোরক।

এক ২০০০ পরবর্তী কবির ভাষায়ঃ

আমার কবিতা যেন বিস্ফোরকভর্তি স্যুটকেস/ দেখতে নিরীহ, আর ভেতরে অনন্ত আর ডি এক্স/ বারবার রেখে আসি ভিড় বাসে, মন্দিরে, হাওড়া স্টেশনে…/কিন্তু শালা কিছুতেই ফাটে না কেন যে…/ কে জানে” ( অভিষেক ভট্টাচার্য)

এই অভিপ্রায় কবির। সমাজ তাকে যা যা শেখায়, সবটাকে সে উলটে দিতে চায়, সে উল্টোমুখে চলতে চায় , অভিকর্ষণের নিয়ম না মেনে সিলিং এ গিয়ে উঠতে চায় ভেসে, সে নিয়মকানুন ভাঙে, আর যা যা শান্তশীলতার শিক্ষা তাকে দেওয়া হয়েছিল সেগুলো হাট করে খুলে দিয়ে অসভ্য হতে চায় খুব।

কেননা কবি স্বাধীন। স্ব ইচ্ছা সম্পন্ন। কবি আসলে নিজের মত থাকতে চেয়েছিল। সমাজ তাকে থাকতে দেয়নি, দেয়না, তাই সে কবিতা লেখে। কবি আসলে নিজের ঘরে থাকতে চেয়েছিল। তার ঘর ভেঙে দেওয়া হয়েছে, সেই ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে সমাজের বিধিনিষেধ। তাই সে বেঘর, সে চির ট্র্যাম্প, সে হেরো মানুষবেগানা, দূরচারী।

২০০০ পরবর্তী কবিতা সেই ছেতরে পড়া ঐতিহাসিক ভবঘুরের কাহিনিই, বার বার আবৃত্ত।

আশিক খুদাবক্স লেখেনঃ

দীর্ঘায়ত সপ্তাহশেষ –

অসংখ্য ঝাঁঝালো শব্দ বাড়ি মারছে মগজের কোষে

শেষ বাস অপেক্ষা অচেনা শহরজোড়া রাতে

শুধু আমি একা আর পৃথিবীর সব ছবি আশ্চর্য তফাতে

আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে এই দেখ এরকমও ছবি হতে পারে

… যে খুব স্টিলেটো-হাঁটা মুগ্ধতা দিয়েছিল বার-এ

বার থেকে বেরোতেই সেও তার জুতোজোড়া খুলে নেয় হাতে

শুধু আমি একা আর পৃথিবীর সব ছবি আশ্চর্য তফাতে

আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে কতটা আকাশ হয়ে উড়ি –

আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে

ভেসে থাকা কতটা জরুরী

 

অথবা শুভ আঢ্য লেখেনঃ

 

একটা হ্যাঙ্গার, জামা, বালিশ, অ্যাসট্রে, ফোন, মাইনাস পাওয়ার,

এমারজেন্সি ল্যাম্প, পেন, ডায়রি, কাঁচা ছটফট, অ্যাকোরিয়াম,

জলের বোতল, বই, ব্লেড, ঘুম, ওয়াল ক্লক, নাটকের টিকিট,

বডি-স্প্রে, কম্পিউটর, দুঃস্বপ্ন, রাত্তির আড়াইটে, সিনেমা,

বাস, ভুড়ভুড়ি আওয়াজ, অ্যালঝাইমার, জানলা, উঠে বসা,

ক্যালকুলেটর, তেলরঙ

উপসংহারে, ফ্রয়েড আর হিচককের সংকরায়ণ

রবি ঠাকুর যে পথ আর ঘরের দ্বৈততার কথা বলেছিলেন , সেই দ্বৈততার থেকে আমাদের প্রজন্ম আরো একশ বছর পরের। আমাদের প্রজন্ম, যাদের জন্ম ষাটের দশকে, তারা দেখেছে পথই আসলে সবকিছু, কেননা ঘরের পরিসমাপ্তি হয়ে গেছে অনেক আগেই। ঘরের চারটে দেওয়াল খসে পড়ে গেছে, সমান হয়ে গেছে। রাস্তাগুলোই ঘর এখন।

তৈলতা, মলিন সন্ধ্যাকাল

কলকাতা কবলে আছে জনশূন্য পার্ক স্ট্রিটগুলো

আমাকে সামান্য চাপ দাও

আমি এই শব্দকে মসৃণ করব, লুব্রিকেট, হোচিমিন বাগানে বাগানে

ঠান্ডা ঠান্ডা আঙুল ছোঁয়াব আর টাটা সেন্টারের পদমূলে

রেখে আসব অনন্য ক্রেডিটকার্ড, ধার

ধা্র করে ঘৃত খাচ্ছি, ধার করে খাচ্ছি ধারা ধারা

বিশুদ্ধ ধারায় পড়ছে তোমার মলিন, সান্ধ্য, তৈলাক্ত বাতাস

বায়ুচাপভূত , শুকনো, ডিসেম্বর, লুব্রিকেট করো আগাগোড়া

মেট্রোর গর্ভের থেকে উঠে আসছি আমরা সব উর্বর, নষ্ট মহিলারা

ওপরের এই লেখাটি যশোধরা নাম্নী আর এক নব্বইচিহ্নিত কবির। লেখা ১৯৯৫ এর আসপাশে। কেন লিখেছিলাম এই কবিতা? কেননা রোজ মেট্রোতে যাতায়াত করতে করতে আর মলিন শীত সন্ধ্যার দূষণপৃক্ত কলকাতা, তার হলদেটে ফগলাইট, পুরো দিনযাপনটাকেই হলদেটে আলোয় ভরে দিত। প্রতিটি হলদে আলোর নিচে দাঁড়াণো মেয়েই তখন প্রচন্ডভাবে নষ্ট বেশ্যার মত মনে হয়, হত।

রাস্তা, রাস্তা আর রাস্তা, আমাদের লেখায় কেবলি সামঞ্জন্স্যহীন পথের কথা থাকে। থাকে চাউমিন গন্ধ, থাকে বিবশ একটা অন্ধকার ছায়াময় অন্য পৃথিবী। মানুষরা থাকলেও তাদের মুখ নেই। মুখহীন, নিজস্বতাহীন, হাসিকান্নাহীন এই ছায়ামানুষেরা ঘোরেফেরে, কোথাও কোন তরঙ্গ ওঠে না, কোন গ্র্যান্ড নেরেটিভ তৈরি হয়না, নতুন কথা বলার কেউ থাকেনা, বড় বাণী, মহৎ অঙ্গীকার রচিত হয়না, মহানাটকীয় কিছুই ঘটে না। শুধু একটা পাঁচমাথার মোড়ে নয়, হাজারমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি আমরা।

নিজের সত্তাকে ভাঙি খণ্ড করি তারপর উত্থানের ছবি

কিউব পদ্ধতি ধরে এঁকে দেব বলে এই ক্ষুদ্র অনুনয়

আজ অমাবস্যা রাত চান্দ্রমাস আমি জেনে গেছি

কালোর পরেও এক কালো আছে তারার ওপাশে অন্য তারা

ভাগ্যচক্র ঠেলে দিই এরপর শিয়ালদা স্টেশন

নিজেকে দাঁড় করাই অগণিত গণিকার দলে যাতে

ফ্ল্যাশব্যাকে জীবনের চল্লিশ বছর জ্বলে ওঠে

আত্মার ভিতর এমন পিপাসা জলের বোতল দিই

মনে মনে বলি এত তৃষ্ণা কেন

সামনে যে সে আমার জীবনের প্রথম খদ্দের

 

নব্বইয়ের কবি চন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্য মানুষী।

যেকোন দিকেই আমি চলে যেতে পারি, লিখেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, চল্লিশ দশকের কবি। পঞ্চাশ দশকের আত্মকেন্দ্রীভূত স্বীকারোক্তির কবি সুনীল শক্তি তারাপদ লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা কীরকমভাবে বেঁচে আছেন সেই কাহিনি। সেখানে নাটকীয়তা পরিহার করেও নাটক ছিল, ছিল নাটকীয় থেকে যাবার দুর্মদ বাসনাটুকু অন্তত।

কিন্তু ষাটের দশকে এসে সেই নাটুকেপনা, আত্ম প্রচার টুকুও চলে যায়। নষ্ট হয়ে যায় কবির নিজের সমস্ত আত্মকেন্দ্রিক পৃথিবী। ষাটের কবি ভাস্কর চক্রবর্তী লিখেছিলেন, যেকোন লাইন থেকেই একটা কবিতা শুরু হতে পারে, আর যেকোন লাইনেই শেষ হয়ে যেতে পারে সেই কবিতা। কবিতা হবে আপাত সরল। হাজারমুখো। বিষয়ের কোন বাছবিচার থাকবে না। আর কবিতার একটা লাইন থেকে আরেক লাইনের দূরত্ব হবে কয়েকশ কিলোমিটারের। কিন্তু অদৃশ্য একটা তলদেশে থাকবে মিলিমিটারের নিবিড় সম্পর্ক।

সময়ের থেকে অনেকটাই এগিয়ে থাকা কবি ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় গৃহহীনের সাড়া। রাস্তার ইশারা। হ্যাঁ, তা সত্যি, একরকমের চুপ থাকা, থেমে থাকা, ঘুমিয়ে থাকা, শূন্যতা, বিষাদ, আত্মমগ্নতা ভাস্করদার কবিতার একদম ভেতরকার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেই বিষাদও এই সময়েরদু হাজার পরবর্তী সময়ের সঙ্গে তার কোন দূরত্ব নেই যেন। যেহেতু এই সময়টাই গতির সময়, ভাস্করদার স্থিতি বা ঘুম বা একাকিত্ব আসলে অতিরিক্ত গতির থেকে আসা একরকমের প্রতিক্রিয়া, শ্লেষ বা ক্লান্তি

আর একইসঙ্গে, ভাস্করদার সৃষ্ট যে চিত্রকল্প, যে ছুটে চলা ইমেজারি, তার ভেতরে যে চাপা গতিবেগ, পারম্পর্যহীনতার , অর্থহীনতার বোধের যে বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে তাকেও লক্ষ্য না করে কি আদৌ থাকতে পারি, আমরা?

আমরা অফিস থেকে ফিরে এসে/ মোজা খুলতে খুলতে হঠাৎ নিঃশ্বাস ফেলি/ আমরা রাস্তায়/ হঠাৎ চুলকে নিই হাত।

আমরা  পুরনো হোটেলে যাই/ শুধুমাত্র হেমন্তকালের জন্যে/ আমরা ভালোবাসি সিগারেট আমাদের চারপাশে হেমন্তকাল।

আলপিন, রান্নাঘর, পুরনো জুতো, বাথরুম। যত সামান্যতার কথা বলেন ভাস্কর, ততটাই বলেন চলে যাওয়ার কথা, ঘটনা ঘটার কথা। একটা বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় চলে যাওয়া আছে তাঁর কবিতায়, “ এইখানে , মূর্খ এক, তার/ অসুখী জীবন নিয়ে খেলা করেছিল/ ছাদে , তার রঙিন পাজামা পড়ে আছে – / ঘরেবাথরুমে তার / পড়ে আছে হাত ও পায়ের কসরৎ।একই কবিতার তিনটি পংক্তির ভেতর দিয়ে তিনি নিচে থেকে ছাতে যান আবার নিচে নেবে আসেন, বাথরুমেআসলে এই কবি, তাঁর কোন স্পষ্ট বাসস্থান নেই বলেই গোটা কাহিনিটির ভেতরে বোনা থাকে চলমানতা।

এমনকি বিছানা, বিছানার অনুষঙ্গও কত গতিময় ভাস্করদার কলমে। চলমান। খোলা শরীরের ওপর, খেলা করছে, খোলা শরীর/ হলুদ বিছানা, ভেসে চলেছে স্বর্গের দিকে”… এই দৃশ্য পট, এই বদলে যাওয়া দৃশ্যাবলী, একাধিক ছবির জন্ম দেওয়া চলচ্চিত্র প্রতিম কবিতা। এটাই ভাস্করদার কবিতা। চোখ বুজলে মাথার ভেতর চলে আসে ফিল্মের দৃশ্যের মত গলি ও রাস্তা, দেওয়াল, ল্যাম্প পোস্ট, গাড়ি, বারান্দা, ছাদ, নীলচে, হলদেটে, ম্লান

এই হেরো মানুষরা বাংলা কবিতার সত্তরের দশকেও এসেছেন, গিয়েছেন। সত্তর থেকে মৃদুল দাশগুপ্ত জয় গোস্বামী ব্রত চক্রবর্তীদের কবিতায় আরো বেশি ভাংচুর শুরু হয়ে, খুলে দেয় অন্য কিছু দরজা।

জয় গোস্বামী সূর্য পোড়া ছাইতে লিখেছিলেন,

আমার স্বপ্নের পর স্বপ্ন হল আরো বেলা যেতে

আমাকে ধ্বংসের পর ধ্বংসক্ষেত্রে বর্ণনার শেষে

শান্তি নেমে চলে গেল, মৃতদেহ টপকে টপকে, দূর তেপান্তরে

তার, গা থেকে স্ফুলিঙ্গ হয়ে তখনও ঝলক দিচ্ছে

রক্ত আর উল্লাসের ছিটে।

দিগন্তে মেঘের কুণ্ড। থেমে থাকা ঝড়

আমাকে দৃশ্যের পর দৃশ্যের ওপিঠে

এইমতো এঁকে রাখছেন

এক মুণ্ডহীন চিত্রকর!

আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো’, কবিতায় জয় গোস্বামী লিখেছিলেন,

আজ যদি আমাকে জিগ্যেস করো কোন্‌ ব্যূহ কোন্‌ অন্ধকুপ

রাষ্টের কোন্‌ কোন্‌ গোপন প্রণালীর ভেতর তুমি ঘুরে

বেরিয়েছো তুমি বেড়াতে গিয়েছো কোন্‌ অস্ত্রাগারে তুমি চা খেয়েছো এক কাপ

তুমি মাথা দিয়ে ঢুঁসিয়েছো কোন্‌ হোর্ডিং কোন্‌ বিজ্ঞাপন কোন্‌ ফ্লাইওভার

তোমার পায়ের কাছে এসে মুখ রেখেছে কোন্‌ হরিণ

তোমার কাছে গলা মুচড়ে দেওয়ার আবেদন এনেছে কোন্‌

মরাল

তাহলে আমি বলবো

মেঘের উপর দিয়ে মেঘের উপর দিয়ে মেঘের উপর

আমি কেবল উড়েই বেড়াইনি

হাজার হাজার বৃষ্টির ফোঁটায় ফোঁটায় আমি

লাফিয়ে লাফিয়ে নেচে বেরিয়েছি মাঠে আর জনপদে

মৃদুল দাশগুপ্ত , গোপনে হিংসার কথা বলির লেখক, সেই সময় থেকে, লিখেছেন  অসংখ্য পথের কথাঃ

প্রতিশ্রুতির ওপরে মেঘ, এবং নিচে জটিল মাটি

তার নিচে জল, মধ্যে ছায়া, শরীর ভাঙছে দৃষ্টিপাতে

দশ দিকে পথ ক্ষুরের ফলা

( কাচের পাত্রে ভ্রমর)

কবি নিজেকে বিনির্মাণ করে চলে যান উইপোকার স্তর পর্যন্ত, অস্তিত্ব ফুটো করেঃ

আমি সেই উইপোকা যে ফুটো করেছে সন্ধিপত্র;

আমি খাই হাসপাতালের মাংস, প্রহরীর শিরস্ত্রাণ,

গান্ধীমূর্তির ঠ্যাং ও লাঠি;

পাউরুটির দুঃখিত দুই হাত আমাকে টেনে নিয়েছে

পাউরুটির শাদা স্তনের ভেতরে;

আত্মহত্যা করার পরেও নিজেকে প্রশ্ন করেছি,

         এটা কোন ঋতু?

অশ্রু ছাড়া গোপন করিনি কিছুই;

দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনের এই ঠান্ডা দেশে

আমাকে বিস্ময়সূচক চিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা হোক ( উইপোকা, মৃদুল দাশগুপ্ত)

মনে পড়বে সত্তরের আর এক অসম্ভব শক্তিশালী কবি রণজিৎ দাশ লিখেছিলেন জিপসিদের তাঁবু নামে এক বই।

লিখেছিলেন অন্য এক বইতে ( সন্ধ্যার পাগল) , কেননা এইসব চিত্রকল্পই বার বার ফিরে ফিরে আসে তাঁর কবিতায়ঃ

যেখানে সাহারা এসে সমুদ্রে মিশেছে, সেই রুক্ষ তটভূমি

আমার ঠিকানা। জানো তুমি?

মাথায় টার্বান, গায়ে আলখাল্লা মিশকালো, আফ্রোআরব

উবু হয়ে বসে থাকি নাইলনজাল নিয়ে, সারাদিন, নিষ্পলক চোখে

রক্তে বেদুইন, কিন্তু পেশায় সমুদ্রজেলে। বোবা দুঃখ শোকে।

বসে থাকি প্রতীক্ষায়, কখন ঢেউয়ের সঙ্গে ছুটে আসে উজ্জ্বল ডলফিন…( আমার ঠিকানা)

কেন জিপসি? কেন উন্মাদ? কেন আরব গেরিলা? কেন কুষ্ঠ রোগী আর আধপাগল বুড়োদের গল্প?

মনে করে দেখব, মধ্যযুগের শেষে, আধুনিক সময়ের শুরুতে যখনই নতুন করে সমাজ পরিষ্করণ, শোধন আর মূল্যবোধের ইনস্টলেশন , তখন থেকেই সমাজের মূল স্রোত থেকে বিবর্জিত,  প্রান্তবাসী হয়ে গেলেন কিছু বেশ্যা, কুষ্ঠরোগী, ভিখিরি আর ভবঘুরে মানুষ। তৈরি হল এই সব স্টিরিওটাইপ। এইসব মিথ। সমাজ থেকে বর্জিত তারা, বার বার নিয়ন্ত্রিত, শাসিত, সুসভ্য সমাজ এদের সন্দেহ করেছে, উনবিংশ থেকে বিংশ শতক অব্দি লক্ষ লক্ষ রোমানি বা রোমা উপজাতীয়, মূলত যাযাবর , জিপসিরা খুন হয়ে চলেছিলেন, সমাজকে পাপ আর দুষ্টতা থেকে পরিষ্করণের মহতী উদ্যোগে। আজও, ফ্রান্সের ডকুমেন্টারিতে পড়ি, কীভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা বেছে বেছে রোমাদের চিহ্নিত করে, বেশ্যাবৃত্তি আর বে আইনি কাজে লিপ্ত বলে দোষারোপ করে চালান করে দেয় হয় কারাগারে নয়ত সীমান্তের বাইরে। আজও, আমেরিকার পার্কগুলো যতই সুসজ্জিত হোক, কোণে কোনও একটা বেঞ্চির ওপরে প্লাস্টিক স্টাফ করা ওভারকোটে, অনেক প্লাস্টিকের শিশিবোতল আর থলি পুঁটলি নিয়ে, একজন না একজন গৃহহীনকে পাবই আমরা, কেননা কর্মহীনতা, বাড়ি ভাড়া দিতে না পারা, অসুস্থতা অথবা নিছকই তীব্র গতিশীল প্রতিযোগিতামূলক সমাজে টিঁকে থাকতে না পেরে ইঁদুর দৌড় থেকে ছিটকে পড়া বলেই সেই ব্যক্তির মাথার ওপর খর শীতেও ছাত নেই, খাদ্য জোটে কি জোটেনা, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত লঙ্গরখানায়। আজও, শুনি, আমেরিকায় এক গবেষিকার অধ্যয়নের বিষয় গৃহহীন মানুষের জীবনযাপন, তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকা গান, কথামালা, লোকসাহিত্য, ভাষা। যা প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছেএই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলির সঙ্গে সঙ্গে। সমাজে যে সব মানুষ গুনতির বাইরে, যাদের ইতিহাস নেই, কীর্তি নেই, অতুল ক্ষমতার সাক্ষর নেই, যারা আজ এক স্টেট তো কাল অন্য হাইওয়েতে, নিয়ত বড় বড় ট্রাকে বা ট্রেলারে করে ভ্রাম্যমান।

সাকিনহীন, ভিটেমাটি ছিন্ন, উদবাস্তু মানুষের সংখ্যা, আজও , এই পৃথিবীতে নানা দেশের নানা জাতির ভেতরে কিছু কম নয়। এ কথা আমরা জেনেছি। জানি, জানছি অহরহ।

৩ নিরীশ্বর, অসুন্দরঃ একধরণের বেঘরঅবস্থা

সত্তর দশকের আর এক কবি তুষার চৌধুরী লিখেছিলেন, নিরীশ্বর পৃথিবীর বুলেটিন। কাব্যগ্রন্থটির কবিতার ভেতর থেকে বাইরের দিকে যাত্রা মাথার ওপর আধুনিক মানুষের ঈশ্বর হারানোর বেদনাই শুধু নয়, মানুষের ভিখিরিপনারও যাত্রা, ক্রমানুসারিক, সারিবদ্ধ।

চেতনা, সচেতনতা, বুদ্ধির শাসনও একধরনের ঈশ্বর, মার্ক্সবাদ, নানাধরনের ইজমের চেতনাও এক ধরনের ঐশ্বরিক শাসন। সব ঈশ্বর হারানো মানেই সবরকমের শাসন হারানো। একইসঙ্গে অশক্ত দুর্বল করুণ, একইসঙ্গে দুঃসাহসী ও আইকন ভেঙে ফেলা ধৃষ্টতাএই হল এ সময়ের কবিতার চিহ্ন।

স্নায়ু জননীর তুমি আদুরে খোকন, আবছা চেতনার গাদ

আর্দ্রতার তুলনায় বৃষ্টি কম, তবু ফোটে কদম কেশর

বিষাদ লুকোতে চেয়েসোহাগমুখোশ পরে আছে গুলমোহর

ভোর বলে সেরকম কিছু নেই, ভৈরোঁ টৈরো  ঘোরের প্রমাদ

সরব স্মারকলিপি চতুর্দিকে, মরা ছুঁচো ঠুকরে খাচ্ছে কাক

অস্তিত্বের টকমিষ্টি চরাচরে ঘোরো ফেরো, কে তুমি স্টকার

পরীর বাগানে রাত্রি শিস দেয় ফেরাতে পারোনা তার ডাক

বিনিদ্র তামাক ফুঁকে সময় ওড়াবে তুমি, সাধ্য কি তোমার

নিরীশ্বর পৃথিবীর বুলেটিন জমে ওঠে লেখার টেবিলে

ওঠো উঠে পড়ো, গেঁতো শিকারী, মেরুর হাঁস খেলা করে বিলে

যেভাবে রণজিৎ দাশ লেখেন,

একটি অশুভ ফুল দিতে চাই ঈশ্বরের বিষণ্ণ কবরে!( একটি অশুভ ফুল)

প্রসঙ্গত সেই বোদলেয়ারের সময় থেকে সুন্দর মৃত, ঈশ্বর মৃত, কিন্তু কবিদের চোখ জেগে আছে। র‍্যাঁবোর কবিতাতেও ঈশ্বরকে মেরে ফেলার যাবতীয় চ্যালেঞ্জ। এবং বাকি পরবর্তীতে কেবলি তার পুনরুদ্‌বোধন।

আমার দুয়োরে এসে হেগে যায় কুকুরবেড়াল

প্রভাতে কপাট খুলে আমার দর্শনলাভ ঘটে

প্রণাম প্রণাম যত প্রাণচিহ্ন নোংরায় প্রকাশ

হয়েছে তো কী হয়েছেআমরা কি এত অসুন্দর

আমার দুয়োরে এসে হেগে যায় সুন্দর জীবেরা

একি সৌভাগ্য নয়তোমার দরজায় করে না তো

তোমার গেটে তো থাকে সিকিউরিটিদেখলেই তাড়ায়

কুকুর বেড়াল পাখি ভিখিরি ও ফেরিওয়ালা সবই

সর্বজীবে দূর করে তুমি চাও তকতকে জীবন

ঝুপড়ি উচ্ছেদে তুমি ভদ্রলোকেদের দলে থাকো

প্রাণ ক্রমে হেরে যায়তোমারই বিস্তার ঘটে চলে

জঞ্জাল পড়ে না পথে রাত্রি কাঁদে খিদের জ্বালায়

সব নোংরা প্রাণচিহ্ন মুছে দিলে এত ব্যস্ত হাতে

অসুন্দর জেগে উঠবে মানুষের মগজে মগজে

(নোংরায় প্রকাশঃ  প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দ ভিখিরি থেকে)

আমেরিকার বৃহৎ হেজিমনির পুরাণের ভেতরেও এখন অনেক ভাঁজ। ইন্টারনেটের জমানা হেরে যাওয়া মানুষদের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসে। সহজেই ইউটিউবে শোনা যায় প্রায় অবলুপ্ত কোন রেড ইন্ডিয়ান প্রজাতির গান। অথবা যে কেউ শুনতে পারেন, ট্রাকে ট্রেলারে সারাজীবন ঘুরে বেড়ানো মানুষের কথাবার্তা। দেখতে পারেন এমন ছায়াছবি যা তৈরিই হয়েছে এক সমাজবিচ্যুত কোন মানুষের জীবনকে ডকুমেন্টারি করে।

সবটা মিলিয়ে এক গভীর ও চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল পৃথিবীর ভেতর থেকে ধীরে ধীরে উদ্ভুত হচ্ছেন হেরো মানুষরা।

আলবের কাম্যুর আউটসাইডার থেকে শুরু করে বহু বিখ্যাত আধুনিক ও অধুনান্তিক লেখকের কলম ক্রমাগত বহিরাগতদের কথা বলতে থাকে।  

২০০৯ এর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপক হের্তা মুলার লিখেছিলেন তাঁর পুরস্কৃত উপন্যাস দ্য হাঙ্গার এঞ্জেলএ  রুশ আধিপত্যের গুলাগ এ নির্বাসিত এক মানুষের আখ্যান।  সুইডিশ নোবেল আকাদেমি বলেছিল এই লেখক সম্বন্ধে,  “who, with the concentration of poetry and the frankness of prose, depicts the landscape of the dispossessed.”

২০১৫ তে সভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ ও, বিপন্ন , হেরে যাওয়া, বাস্তুচ্যুত নানা মানুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত বইয়ের জন্যই নোবেল পেয়েছিলেন।

এই তালিকা দীর্ঘ, কিন্তু মূল বিষয়টিতে ফিরি।

যে কোন মুহূর্তে, যে কোন পরিস্থিতিতে সমাজের নতুন নতুন সমস্যার মুখে, ধাক্কা খেয়ে, কিছু মানুষ পর্যুদস্ত, বিচ্ছিন্ন, উৎখাত, উদবাস্তু হচ্ছেন যে পৃথিবীতে, আমাদের চোখ হেরে যাওয়া মানুষদের দীর্ঘ সারি শেষ হবে না কোনদিন।

আমরা কি নিজেদের চেতনার জিতে যাওয়া মানসিকতা ছেড়ে, সেই দীর্ঘ ট্রলারেট্রেকারে চড়ে বসতে পারিনা?

দ্য ফিমেল ইউনাখ : এখনো সজীব এই বই

দ্য ফিমেল ইউনুখ/ জার্মেন গ্রিয়ার

 

একটি মেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে যখন নিজের রূপচর্চা করছে আয়নার সুমুখে, যে মুখকে সে ‘বানিয়ে তুলছে’ তা কি তার নিজের মুখ, না, কোন এক ধারকরা মুখ? পুরুষের ভাল লাগার, কামনার, আকর্ষণের জন্য একটা মুখোশই সে তৈরি করে তুলছে না তো, নিজেকে সাজানোর ছলে? আর ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে না তো, তার নিজস্ব মুখটি?

আসল মেয়েত্ব কাকে বলে? কাকে বলে প্রকৃত নারীত্ব আর কোনটা তার খোলশ? কোনটা আমার আসল মুখ আর কোনটা মুখোশ? আমি কি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি কখনো? নাকি পরত পরত রূপের খোলসের ভেতরে নিজেকে হারিয়েই চলেছি ক্রমাগত?

আমি সৌভাগ্যবান। বড় হতে হতে , অজস্র প্রশ্নের সঙ্গে, ওই  প্রশ্নগুলোও যখন ইতিউতি ভিড় করছে আমার মনের কোণে, সেইরকম এক সময়ে, বয়স যখন ষোল থেকে আঠারোর মাঝামাঝি, সালটা ১৯৮৩-৮৪, সদ্য বিলেত থেকে আমার মাসতুতো বোন ( পূর্বা চৌধুরী, এখন নটিংহাম নিবাসী, তখন লন্ডনে ইশকুলে পড়াশুনো করছে) ডাকে পাঠিয়েছে একগাদা নারীবাদী প্যামফ্লেট আর পত্রিকার কাটিং, যে সব পড়ে কিছুটা রক্ত গরম হয়ে উঠেছে, আর কিছুটা উত্তর পেয়েছি নিজের মনের মধ্যে জেগে ওঠা কিন্তু কারুকে না বলতে পারা নানান প্রশ্নের, সেই সময়েই নিজের ব্যক্তিগত খোঁজ পূরণ করল ফুটপাতের দোকানের এক সেকেন্ড হ্যান্ড বই।

জার্মেন গ্রিয়ারের ফিমেল ইউনুখ।

কান দোমড়ানো বইটার প্রচ্ছদের ছবি, আলনায় টাঙিয়ে রাখা পোশাকে,  এক মেয়ের স্তন-যোনি। চমকে দেওয়া, অনেক কথা বলে দেওয়া প্রচ্ছদ সে। কাঁচা বয়সের মনকে এক ধাক্কায় অনেকটা জাগিয়ে দেওয়াও বটে।

নারীত্বকে খোঁজা কি সমাজের চার দেওয়ালের চাপা বদ্ধ অবস্থায় থাকতে থাকতে শেষ হয় নিষ্ফলতায়?  তখনই কি  উঠে আসে না এই তিক্ত সত্য, যে,  মেয়ের মেয়েত্ব তথা মনুষ্যত্ব হারিয়েছে কবে, রয়ে গেছে শুধু মেয়ের আকারের এক খোজা?

 

আমার হাতে ১৯৮৩ তে এলেও, আসলে তো বইটির প্রকাশ ১৯৭০ এ। প্রথম দুই বছরেই নিঃশেষিত হয়েছে যে বইয়ের দু তিনটি সংস্করণ, এ বই ছাপার অক্ষরের দুনিয়ায় শোরগোল ফেলা এমন এক অস্তিত্ব, যাকে গল্পগাথার অংশ হয়ে উঠতে বেশি চেষ্টা করতে হয়নি।  আমি যতদিনে এ বই পড়ার যোগ্য হয়ে উঠব ততদিনে বেরিয়ে গিয়েছে এ বইয়ের অসংখ্য সংস্করণ , এগারোটা ভাষায় হয়ে গিয়েছে অনুবাদও। ইতিমধ্যেই অতি বিখ্যাত এক সেলিব্রিটি গ্রিয়ার নিজে। ডাকসাইটে বিদুষী, তাত্বিক, তার্কিক, চেহারায় চোখ ঝলসানো, ব্যক্তিত্বময়ী, উইমেন্স লিব এর সামনের সারির যোদ্ধা। বহু প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ নিয়েছেন এই সাহসিনী। জার্মেন সত্তর দশকের নারীবাদী আন্দোলনের কখনো বা অতি-আলোচিত মানুষও বটেন। কেননা তীব্র ভঙ্গিতে তিনি কথা বলেন, অনেকটাই ‘ব্রডকাস্ট’ করেন নিজের বক্তব্য।

এই বইয়ের সিক্যুয়েল, তথা পরবর্তী বই ‘দ্য হোল ওয়োম্যান’ বা পূর্ণাঙ্গ নারী লিখতে লেখকের যদিও লেগে গিয়েছে ২৯ বছর। এমনই লাগার কথা। কেননা, নারী খোজা-র ভবিষ্যত এই ২৯ বছরে কতটুকুই বা পাল্টালো, আর নারীর নিজেকে খোঁজারই বা শেষ হল কোথায়। (দুঃখিত , খোজা-খোঁজার এই ‘পান’ বা শব্দখেলাটি ইংরাজি ইউনুখ-শব্দের  মধ্যে নিহিত বা অভিপ্রেত ছিলনা, এটা আমারই একান্ত নিজস্ব দুর্বলতা। )

প্রথমবারের পড়ার যে অভিঘাত, তা তো আজো পাল্টালো না ‘ফিমেল ইউনুখ’ বইটার। তার মেধা ও মননের দার্ঢ্য আর ভাষার প্রাঞ্জলতা, গবেষকদৃষ্টি আর অনেকটা ব্যপ্ত এক বিশাল পটভূমি আজো আমাকে স্তম্ভিতই করে।

এ বইয়ের সবচেয়ে বড় যে গুণ, তাই এর দোষ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। সেটা এ বইয়ের একপেশেমি। এ বই নারীমুক্তির কথা বলে বলেই, নারীর দিকে পাল্লা ভারি রাখে, আর একপেশেমি , কে না জানে, জন্ম নেয় লড়াকু মনোভঙ্গি থেকে, অথবা অবিচার-অন্যায়ের সুরাহা করার ইচ্ছা থেকে। অর্থাৎ কিনা,  পৃথিবীর বিখ্যাত ও বিতর্কিত অনেক বইয়ের মতই, এ-লেখারও মূলাধার পলেমিক্স।

কাকে বলে পলেমিক্স ? গ্রিক মূল শব্দটির উৎস যুদ্ধ অথবা যুদ্ধং দেহি মনোভাব। একটা বিষয়ে নিজের মত প্রতিষ্ঠায়, বা অন্যের যুক্তিকে খন্ডন করতে, নানারকম ভাবে , নানা দিক থেকে ধারাল  যুক্তির অবতারণাই পলেমিক সাহিত্যের প্রাণবস্তু। এই বইয়ের গোটাটাই তাই।

এই বইয়ের প্রস্তাব হল মেয়ে বা নারীর সামাজিকীকরণের প্রতিটা উপকরণকে ভেঙে ভেঙে দেখব। প্রশ্নহীনভাবে মেনে নেব না কিছুই।

যে যে বিশেষ সংগঠিত যুক্তি বলে, মেয়েদের বোঝানো হয়, পুরুষের থেকে সে হীন, দীন, দুর্বল, শারীরিক ও মানসিকভাবে দ্বিতীয় সারির, সেই সংগঠিত যুক্তি যে পুরুষতন্ত্রের যুক্তি, আর তাকে ভাঙাটাই যে একটা কাজ, বিশেষ মেধা ও মনন দিয়ে তা করতে হয় , সেটাই দেখায় এ বই।

অবশ্যই এই বই পুবের অন্যান্য সংস্কৃতির চেয়ে অনেক তরুণ এক সংস্কৃতিকে প্রশ্ন করে। আমাদের দেশে এ প্রশ্ন তুললে তুলতে হয় মনু সংহিতা বা বেদ-বেদান্ত-সূক্ত-সূত্রের বিরুদ্ধে।  কোরানের মত কোন বৃহৎ শক্তিশালী টেক্সটকে আক্রমণ করতে হয়। গ্রিয়ারকে তা করতে হয় পাশ্চাত্যের কাঠামোয় ধারণ করা যাবতীয় পুরুষ নারীর ভেদাভেদের বিরুদ্ধে । যা চিরকাল নারীর ক্ষেত্রের বৈষম্যকে মান্যতা ও প্রতিষ্ঠা দিয়ে এসেছে। প্রাচীন থেকে নবীন কাল অব্দি ছড়ানো নানা টেক্সট থেকে তুলে আনার এই কাজ শেষ হয় গ্রিয়ারের নিজের সময়ে , আধাশহুরে জনগোষ্ঠীর মধ্যে, ভোগবাদী সমাজে, ছোট পরিবারের প্রেক্ষিতে। এখনো একইভাবে মেয়েরা লাঞ্ছিত, অত্যাচারিত। গ্রিয়ারের কাজ এখানে অসংখ্য বিখ্যাতদের লেখাকে বিশ্লেষণ করে দেখানো, কীভাবে আদিকাল থেকে  পাশ্চাত্য  সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে নারী সংক্রান্ত নানা মিথ বা মিথ্যের লালন পালনে। যেগুলি নারীকে ক্রমশ নিজের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন ই করেছে মাত্র। একাত্ম করেনি। তাঁর ধারালো কুঠার থেকে বাদ পড়েনি ফ্রয়েড অথবা মাসলোর লেখা,  ফালাফালা করেছেন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক জ্যাকি কলিনস-কেও।

 

পুরুষতান্ত্রিক বিশ্বধারণা আসলে পুরুষকেন্দ্রিক বিশ্বধারণাও বটে। একটা জগত, একটা বিশ্ব, যে বিশ্বের কেন্দ্রে বসে আছে যে, সে পুরুষ। আমাদের সংস্কৃতিতেও যেভাবে “খোকা ঘুমলো পাড়া জুড়লো” থেকে “আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে ভ্রমি বিস্ময়ে”, সর্বত্র স্পষ্ট পুং লিঙ্গের খোকা বা মানব-কে সর্বদা হতেই হবে বিশ্বের কেন্দ্রে। সেভাবেই , সব ধারণায় প্রথম প্রস্তাবেই কেন মানব, কেন নয় মানবী, এই প্রশ্ন তোলেন গ্রিয়ার, আর সেই প্রশ্ন তোলাটাই হয়ে ওঠে এক বিপ্লব।

গ্রিয়ার নিজেই যেমন উল্লেখ করেন দ্য ডলস হাউজ, ইবসেনের বিখ্যাত নাটকের নোরার কথা। নোরা প্রশ্ন করে তার স্বামীকে , আমার সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব বা কর্তব্য কী? উত্তর আসে, তোমার স্বামী ও সংসারের প্রতি দায়িত্ব, কর্তব্য। নোরা প্রশ্ন তোলে, না, আমার প্রথম কর্তব্য নিজের প্রতি কেন নয়? আমিও ত এক ব্যক্তি, এক মানুষ, ঠিক তোমারই মত।  আমার স্বামী বা সংসারের প্রতি দায়বদ্ধতা আমি স্বীকার করব, কিন্তু নিজের মূল্যে নয়। আমি জানি তুমি তোমার ওই বইগুলো পড়ে বলে দেবে কেন আমার কথাগুলো সব ভুল। কিন্তু আমি তোমার কথার , আর তোমার বইগুলোর ধার ধারিনা। আমাকে নিজের মত করেই যে বুঝে নিতে হবে, ভেতর থেকে, আমি মানুষ। নিজের পথ আমাকে নিজেই খুঁজতে হবে।

এই পথখোঁজার কাজেই এগিয়েছে ফিমেল ইউনুখ।

গ্রিয়ারের প্রশ্ন তোলার ধরণ নিয়ে অনেক বিস্ময় বা আপত্তি এসেছে। কিন্তু দৃঢ়  আত্মবিশ্বাসী এক তরুণ লেখক, তাঁর বহু পঠনপাঠনে ঋদ্ধ, মেধাবী একটি টেক্সট দিয়ে অনেকের চোখ ঝলসে দিয়েছেন।

একটা বিচারসভায় বিচারপতির কাছে উকিল যেভাবে একে একে একজিবিট দাখিল করেন, সেভাবেই, গ্রিয়ার খুলে খুলে দেখান পুরুষতন্ত্র রচিত সারিবদ্ধ “স্টিরিওটাইপ” এর একজিবিটগুলি। যা থাকে ঐ সব বইগুলোয়, যা পুরুষদের লেখা, পুরুষকেন্দ্রিক বিশ্বভাবনায় নারীকে নানাভাবে তার প্রয়োজনের সামগ্রী হিসেবে দাঁড় করানোর জন্য তৈরি ভাবনা-অস্ত্র।

পুরুষ যখন কেন্দ্রে, তার দরকার হয় মা, স্ত্রী, বোন, সেবিকা, কন্যা, প্রেমিকা, শিষ্যা, এমন কি উৎসাহদাত্রী প্রেরণাদাত্রী, মিউজ। সবটাই তার প্রয়োজনভিত্তিক নির্মাণ যার সঙ্গে সঙ্গে চলে নির্মিত প্রাণীটি, অর্থাৎ নারীর  মুখ বুজে এই এই চরিত্রগুলোতে অভিনয় করার সম্মতি আদায়।

কীভাবে মেয়েদের সম্বন্ধে এই “স্বতঃসিদ্ধ ধারণা”গুলি, যা দীর্ঘ , আজন্ম লালন পালনের নিয়মাবলীর মধ্য দিয়ে ঠুশে দেওয়া হয় , যাকে বলা হয় সামাজিকীকরণ, সেই নিবিড় পদ্ধতিটার মধ্যে দিয়ে কেবলমাত্র জীবতাত্ত্বিকভাবে  যে ছিল ‘ফিমেল’ তাকে মানসিক-মনস্তাত্বিকভাবেও নারী করে তোলা হয় –এই গোটা প্রক্রিয়ার মুখোশ খুলতে চাওয়া বই ফিমেল ইউনুখ।  গ্রিয়ার নিজের কথার সঙ্গে সঙ্গে এও বলবেন, কীভাবে এই ধারণাগুলিকে ভেঙে ফেলতে চেষ্টা করছেন উইমেন্স লিবারেশন আন্দোলনের  অন্য শরিকরা।

শরীর, আত্মা, প্রেম , ঘৃণা, এইরকম কয়েকটি অধ্যায়ে ভাগ করা আছে এই বই।

বইয়ের শুরুতেই ‘সামারি’ অংশটি থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করলেই স্পষ্ট হবে, এ বইয়ের বিভাগ গুলি কী ভাবে সাজানো।

প্রস্তাবনা অংশে তাঁর বক্তব্য একটু পড়া যাক।

‘নারীস্বাধীনতার জন্য যুক্তি সাজানো অসম্ভব, যদি এটাই স্থিরনিশ্চিত  না হয় যে জৈবিকভাবেই নারীকে পুরুষের চেয়ে অধম করে তৈরি করেনি প্রকৃতি।  অথবা নারী-অস্তিত্ব পুরুষ-অস্তিত্বের উপর “অপরিবর্তনীয়ভাবে” নির্ভরশীল। তাই এই বই শুরু হয় শরীর দিয়েই। … এযাবৎকালের বিজ্ঞান অনড় প্রাতিষ্ঠানিক। তা শেখায় স্থিতাবস্থা জারি রাখার কথা। আমরা প্রশ্ন তুলব, কাকে বলে “নারীর স্বাভাবিক” শরীর লক্ষণ?  যাবতীয় পূর্বধারণা বাজিয়ে দেখতে হবে। সামাজিকীকরণের ফলে যে সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে সেই দ্বারগুলি উন্মুক্ত করে দেখতে চাই আমরা। আমাদের নতুন প্রকল্প : যাকিছু আমাদের শেখান হয়েছে শরীর সম্বন্ধে, সবটাই অন্যরকম হতে পারত। শারীরবৃত্তীয় সবকিছু, কঙ্কাল থেকে কোমল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, চুল  – সবটাই দেখব।

‘নারীর যোনি ও যৌনতার ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি করে সামাজিকীকরণের, সামাজিক বিধিনিষেধ মেনে চলার ঘটা। নারীকে যৌন ভোগ্য হিসেবেই দেখান হয়, অপরের ব্যবহারের জন্য, যে অপর, পুরুষ। নারীর অন্য আর কোন যৌনতাকে  অস্বীকার করা হয় এবং নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে ভুল উপস্থাপনা করা হয় তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে। শরীরের বাকি অংশের স্বাধীনতা এবং শক্তি যেমনভাবে চেপে দেওয়া হয়, তেমনি অবদমিত হয় তার যৌনতাও। যোনি মুছে যায় একটি মেয়ের নিজের সম্বন্ধে ধারণার ক্ষেত্র থেকে। যা কিছু প্রশংশিত ও পুরস্কৃত হয় একটি মেয়ের যৌনতার ব্যাপারে, তার সবটাই কাস্ট্রেটেড বা খোজার প্রতীক – নম্রতা, স্থিরতা, ঢিলেঢালা, স্থূল, ফুলের ঘায়ে মূর্ছা যায়-রকমের স্পর্শকাতর… ইত্যাদি ইত্যাদি।

শরীর নিয়ে এই আলোচনা আমাদের শেষ হবে মেয়েদের সবচেয়ে ভুল বোঝা অঙ্গ, প্রজননকারী অঙ্গ, জরায়ুতে গিয়ে। দুষ্ট জরায়ু, যে হিস্টিরিয়া, মেনোপজের ডিপ্রেশন, দুর্বলতা, সার্বিক অক্ষমতার উৎস মেয়েদের।

নারীত্বের ছবিটি নির্মাণ করা হয় শুধু দেহে তো নয়, মেয়েদের মনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনাতেও। তাই ‘স্টিরিওটাইপ’ অংশ দিয়ে শুরু হবে আমাদের মেয়েদের আত্মানির্মাণের কথা।…’

এরপর শক্তি,  শিশুকন্যা, বালিকা, কৈশোর, মনস্তাত্বিক বিক্রয়, উপাদান, নারীশক্তি, কর্মক্ষেত্র… এইভাবে বিস্তৃত হয়েছে গ্রিয়ারের প্রকল্প। প্রেমের আলোচনায় তিনি ‘আদর্শ প্রেম’ থেকে শুরু করে এগিয়েছেন সর্বপ্রেমবাদ, অহংকার, ইত্যাদি দার্শনিক সংস্থান থেকে সরাসরি পুরুষের কল্পনার বিষয় হিসেবে নারীতে এবং মধ্যবিত্তের মনে প্রেম বিবাহের মিথের নির্মিত অবয়বকে ভেঙেচুরে দিতে। অতঃপর পরিবার ও নিরাপত্তাও এসেছে। এসেছে ঘৃণার কথা। একেবারে শেষে বিপ্লবের কথাও।

এই গোটা আলোচনাতেই গ্রিয়ার রেখেছেন তাঁর মেধার স্বাক্ষর। বইটা হাতে নিলে একাধারে টের পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়ায় জন্মে ব্রিটেনে পঠনপাঠন করা ইংরাজি সাহিত্যের সেই মননশীল ছাত্রী ও লেখিকার মননের মধু। অন্যদিকে তীব্র প্যাশনের সংগে নিজের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা দেবার সঙ্কল্প। দুইয়ে মিলে এক চূড়ান্ত যাদু আছে এ বইয়ের পরতে পরতে। ‘অনস্বীকার্য’  এই বই পড়লে হয় আপনি এর পক্ষে, নয়ত, বিপক্ষে , থাকবেনই, উদাসীন কখনোই থাকতে পারবেন না। এ বই পাঠকের মধ্যে জাগিয়ে তুলবে অত্যন্ত গাঢ় প্রতিক্রিয়া, যা আপনাকে পক্ষপাতহীন থাকতেই দেবে না।

আমার কাছে , যে বয়সে এই বই আসার কথা, এখন মনে হয় সেই বয়সেই এসেছিল। জীবন বদলে দেয় এরকম বই , ঠিক যেরকম কেট মিলেট এর সেক্সুয়াল পলিটিক্স ( ১৯৭০), বেটি ফ্রিডান এর ফেমিনিন মিস্টিক ( ১৯৬৩), শুলামিথ ফায়ারস্টোনের দ্য ডায়ালেক্টিক অফ সেক্স ( ১৯৭০)। একবার জীবন বদলালে আর ফিরে আসা যায়না, স্বতঃসিদ্ধগুলির বৃত্তে, যা আমাদের আশৈশবের লালন পালনে পুরে দেওয়া হয়েছিল মাথায়।

মনে পড়ে যায় আমাদের এ পোড়া বাংলার এক যুগ এগিয়ে থাকা কবিতা সিংহকেও। গ্রিয়ারদের সমসময়েই, মহাভারতের অনুষঙ্গ ব্যবহার করে নারীকেই বৃহন্নলা বা খোজা হিসেবে দেখিয়েছেন।  “কিছু কি আলাদা রাখো ?/ শমীবৃক্ষে, রমণী হে একা? /সত্যকার এলোচুল, সত্যকার রমণীনয়ন/ সত্যকার স্তন ?/ খুলে রাখো নিজস্ব ত্রিকোণ ?/ তারপর চলে যাও বিরাট রাজার ঘরে –/ আহা যেন স্মৃতিভ্রষ্ট অজ্ঞাতবাসিনী/ খুলে রেখে চলে যাও সত্যকার শ্রোণী…/ শমীবৃক্ষে অস্ত্র খুলে রাখো/ খুলে রাখো রমণী ধরম/ কিম্পুরুষের সঙ্গে ঘটে যায় পৃথিবীর/ সমস্ত অফলা সঙ্গম।       ( পৃথিবী দেখে না )

 

দুনিয়া জোড়া ইন্টারনেটযোগের এই দিনকালে, আমাদের একটা সুযোগ এসেছে স্বকর্ণে বিখ্যাতদের বক্তব্য শোনার।  বইপত্রের সহজলভ্যতার মতই, ভিডিও বা অডিও রেকর্ডিং এর সুলভতার ফলে বিংশ শতাব্দীর ৪০-৫০ দশক থেকে শুরু করে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনারই কিছুটা আঁচ পাই আমরা এভাবে। এ কিছু কম সৌভাগ্য নয়। সেরকমই দুটি রেকর্ডিং এর মাধ্যমে গ্রিয়ারের কথাবার্তাকে সাক্ষাৎ করলাম, সম্প্রতি।

কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ১৯৭৩ রেকর্ডিং এ, কেমব্রিজ ইউনিয়ন ডিবেটিং সোসাইটির ৭০০ তরুণ তরুণীর সামনে সাংবাদিক  উইলিয়াম বাকলির সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেন জার্মেন গ্রিয়ার। সভার মত এটাই ছিল, ‘কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় উইমেন্স লিবারেশন আন্দোলনকে সমর্থন করে’। এক ঘন্টার সেই বিতর্কে কোন চীৎকার নেই, পরস্পরকে গালি দেওয়া নেই, কোন অযৌক্তিক ব্যক্তি আক্রমণ নেই গ্রিয়ারের তরফ থেকে। বাকলি সামান্য চেষ্টা করেছিলেন গ্রিয়ারকে ব্যক্তি আক্রমণের কিন্তু তাও তা কুৎসার স্তরে যায়নি। বিতর্কের শেষে সোসাইটির বিধি অনুসারে “আয়” ( হ্যাঁ) এবং ‘নো’ ( না) এই দুই মতের ভোট নেওয়া হলে দেখা যায়, সাড়ে পাঁচশো ছাত্র-শ্রোতা গ্রিয়ারের পক্ষে রায় দিয়েছেন, আর দেড়শো বিপক্ষে। গ্রিয়ার তথা নারীবাদ, তথা সত্তরের দ্বিতীয় তরঙ্গের নারীবাদ, যাকে বিদ্রুপ করে কখনো বা  ‘মধ্যবিত্ত মার্কিন মেয়েদের নারীবাদ’ও বলা হয়ে থাকে, গ্রিয়ার যার সঙ্গে একাত্ম ও অঙ্গীভূত, সেই নারীবাদের পক্ষের ভোট ফুলে ফেঁপে উঠছে তখন , ১৯৭০ পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই। অবশ্যই ফিমেল ইউনুখ সে আগুনের অনেকটাই ইন্ধন।

১৯৭৯ এ নিউ ইয়র্কে এক বিশাল জনতার সামনে গ্রিয়ার যোগ দেন, আরো তিন নারীবাদীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, মূলস্রোতের প্রতিষ্ঠানপন্থী/ পুরুষতান্ত্রিক লেখক নর্মান মেইলার-এর সঙ্গে বিতর্কে ভাগ নিতে। ‘টাউন ব্লাডি হল’ নামে এক ছোট ডকুমেন্টারিতে রেকর্ড করা হয় সে বিতর্ক। সেই বিতর্কে দেখতে পাচ্ছি  নাউ অর্থাৎ ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর উওমেন –এর নিউ ইয়র্ক চ্যাপ্টারের সভানেত্রী জ্যাকলিন সিবায়োস ( Jacquelene Ciballes)  বলছেন, “আমি মধ্যবিত্ত, একদা সুখে লালিত” এক মেয়ে, কিন্তু সব আরাম আমি ছেড়েছি নারীবাদের জন্য। আর মধ্যবিত্ত  বলেই আমার লড়াই কিছু কম নয়।

আসলে মার্কিন দ্বিতীয় তরঙ্গের নারীবাদকে লেসবিয়ানিজম-পন্থীদের সঙ্গে,  বা ব্রা পোড়ানোর উৎকট দ্যাখনদারির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার চল  দক্ষিণপন্থী অথবা প্রতিষ্ঠানবাদীদের মধ্যে বহুদিনের। অন্যদিকে বামপন্থীদের চোখে মধ্যবিত্ত মেয়েদের ইনটেলেকচুয়াল এই আন্দোলন নেহাতই ছেলেমানুষি , কেননা তা উপেক্ষা করে অসং খ্য দরিদ্র শ্রমজীবী মেয়েদের আন্দোলনকে, যা তাদের শোষণের ভাগীদার পুরুষ শ্রমজীবীদের আন্দোলনের সঙ্গে অঙ্গীভূত। সেক্স ওয়ার বা লিঙ্গভিত্তিতে বিভাজন তৈরি করা বামপন্থী আন্দোলনকে দুর্বল করবে সুতরাং অভিপ্রেত নয় তা।

উইমেন্স লিব বিট্রেজ দ্য পুওর…এই ছিল পিসনিক তথা বিশ্বশান্তি বা মানবাধিকার  আন্দোলনের কর্মীদের। মার্কিন মুলুকে ষাটের উত্তাল মানবাধিকার আন্দোলনের দিনগুলোতে বলা হচ্ছিল, “ ইকুয়ালিটি ফর অল হিউম্যানিটি” । অর্থাৎ গোড়া থেকেই নারীবাদকে সন্দেহের চোখে দেখার শুরু, মূল ধারার বাম তাত্ত্বিকদের, যদিও, দক্ষিণপন্থীরা উইমেন্স লিব আন্দোলনকে অতি-বাম বা র‍্যাডিকাল পন্থী বলেই অবিশ্বাস করে এসেছেন। এত স্ববিরোধী নানা অবস্থান থেকে দেখা হলেও, এত বছর পরেই কিন্তু নারীবাদীদের, তথা গ্রিয়ারের তোলা কিছু সন্ধানী প্রশ্ন আজো ক্ষুরধার থেকে যায়। কোন উত্তর আজো পাওয়া যায় না অনেক প্রশ্নেরই।

কেউ যদি বলেন, মার্কিন মডেলের এই নারীবাদ দিয়ে আমরা ভারতীয়রা করবটা কী? আমরা এশিয়, ভারতীয় , বাঙালি মেয়েরা মনু বা কোরানের বিধান, সমাজের আর পাঁচটা পুরোহিত বা উলেমার বিধিনিষেধে ওষ্ঠাগত প্রাণ। সেই আমরা, শেষ অবধি কি “ফিমেল ইউনুখ” এর মতন একটা বইকে ধ্বজার মত তুলে ধরে মিছিলে নামব? না কি এর থেকে পাব কোন পথের দিশা? এর প্রকাশের প্রায় ৪৬ বছর পরেও , এর তাৎপর্য কোথায়। আমাদের জন্য, আমাদের পরিস্থিতির উপযোগী নারীবাদ কি আদৌ, এটা? এ ত ভোগবাদী পশ্চিমি দুনিয়ার নারীবাদ।

লক্ষ্য করবেন যে কোন সহৃদয় পাঠক, এই ২০১৬ তে আমাদের এই উপমহাদেশে নারী আন্দোলন যে মুহূর্তে এক অন্য মাত্রা পাচ্ছে নানা সংস্থার কাজের মাধ্যমে, পাশাপাশি,  খবরের কাগজ ছেয়ে রয়েছে তরুণী-কিশোরী-শিশুকন্যা ধর্ষণের কাহিনিতে । কিন্তু তাই কি সব? আরো রয়েছে তথাকথিত “নিরাপদ” “সামাজিকভাবে স্বীকৃত” বিবাহসম্পর্কের “পবিত্র বন্ধনে”র মধ্যেই, অসংখ্য সারিবদ্ধ বধূমৃত্যু। প্রায় সবই পণ নিয়ে বধূকে উৎপীড়ন করে হত্যা, বা আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়া। গৃহাভ্যন্তরের সন্ত্রাস বা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স যত প্রাণ আজো কাড়ছে, তা কিন্তু সীমান্তের সন্ত্রাস বা উগ্রপন্থীদের সন্ত্রাসের বলির চেয়ে ঢের বেশি। অথচ তা নিয়ে আমরা নিরুত্তাপ, আমাদের মোমবাতি মিছিল নেই, এমনকি ফেসবুকে লম্ফঝম্পও নেই।

গ্রিয়ারের বই থেকে একটা অংশ তুলে দিতে ইচ্ছে করে , কত সহজ ভাষায় তিনি বিবাহের বিরোধিতা করেছেন , যুক্তি দিয়ে। সেটা করেছেন আঠারো অনুর্ধ লেখক জন গ্রিনাওয়ে-র লেখা “নিরাপত্তা” বিষয়ক সন্দর্ভের সমালোচনা করতে গিয়ে।

“গ্রিনাওয়ে মিশিয়ে ফেলেছেন জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার সঙ্গে আবেগের নিরাপত্তাকে, আর তা ছাড়া তাঁর করারই বা ছিল কী? আমাদের এই নিরাপত্তার ধারণা নিয়ে যে রহস্য, তার তো অনেকটাই “ইনসিকিওর” ( নিরাপত্তাবোধের অভাবে ভোগা) বিশেষণটি যখন কোন ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, তার মধ্যের নিহিত দোষারোপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষত, ধরেই নেওয়া হয় মেয়েদের বেশি বেশি করে নিরাপত্তা দেওয়া দরকার, প্রেমভালবাসা্র ঘেরাটোপে রাখা দরকার, ঘরের আরাম দিয়ে নিশ্চিতি দেওয়া দরকার।  যে মেয়েরা বিবাহ করেন না, তাই তাঁদের ধরে নেওয়া হয়, নিরাপত্তাকে তুচ্ছ করছেন, একাকিত্বভরা বৃদ্ধ বয়সের মুখোমুখি হবেন, এবং নিজেকে ঠেলে দেবেন দারিদ্র্য আর অবক্ষয়ের দিকে। কিন্তু স্বামীরাও তো মারা যান, পেনশন দিয়েও ত সংসার চলে না, বাচ্চারা বড় হয়ে দূরে চলে যায় এবং মায়েরা ক্রমশ ‘শাশুড়ি’ হয়ে ওঠেন। মহিলারা বিবাহিতা বা অবিবাহিতা যাই হোন না কেন, তাঁদের কাজ কোনোদিন সম্মান পায়না, তা ঘরেলু কাজ, এবং অল্পমাইনের কাজ হিসেবেই বিবেচিত হয়। মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার সব সময়েই খন্ডিত, বেশি করে তা খন্ডিত হয় যদি তিনি বিবাহিত হন। তাহলে, বিবাহ নিরাপত্তা দিল কীভাবে? যদি স্বামীকে ধরা যায় এক সম্পত্তি … আর সেটা যদি কখনো হারিয়ে যায়, স্বামীহারা মেয়েটি সন্তানসহ তো আরো গভীর জলে পড়েন, অবিবাহিতার তুলনায় তাঁর জীবনের সংগ্রাম বা ভারাক্রান্ততা তো আরো অনেকটাই বেড়ে যায়। “

এই যুক্তির অভিমুখ , অবশ্যই , গ্রিয়ারের মূল অ্যাজেন্ডার সঙ্গে সমান্তরাল। শুধু ফিমেল ইউনুখ এর মত বইতে তিনি বার বার তুলে তুলে এনেছেন বিখ্যাত লেখকদের লেখা থেকে সেই সব অংশ যাতে করে পুরুষতন্ত্রের নিশ্ছিদ্র বলয় আরো পোক্ত হয়। আর তাদের পরাভূত করতে চেয়ে তিনি ছিদ্র বানাতে চেয়েছেন এই পুরু, পোক্ত , নিরেট বলয়ে। একশোজন পুরুষতান্ত্রিক লেখকের( যাদের কেউ কেউ মহিলাও হতে পারেন)  বিরুদ্ধে একা কলম ধরতে চেয়েছেন।

এই বইয়ের তাৎপর্য তো কোন সময়সীমার মধ্যে ফুরিয়ে যাবার নয়। বারংবার পড়ে, বারংবার অনুভব করার, আমাদের এই মুহূর্তের জীবনে আমাদের চারিদিকে কীভাবে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে পুরুষতান্ত্রিক কিছু বদ্ধ ধ্যানধারণার আপাত স্বতঃসিদ্ধ জাল। মেয়েত্ব কাকে বলে, কাকে বলে মরদ? “যদি মরদ না হই ত হাতে চুড়ি পরে নেব” এমন কথা শুনতে শুনতে বড় হয়ে ওঠা মেয়েদের কানে মধু ঢালে না “মেয়েলি” নামক বিশেষণটি। অথবা, মেয়েলি বললেই মাথার মধ্যে ফুটে ওঠা কিছু ছবি, নির্জীব, শক্তিহীন, ন্যাকা, সরু গলায় কথা বলা বা এঁকেবেঁকে হাঁটা এক অসহায়তার মূর্তি। কিচ্ছু না পারাটাই যখন মেয়ে হয়ে ওঠার সাফল্য, তখন কবিতা সিং হের “আমিই সেই মেয়েটি” কবিতার মত, ধাঁ করে একটা বাসে উঠে পড়া, অথবা , নিজের বাড়ির ইলেকট্রিক ফিউজের তার নিজে পালটে ফেলতে পারা, আমাদের “পুরুষালি” বলে প্রমাণ করবে… তাই কি আমরা অনেকে ভয় পাই ওগুলো করতে?

প্রশ্নের পাথরে নিজেকে ক্ষতবিক্ষত করাটাই তো আসলে  এক সারা জীবনের কাজ।

 

চাকুরে কন্যার কাহিনি

 

চাকুরে কন্যার কাহিনি

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

ছোটবেলায় একটা সহজ সুন্দর কার্টুন দেখেছিলাম, যে সময়ে নারীবাদে হাতেখড়িও হয়নি।

একটি  মেয়ে তার বাবাকে জিগ্যেস করছে, বড় হয়ে আমি কী হব, বাবা?

বাবা বলছেন, তুই ডাক্তার হতে পারিস।

মেয়ে বলছে, কেন, কেন, আমি তো নার্স হব। ডাক্তার তো ছেলেরা হয়।

বাবা হাঁ করে তাকিয়ে আছেন।

এই একই কথা ছোট্টবেলায় আমাদের মাথায়ও আসত। তখনো পৃথিবীতে নারীপুরুষের সংজ্ঞায় অনেক কিছু শিখতে বাকি। ইংরিজি ছবির বই মাত্রেই, সাদা পোশাকের ডাক্তার পুরুষ আর সঙ্গের নার্স মহিলা। এর ব্যত্যয় দেখিনি কখনো। প্রশ্নটা ওই ছোট্ট মেয়েরই মত মাথায় এসেছে অবচেতনে কখনো না কখনো।

বড় হয়ে গেলাম কবে যেন। কিন্তু অজস্র বান্ধবী ডাক্তার হবার পরে, অসংখ্য বিজ্ঞাপন, ছায়াছবি , ম্যাগাজিনের ছবি সবকিছুতে মেয়ে ডাক্তারদের ছবি ছাপার পরে, আজ মাথার মধ্যে আমার অন্য প্রশ্ন জাগে।

কতখানি মুক্ত, কতখানি সহজ, কতখানি অনায়াস ডাক্তারির জগতে মেয়েদের হাঁটাচলা?

দুটো ছোট ঘটনা মনে পড়ছে। এক, এক চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডাক্তার ( পুরুষ তিনি) এর স্ত্রী গাইনোকলজিস্ট। ছেলের পরীক্ষার আগে মা হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়েছিলেন, বাবা নেন নি।

দুই, আমার বান্ধবী , ডাক্তারিতে ভাল রেজাল্ট করেও বিয়ের পর ১৫  বছর কোন কাজে যোগ দিতে পারেনি, কেননা ছেলে ছোট আর শ্বশুরবাড়িতে বলা হয়েছিল , আমাদের ছেলের যা মাইনে, তাতে বউমার চাকরি করার দরকার কী? এতো পরিবারের অসম্মান।

আজকের দিনে যে মেয়েরা ডাক্তারি পাশ করে বেরোয়, তাদের মনে হয় এই “স্বাভাবিক” ডিসক্রিমিনেশনের মুখোমুখি হতে হয়না!

যা হোক, যে ক্ষেত্রটা বেশি চিনি , তা নিয়েই দু চার কথা বলি বরং।

আমি যে চাকরিটা করি, সেটা ভারতের সিভিল সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবছর কেন্দ্রীয় পাবলিক সার্ভিস কমিশন আট থেকে নশোটা ফাঁকা পদ পুরণ করে একটা পরীক্ষার মাধ্যমে। সেই পরীক্ষায় যারা ছাঁকনিতে ছেঁকে ওঠেন, তাঁদের মধ্যে আবার মেরিট অনুসারে, এবং তাঁদের পছন্দের তালিকা অনুসারে, নানা সার্ভিসে অ্যালট করে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, কে বাকি জীবন কী কাজ করবেন সেটা নির্দিষ্ট হয়ে যায় পরীক্ষার ফল বেরোবার সঙ্গে সঙ্গেই। সুতরাং, ১৯৯১ সালের পরীক্ষার ভিত্তিতে আমার চাকুরিপ্রাপ্তির পর পরই নির্ধারিত হয়ে যায়, আমি ভারতীয় অডিট ও অ্যাকাউন্টস সার্ভিসের সদস্য হব।

ভাগ্যক্রমে, এই সার্ভিসটি আমার পছন্দের তালিকাতেও ছিল। যদিও ওই পরীক্ষাটি দিতে যারা যায় তাদের অভীষ্ট থাকে আই এ এস বা ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে যোগ দেওয়া ( যার ফলে পরীক্ষাটার একটা মোটা দাগের নাম হয়ে গেছে আই এ এস পরীক্ষা), কিন্তু বছর বছর আই এ এসের ভেকেন্সি বা ফাঁকা পদের সংখ্যা পালটে যায় এবং অতি বড় ভাগ্যগণকও বলতে পারবে না, কে আই এ এস পাবে কে পাবে না।

ভারতে আই এ এসের সম্বন্ধে বলা হয়, রাজার সার্ভিস। কেন তা বলা হয়? কেননা, ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিসট্রিক্ট কালেকটরের যে মূর্তিটি একদা নয়া জমিদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল ( শোলা হ্যাট ও সাইকেল সহকারে), তা ক্রমে ক্রমে ওয়েলফেয়ার স্কিম অর্থাৎ সরকারের যাবতীয় দান খয়রাতের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।   সরকারি প্রশাসন যন্ত্রের মূল কাঠামোটা আই এ এসদের মধ্যেই দিয়েই জনগণের সঙ্গে যোগ রেখে চলে, অন্যদিকে, এই সার্ভিসটি প্রকৃতপক্ষেই সরকারের ডানহাত হিসেবে বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা ভোগ করে।  অসুবিধা যে কিছু নেই তা নয়। যেমন রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধাচরণ করলে, তার ফল হতে পারে সপাটে অন্যত্র পোস্টিং, বোরা বিস্তর বেঁধে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যেতে হতে পারে।

পুলিশ অথবা বিদেশ সেবা , এ দুটোরও দিব্যি জাত আছে জনমানসে। পুলিসের যে ধারাটি আসছে ঐ সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা থেকে, তার নাম ইন্ডিয়ান পুলিস সার্ভিস, বছর ছ সাত চাকরি করলেই জেলার পুলিস সুপার হতে পারার সুযোগ। বিদেশ সেবা একদা খুব প্রীতিকর ছিল। এখন তার কদর কমেছে, কেননা প্রবাসে, বান্ধবহীন অবস্থায়, গুটি কয়েক অধস্তন ভারতীয়কে নিয়ে, নির্জন কোন দ্বীপে বা মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি শীতে পোস্টিং করার তুলনায়, ভারতের ভেতরেই পোস্টিং করাটা সবার কাছে আকর্ষণীয়। সবচেয়ে বড় কথা, হাতের ভেতর দিয়ে কতটা টাকা গলছে তার হিসেবেই মাপকাঠিটা বাঁধা হচ্ছে। একজিকিউটিভ সার্ভিস, এঁদের হাত দিয়ে টাকাপয়সার সরাসরি লেনদেন চলে, কেননা এঁদের হাত দিয়েই রূপায়িত হয় সরকারের কাজের রূপরেখা।

আমার সার্ভিসটি এই সবের তুলনায় কম উল্লিখিত, জাত আছে  তবে বেশি কেতাবি, তুলনামূলকভাবে ডেস্ক জব। নাইন টু ফাইভ জব । কেননা, আমাদের কাজ শুরু হয় পোস্ট মর্টেম হিসেবে। যখন শেষ হয় একজিকিউটিভের কাজ, তখন শুরু হয় অডিটের কাজ। নিয়ম কানুন মেনে টাকা খরচ হয়েছিল কিনা, তা থেকে শুরু করে, যে টাকা খরচ হয়েছে, তার সবটাই উদ্দিষ্ট ক্ষেত্রে পৌঁছেছে কিনা, সবটাই দেখার কাজ করেন অডিট ডিপার্টমেন্টের লোক। ফলো দ্য রুপি, বা একটা টাকা মূল থেকে গন্তব্য অব্দি পৌঁছল কিনা তা গোয়েন্দার মত পিছু নিয়ে ট্র্যাক করার কাজটাই আমরা করে থাকি। এই টাকা অবশ্যই হতে হবে সরকারি টাকা, কনসলিডেটেড ফান্ডের থেকে যার উৎস।

মেয়েদের ভূমিকায় এবার প্রবেশ করি।

ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের যে কোন চাকরিতেই বেশ কিছু বছর ধরেই অনেক নারীর যোগদান আছে। কিন্তু তার ভেতরেও অনেক রকমের প্যাঁচ আছে। যেমন মনে পড়ছে, ১৯৯১ তে আমার লিখিত পরীক্ষার ফলের ওপর ভিত্তি করে যে মুহূর্তে ইন্টারভিউতে ডাক পাওয়া, সে মুহূর্তেই কানে এসেছিল , অবশ্যই পুরুষ প্রার্থীদের একটি কথা, পেয়ে যাবে, পেয়ে যাবে, মেয়েদের একটা কোটা আছে, হিডেন কোটা, কুড়ি শতাংশ মহিলা নেবেই ইউ পি এস সি!

অর্থাৎ, মেরিটে তুমি যেখানেই থাকো না কেন, আসলে তোমাকে চাকরিটা দেওয়া হচ্ছে দয়া দাক্ষিণ্য হিসেবেই, তোমার থেকে দশগুণ যোগ্য পুরুষ প্রার্থীকে ডিঙিয়ে তুমি চাকরি পেয়ে যাচ্ছ, কেননা তুমি মেয়ে।

বলাই বাহুল্য কোন লিখিত রুল রেগুলেশনে এই “মহিলাদের জন্য হিডেন কোটা” নামক দিবাস্বপ্নটির কোন স্থান নেই। ওটা সম্পূর্ণ পুরুষ প্রার্থীদের মস্তিষ্ক প্রসূত বলেই মনে হয়।

যেখানে সংখ্যার ওপোর ভিত্তি করে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারিত হয়, সেখানে পুরুষ বা নারী, সকলেই তো শেষ মেশ একটা রোল নম্বর মাত্র। ইন্টারভিউতে চাক্ষুষ দেখাসাক্ষাৎ ঘটলেও, তা কি এতটাই বায়াসড হতে পারে, মেয়েদের প্রতি, যে মেয়েরা ঠিক গুণে গুণে কুড়ি শতাংশ অব্দিই ঠাঁই পান সিভিল সার্ভিসে?

এ তো গেল একটা মিথ।

অন্য মিথ, আরো চমৎকার। অডিট অ্যাকাউন্টস সার্ভিস নাকি “মেয়েদের জন্য আইডিয়াল” সার্ভিস। কেন? কেননা ডেস্ক জব, কেননা নাইন টু ফাইভ জব, কেননা পুরোটাই কেতাবি। রাত বিরেতে রেডে বেরোন নেই, গুন্ডাদের সঙ্গে মারপিট নেই, এমনকি রাজনৈতিক নেতাদের রক্তচক্ষুও নেই।

অথচ, আমাদেরই অনেক বান্ধবী ইনকাম ট্যাক্স সার্ভিসে সারারাত রেড করেছেন, অনেকেই পুলিশে গিয়ে সফলভাবে মারপিট করেছেন, আর  কে না জানে যে ফিল্ডে নেমে মারপিট করা ছাড়াও পুলিশের আরো অনেকগুলো কাজ আছে এবং কিছুটা পদোন্নতির পর সবটাই মাথা খাটানোর কাজ, আইনের রক্তচক্ষুকে বাঁচিয়ে নানান ধরণের ক্রাইমের গ্রে-স্কেলের চুলচেরা বিশ্লেষণ আর ক্রিমিনালদের টাইট দিতে পারা-না-পারার কাজ।

অথচ, দেখা যাবে, অডিট ডিপার্টমেন্টের পুরুষেরা, নিজেদের কাজটাকে সর্বদাই অন্যান্য একজিকিউটিভ সার্ভিসের সঙ্গে তুলনা করে দুঃখ পেয়ে চলেছেন। কেন, তা লিখিত আকৃতিতে না-ই বা লিখলাম। দুর্জনে বলে থাকেন, আমার সার্ভিসে উপরির সুযোগ কম।

আর যে কাজে উপরি নেই, বিয়ের বাজারে সে কাজের কদর যে কম, কে না জানে।

যাইহোক,  মিথ তো আছে ভাঙবার জন্যেই।  আমি ও আমার মত অনেক নারী, অডিট সার্ভিসে থেকেই , দেরি করে অফিস ছেড়েছি কাজের চাপে, প্রবল ট্যুরিং করার সুফল কুফলে রীতিমত পালিশ হয়ে গেছি , কাজের চ্যালেঞ্জ নিতে এতটুকু পিছপাও হইনি, আবার বিদেশ ভ্রমণ করে ফেসবুকে ছবি পোস্টও করেছি। আর এখনো “মেয়েদের জন্য ভাল” অডিট সার্ভিসে মাত্র এক তৃতীয়াংশের কাছাকাছিই কেন মহিলা, তার কোন ব্যাখ্যা পাইনি। যদি এমনই হত যে এটা “মেয়েলি” সার্ভিস তাহলে অন্তত আশি শতাংশ মহিলা থাকা উচিত ছিল…তা তো নেই। অন্যান্য কয়েকটি প্রধান অ্যাকাউন্টস সার্ভিস আছে এই একই পরীক্ষা দিয়ে যে সব সার্ভিসে প্রবেশ করা যায়, সিভিল অ্যাকাউন্টস ডিফেন্স অ্যাকাউন্টস, রেলওয়ে অ্যাকাউন্টস , টেলিকম অ্যাকাউন্টস, ইত্যাদি। সেখানেও ডেস্ক জবের সূত্রে মহিলাপ্রাধান্য হবার কথা অডিট সার্ভিসের মতই। সে সব ক্ষেত্রে কিন্তু দেখা যাবে চিত্রটা একই রকম।

একটা কথা এখানে স্পষ্ট করে রাখতে চাই, যে আমি যে চাকরিটা করি তা কিন্তু কোনভাবেই ভারতের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর কর্ম সংস্কৃতির প্রতিভূ নয়, বরঞ্চ অত্যন্ত সংখ্যালঘু একটি দল। কেননা, ওপরের সারিতে প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত কেন্দ্রীয় সরকারের গ্রুপ এ সার্ভিসের সদস্যদের মধ্যে ক’জন মহিলা, তা থেকে গোটাভারতের ছবি কিছুতেই উঠে আসবে না।

গোটা ভারতের কথা পরে বলছি। আগে বলি, আমার ডিপার্টমেন্টেই, একটু নিচের দিকে মেয়েদের অংশগ্রহণের অপ্রতুলতার কথা। নানা স্তরের চাকরিতে মেয়েদের অনুপ্রবেশ দেখলেই “শিক্ষিত”, “মধ্যবিত্ত” মেয়েদের চাকরির ছবিটা স্পষ্ট হবে। এবং যে কোন মিথ ভেঙে যাবে।

আমার অফিসে আমি যে পদে আসীন, তার তলায় তিন-চারটে ধাপ।  আছে অডিট অফিসার এবং অ্যাসিস্টেন্ট অডিট অফিসার ক্যাডার। এখানে তীব্রভাবে প্রকট হবে পুরুষতান্ত্রিকতা। এই ক্যাডারকে বলা চলে অডিটের কাটিং এজ, বা জনগণের সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টিকারী অংশ। আমাদের ক্ষেত্রে অবশ্য সংযোগ  জনগণ না, অডিটি সংস্থার সঙ্গে।  মানে যাদের আমরা অডিট করছি ।

যেটা আগেই বলেছি, গ্রুপ এ ক্যাডারে যদি সার্বিক সংখ্যার এক তৃতীয়াংশ হন মহিলা, এই তলার ক্যাডারের মধ্যে যেটি অডিট অফিসার/ অ্যাসিস্টেন্ট অডিট অফিসার, অর্থাৎ গ্রুপ বি ক্যাডারে সেটা দশ ভাগের এক ভাগ। ১০০ জনের মধ্যে দশ জন মহিলা । ্তার নিচে গ্রুপ সি ক্যাডারে, যেখানে অডিটর, ডেটা অপারেটর, ক্লার্ক টাইপিস্ট পোস্টগুলি, সেই ক্যাডারে মেয়েদের সংখ্যার অপ্রতুলতা আরো বেশি। এ থেকে দুটো জিনিশ বোঝা যায়। এক, ঘুরে ঘুরে অডিট করার চাকরির ব্যাপারে , অন্তত সরকারি চাকরির একেবারে নিচের থাকে এখনো মেয়েরা অপ্রতুল। চাকরির আনুষঙ্গিক অবস্থাগুলো যেখানে মেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর মত ততটা নয়।

দুই, উচ্চশিক্ষিত উচ্চবিত্ত বা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি থেকে মেয়েরা যে হারে আসছেন সরকারি চাকরিতে, তলার থাকগুলো থেকে ততটা আসছেন না, অ্যাপিয়ার হচ্ছেন না বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায়।

একেবারে নিচের নতুন থাক এম টি এস। ২০১০-১১ তে পরীক্ষা নিয়ে অতি সম্প্রতি এক ঝাঁক নতুন ছেলে মেয়েকে ইনডাক্ট করা হয়েছে সেখানে। এই চাকরির পরীক্ষায় বিপুল কম্পিটিশন হয় । যেহেতু , সরকারির চাকরির বিজ্ঞাপনই বেরোয় খুব অনিয়মিত, ইদানীং ফ্রিজ হয়ে ছিল বহু বছর।  আগে যে পোস্টগুলিকে গ্রুপ ডি পোস্ট বলা হত, দারোয়ান,  সাফাইওয়ালা, পিওন, ভিস্তি ইত্যাদি ইত্যাদি প্রাগৈতিহাসিক নামকরণ ঘুচিয়ে ইউফেমিজম করে “মাল্টি টাস্কিং স্টাফ” নামের মিষ্টি আবরণের তলায় রেখে সেই পোস্টে  বিপুল লোক নেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। এখানে উলটো চিত্র, পঁচিশজনের মধ্যে পাঁচজনই মহিলা।

এবং এই পঁচিশজনই বি এ , এম এ পাশ, কেউ কেউ চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সি পাশ, কেউ কেউ এম টেক অব্দি! মেয়েরা তথৈবচ! কম্পুটারে ডিপ্লোমা আছে, ভূগোলে এম এস সি, মেয়েটিকে ঘরে ঘরে ফাইল বা জল পৌঁছে দিতে আমরাই বাধা দিয়ে, আই টি বিভাগে পোস্ট করতে বাধ্য হয়েছি।

অর্থাৎ, সময় পাল্টাচ্ছে। সে সময়টা আসছে তাতে ছেলে কি  মেয়ে কোনটাই না দেখে বাবা মায়েরা উচ্চশিক্ষিত করে তুলছেন এবং তারা সমানভাবেই চাকরির বাজারে ঢুকে পড়ছে, তারপর সরকারি চাকরির ভেকেন্সির অপ্রতুলতায় তারা যে কোন সরকারি চাকরিতেই অ্যাপ্লাই করছে, কমপিটিটিভ পরীক্ষাতেও বসছে।

কিন্তু এক্ষেত্রে এই নয়া প্রজন্মের মেয়েদের বিশাল একটা অংশ সরকারি চাকরির হায়ারার্কি অর্থাৎ উল্লম্ব যে ছোটবড় ভেদাভেদ আছে ( যা জাতিভেদ প্রথার চেয়ে কম কিছু নয়) তার সঙ্গে কীভাবে অ্যাডজাস্ট করতে পারছে, তাদের প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে কিনা, কাজের ক্ষেত্রের ব্যাক্তিগত-নৈর্ব্যক্তিক পরিসর কতটা রক্ষিত কতটা লঙ্ঘিত হচ্ছে, এগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার ও অনুধাবন করার দরকার আছে।

আর প্রয়োজন আছে পরিসংখ্যান গুলো নিয়ে বসে তুলনামূলক পর্যালোচনা করবার, প্রাইভেট সেক্টর ও সরকারি সেক্টরের মধ্যে কতটা ফারাক আছে  লিঙ্গগত বৈষম্যের এই সংখ্যাগুলোকে দেখলে।

 ৪

আগেই বলেছি, সরকারি চাকুরেরা সমগ্র ভারতীয়দের অতি ক্ষুদ্র অংশ। তাই , গোটা ভারতের পরিসংখ্যানের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিতে পারলে ভাল, নইলে যে অংশের হয়ে আমি কথা বলছি তার প্রতিনিধিত্বের মূল্যমান কতটা তা স্পষ্ট হবে না পাঠকের কাছে।

২০০১ এর সেন্সাস বা জনগণনা অনুসারে ভারতের মোট কর্ম-ক্ষম জনগণের সংখ্যা ৪০ কোটি। তা গোটা দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ। এর ভেতরে ৩১.২ কোটি মূল কর্মী আর ৮.৮ কোটি হলেন প্রান্তিক কর্মী, অর্থাৎ যাঁদের তার আগের বছরে ১৮৩ দিনের ওপরে কাজ ছিল না।

কর্মক্ষম   চল্লিশ কোটি মানুষের ভেতরে ১২.৭ কোটি মাত্র নারী। অর্থাৎ ২৫.৬% নারী আছেন ভারতীয় কর্মক্ষেত্রে। মূলধারা আর প্রান্তিক কর্মীদের মধ্যে যদি তুলনা করি, দেখব, মূলধারায় মাত্র ২৩.৩ % কর্মী হলেন মহিলা। অথচ প্রান্তিক ধারায় মহিলারা পুরুষদের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে কর্মী মহিলাদের ৮০ শতাংশই কিন্তু আসছেন গ্রাম থেকে। অর্থাৎ চাষবাসের কাজের সঙ্গে যুক্তদের একটা বিশাল অংশই যেমন প্রান্তিক ধারার, তাঁদের অর্ধেকের ওপরই মহিলা।

শহরের কর্মীদের মধ্যে ঘরে ঘরে কাজ করার মহিলার সংখ্যাই বেশি।

এবার আসি , সরকারি বেসরকারির হিসেবে। অবশ্যই এটা অর্গ্যানাইজড সেক্টরের কথা। লেবার ব্যুরো, কেন্দ্রীয় সরকারের ২০০৫ এর একটি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩০ লাখ মহিলা পাবলিক সেক্টরে কাজ করেন, আর ২১ লাখ মহিলা প্রাইভেট সেক্টরে। কিন্তু কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যানের যথাযথতা কতখানি বলা মুশকিল। একটা অর্থে ধরেই নিতে পারি যে অর্গ্যানাইজড সেক্টরে যেটুকু যা মেয়েদের অংশগ্রহণ, সেনসাসের মাধ্যমে বা অন্যান্য রিপোর্টিং এর মাধ্যমে তা ধরা পড়বে। কাজেই এই তথ্যটুকুকে কাজে না লাগিয়ে আমাদের উপায় নেই।

সাম্প্রতিক কিছু স্টাডিও বলছে, মেয়েদের অর্গ্যানাইজড সেক্টরে বেশি না আসার কারণ প্রথাগতভাবে বিয়ের পর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা। এবং কিছু ক্ষেত্রে চাকরি ছেড়ে দেবে এই ভয়ে, তাদের প্রাইভেট সেক্টর ফার্মগুলি নিতে চাইছে না। অর্থাৎ একটা পঙ্কিল আবর্তের মত কাজ করছে এই ব্যাপারটি। এর সঙ্গে সঙ্গেই ওই স্টাডি থেকে আরো দেখা যাচ্ছে যে কর্মক্ষম মহিলাদের ( ১৫ থেকে ৫৯ বয়সী) মাত্র ৬.৫% হাই স্কুল পাশ করেছেন। সুতরাং  যে সব কাজে কলেজ-পাশের বিদ্যে দরকার বা কোন বিশেষ কাজের দক্ষতার প্রশিক্ষণ দরকার এমন ভাল মাইনের চাকরি জুটবে না সেই সব মেয়েদের, যাঁরা সামান্য লেখাপড়া করেছেন। ফলত মেয়েরা অধিকাংশই কাজ করেন খুব খারাপ মাইনেতে।

আর সেখানেই লিঙ্গবৈষম্য মারাত্মক। সামাজিক সুরক্ষা থেকে শুরু করে  ছুটিছাটার সুযোগ ( বিশেষ করে মেটার্নিটি লিভ) বা অন্য কোন রকম সুযোগ সুবিধা তো তাঁদের নেইই, এমনকি সমান মেধা বা দক্ষতা সম্পন্ন পুরুষদের থেকেও তাঁরা অনেক কম মাইনে পান। যেখানে নিরক্ষর এক পুরুষের দিনমজুরি ১৭৭ টাকা, এক নিরক্ষর মহিলার মজুরি ৮৫ টাকা মাত্র।

 

জানার চেষ্টা করি, এইসব মেয়েরা কোথায় কাজ করছেন তাহলে?

ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে অরগ্যানাইজেশনের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০০৯-১০ এই সময়কালে,  এক লক্ষ গৃহ থেকে সংকলিত তথ্যের ভিত্তিতে, ভারতে নারী কর্মীর সংখ্যা, ১১.২ কোটি। (২০১১ র জনগণনা অনুযায়ী দেশে নারীর সংখ্যা ৫৮ কোটি)। লক্ষ্য করব, আগেই যে তথ্য পেশ করেছি, তার ভিত্তি ছিল ২০০১ এর জনগণনা। সেখানে বলা হয়েছে নারী কর্মীর সংখ্যা ১২.৭ কোটি। অর্থাৎ ২০০১ এর জনগণনার চেয়ে ২০১০ এর রিপোর্টে নারী কর্মীর সংখ্যা কম দেখা যাচ্ছে। যাই হোক, মূলত কোথায় কাজ করেন এঁরা?

 

১। চাষবাস, পশুপালন – ৬৮ শতাংশ

২।  তামাক শিল্প, বস্ত্র শিল্প, দর্জির কাজ- ১০.৮%

৩। গৃহনির্মাণ কাজ ( মূলত ইঁট, বালি ইত্যাদির বহনের শ্রমিক হিসেবে) – ৫%।

৪। ইস্কুল/কলেজ – বিভিন্ন স্তরে শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত থাকা -৩.৮%

৫। মুদি -দোকান দেওয়া ( চাল ডাল তেল খুচরো সবজি এবং পানসিগারেটের দোকান দেওয়া)  ২.১

৬। গৃহকর্ম  ( ঝাড়পোঁছ , বাসন মাজা , কাপড়কাচা প্রভৃতি ) ১.৬%

৭। ব্যক্তিগত সেবা ( ম্যাসাজ, বিউটি ট্রিটমেন্ট, বেবি সিটিং ইত্যাদি) ১.৫%

৮।স্বাস্থ্য সেবা ১.১ %

৯।  ব্যুরোক্রেসি ( সরকারি চাকরি) ১%

 

লক্ষ্যণীয় যে, চাষবাস থেকে শুরু করে নির্মাণ ও শিল্প সর্বত্রই সামান্য হলেও মেয়েদের যোগদান গত দশবছরে কমে এসেছে দেখা যাচ্ছে। এমনকি গৃহকর্মের ক্ষেত্রেও মেয়েদের যোগদান কমেছে সংখ্যাতত্ত্বের নিরিখে। দুই শতাংশ থেকে নেমে ১.৬% । একমাত্র ব্যুরোক্রেসি তেই, .৭ % থেকে উঠে গেছে ১% এ !

 

 

সেই এক শতাংশেরই একজন আমি। কেমন করে আর বলি , আমি তোমাদেরই লোক । সমাজ সুরক্ষা থেকে পেনশন, গ্রাচুইটি আরো নানা রকমের সুযোগ সুবিধায় লালিত সরকারি কর্মচারী, লোকে বলে এ চাকরি পাওয়া কঠিন, ছাড়া আরো কঠিন। ছাড়ালেও না ছাড়ে, আমার এক বান্ধবী স্বামীর সঙ্গে বিদেশ গিয়ে ছ বছর কাটিয়েছিল উইদাউট পে, তারপরও তার প্রোমোশন অর্ডার বেরিয়ে যায়, কালচক্রের নিয়ম অনুযায়ী, সে লিখে লিখেও নিজের রেজিগনেশন অ্যাক্সেপট করাতে পারছিল না তার ডিপার্টমেন্টে!

 

তো এইহেন সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রটিতে বিচরণ করে আমরা কীভাবে বেড়াই? কতটা সুবিধাভোগী এই শ্রেণীর ভেতরে আবার মহিলা অফিসার কুল?

 

দুটো গল্প বলি।

এক, আমার এক সিনিয়র , আমারই সার্ভিসের, ভদ্রমহিলার সঙ্গে একদিন কথা হচ্ছিল। আশ্চর্যভাবে মিলে গেল দুটি অভিজ্ঞতা, যে গাড়িটি আমরা চড়ি, অফিস থেকে দেওয়া এবং বিশেষভাবেই চিহ্নিত, কারণ ওপরে গভর্মেন্ট অফ ইন্ডিয়া লেখা থাকে, এবং মাথায় একটি লাল টুপির মত বাতি থাকে ( যে বাতিটা ইদানীঙ খুলে নিতে হয়েছে, অন্তহীন অপব্যবহারের ফলে যে বাতিটি এখন শুধুমাত্র গুটিকতক ব্যক্তিই ব্যবহার করতে পারবেন যে কোন রাজ্যে, রাজ্যপাল, চিফ জাস্টিস, মুখ্যমন্ত্রী, ইত্যাদি ইত্যাদি বাদে, আর কেউ নয়, কিন্তু সে অন্য এক গল্প)। গাড়িতে চড়ার জন্য পুরুষ অফিসারদের কিছু কেতা কানুন আছে, যেমন প্রতিবার তিনি যখন গাড়িতে উঠবেন বা নামবেন, সাদা পোশাক পরা ধোপ দুরস্ত ড্রাইভার দরজা খুলে দেবেন। আমার সিনিয়র ভদ্রমহিলার পর্যবেক্ষণ বলে, মহিলারা এভাবে ড্রাইভারের দরজা খুলে দেওয়ার তোয়াক্কা করেন না, সটান নিজেই দরজা খুলে নেবে আসেন। এতে ড্রাইভাররা প্রথম প্রথম থতমত খেলেও, পরে দিব্যি মেনে নেয়, এবং গাড়ি থেকে নামবার নামটিও করে না। এই গল্পের সঙ্গেই ফুটনোট হিসেবে একটা ফাউ গল্প পাই তাঁর কাছে, তাঁর ভাইয়ের একবার একটা ছোট পথ দুর্ঘটনায় গাড়িটি জখম হয়, এবং যে গাড়িটি তার গাড়িকে ধাক্কা দিয়েছিল, সেই গাড়ির মালিক কোন রাজনীতিক বা প্রভাবশালী লোক, তাই ভাই ক্ষতিপুরণ পাবার বদলে গলাধাক্কা পেয়ে বাড়ি ফেরে।  সেই প্রভাবশালীর ড্রাইভার ভাইটিকে শোনায়, জানেন এটা কার গাড়ি? অমুকচন্দ্র তমুক, অমুক মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। পাঙ্গা নিতে আসবেন না। প্রবল অপমানিত হয়ে, ভাই সেই রাস্তাতেই চীৎকার করে বলে, আপনাকে দেখে নেব, আমার দিদিও অ্যাকাউন্টেন্ট জেনেরাল। ভয়ানক বিচলিত ও খুব আহত ভাই, তার দিদিকে ফিরেই চার্জ করে, দিদি, তুই আমার দিদি না হয়ে দাদা হলে আজ আমার বেশি সুবিধে হত, তুই যে অ্যাকাউন্টেন্ট জেনেরাল, তবু তোর নাম নিয়ে আমি কোন সুবিধে করতে পারলাম না ! এখন ব্যবস্থা কর দেখি, ওই লোকটার গাড়ির লাইসেন্স বাতিল করিয়ে দে, অথবা অন্য কিছু?

অ্যাকাউন্টেন্ট জেনেরাল, শব্দযুগল মনের ভেতর যে ছবিটা ফুটিয়ে তোলে তাতে অনেকটা সম্ভ্রম আর বেশ কিছুটা পৌরুষ আছে, মহিলা টিপ্পনী দিয়ে আমাকে বলেন। দাদা এ জি হলে যতটা ভাও পাওয়া যায়, দিদি এ জি হলে কি আর ততটা পাওয়া যায়?

আমার চোখে, এ গল্প এক বিশাল ভারতীয় লঘু কাহিনি। ভারতের আমলাতন্ত্র, ভারতের প্রদূষিত ভ্রষ্টাচারী রাজনীতিতন্ত্র, সুবিশাল ঐতিহ্যের মত বহন করা আমাদের মধ্যযুগীয় মানসিকতায় রাজকীয় এই শোষণ পদ্ধতি, এগুলির সঙ্গে পুরুষতন্ত্রও কতই না ওতোপ্রোত। খারাপ একটা সিস্টেম বাপু আপনাদের এই পশ্চাৎপদ ভারতবর্ষের আমলা-নেতাতন্ত্র। বলতেই পারেন যে কেউ। ত, এ গল্প তারই এক ছোট টুকরো। এটা না হলেও চলে যায়, তাই এটা লঘু ঘটনা, কিন্তু ঘটনা তো বটেই!

অন্য ঘটনা আমার নিজের চোখে দেখা। আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলে, মহিলা হিসেবে আমার নিজের কোন মাথাব্যথা নেই, কিন্তু অন্যদের কাছে আমার মহিলা আইডেন্টিটি খুব গুরুত্ব পেয়ে যায়, যখন, এক কনফারেন্স রুম ভর্তি পুরুষ অফিসারের মধ্যে বসে, আমি এক এবং অদ্বিতীয় মহিলা হিসেবে থাকি। প্রত্যেকটা মিটিং এ তাদের মাথার ওপরে  আমি আছি এটা টের পাওয়ানোর খেলাটা খেলতে খেলতে হঠাৎ খেয়াল করি, এই যে পুরুষসিং হের দল, যাঁদের আমি “আপনারা আমার টিম” “আপনারা অডিট ডিপার্টমেন্টের স্তম্ভ” ইত্যাদি ভাল ভাল কথা বলে কাজে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি, এঁরা প্রত্যেকে তাঁদের পরিবারে এক একজন সম্রাট এবং স্ত্রীরা এঁদের কাছে হয়ত বা জুজু। এখানে মাথা নত করে এঁরা “ম্যাডামের” কথা শুনছেন এবং বকাবকিতেও চুপ থাকছেন। বহু মিটিং চলতে শুরু করার অনেক অনেক পরে সচেতন হয়ে দেখেছি, আমার নারী সত্তা প্রকাশ্যে আমি নিজে আনিনি, কিন্তু পরিস্থিতিগত বৈষম্য আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, হংস মধ্যে বক যথা আমি নারী হয়ে এঁদের পরিচালনায় আছি। এই সচেতনতা আমার মধ্যে এনে দিচ্ছে ছোট ছোট শরীরী ভাষা বা ইঙ্গিত হয়ত বা। তাই হয়ত , এঁদের ভেতরে যে যুগসঞ্চিত বিশাল পুরুষতন্ত্রের দেওয়ালটা আছে তাতে ধাক্কা লাগবে বলেই কি আমিও , আমার কন্ঠস্বরে আমার কথায় বন্ধুত্ব এবং টিম ওয়ার্কের কথা বলছি বার বার? এ আমারই অচেতন দুর্বলতার প্রকাশ নয়ত?

একটা হাসির গল্প দিয়ে এই লঘুনাটিকার ইতি করি। অসম প্রদেশে অ্যাকাউন্টেন্ট জেনেরাল হিসেবে যোগ দেবার পর, কিছুদিনের মধ্যেই অসমের বেশ কিছু ভাল বাংলা পত্রপত্রিকার সন্ধান পাই , অনেক লেখক সম্পাদকের সঙ্গেও সঙ্গে দিব্য জমে ওঠে আলাপ পরিচয়। সেখানেই সৌমেন ভারতিয়া-র সম্পাদিত ব্যতিক্রম নামের পত্রিকাটিতে “অসমের প্রথম মহিলা অ্যাকাউন্টেন্ট জেনেরাল” এই শব্দবন্ধ দিয়ে আমার একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশ পায়। আমি এই শব্দবন্ধটিতে বড়ই জড়োসড়ো বোধ করি, কেননা, ঠিক যেভাবে চাকুরি ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ আমার না পসন্দ, সেভাবেই, প্রথম মহিলা অমুক তমুক সেমুক হয়ে ওঠায় আমার বেশ অসুবিধে। কিন্তু এবার সচেতন হয়ে আমি সত্যিই দেখি আমার অফিসে রাখা বিশাল কাঠের ফলকে, যাতে ১৯৪৭ থেকে সব অ্যাকাউন্টেন্ট জেনেরালের নাম আছে , ( আর এক মধ্যযুগীয় প্রথা)… আমার নামটিই শুধু মিস/মিসেস/এম এস লাঞ্ছিত।

বোঝাই যায় কেন অসমে গিয়ে, এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে আসা সেক্রেটারি সাহেব যখন গলা দু ধাপ নামিয়ে সামনের খাকি উর্দির লোকটিকে বলেছিলেন,  আমাদের ম্যাডাম এজি, তখন খাকি উর্দির ভদ্রলোক আশেপাশে তাকিয়ে স্যার এজি-কে খুঁজছিলেন।

শুধু একবার নয়, বহুবার এই অভিজ্ঞতা। এজি ম্যাডাম মানে, এজি সায়েবের স্ত্রী, এটাই ছিল ও অঞ্চলের প্রায় অধিকাংশের ভাবনার দস্তুর। যে ম্যাডামটি এখন গাড়ি থেকে নামলেন তিনি যে কোন জাঁদরেল পুরুষ্টু গোঁফ সম্পন্ন কোন অফিসারের পত্নী নন, নিজেই অফিসার, এটা বিশ্বাস করার মত অভিজ্ঞতা বা ডেটাবেস হয়ত তাঁদের নেই,তাই এ নিয়ে বেশি ভাবিনি, নিছক গল্প করে বলার মত ঘটনা হিসেবে, হাসির খোরাক হিসেবেই আছে।   সত্যি বলতে অসম ক্যাডারের আই এ এসেও, মহিলার সংখ্যা অতি নগণ্য। পারুল দাস বা এমিলি চৌধুরীর মত হাতে গোণা কয়েকজন মহিলাকেই আমি সিনিওর আমলাদের মধ্যে পেয়েছিলাম আমার অসম বাস কালে।

 

রাজনীতির মঞ্চেই বা অসমে কজন মহিলাকে দেখা গেছে? সে অর্থে দেখলে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীগুলি তো নির্ধারিত হয় তথ্য থেকেই।  বারংবার এক একটা তথ্য চোখ কানের ওপর আছড়ে পড়ার গতিবেগে দৃষ্টিভঙ্গীও পরিবর্তিত হয়।

 

আপাত দৃষ্টিতে অবশ্যই , একজন জনমজুর মহিলার চাইতে ক্যাডারভিত্তিক অফিসারদের ভেতরে পুরুষ নারী বৈষম্যের ব্যাপারটা নেইই। মাইনে এক, প্রোমোশনের পদগুলি বা প্রোমোশন হবার জন্য যা যা করণীয় সে সবই পুরুষনারী নির্বিশেষে এক। বিদেশের নানা জার্নালে পড়া গ্লাস সিলিং এর বিষয়টি তথাকথিতভাবে অন্তত আমাদের সার্ভিসে নেই। গ্লাস সিলিং অর্থে, অদৃশ্য বাধা, ওপরের দিকে উঠতে। যেখানে, একটি মানুষ, তার সমস্ত যোগ্যতা সত্ত্বেও, কেবলমাত্র নারী বলেই , সবচেয়ে উঁচু পদে উঠতে পারছেন না। কোন কারণ না দর্শিয়েই তাঁকে রেখে দেওয়া হচ্ছে মধ্যমানের পদে। ম্যানেজেরিয়াল পোস্টে থেকেও, তিনি কখনোই সংস্থার নিয়ন্ত্রক ভূমিকায় আসতে পারছেন না। কেননা, তাঁর আশপাশের পুরুষরা কখনোই চাইছেন না, একজন মহিলা ওই পদে বসুন। অসংখ্য অধস্তন কর্মচারীর কাছেও একজন মহিলার কাছে জো হুজুর করাটা খুবই অসম্মানের।

আপাতদৃষ্টিতে রুলস রেগুলেশনে বাঁধা আমাদের সার্ভিস। তার ভেতরে এই রকমের কোন আবছা পলিটিক্স নেই।

কিন্তু সত্যিই কি নেই?

হ্যাঁ, আমরা মহিলারা পুরুষদের থেকে পে স্কেলে, কাজের বিবিধ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। কিন্তু “মানসিকতা” নামক বিষয়টি তো রুলস রেগুলেশনের আওতায় পড়ে না। তাই কী কী দেখতে পাচ্ছি, বা পেয়েছি নিজের জীবনে, যা অন্য অনেক মহিলা অফিসারের সঙ্গে কথা বলেও দেখেছি?

 

পুরুষ উর্ধতন অফিসারের মনে , একটি মেয়ের কর্মক্ষমতা সম্বন্ধে একটা সন্দেহের ভাব। যেটাকে কাটিয়ে উঠতে কখনো বা মহিলা অফিসাররা একটু বেশি বেশি কর্তব্যপরায়ণ, একটু বেশি বেশি নিজের কাজের ব্যাপারে কঠোর। নিজেকে প্রমাণ করে যেতে হবে সর্বদা তাঁদের। নতুবা অদৃশ্য ছাপ্পা পড়ে যাবে পিঠে, তুমি তেমন দড়ো নও।

 

কোন অফিসার যদি বিবাহিত হন, এবং সন্তানবতী। তাঁর ক্ষেত্রে পরিবারের বিষয়ে কোন প্রি অকুপেশন থাকলে তো হয়ে গেল। পুরুষ বস, এমন কি মহিলা বসের চোখেও , সেই অধস্তন মেয়েটি তখন চূড়ান্ত অক্ষমতার প্রতীক, বিরক্তির সূচক। মাথা উঁচু করে, কোন অপরাধবোধ হীনভাবে সন্তানের জন্ম দিতে দীর্ঘ ছ মাসের ছুটি নিতে আমি পারিনি, আমার মনে হয়েছিল আমার অফিস খুশি নয়। ঠিক যেমন ছমাস পরে অফিসে ফিরে যেতে গিয়ে আমার মনে হয়েছিল আমার বাড়ি খুশি নয়। বাড়িতে এমন জল্পনাও শুনেছিলাম যে, এখন কি আর পারবে নটা ছটা চাকরি করতে, এখন থেকে তো চারটের সময়ে ফিরে আসতেই হবে বাচ্চার জন্য।

 

বিবাহিত মেয়েরা, বিশেষত যারা জীবনের একটা বড় পর্বেই এই দোটানায় চাকরি করেন। সবাই করেন। কিন্তু নিজেদের মধ্যে কেউ এ নিয়ে আলোচনা করেন না । কোন হেল্প লাইনও মজুদ নেই। একা একাই এই গোটা সমস্যাটাকে নিজের মত করে যুঝতে যুঝতে জীবনের অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা বছর কেটে যায়। যখন কাজের ক্ষেত্রেও ক্রমশ সিনিয়র হয়ে উঠছেন সেই মহিলা। ক্রমশ দায়িত্ব বাড়ছে।

 

যে কোন মহিলা , যে সময়টায় সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন, সন্তানকে মানুষ করছেন, তাঁদের টানাপোড়েনের যেন শেষ নেই। সংবেদনহীন পুরুষ উর্ধতন, এমনকি মহিলা উর্ধতনরাও, সন্তানকে সময় দিতে চাওয়া মেয়েটিকে নানাভাবে অসহযোগিতা করে যাবেন। অথচ, না, মেয়েটি তার অফিসের কাজের যে সময় তাকে কোনভাবেই ফাঁকি দেন না। নটা থেকে ছটা অফিস করেন। নিজের করণীয় কাজের তালিকা ধরে ধরে শেষ করেন। তার পরেও, উর্ধতন অফিসারটি শনি রবিবার কাজে ডাকেন, বা রোজকার কাজের দিনে অনাবশ্যক সন্ধে অব্দি বসিয়ে রাখেন অধস্তন মহিলাকে, সাতটা আটটা অব্দি কাজের ছুতোয় নিজের ঘরের উল্টোদিকের চেয়ারেওফিসে কিছু সিজনাল কাজের চাপের সময়ে, আরো দেরি হয়।  মেয়েটি বাড়ি ফিরতে পারেননা অনেক রাত পর্যন্ত। বাড়িতে সন্তানের দেখভাল করা শাশুড়ি বা অন্যান্যদের ভ্রুকুটি ক্রমশ কুটিল হয়ে ওঠে।

অফিস থেকে ট্যুরে যেতেই হয়। কখনো অসুবিধে থাকলেও পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাকে, বাড়িতে অসুস্থ সন্তানকে ফেলেই যেতে হয় এমন ট্যুরে, যা হয়ত না গেলেও চলত। এ কাহিনি আমার শুধু নয়। আমার নিজের  অভিজ্ঞতার সঙ্গে অন্য নারীদের অভিজ্ঞতাকে টুকরো টুকরো জুড়ে বানানো এক কাঁথার মত।  যেমন, কাজ করতে করতে আমার সঙ্গেই কর্মরত কিন্তু অনেকটাই বয়সে ছোট এক মহিলার একটা গল্প শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। তার ক্ষেত্রে ঘটে যায় চূড়ান্ত ঘটনা।  তার চাকরির জন্য ছোটাছুটির প্রয়োজন, অথচ সে অন্তঃসত্ত্বা। বসকে জানায়, এখন ডাক্তারের কথা অনুযায়ী আমাকে বিশ্রাম নিতে হবে। বস শুনিয়ে দেন, কাজটা না হলে চলবে না। তারপর যতখুশি বিশ্রাম কর। তাকে দুদিনের মধ্যে দুবার প্লেনে চেপে এ শহর ও শহর করতে হয়। কিন্তু এর ফলে মেয়েটির শরীরে চাপ পড়ে এবং তার  গর্ভপাত হয়ে যায়। সারাজীবন ঐ ভদ্রলোকটিকে ক্ষমা করতে পারেনি মেয়েটি। অত্যন্ত কর্মদক্ষ মহিলা । আমাকে যখন গল্পটি বলেন, কেঁদে ফেলেছিলেন। ঘটনা থেকে তখন তিনি দশ বছরের দূরত্বে। পরে আর একটি সন্তান এলেও, প্রথম অজাত সন্তানের জন্য বেদনা তখন তাঁর চোখে মুখে।

 

আমার কানে এই ঘটনাটি কোথায় যেন নিজের অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি বলে মনে হয়েছিল। অথচ আমার তো কখনো গর্ভপাত ঘটেনি। কিন্তু অনুরূপ অন্য অভিজ্ঞতা কি আমার নেই? সবচেয়ে বড় কথা, এই বাধ্যতা, মানসিক অত্যাচার, নীরব অসহযোগিতা, এগুলো সবই আমার চেনা।

সবচেয়ে বড় যে কথাটা আমার মনে হয়েছে তা অন্য । মনে হয়েছে, আশ্চর্য, আমাদের কখনো জেন্ডার নিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়না কেন? পুরুষদের ট্রেনিং দরকার সবচেয়ে বেশি, একজন মহিলার জীবনের নানা সময়ের যে অত্যন্ত জরুরি কাজগুলো সেগুলো সমাজের কাজ। সেগুলো সম্বন্ধে সংবেদন তৈরি করতে। মেয়েদের ট্রেনিং ও জরুরি। কেননা, কীভাবে এই ধরনের সমস্যার সমাধান করা যায় তা আমাদের শিখিয়ে দেওয়া হয়নি। উলটে , অন্য কারুর সঙ্গে এগুলো শেয়ার করার কথাও আমরা কোনদিন ভাবিনি। বলতে কি,  আমার যা যা ঘটেছে, অন্যদেরও তাই ঘটে থাকবে , এটাই যেন ভাবিনি। ভেবেছি এগুলো একান্তভাবে আমার ব্যক্তিগত সমস্যা। কিন্তু এ সমস্যা একটা সামাজিক সমস্যা এবং এর সমাধান আমার বাইরে, অন্য কোথাও থাকতে পারে, এভাবে ভাবতে আমরা অভ্যস্ত নেই। তাই বিভিন্ন সময়ে কাজে যোগ দেওয়া মেয়েদের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ একই ধরণের হলেও তাদের মধ্যে সংযোগের কোন সূত্র নেই।  হেল্প লাইন নেই শেয়ারিং নেই। তাদের কোন ফোরাম নেই। যেখানে বয়স নির্বিশেষে এসে তারা বলতে পারবেন নিজের সমস্যা।

এই প্রসঙ্গে বলি, আমার খুব রাগ হয় যখন গল্পে উপন্যাসে পড়ি, একটি মেয়ে চাকরি করতে গিয়ে কী কী কম্প্রোমাইজ করল তার কাহিনি ফেঁদে বসা হয়। উর্ধতন পুরুষ বসের সঙ্গে দৈহিক সম্পর্কের চটুল বিবরণ  আঁকা হয়। কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রে এই ঘটনাটা কতটা সুলভ জানি না, সরকারি ক্ষেত্রে একেবারেই সুলভ নয়। অন্তত কোন পুরুষ উর্ধতনকে আমি যৌন ইঙ্গিতবাহী বা অন্য ধরণের আকর্ষণবাহী কিছুই আচরণ করতে দেখিনি। এবং যারা আমার আশেপাশে আছে তাদেরও দেখিনি। আসলে ভারতীয় ব্যুরোক্রেসির কতগুলো অলিখিত নিয়ম ও অদৃশ্য দেওয়াল আছে। একটা দেওয়াল হল , এই সার্ভিস ক্যাডারগুলি অত্যন্ত রক্ষণশীল, অত্যন্ত গভীরভাবে প্রথাসিদ্ধ কিছু আদবকায়দায় গাঁথা , যাকে বলি ডেকোরাম। এবং সর্বোপরি খুব নারীবিদ্বষী। অর্থাৎ সমস্যাটা উল্টোদিকেরনারীদের দূরে রাখো, এই নীতিতেই চলেছে আজও, ভারতীয় আমলাতন্ত্র। মেয়েদেরও হয়ে উঠতে হচ্ছে “পুরুষের মত”। যাকে , মজা করে কেউ কেউ বলে ব্লটিং পেপার। একজন কিরণ বেদি বা একজন লীনা চক্রবর্তী বিখ্যাত হন “পুরুষ” দেরও হার মানিয়ে দিতে পারার ক্ষমতা দিয়েই।

 

প্রশাসনের চেয়েও আরো বেশি এই নারীবিদ্বেষ লক্ষ্য করেছি জুডিশিয়ারি বা বিচারবিভাগীয় কাজকর্মের ক্ষেত্রে। কোন লোয়ার কোর্ট যখন চলে, সেখানে বিচারকরা তাঁদের চারিপাশে যে নিশ্ছিদ্র ডিসিপ্লিনের বলয় রক্ষা করেন, তা দেখার মত। এই সময়ে সেই কোর্টরুমে সামান্য কথাবার্তা বললেও তা “আদালত অবমাননা” আর আপনি যদি মহিলা হন, এবং কালো কোট পরিহিতা না হন, তাহলে আপনার দিকে যে রোষদৃষ্টিতে তাকানো হবে তা রীতিমত ধাক্কা দেওয়া। একবার আমি অফিসের কোন কেসের ব্যাপারে এমন এক কোর্টরুমে আমার সহকর্মীর সঙ্গে হেসে কথা বলছিলাম, এবং প্রায় রুলের গুঁতো খেয়েছিলাম। ওই মহিলা ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছেন কেন? বেরিয়ে যেতে বলুন ওনাকে।

 

আদালতের যে ভয়ংকর হায়ারার্কি, তার একটা আবছা ছায়া এখনো বাকি প্রশাসনেও রয়ে গেছে। সম্পূর্ন উল্লম্ব এক প্রবল মান্যতার সিঁড়ি আছে। সাপসিঁড়ি খেলার চেয়েও যার ছোবল সাঙ্ঘাতিক।

এই এই করতে নেই, এই এই করতে হবে, এই নিয়মগুলো প্রায় অলঙ্ঘ্যনীয়। বসেরা সচরাচর খুব কড়া, নিজেদের বস-ত্ব প্রমাণ করতে অসম্ভবরকম উদ্যোগী হয়ে অধস্তনদের উৎপীড়ন করে রাখেন সাগ্রহে। পুরুষ নারী নির্বিশেষে, ঘন্টার পর ঘন্টা ডিটেন করা অথবা আচমকা মেজাজ হারানো, ছুটি দিতে অস্বীকার করা, এসব করে তো থাকেনই, মেমো, শো কজ,  সাসপেনশন ইত্যাদিও পান থেকে চুণ খসলেই হতে পারে।

 

আমি ব্যক্তিগতভাবে অধস্তনদের আমার জমিদারির প্রজা, অথবা “স্বতঃই গবেট” “বেসিকালি ফাঁকিবাজ” বলে ধরে নিতে পারিনা বলেই, তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে থাকি। সেটা আমার কোন কৃতিত্ব নয়, বরং জেনেটিক কোডিং, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে আমার দুর্বলতা হিসেবেও পরিগণিত হয়, আমি জানি। বস হিসেবে আমার অধস্তনদের চোখে খুবই নরম সরম আমি। অন্তত নিচের দিক থেকে পাওয়া ফিডব্যাকে এরকমই জানতে পারি। মুখে তাঁরা বলেই থাকেন যে “ম্যাডাম আপনার মত বস পাব না” কিন্তু মাঝে মাঝে আমার মন বলে, হয়ত আমার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে এঁদের আউটপুট বেড়ে যেত, ভয় এখনো ভারতীয় কর্মীবৃন্দের বড় চালক । ভয়ের জন্য ঠিক সময়ে অফিসে আসা থেকে শুরু করে আরো নানা ডিসিপ্লিন চলে।

 

এক্ষেত্রে একটা কথা অপ্রিয় হলেও বলে ফেলা ভাল। সে কথাটা বললেই আমি পলিটিকালি ইনকারেক্ট হয়ে পড়ব, এবং প্রাদেশিকতা বা পক্ষপাতিত্বের দায় এসে ঘাড়ে চাপবে। তবু, যেসব অসংবেদনশীল অফিসারদের সংগে মহিলা অফিসারদের সমস্যাগুলো বেশি করে হয়, এবং যে সব অফিসাররা নিজের অধস্তনদের সঙ্গে সাংঘাতিক অসভ্যতা করেও , ভয়ের রাজত্ব নির্দ্বিধায় স্থাপন করে নিতে পারেন, তাঁরা বেশির ভাগই আসেন একটা বেল্ট থেকে, যাকে ভারতের কাউ বেল্ট বলা হয়।  বিহার উত্তরপ্রদেশ মধ্যপ্রদেশ এইসব রাজ্য থেকে এখনও নারীবিদ্বেষ, জাতপাত এবং অন্যান্য  সুপ্রাচীন ঐতিহ্যগুলো যায়নি। যথেষ্ট জমিদারীসুলভ সামন্ততান্ত্রিক আদবকায়দার চল তাই এঁরা বহাল রেখেছেন কর্মক্ষেত্রেও।

কিন্তু এই সামন্ততন্ত্রে ক্ষমতাময়রা শুধু না, ক্ষমতাময়ীরাও কম যাননা।

 

 

আসলে ভূগোলকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। বরং এই প্রশ্নটা থেকেই এসে পড়ি আর এক অস্বস্তির জায়গায়। মেয়েদের সমস্যার কথা শুরু হলেই একদল পুরুষ বলেন, কেন , মেয়েরা নিজেরা কি ধোয়া তুলসীপাতা নাকি? তারা ঘুষ নেয়না? তারা অত্যাচার করেনা অক্ষমের ওপর?

 

হ্যাঁ, এঁরা ঠিক বলেন। আসলে , পুরুষ নারী এগুলি কোন নির্ধারক নয় । আসল নির্ধারক বোধ করি ক্ষমতা। পাওয়ার। যে ক্ষমতা পাবে, সে অক্ষমের ওপরে অত্যাচার করবে। এটাই সমস্যার জায়গা। সুতরাং একাধিক মহিলাও ক্ষমতার অলিন্দে নিজেকে পালটে ফেলেন , যে মুহূর্তে হাতে রাজদন্ড এসে পড়ে, তাঁদের রূপ বদলে যায় । এবং আগেকার প্রতিবাদী চরিত্র চলে গিয়ে এসে পড়ে একটা সংবেদনহীনতার মূর্তি।

 

এমনকি মেয়েদের ব্যাপারেও তখন তাঁদের কোন সংবেদন দেখা যায় না। ঠিক যেমন, বাংলা সিরিয়াল কাহিনিতে শাশুড়িরা বৌমাদের ওপরে অত্যাচার করার সময়ে, ভুলে যান তাঁদের বৌমা অবস্থার কথাগুলি, তেমনি, প্রশাসক যদি মহিলা হন, তাঁর অধস্তনের সমস্যাগুলোও তাঁর কাছে তখন আর লক্ষ্যনীয় থাকেনা। তিনি তখন জাস্ট লাইক এনি আদার প্রশাসক। তিনি তখন ক্ষমতার কেন্দ্রভূমি। সুতরাং।

 

 

অরুণ মিত্রের কবিতা

 

 

 

অরুণ মিত্র :  স্থিরতা আর ঘুর্নির, ভর আর টানের কবিতা

 

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

 

আমার ছটফটানি থামাতে পারিনা।

টেবিলের উপর আমার প্রার্থনার হাত –

অক্ষর দাও অক্ষর দাও

সাতরঙা পৃথিবীর মুখ চেয়ে আমি এক ভিখিরি,

দয়া করো ।

যে অরুণ মিত্রকে বাঙালি মনে রাখবে সে এই ছটফটে তরুণ। নব্বইয়ের কোঠাতে যিনি অদম্য এক ভ্রমণকারী। হাস্যমুখ, গৌরবর্ণ, পরিশীলনের শেষ কথা।  প্রথম দর্শনেই একটা কথা মনে না হয়ে পারে নাঃ কবিদের জগতের তুলনায় ইনি বেশ বেশিরকম ফিটফাট। অনেকটা সাহেবদের মত। ছিপছিপে মেদহীন চেহারাটা চোখে পড়ার মত, উপস্থিতির মধ্যেই এক ফুর্তিবাজ রসঘন ব্যাপার। অরুণ মিত্র মননে আর স্বভাবেও ইউরোপীয়। পুবের সংস্কৃতি প্রবীণ চিন্তাবিদের অনুষঙ্গে গাম্ভীর্য আর চিন্তামগ্নতা, বিষাদ আর নির্বেদকে অনিবার্য মনে করে। সতেজ , স্বাদগ্রহণে সক্ষম , গ্রহিষ্ণু , উষ্ণ এক মানুষ, কবিতাভাষাতেও জীবনের প্রতি তৃষ্ণার অফুরান স্রোত তাঁর।

 

এই অরুণ মিত্রই ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে বাঙালিকে পরিচয় করাবার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাঁর প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা জেনেছিলাম ফরাসি সাহিত্যের সাম্প্রতিক প্রবণতার কথা।  কবিতায়, গঠনে ও বিষয়ে তিনি এতটাই ভিন্ন ছিলেন তাঁর সমসাময়িক আর সবার থেকে, যে চোখে পড়তেন। আবার অনেকটাই চোখের আড়ালে থেকে যেতেন হয়ত। নিজেকে জাহির করার বদলে কবিতার ভেতরে ডুবে থাকার মর্জি ছিল তাঁর। তাইই।

 

গদ্যভঙ্গির তুখোড় তীরন্দাজ অরুণ মিত্রের কবিতা বাংলাভাষাকে দিয়ে গেল এক গোছা আশ্চর্য গদ্যকবিতা। চলনে যা থেকে চুঁইয়ে পড়তে থাকে সুর। ভ্রাম্যমান বাঁশিওয়ালা অরুণ মিত্র, কেননা, হাঁটতে হাঁটতে বনপথ দিয়ে বাঁশির সুর ছড়ানোর আকর্ষণ, সাঙ্গীতিকতা, তাল-লয় সবটায় তিনি কীভাবে যেন তার গদ্যকবিতায় গাঁথেন। চটুল বা তরল এক জলজ গতি আছে সে কবিতায়।

 

 

একটা অদৃশ্য সুরধুনি কোথাও কুলকুলিয়ে বইতে থাকে। আমরা তাকে চোখে দেখিনি। কবির কবিতা তার চরণ পেয়েছে। আমরা পাইনি।

 

“ঝুপড়ি থেকে নর্দমার ধার পর্যন্ত মহাযাত্রার কত মোড়। সেখানে তুলোট বেলা। পাঙাশ আকাশে কিছু কি আছে, কোন স্ফূরণ, সেখানে আমার দৃষ্টি যায় না। আমি হাত নাড়ি আর উজ্জ্বলতার ঢেউগুলো হারিয়ে যায়। কত  মোড়।“

 

 

এমনভাবে শেষ হয় তাঁর একটি গদ্যকবিতা। চলন আছে। সর্বদা যেন চলতে চলতে কথা বলছে তাঁর লাইনগুলি। দৃশ্যের পর দৃশ্যপট বদল হয়ে যাচ্ছে। ক্রমাগত আমাদের, পাঠককুলকে, টেনে রেখে, তাঁর যাত্রাপথের সঙ্গী করে নিয়ে তিনি চলেছেন। হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালার মত।

 

সবসময় যদি চলতে না-ও চান কবি, কখনো কখনো বসতে, বা বসাতেও চান। সে বসা চারদিক খোলামেলা ঘরে। সে বসা গ্রামের চন্ডীমন্ডপের মত  বা বটতলার মত আসরে। সেখানে আড্ডা আর গল্পের ঢের ।

 

শিকার –কথা কবিতাটি দেখি। “আমাদের গাঁয়ে বাঘা-বাঘা শিকারীর বাস। তাঁরা গুলি করে উড়ন্ত পাখি নীচে নামাতে পারে… তাঁদের দবদবানিতে আমাদেরবুক দশহাত…।/ সম্প্রতি কাছেপিঠে বাঘ বেরিয়েছে। …কটা বাঘ নিশ্চয় করে বলা যায়না, একটা হতে পারে অথবা আরো বেশি। …তাঁরা রোজই শিকারে যাচ্ছেন। ফিরে এসে তাঁরা যে সব গল্প বলেন, তা রীতিমত রোমহর্ষক। তাঁদের কথার মধ্যে আমরা বাঘের গর্জন শুনতে পাই, ডোরাগুলো আমাদের চোখের সামনে বিদ্যুতের মত ঝল্‌কে ওঠে।  … কিন্তু বাঘ মারা পড়ছে না কেন? … সঙ্গে সঙ্গে কথকদের সে কী বিজ্ঞ হাসি। বললেন, ‘মেরে ফেললে তো ল্যাঠা চুকে গেল। তাতে আর মজা কী? আসল মজা হল বাঘের সঙ্গে লুকোচুরি খেলায়।‘/ইতিমধ্যে আরো ছাগল ইত্যাদি নিখোঁজ হয়েছে।

 

এ কবিতায় শ্লেষ আছে, মজা আছে, তির্যকতা আছে। কিন্তু বিদ্বেষ নেই। অরুণ মিত্র গঠনের দিক থেকে নানাভাবে সাজান কবিতাকে। কখনো নিপাট গদ্য কাহিনির বর্মে, কখনো সংলাপের ধর্মে, কখনো বিমূর্ত , র‍্যাঁবোর কবিতা মনে করিয়ে দেওয়া অনুষঙ্গবিস্তারী কারুকর্মে সাজান।  তবু কোথাও, কোন বিদ্বেষভাব থাকে না, অন্ধকার থাকেনা, কালিমা থাকে না। সবদিক আলোয় আলো করে রাখে তাঁর মেধা, তাঁর আনন্দময় সত্তা। যে সত্তা কোন ঔপনিষদিক ধাঁচে ধরে ফেলেছে কোন অজানা সূত্র, ভাল থাকার, ভাল রাখার।

 

‘কবে এর জন্ম, এই পৃথিবীর? মেয়েদের কথা আর হাসি ঝর্ণার স্রোতে ঝরে পড়ছে, পাহাড় থেকে পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলছে, আকাশে রং ছড়িয়ে দিচ্ছে। ‘ মেয়েদের প্রতীক অরুণ মিত্র ব্যবহার করেন কেবলমাত্র পুরুষের কাম রিরংসার বিষয় হিসেবে নয়, সৃষ্টির আরম্ভ হিসেবেও। “নীল জল ঘিরে ওরা কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ মাটির ঢিবিতে হেলান দিয়ে বসে। হরিণীদের মত ওদের গ্রীবা পরস্পরের দিকে ফেরানো। ওদের স্তনচূড়া রক্তিম, যোনিরেখা রহস্যময়, উরুসন্ধি দুর্বাদলছাওয়া। বোঝা যায় ওরা জন্মের কথা বলছে।“

 

ভাষার সমসাময়িকতা, চিত্রকল্পের শহুরেপনা, সহজবোধ্য যতিবদ্ধতা। একইসঙ্গে অরুণ মিত্রের কবিতা চিরন্তন এক পৃথিবীর গল্প বলে। লোকায়ত ভঙিতে। নইলে বাংলা কবিতা “বাঁচার হ্যাপা কি কম?” অথবা “মাঝরাত্তিরটা ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে”-র মত পংক্তি কীভাবে ভেবে ওঠা সম্ভব, তাই ভাবি। যে কবি শতবর্ষ ছুঁলেন, তাঁর কলম ঝরিয়ে যায় একের পর এক অনবদ্য দেশজ, তদ্ভব শব্দ। তৎসমের ভারাক্রান্ততা নেই, ছুটিয়ে চলা লেখায় শব্দপ্রকরণও তাই তুখোড় হয়ে ওঠে, ওতোপ্রোত।

 

অথবা, এই লেখাটিতে, লক্ষ্য করি ভাষার পোখরাজ-চুনি-পান্নায় আলো পড়ে কত রং বদল…

“রোদবৃষ্টি শুষে সোনা হয়েছে গম/ এখন চুরচুর হচ্ছে দানা,/ মুখ টিপে হাসছে মেশিন আর ভাঙছে/ ক্ষেতময় রক্তের ছোপ অথচ একটু ছিটেও নেই এখানে/ এই তো আসল কেরামতি/ ঝকমক দানা/ ঝিকমিক গুঁড়ো/ কত স্বপ্ন ঝলমলাবে পালংকে।“

 

পরিচিত কবিতাবলয়ে কোন্‌ এক ভিন্‌দেশি ভাঙচুরের ভাষা হাজির করেন অরুণ মিত্র। আলাদা করে আলোচ্য হওয়া উচিত কিন্তু নিজের অনন্যতায় একাকিত্ব তিনি হয়ে যান সকল লোকের মাঝে একা। নিজ মুদ্রাদোষে তাঁকে নিয়ে মাতামাতির মানুষও কম । নিজে অনুবাদের কাজে অবিরত থেকেছেন বলেই হয়ত ভাষা সচেতনতা তাঁর প্রখর হয়েছিল, ক্রমাগত মনের জানালা খুলে রাখার , নতুন ব্যবহার নতুন চিন্তা নতুন উত্তেজনা ও অ্যাডভেঞ্চারে মাতার সারল্য ও সবলতা দুটোই কব্জি আর মর্জিগত করেছিলেন ।

 

কবিতা যে শব্দশিল্প এক। কবিতার একমাত্র ইঁট কাঠ বালি পাথর, শব্দই। শব্দ সঞ্চয় করেন কবি, শব্দকে শস্ত্রের মত ব্যবহারও করেন। সেই শব্দ সচেতনতার কবিতাও, গদ্যছাঁচের পরিশীলিত দক্ষতায় পাঠকের সামনে মেলে ধরেন অরুণ মিত্র।

“শব্দগুলোকে আমি দারুণভাবে সাজিয়েছিলাম। মিল অমিল সমস্ত নিয়ে এক দুর্ধর্ষ ব্যূহ।  লড়াই শুরু হতেই সেটা প্রমাণিত হল। দিনদুপুরে আমি সূর্য ঢলিয়ে দিলাম। নিকষ কালোয় আমার চোখ শত সহস্র পতন দেখল। নোঙর করা কত নৌকো দড়িদড়া ছিঁড়ে সর্বনাশে ভেসে গেল। …।আকাশ বাতাস আমি  আওয়াজে আওয়াজে দলে তাল পাকিয়ে দিলাম। কিছু রাস্তাঘাটে এককালে চলাফেরা করতাম। সেগুলো ছত্রছান হল। মারাত্মক নেশায় আমার রক্ত নাচতে লাগল।

কোনো মুহূর্তে আমার শরীরটাকে হয়তো একলা বিছানায় শোয়াতে চেয়েছি। নেশা একটু পাতলা হয়ে এলে এমন হয়েছে। কিন্তু নতুন শব্দকে ছুঁয়ে আমি আবার পরাক্রান্ত হয়ে উঠেছি। আমার বিছানাও এক রণক্ষেত্র, এটা বুঝে আমি ঝাঁপিয়ে পড়েছি। সেও এক লড়াই বটে। ঘর্মাক্ত হয়ে আমি একের পর এক অবরোধ ভেঙেছি, কথায় চড়ে অন্ধকার সুড়ঙ্গে প্রবেশ করেছি, কল্পনা যতখানি যেতে পারে আমি হাড়মাংসের আড়ালকে বিধ্বস্ত করেছি। এবং তারপর রসিয়ে রসিয়ে আমার বিক্রমের আস্বাদ নিয়েছি।

কিন্তু কার সঙ্গে এতক্ষণ লড়লাম? কে জানে কার সঙ্গে? অথচ আমি যে লড়েছি তাতে সন্দেহ নেই। … আমার ক্ষমতাকে আমি তো জাহির করেছি। বাহবার জন্যে আমি গোড়া থেকেই কান পেতে ছিলাম। অক্ষরের ঝঞ্ঝনায় দিগবিদিক বাজিয়েছি এবং তারই ফাঁকে ফাঁকে বাহবা শুনেছি…।

 

এ কবিতায় সেই অনামা সমালোচকের কবিকে বলা সমালোচনাটি মনে পড়েঃ you have merely reduced an affair of things to an affair of words… অতি কুশলী শব্দব্যবহারকারীই আসলে, কবি।

 

তারপরেও, দুটো জিনিশ বলার থাকে। এক , বিষয়ের দিক থেকে যে অভিনবত্ব যে গতিময়তা এনে দিলেন অরুণ মিত্র এ কবিতায়, তা বোধ হয় সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে। আর, শব্দের সঙ্গে সম্পর্কের যে ওঠাপড়া, যে শরীরী টানাপোড়েন বর্ণনা করলেন অরুণ মিত্র, যে কোন একনিষ্ঠ শব্দশিল্পীই তার অভিঘাতে কেঁপে উঠতে পারেন। কবিতায় এই এনার্জি , এই পৌরুষ, এই সতেজতা আমরা আগে দেখেছি কি? দুই, এই কবিতাগুলির শেষ কোন চূড়ান্ততায় নেই, কোন ক্লাইম্যাক্স ঘটে না… শেষ আর শুরুর ভেতরে সীমানা নির্ধারণ করা যায়না। কবিতাটি কেবলমাত্র বয়ে যায়, তার  নাটকীয়তা তার বয়ে যাবার ভেতরেই, শেষ লাইনের মোচড়ে বা কোন দার্শনিক সিদ্ধান্তের আরোপিত উপসং হারে নয়। এটা নতুন, বাংলা কবিতায় অননুকরণীয়।

 

তাঁর প্রতিটি লেখাই এক একটি যাত্রা, এক একটি ভ্রমণ। অনেক আলো ছড়াতে ছড়াতে চলে যান তিনি, খুব দেশজ শব্দও পেয়ে যায় অপরিচিতের মাত্রা। যাদুকরের মত ঝুলি থেকে বের করেন আশ্চর্য সব ছবি। অরুণ মিত্রের বইয়ের নামেও এই অনিশ্চিতি, এই ওপেন এন্ডেড পথমুখিনতা। প্রান্তরেখা ( ১৯৪৩) , উৎসের দিকে ( ১৯৫৫),  খুঁজতে খুঁজতে এতদূর ( ১৯৮৬), যদিও আগুন ঝড় ধসাভাঙা ( ১৯৮৮), খরা –উর্বরায় চিহ্ন দিয়ে চলি ( ১৯৯৪), ওড়াউড়িতে নয় ( ১৯৯৭) এবং শেষ বই ভাঙনের মাটি ( ১৯৯৮) অব্দি… বেশ কিছু বইয়ের নামেই রয়ে যায় অস্থির ছটফটে  সত্তার লেখন।

 

ঘর আর পথ। শান্ততা আর অশান্ততা। স্থিরতা আর ঘুর্নি। সবটা মিলিয়েই এক আবর্ত। এই তাঁর কবিতার ভর, টান।

 

চলিষ্ণু কবি ‘আমার ঘর’ কবিতায় সঙ্গীদের সবাইকে নিয়ে বসতে চেয়েছেন। কীরকম সেই বসা? কতখানি বিশ্বাসযোগ্য?  লক্ষ্য করব, প্রায় কোন কবিতাতেই দর্শনের কথা বলার জন্য কবির কোন আরোপিত চাল নেই। অথচ কত বড় এক দর্শন সেই আপাতসহজ কাজটিতে। কবিতাটিতে। আকাশের মত বড় এক হৃদয়, আর বসুধৈব কুটুম্বকম-এর সেই বিরাট পারিবারিকতা… সব মিলিয়েই ।

 

‘বড্ড ছোট আমার ঘর।  এখানে আমার প্রিয়দের আমি ধরাই কী করে? কতরকম কায়দা করি, কিন্তু কোন সুরাহা হয়না। হওয়ার কথাও নয়। ‘

এভাবেই শুরু কবিতাটি। তারপর নিজেকে গায়েব করে দেওয়ার পরিকল্পনা এসে যায় অনায়াসেই। কেননা। প্রিয়দের বসাতে গেলে তো জায়গা চাই। তারপর, বলেন, ‘অগত্যা পৃথিবীর দিকে ঘুরি। মেঘরোদের দিকে ঘুরি, তাদের বলি : তোমরা চলে এসো, সমস্ত ফসলের আহ্লাদ বুকে ধরে চলে এসো। তারাদের ডেকে বলি, তোমরা মায়াবী আকাশটা নিয়ে ঢুকে পড়ো। সবাইকে বলিঃ তোমাদের কোন অন্তরায় এখানে নেই। এখানে যেটুকু কথাবার্তা হয় যেটুকু নিঃশ্বাস বয় তার ওপর ভর দিয়েই এসে পড়ো। ‘

 

আর এই অদ্ভুত কবিতার শেষে কী হয়? ছোট্ট ঘরের ভেতর যখন আকাশ ঢোকে? “ এই আমার ঘর, ছোট ঘর বটে, কিন্তু কখন দেয়াল ভেঙে, ছাত ভেঙে সে দুনিয়ায় দুনিয়া তারপর আরও দুনিয়ায় ভিড়ে গিয়েছে। আমার প্রিয়রা তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের সবার ঠাঁই আমার এই ঘরে। এসো আমরা উৎসবে মেতে যাই। “

 

এই হলেন অরুণ মিত্র। আদিম সৃষ্টির পদাবলী, লোকগাথা, রুশ, আফ্রিকীয় বা এশিয় সৃষ্টিমিথ, বেদ উপনিষদ সবকিছু যেন একসঙ্গে ছেনে টেনে আনা হয়েছে এই কবিতায়। রবি ঠাকুরও আছেন কোথায় যেন। যিনি লিখেছিলেন, মানুষ যথার্থই অনাগারিক। জন্তুরা পেয়েছে বাসা, মানুষ পেয়েছে পথ।

 

আসলে মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলতে চাওয়াই ঘরকে পথ করে দেয়। আর ঘরের ভেতর দিয়ে রাস্তা কেটে চলে যাচ্ছে মানুষের যাত্রা, এই রূপকল্প যেমন রবি ঠাকুরে তেমনই অরুণ মিত্রের কবিতায় বার বার ফিরে আসে।

 

 

2

অরুণ মিত্রকে নিয়ে এইটুকু লিখলেই তাঁকে নিয়ে বলা ফুরিয়ে যায় না। কেননা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তাঁর কাছে বহু আগে থেকেই অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে আছে আর একটা কারণে। তা হল। এই যাদুকরের টুপিতে অনেক পালক। মৌলিক কবিতার পাশাপাশি তাঁর অঙ্গে আরো পোষাক। একটা  তাঁর ফরাসি ভাষাবেত্তার পোশাক, ফরাসি ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় অনুবাদকের পোশাক। এই দুই সত্তা যা আবার পরস্পর জড়িত, অরুণ মিত্রের নামটার সঙ্গেই অঙ্গাঙ্গী আমাদের কাছে। আমরা যারা অরুণ মিত্রের ‘ফরাসি সাহিত্য প্রসঙ্গে’ বইটির সঙ্গে পরিচিত, অথবা কাড়াকাড়ি করে পড়েছি পাঁচশো বছরের ফরাসী কবিতা বইটিতে তাঁর অনূদিত সেভ, বোদলের, ভের্লেন রাঁবো আপোলিনের পের্স এল্যুয়ার-এর কবিতা । প্রেভের, শার গিলভিক নামগুলির সঙ্গেও আমাদের আলাপ হয়েছে তাঁর হাত ধরে।

 

অরুণ মিত্র অনেক ক্ষেত্রেই চিহ্নিত করেছেন বাঙ্গালির ফরাসি কবিতা বা ফরাসি সাহিত্যকে গ্রহণের ক্ষেত্রটি, পরিসর তৈরি করেছেন বঙ্গভাষাভাষীদের ফরাসি কবিতা পড়বার। যদিও কিছু গবেষকের মতে, তাঁর ফরাসি কবিতার গ্রহণও, সময়ের দাবি মেনে কিঞ্চিত একপেশে । এই বিষয়টি পৃথক আলোচনার দাবি রাখলেও এই কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়টি না উল্লেখ করে পারছি না, যে, অনুবাদের সময়ে পক্ষপাতিত্ব অরুণ মিত্র সেইসব ফরাসি কবির প্রতিই রেখেছিলেন যাঁরা বামপন্থী ও মানবতাবাদী। আসলে অরুণ মিত্রের সময় রুশ স্মাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হবারই সময়। ব্যক্তিগতভাবে বামপন্থী প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী অরুণ মিত্রের স্বাভাবিক আকর্ষণ কাজ করে যায় আরাগঁ আর এলুয়ারের প্রতি। শার বা মিশোর তুলনায় জনপ্রিয় এবং মানবতাবাদী প্রেভের তাঁকে বেশি টেনেছেন। অনুবাদ করবার সময় কবিতা বেছে নেবার ক্ষেত্রেও তাই , তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, মধ্যে মধ্যে কিছু ফাঁক থেকে গেছে কবিদের বেছে নেবার সময়ে। তবু, এই একজন মানুষের প্রচেষ্টা আমাদের ফরাসি সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণকে অনেকটাই নির্ধারিত করে নিঃসন্দেহে।

 

আজকের দিনে যাঁরা নানারকম অনুবাদে অসংকোচে হাত দেন তাঁদের অনেকেরই জানা নেই, অনুবাদ একটি অতি জটিল কলা। এ নিয়ে পাতার পর পাতা লেখা হয়েছে। পুষ্কর দাশগুপ্তের অনুবাদ বিষয়ক বিবিধ নিবন্ধের বিশ্লেষণে পেয়েছি অরুণ মিত্রের প্রসঙ্গও। সেই বিবৃতি , প্রতিতুলনা, মূল্যায়ণ অতি সুপাঠ্য, আগ্রহোদ্দীপক । আসলে অরুণ মিত্রের একটি স্পষ্ট ও ব্যাখ্যাত দর্শন ছিল অনুবাদ বিষয়ে । সেটির সারসংক্ষেপ এইভাবে করা যায় , তাঁরই “বোদলের এবং বোদলের কাব্যের অনুবাদ” নামক প্রবন্ধটিতে তাঁর নিজের বক্তব্য থেকেঃ

‘কবিতার অনুবাদ দুরূহ কাজ। তার সমস্যা অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ রূপ নিয়ে, সারা পরস্পরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। মূল কবিতার বক্তব্য অবিকৃত রাখতে হবে এবং যথাসম্ভব তার আবহয়াওয়াও। সেই সঙ্গে তার গঠন এবং ভাষার বৈশিষ্ট্যকেও বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। … এ কাজ কবি ছাড়া অন্যের দ্বারা সম্ভব মনে হয় না। ।। যে কবিতা অনুবাদ করব তার ভিতরে বাস করা দরকার, সাময়িকভাবে তার হাওয়ায় নিঃশ্বাস নেওয়া দরকার।‘

 

অতঃপর তিনি সমস্যার জায়গাগুলি স্পষ্ট করে চিহ্নিত করেছিলেনঃ

“মূলের ছন্দ ও মিল রাখার কোন প্রশ্নই নেই, কারণ সে অন্য ভাষা। কেবল ছকটা রাখাই এ ক্ষেত্রে কর্তব্য, যাতে মূলের গঠনের একটা আভাস পাওয়া যায়। মূল ছন্দের একটা চলন যেন নিঃশ্বাসের আন্দাজেই রাখতে হবে। এবং মিলের ক্রমটা। … কবিতার চরিত্রের পক্ষে অপরিহার্্য কোন শব্দ বা শব্দগুচ্ছ যাতে বাদ না যায় এবং কবি চরিত্রের সঙ্গে অসমঞ্জস কোন ভাষাভঙ্গি না আসে, এই সাবধানতাটুকু প্রয়োজন।  ধ্বনির সমস্যাও আছে। কিন্তু এক ভাষার ধ্বনি অন্য ভাষায় আর কী করে আনা যাবে?  মোটের উপর এই করতে পারি যে, গম্ভীর ধ্বনিকে ভাষান্তরে গম্ভীরই রাখব এবং লঘু ধ্বনিকে লঘু।  এ বিষয়ে যথেচ্ছ আচরণ করব না। “

 

নিজের অনুবাদেও অরুণ মিত্র এই কঠোরতা অবলম্বন করতেন। অতএব , বর্জিত হত বাংলা কবিতার রীতিনীতির নৈকট্য খোঁজা ফরাসি কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে। যা তাঁর সমসময়ে অনেকেই করেছেন, কৃত্তিবাস কালখন্ডের কবিরা যেমন। কবিই হবে অনুবাদক, অরুণ মিত্রের মতে, কিন্তু অনুবাদক সত্তাকে ছাপিয়ে যদি কবি সত্তা বেশি প্রাধান্য পায় তাহলে মূল কবিতাটি থেকে সরে যাবেন পাঠক।  যে ধবনিমাধুর্জ্য মূলে নেই, সেই ধ্বনি আরোপ করতেন না অরুণ মিত্র তাঁর অনুবাদে। ব্যকরণ গতভাবে গঠনের দিক থেকে বাংলাকেই বরং তিনি ফরাসির কাছাকাছি নিয়ে যেতেন, ফরাসিকে বাংলার কাছাকাছি আনবার বদলে।

 

এই অনুবাদকের নিষ্ঠা এবং মূলের প্রতি আনুগত্যের জন্যই বাংলা কবিতার জগতে অনুপ্রবেশ লাভ করেছিল এমন সব আশ্চররয ঝলক, স্যাঁ ঝঁ পের্সের অনুবাদে :

 

আমাদের ভাবনা ইতিমধ্যেই রাত্রি থাকতে উঠে পড়ে বড় তাঁবুর মানুষদের মতো, যারা দিন হবার আগেই বাঁ কাঁধে তাদের জিন বয়ে লাল আকাশের নিচে হাঁটে ।

এই আমাদের ফেলে চলা জায়গা। মাটির ফল আমাদের পাঁচিলের নিচে, আকাশের জল আমাদের চৌবাচ্চায় এবং পাথরের মস্ত জাঁতাগুলো বালির উপর পড়ে।

 

হে রাত্রি , উপহার কোথায় নিয়ে যেতে হবে, কোথায় রাখতে হবে স্তুতি?

 

অথবা রাঁবোর যাত্রা নামক বিখ্যাত কবিতাটিতে লক্ষ্য করব অন্য অনুবাদকের গৃহীত স্বাধীনতার তুলনায় অরুণ মিত্রের সংযম,

“ যথেষ্ট দেখা গেল। দৃশ্যের সাক্ষাত ঘটেছে সকল বায়ুস্তরে।

যথেষ্ট পাওয়া গেল। নগরের গুঞ্জন সন্ধ্যায়, রৌদ্রে, সর্বক্ষণ

যথেষ্ট জানা গেল, জীবনের সব বাধা – আহা গুঞ্জন আর দৃশ্য !

নতুন স্নেহ আর নতুন কলরোলে যাত্রা । “

 

এই একটি কবিতাই আমরা অনেক রকমের অনুবাদে পাই। “যাত্রা”কে কেউ অনুবাদ করেন “বিদায়” কেউ বলেন “পাড়ি” । কেউ কেউ ছন্দের সিঞ্চন ঘটান গদ্যধর্মী কবিতায়, নিছক বাংলা কবিতার মত করে তোলবার জন্য! অরুণ মিত্র আপোষহীন মূলানুগ । অথচ নতুন দেখতে হলেও সেই সব অনুবাদ কবিতাই হয়ে ওঠে । অকবিতা নয়।

 

অরুণ মিত্রের কাছে আমাদের পাওয়া শেষ হয়নি এখনো। এখনো তাঁর লেখাগুলি থেকে বহুমাত্রিক হিরের মত বর্ণচ্ছটা উপচে পড়ছে। তিনি নিজেই বলেছিলেন,

“আমি যে গলায় কথা বলি তার কোন স্থিরতা নেই, এক-এক সময় এক-এক রকম।যেজন্যে মাঝে মাঝে আমাকে বেশ ধাতানি খেতে হয়। দশ রকম গলায় দশ রকম কথা, এ কি ভদ্দরলোকের আচরণ? কিন্তু আমি নাচার। গলা কি শুধু আমার? যে শোনে তারও নয়কি? ( খরজবদল)

 

এ কবিতার শেষে তিন ব্যাখ্যা করেন, যে শোনে, গলাটা আসলে তারও। প্রত্যেক শ্রোতার বদলের সঙ্গে সঙ্গে গলাও বদলে যাচ্ছে তাই।  কারণ, “তার শোনাটাই যে অন্যরকম। আমি গাছের কানে কানে যা বলি, নদীর কাছে তা বলি না, তেমন ভাবেও না। …।“ আর, “বুলার” সঙ্গে কথা বলার সময় সবচেয়ে অন্যরকম তিনি… কারণ “ তখন আমাকে আকাশ জুড়ে উছলে তুলতে হয় সিম্‌ফনি। সেই গলা কি শুধু আমার? না, তা বুলারও।“

 

এই এক আকাশ ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ রেখে গেলেন অরুণ মিত্র। যা বাংলা ভাষার ঐতিহ্য ঐশ্বর্য। যেন আবার আবিষ্কার করতে বসি তাঁকে।

 

 

____________________________________________________________________________________

 

ভাষাশরীরের মধ্যে সমকালঃ নব্বই দুহাজার

‘অন্ধকার খাদ, বলো তুমি কিশোরকুমার শোননি

বলো তুমি শোননি ‘জিন্দেগী এক সফর”

বলো তুমি শোনোনি তাগধুম তাগধুম বাজে

মনঃকষ্টের ঢোল…

 

ওই আবার কিশোরকুমার ফুটছে

ওই তো আবার

জিন্দেগী রাফ এ্যান্ড টাফ হয়ে জেগে উঠছে …’ ( একটি রোগা কবিতা, রাণা রায়চৌধুরী)

 

কবিতার ভাষাশরীরে সময়ের চিহ্ন দেখার বদ অভ্যেস কাটাতে পারিনি, কখনো, কিছুতেই, আর এই কারণেই, কবিতার ভেতরে সমসময়ের কিছু উপাদানকে বেমালুম সেলাই হয়ে যেতে দেখলে কখনো ভুঁইফোঁড় মনে হয় না, বরঞ্চ এটাই বুঝতে পারি যে জীবিত এক ভাষার অতিজীবিত একটা সাহিত্যধারার ভেতরেই রয়েছে বাংলা কবিতা।

কিন্তু সময়ের চিহ্ন মানে ঠিক ঠিক কী? কোন উপাদানকে আমরা বলি সমসাময়িক? মোবাইল ফোন, অথবা এফ এম রেডিওর উল্লেখ থাকার মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ থাকবে সমসাময়িকতা? কোন মূলগত তফাত , কোন গঠনগত পরিবর্তন কি ঘটে গেছে কবিতার, অধুনার বাংলা কবিতার শরীরে ও মনে? কোথাও কি চিহ্নিত করা যায় এমন বদল, যার মধ্যে দিয়ে এ সময়ের কবিতাকে এ সময়ের বলেই চিনে নেওয়া যাবে?

এ সময়ের কবিতা বলতে আমি বিগত দশ বছরের বাংলা কবিতাকে ধরছি কিন্তু দশক বিভাজনে ৯০ বা ২০০০-এর কবি, এমন কোন ভাগকে আলাদা করে রাখছি না বিশেষ। তবে ঘুরেফিরে এক আধজন সত্তর বা আশির কবির গত দশ বছরের লেখালেখিকে আওতার মধ্যে আনলেও, মূলত দেখা যাবে ৯০ পরবর্তী কবিরাই ঠাঁই পাবেন এই লেখায়, উদ্ধৃতি কালীন।

প্রথমেই ফ্রেম রচনার প্রয়াস করি। চেষ্টা করি ধরিয়ে দেবার , কী জাতীয় পরিবর্তনের চিহ্ন দেখতে চাইছি আজকের কবিতায়। ধরে নেওয়া যাক সত্তরের কবিতা। সত্তরের কবিতা সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে রাজনৈতিক উত্তালতা সত্তরেরে লেখাকে বিশেষভাবে আলোড়িত করেছিল বলেই ওই দশকটি এমন ফলবান। অর্থাৎ কবিরা কী লিখবেন তা নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছিল বহিরঙ্গিন কিছু ঘটনাবলী, যা , ধরে নেওয়া যায় , কবির অন্তর্দেশকেও পরিবর্তিত করে দিচ্ছিল। এর প্রেক্ষিত কেউ কেউ তাঁদের লেখা বা আলোচনায় দিয়েছেন এমনভাবে।

“ তীব্র একটা পালাবদল ঘটে যাচ্ছিল কবিতাশরীরে। পঞ্চাশের উত্তাল উদ্দামতার পর ষাটের স্তিমিত অববাহিকায় গা বেয়ে সত্ত্রের তুমুল গর্জন বিশেষ করে প্রতিফলিত হল কবিতায়। পুরনো চিন্তাপ্রণালী ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে এই দশকে। এই দশকের কবিতায় পালটে গেল কবিদের ধ্যানধারণা, স্বপ্ন, আশা আকাংক্ষা, রাজনীতি, এমনকি রোম্যান্টিকতাও। এই সময়ের কবিতা বিশেষ একটি ধ্যানধারণা বা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্ম হবার চেষ্টা করেছিলেন। … এঁরা অধিকাংশই কলকাতাকেন্দ্রিক ছিলেন না… জেলাগুলি থেকে এসেছিলেন। … লেখালেখিতে এসেছে পটভূমির বিবর্তন, সমকালীন স্পষ্টতা। “

( সোমক দাস, সত্তরের কবিতা নিয়ে)

আমার প্রশ্ন, সত্তরের দশক নিয়ে স্পষ্ট ভাষায় এমন বিবরণ দেওয়াই যায়, সেই একই ভাবে কি কোন বিবরণ দেওয়া সম্ভব নব্বইকে নিয়ে? অথচ আমরা জানি, পটভূমি সত্তরে যতখানি পাল্টেছিল, নব্বইতে রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজের বদল তার চেয়ে বেশির থেকে কিছু কম না।  নব্বই এনেছে মুক্ত বাজারের হাওয়া, নব্বই এনেছে গ্লোবালাইজেশন আর স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট, ডিসিনভেস্টমেন্ট আর মনমোহন-ইকনমিক্স। নব্বইতে যার শুরু , দু হাজারে এসে তার পরিণতিতে সমাজের নানা স্তরে সার্বিক বদল দেখছি আমরা। সুতরাং নব্বইয়ে-দুহাজারে যারা লিখতে এলেন, তাঁদের পারিপার্শ্বের বদল হয়েছে এই বিগত সবকটি দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

অথচ নব্বইয়ের কবিতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা কী সুরে হয়েছে? পরিপার্শ্বকে ছেড়ে দিয়ে কথা হয়েছে এক আমূল পরিবর্তনকে নিয়েই , যদিও পরিপার্শ্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সেই আমূল, গঠনগত পরিবর্তনকে যদি যুক্ত না-ই করা যায় তাহলে কী লাভ জানি না।  আমূল তফাত টি হল, আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিকে উত্তরণ। থিওরির স্তরে এই মতগুলি বার বার এসেছে বিদেশি টার্মিনোলজির হাত ধরে ধরে। আসলে সত্তর বা আশি থেকে ঘটে যাওয়া স্ট্রাকচারালিজম, ডি কন্সট্রাকশন আদি দার্শনিক মতবাদ আমাদের দেশে পাড়ি দিয়ে উঠতে উঠতেই এই কটা বছর কেটে গেছে। সুতরাং এমনই কপাল, নব্বইয়ের কবিরা এক লাফে প্রোমোশন পেয়ে গেছেন আধুনিক থেকে উত্তরাধুনিকে। তার ব্যাখ্যা বা চর্চা আমরা পাইনি কোথাও। শুধু স্টেটমেন্ট পেয়েছি। তাতে বলা হয়েছে, এখন যা লেখা হচ্ছে সব উত্তর আধুনিক…

কেন? তত্ত্বকথার বুলি আওড়াতে শুরু করেও আমরা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হই… ব্যাখ্যাগুলো এতদিনে এসে পৌঁছল কিনা ভাবি। অনেক পড়ার পর। অনেক কবিতার সঙ্গে কথোপকথনের পর। কিছু চিহ্ন আছে, সেইসব চিহ্ন আমাদের এই সময়ের কবিতায় কিভাবে ফুটে উঠল , আদৌ ফুটে উঠল কি না, জানতে ইচ্ছে করে।

 

সমীর রায়চৌধুরী যেমন, তাঁর  এক লেখায়, পোস্টমডার্ন কবিতা চেনার উপায় বলেছেন কয়েকটি। তার থেকে বেছে নিলাম খান কয়েক।

 

১। কবিতায় ভাষার গুরুত্বকে মান্য করে

২। এ থেকে কবির নিজস্ব ইমেজ তৈরি সম্ভব নয়/ অনুপস্থিত ‘আমি’।

৩। যে কোন সীমাকে ছাপিয়ে যায় এই কবিতা। তাকে নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ধরে রাখা সম্ভব না।

৪। আধুনিক কবিতা ছল হিউম্যানিস্ট। মানব মুখী। মানুষের জয়গান। আজকের কবিতা কীটপতঙ্গ, গুল্মলতা, পশুপাখি, ফ্রিজ, টেবিল, অ্যাসট্রে, সবকিছু নিয়েই লেখা হতে পারে।

৫। বিষয়কেন্দ্রিকতার অভাব।

৬। ওপেন এন্ডেড

আমাদের নব্বইয়ের শুরুর দিকে থেকে আজ অব্দি লেখা বিবিধ কবিতাকে খুঁটিয়ে দেখলে এই তালিকা থেকে অনেক গুলো বৈশিষ্ট্যকেই কিন্তু মহাসম্মানে সমারূঢ় দেখব । যেমন কবির আমি-র অনুপস্থিতি। আগে যেখানে আত্মকথন=কবিতা এমন এক লিরিক মাহাত্ম্য দেখতাম আমরা সব কবিতায়, এখন সেখানে দেখব, বিবরণ ছত্রখান হয়ে পড়ছে …

 

“আগের কথা বাদ দিই, মনে করো বৃষ্টি শুরু/ জীবনানন্দ দাশ থেকে/মেঘে মেঘে ডেকে উঠল প্যাঁচা…/ ভিজছে বরিশাল, আর আকাশে মহাপয়ার…/মনে করো, লাইনের পর লাইনে পেরিয়ে যাচ্ছে/ভিজে সপসপ বিষণ্ন একটা চিল/নেমে পড়ছে কারো অশ্রুতে/ তার নামও বৃষ্টি কিনা, বলো? “ ( বিভাস রায়চৌধুরী, তরুণ কবি কথিত)

 

ভাষাকে নিয়ে কাজ কম্মো করার প্রবণতাও এই সময়ের কবিতার বড় গুণ। বা দোষ। “ বড় বিষ… বড় বিষণ্ণ এই সন্ধ্যা…মাঠে ময়দানে অহেতুক কিছু রোশনাই/শব … শব… মৃত শব্দের অনুসন্ধান…/অন্ধ গলিতে মাথা খুঁড়ে মরে রাস্তাই…(মন্দাক্রান্তা সেন, ছদ্মপুরাণ)” এমন সব কারুকৃতি, শব্দ খেলা সুপ্রচুর ঘটবে এর পর থেকে.. ‘ঘ্যাম বেড়েছে শ্যামসোহাগী রাধার” ( শ্রীজাত)… উদাহরণ বহুল পরিমাণে পাওয়া যাবে, খুঁজলেই।

হাঙর থেকে লিবিডো, যৌনতা থেকে দুর্গাপুজো, যাত্রা পালা থেকে শ্যারন স্টোন, কি পাইনি আমরা ৯০ দশকের কবিতায়?  বহুধরনের বিষয়ের খোঁজ, এবং বিষয় থেকে ভাষার দিকে, এবং ভাষা থেকে বিষয়ের দিক সুস্পষ্ট দেওয়া নেওয়ার ইঙ্গিত , এ তোঈই সময়ের প্রতিটি কবিতা থেকেই খুঁজে নিতে পারব আমরা।

এ প্রসঙ্গে পড়ে নেব আর একটি লেখার টুকরোও, “বাংলা কবিতার সামান্য পাঠক হিসেবে… মনে হয়েছে এগুলি আধুনিক কবিতা নয়। এ আমাদের সময়ের উত্তর আধুনিক কবিতা। আধুনিক কবিতা হল নিটোল, প্রতীকী, একক , ব্যাখ্যাযোগ্য। তা এক স্থিতি, এক অভিজ্ঞতা, এক ছবিনির্ভর। বস্তু, স্থান, প্রাণী, সংস্থা, আইডিয়া ও সময় – যে ছ’টি বিষয় নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা গড়ে ওঠে, তার যে কোন একটির প্রতি আলোকপাত করে আধুনিক কবি কবিতা রচনা করেন। উত্তর আধুনিক কবিতায় চিত্রকল্প হয়ে গেছে ভঙ্গুর। তার কারণ বাস্তব জগত থেকে প্রতিমায় ঠাসা সংকেত অত্যন্ত দ্রুতবেগে একের পর এক এসে আছড়ে পড়ছে কবির পঞ্চেন্দ্রিয়ে । যে নার্ভতন্তুরা প্রতিমাবহনে সক্ষম তারা ঘন ঘন সক্রিয় হয়ে উঠছে।  কবির মাথায় যে প্রতিমাগুলো নথিবদ্ধ হল তার উৎস চারপাশ থেকে তাঁর উপর উদ্দীপক সমূহের বৃষ্টি। আধুনিক কবিদের ক্ষেত্রে এই বৃষ্ট ছিল পশলায় পশলায়। উত্তর আধুনিক কবিদের ক্ষেত্রে তা মুষলধারে, অবিরাম বৃষ্টির মত। আধুনিক কবির পক্ষে এক পশলা থেকে আরেক পশলার ফাঁকে প্রতিমাগুলোর বর্গীকরণ, হিসেব রাখা সম্ভব ছিল।  উত্তর আধুনিক কবির পক্ষে তা সম্ভব নয়। এখন একশোটা টিভি চ্যানেল, ইমেল, এস এম এস, অসংখ্য দৈনিক-ম্যাগাজিন-শয়ে শয়ে লিটল ম্যাগাজিন, অসংখ্য নাট্যগোষ্ঠী, অগুন্তি গায়কগায়িকা – “আধুনিক” কবিরা এই তথ্যবিস্ফোরণের কথা ভাবতেই পারতেন না। যুক্তি প্রয়োগ করে  এই বিস্ফোরণকে ব্যাখ্যা করা যায় না।  তাই উত্তর আধুনিক কবিতকে তাঁর মাথায় অবিরাম নথিবদ্ধ করতে হয় এরকম হাজার হাজার প্রতিমা। আই উত্তর আধুনিক কবিতার চিত্রকল্প ভঙ্গুর।

আধুনিক কবি যুক্তি দিয়ে জানতেন, শীতকালে ক্রিকেট খেলা হয়। উত্তর আধুনিক কবি জানেন ৩৫ডিগ্রি উত্তাপেও ওয়ান ডে ক্রিকেট খেলা যায়।

তবে ব্যাপারটা এমন নয় যে আধুনিক কবিতা খারাপ, উত্তর আধুনিক কবিতা ভাল, বা আধুনিক কবিতার চেয়ে উত্তর আধুনিক কবিতা এগিয়ে আছে।

উত্তর আধুনিকতা একটি কালখন্ড, অস্থায়ী, অস্থির সময়ের উচ্চারণ, আধুনিকতার মত তত্ত্বে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়।

আধুনিক কবিরা একটি কবিতাকে সম্পূর্ণতা দেবার জন্য প্রথম পংক্তির উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেন শেষ পংক্তিতে। কবিতার ক্লোজ এন্ডেড হওয়া জরুরি ছিল। উত্তর আধুনিক কবিতা ওপেন এন্ডেড।

-সুরজিৎ সেন (আধুনিক কবিতা নয়ঃ রাণা রায়চৌধুরীর কবিতা)।

সকল ফুলের কাছে এত মোহময় মনে যাবার পরেও

মানুষেরা কিন্তু মাংসরন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালবাসে।

বিনয় মজুমদারের এই আশ্চর্য উচ্চারণের পর এতগুলো দশক কেটে গেছে। কিন্তু, স্বাদ গ্রন্থিকে উত্তেজিত করার শিল্প যদি হয় রন্ধনশিল্প, স্বাদকে শব্দে রূপান্তরিত করাটা কবিদের কাছে এখন খুব দৈনন্দিন কাজ হয়ে গেছে। তাই বিনয়ের বৈপরীত্য নয়, চমক নয়, দিনযাপনের গ্লানি, দিনযাপনের আনন্দ, সবটাকেই বোঝায় কবিতার আজকের খাদ্যবিষয়ক উল্লেখ।

কবিতার এই নয়া মোড়, আমাদের দেখাল, খাবার-খাদ্যের কত চটুল ব্যবহার হতে পারে কবিতায়। নব্বইয়ের কবিতায় এর ব্যবহার আমরা অসংখ্য দেখেছি। এর ব্যবহার আমরা অসংখ্য করেছি। চাউমিন রোল চিলি চিকেনের যুগে ও জগতে আমাদের লেখায় আসে কামময়তায় মাংসের গন্ধের ভেতরে কাবাবের উল্লেখ, আড্ডার সংশ্রবে চা-বিস্কুটের উল্লেখ, অথবা রাস্তার গতির সঙ্গে রোলকর্নার-চাউমিনের দোকানের একাত্মতা আসে । এই মুহুর্তের কিছু কবিতায় আরো বেশি বেশি করে খাবারের অনুষঙ্গ এসেছে, যার কিছু এই লেখায় বলা থাকুক…

সুতপা সেনগুপ্ত প্রেমিকের ঠোঁটকে চিজের টুকরোর সঙ্গে তুলনা করে যে বিপ্লব আনছিলেন নব্বইয়ের শেষাশেষি, তাঁর ছোকরা ছোকরা শ্যামরায়বাই গ্রন্থে, যে কবিতাবইয়ের লেখাগুলিকে কবিতা বলেই মানতে নারাজ ছিলেন সে সময়ের কোন কোন প্রতিষ্ঠিত সমালোচক, কিছুতেই সেই বিপ্লব আর ফেরার পথ দেখবে না, কেননা দুহাজারে এসে এই ঘোর ফাস্ট-ফুডময় শতকের কবিতাও ফাস্ট-ফুডময় ।

 

“ ডিম-পাঁউরুটির মত জীবনে, তুমি এলে

একটি হলুদ রঙের কলা…

নিটোল আকার দেখে, বিশ্বাস করো,

ভারি খিদে পায়…”(রাজশ্রী চক্রবর্তী, ডিম-পাঁউরুটির কবিতা)

“তোর পিঠের তিলগুলো দিয়ে নতুন রেসিপি বানিয়েছি। আজকে আমার সাথে লাঞ্চ

কর। আমাদের গন্ধ মিলেমিশে ভরে আছে ডাইনিং রুম । তোর হাতের নিচের দিকটা

খেতে খেতে মনে হয় বাঁ পা-টা একটু টেস্ট করি । নোনতা বুড়ো আঙুলের মাথাটা

জিভে নিই। ছ’ ঘন্টা ম্যারিনেট করা তুই গলে যাস আমার মুখের মধ্যে । ডানদিকের

বুকে এসে কিছুক্ষণ দম নিই । আর ওটা? ওটা রেখে দিই সবার শেষে খাব বলে ।“ (স্বাগতা দাশগুপ্ত ,আ লা কার্টে)

“আমাদের গা চুঁইয়ে যেসব আদর পড়ে গেছিল ফোর্ট রায়চকের পাঁচতলার ঘরটায়

ওই ওদের জন্যই , বিশ্বাস কর, আমি লিখতে বসেছি। তোর ঊরুর খাঁজে শুয়ে থাকা

আঁচিলগুলো যখন এক এক করে উঠে আসছিল আমার ডিনার প্লেটে, তুই বৃথাই

রুম সার্ভিসে ফোন করছিলি। পর্ক সিজলারের চেয়ে অনেক বেশি ধোঁয়া ছাড়ছিল

আমাদের গরম গরম শরীরদুটো …” (স্বাগতা দাশগুপ্ত , ফোর্ট রায়চক)

“চিলি চিকেনে ওরা অনেক বেশি পেঁয়াজ আর টক দেয়। টক খাই না বলে আমি মাংসগুলো আলাদা করে খেতাম। কী করব, মধ্যবিত্ত মন – এত সস্তার আমিষ এড়াতে পারিনি ! /সেইসব রাস্তাঘাট রুমালি রুটির মত হাত নাড়ে। অনেক আকাশ পেরিয়ে, ইশারা আমার কাছে পৌঁছয়। /আমি সাড়া দিই – আমার কথা শুনতে পাও তো পালবাজার?” ( শুভ্রনীল সাগর, বোবা মানচিত্র)

সেই কোন শৈশবে পড়েছিলাম, পূর্নিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি, সুকান্তের এই ব্যবহারকে ঘিরে পাঠকের উত্তেজনা, মুগ্ধতা, অথচ নব্বই দুহাজারের যা কিছু, সবই যেহেতু প্রশ্নচিহ্নময়, আমার মত পাঠকের কাছে যতটাই গ্রহণীয় হোক না কেন,এই সব লেখাও, কেউ কেউ বলবেন কবিতাকে পণ্যায়িত করার কৌশল।

কবিতা কি তবে পণ্যায়নেরই হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, আজ, দুহাজার পরবর্তী কবিতায়?

ইদানীং কবিতার দু দুটো আলাদা মুখ দেখি। একটা মুখ ঝাঁ চকচকে শপিং মল সমৃদ্ধ নিয়ন বাতির আলোয় আলোকিত , শাঁ শাঁ ফ্লাইওভারে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে ছুটে চলা, কলকাতার শহুরে সিনথেটিক মুখ। অন্যটা সে মুখের আলো না পড়া  অংশ, যেখানে লেগে আছে বর্জন আর ব্যথা আর উপেক্ষা। কিন্তু সেই অংশে কবিতার যে তির্যক আলো এসে পড়ছে তাই তো আসল উৎসুকতার জন্ম দেয়। সেখানে ভাষা নিয়ে যে ভাংচুর চলে তা বরঞ্চ আরো বেশি আনন্দ দেয় আমাকে। ভাষায় হিন্দি-ইংরিজি শব্দের প্রাদুর্ভাব নিয়ে নব্বইয়ের শুরুতে যে যায়-যায় ভাব  এসেছিল তা আর উচ্চারিত নয়, কিন্ত  বাংলা কবিতা দুটো স্পষ্ট কিন্তু সমান্তরাল ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে যেন।

প্রথম ভাগ , মোটা দাগের ধারণা-ব্যবহারের লোভ না সামলেই বলছি, বাংলা কবিতায় “উন্নয়নে”র পক্ষে । যাদের লেখায় শপিংমল কাফে কফি ডে-সর্বস্বতা। আরবান, রক গায়ক , রাগি ও তেতো তারা। এরা প্রকৃত অর্থে ইন্ডিয়া-র বাসিন্দা, ফেসবুক অর্কুটে রোজ চ্যাটিয়ে থাকেন সকাল থেকে মাঝরাত্তির তক।  ঝাঁ চকচকে জিন্স-টপের ব্রাপ্যান্টির বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে, পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলোতে, বিন্দাস, ঝাক্কাস সহ নানা পথচলতি বাংলিশ-হিংলা শব্দের অনুপ্রবেশে যে নতুন কবিতা ভাষা একাংশের কবি তৈরি করলেন, সে অংশকে “বাজারি” বা বাণিজ্যিক বলাই চলে ।  এ ধরণের চটজলদি চটুল শব্দ ব্যবহার দেখে  বাংলাভাষার এক অবক্ষয়েরই রূপ, এমন কথা বলাই যায়। সংকট নয়, কেবল অধুনার এক ঝুঠা চাকচিক্যকে প্রকাশ করে একের পর এক প্রেমের কবিতা , তুচ্ছতার কবিতা, সময় কাটানোর কবিতা লিখছেন এই বাজারসফল কবিরা।

আসলে , কবিদের কাজ সময়কে অনুবাদ করা, কবিদের কাজ সবরকমের ক্ষমতাকাঠামোতে ঘুণ ধরানো। সে ক্ষমতা রাষ্ট্রের হোক, সে ক্ষমতা বাজারের হোক, সে ক্ষমতা ব্যক্তি বা পরিবারের বা সমাজের হোক। তাকে তছনছ করেই আবার নতুন কিছু তৈরি হয়ে উঠবে। তবু, কে না জানে, সবটাই আর তেমন সরল নেই! যাকে এ মুহূর্তে মনে হচ্ছে পণ্যায়নের পক্ষে , পরের কবিতাতেই বুঝবেন, আসলে সে ক্রিটিক রচনা করছে এই গোটা ক্ষমতাকাঠামোর, সর্বত্র চারিয়ে যাওয়া পণ্যজীবনের । আর পক্ষে বা বিপক্ষে যে দিকেই আপনি হোন না কেন, শেষ পর্যন্ত আপনার বাচন ভাবনা জীবনযাপনও এক তুমুল পরিবর্তনের ঢেউ-তে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত । হবেই।

প্রতিমুহূর্তে সাত আটটা নিউজ চ্যানেল যে খবর উগরে দেয়, তার অনেকগুলোই টি আর পি ধরে রাখার জন্য তাদের সৃষ্টি করা, ঠিক যেমন দেখা গেছে পিপলি লাইভে। অন্যদিকে আমরা এন্টারটেনমেন্ট চ্যানেলে দেখেছি রিয়ালিটি শো-এর খেলাগুলো, গ্রামের দম্পতি এসে তাদের দাম্পত্য কেচ্ছা লুটোচ্ছেন টিভির পর্দায়, আর বিখ্যাত নায়িকা তাঁদের বিবাহিত জীবনের দায়িত্ব নিয়ে বকাঝকা দিচ্ছেন, বলুন , এর পর থেকে আর ঝগড়া করবেন না! ব্যক্তিগতর পাবলিকে লুটিয়ে পড়ার এইসব ঘটনা আমাদের মুখে মৌরি-জোয়ানের মত মুখরোচক। নিজেদের অজান্তেই আমরা গ্রহণ করছি এই বিষ শিরায় শিরায়।

অসচেতনে অথবা সচেতনে, এই সময়ের প্রতিটি নতুন নতুন বাজারলক্ষণকে লেখায় জুড়ে নেওয়া? তা কোন ক্ষমতাকাঠামোকে তছনছ না করে, তাকে তোল্লাই দেওয়া। রিডিং বিটুইন লাইন্স না করে, ভাঁজগুলো খুলে খুলে নোংরা তলপেটটা না দেখিয়ে, শুধু ওপর ওপর ফ্লাইওভার আর হ্যালোজেনের আলো, রঙ্গিনী কলকাতার তুলতুলে নরম  অংশটাকে তুলে আনা ভাষায়। যে ভাষা কেবল ‘ইন্ডিয়া’র কথা বলে, কতিপয় শিক্ষিত নাগরিক উচ্চমধ্যবিত্ত বা আপওয়ার্ডলি মোবাইল মধ্যবিত্তের কথা বলে। বলে না পা ফস্কে যাওয়া , বা চিরদিন যে অন্ধকার সেই অন্ধকারেই থেকে যাওয়া ‘ভারত’-এর কথা । যে লেখা  আমাদের শুধু শপিং মল দেখায়। শপিং মলে ইনস্টোর জবের হাজারটা মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্ত গেরস্তালির ছেলেমেয়েকে দেখায় না, যারা রোজ লম্বা শিফটের ডিউটি করে লোকাল ট্রেনে ঘরে ফেরে। বদল-ই শুধু দেখবেন কি, কবিরা? রংচঙে চটকদার? যে উন্নয়ন আমাদের মধ্যে ফোকটে বিদেশ ভ্রমণের লোলুপতা আনে, কফি আর চকোলেটের মধুরতা আর তেতোভাব আনে, সেই উন্নয়নই শুধু লিখবেন তাঁরা? তার পেছনে ভিজে সপসপ বিষন্নতা লিখবেন না? তার পেছনে শূন্যতা আর প্রাণহীনতার ফিল লিখবেন না?

সোজা কথায় ফিলগুড লিখবেন শুধু, সংকটটা এড়িয়ে যাবেন? কে যেন বলেছিল কাকে, শোন, তোর আসল প্রবলেমটা হল, তোর কোন প্রবলেম নেই। সেই প্রবলেম না থাকাটা যে আরো কত বড় রোগের লক্ষণ, সারাখন ঝাক্কাস আর বিন্দাস থাকাটা যে আরো  কতখানি নিঃসঙ্গতা আর ফাঁকা দেওয়ালের দিকে তাকানোর জন্ম দিচ্ছে, শপিং মল বা কফিশপ থেকে বাড়ি ফিরে যাবার পর… সেটা লিখবেন না?

আজ যা সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম, কাল তা নয়ডা-ভাট্টা-পারসৌল। ম্যানিলা, ফিলিপাইন্সে বা দুবাইতে যে শ্রমিকেরা ঘেটোতে থাকেন, একটা ঘরের মধ্যে ছটা বাংক বেডে ঘুমিয়ে , টাইমের কলের জলে চান করে কারখানার ভোঁ শুনে লাইন লাগান গেটের সামনে, তাদের নিয়ে নতুন চার্লি চ্যাপলিন কোন যুগান্তকারী মডার্ন টাইমস করবেন না, মজার ছলে? বাংলাতেও তো আসছে সেই সব ডাও-সেলিমরা, আসতে চাইছে…আজ না এলেও কাল আসবে, নতুন নতুন সব আন্দোলনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে। তখন কি আবার নতুন করে লেখা হবে না ব্যান্ডমাস্টার বা প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার।  কবিরা নিজে আন্দোলনে যোগ না দিলেও কবির লেখায় বুভুক্ষা-তাড়িত আশাআকাংক্ষার কথা আসবে না আর, মানুষ মানুষ মানুষের?

ভাংচুর তাহলে হয়ে থাকবে শুধুই ভাষাগত একটা নতুন শৌখিনতা। বা গ্রামারে, শুধুই লাইনের পর লাইন আমি ভেঙে যাওয়া, ছত্রখান হয়ে থাকা বাক্য, অথবা বার বার ঘটমান বর্তমান কালের প্রয়োগে গতিমান হয়ে থাকা, এইটুকুতেই কি পর্যবসিত হয়ে থাকবে আমাদের কবিতা? কবিরা ক্রমাগত প্রেমিকের উরুতে কনসেনট্রেট করবেন, বাঁ পা টেস্ট করার পর ডান পা… ছ ঘন্টা ম্যারিনেট করা শরীর। এই স্বাদগ্রহণের নতুনত্ব যতক্ষণ থাকবে, আমাদের ঝাঁ চকচকে নতুন কবিতার আয়ু ঠিক ততদিন। অথবা, ইশ, আমরা কমপিউটারের সামনে বসে কতটাই না খারাপ আছি! আহা! পাসওয়ার্ডের হাত ধরে আমাদের ব্যক্তিগত কতটাই তছনছ, তবে আয় তুই আমি লীলা খেলি… এমন এক দুঃখবিলাসে শেষ হয়ে যাবে। হয়ত বা মননের আলো এসে পৌঁছবে এখানেও, তবে দ্রুত আলোছায়ার খেলার ভেতরে শেষ হয়ে যাবে তা ছায়াবাজির মত। হ্যালুসিনেশনের ভেতরে মজে থাকতে থাকতেই হারিয়ে যাবে পরিপূর্ণ একটা সময়পর্ব । লেখায় সহজে বিস্তৃত হবে, “যতবার মিসড কল দিই, উচ্চারণ করো প্রণয়” ( বিশ্বজিৎ মন্ডল) , “হাত দিয়ে দিয়ে দেখছি/ সময়ের বানানো ক্লিভেজ” বা “সময়ের বিভিন্ন স্টিকারে/ আমার লিঙ্গচিহ্ন রেখে রেখে গেছি”( অনিমিখ পাত্র) এমত স্মার্ট ঝাঁচকচকে চিত্রকল্প। ‘টুথব্রাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার কৈশোর’, এমন লাইনও রচনা হবে আজ, ( অমিত ভট্টাচার্য), অথবা, “নিরুত্তর এস এম এসের মতো রাত্রি আজ/কেটে যাবে…” এমন আশ্চর্য নতুন চিত্রকল্প বানানো হবে ( সীমিতা মুখোপাধ্যায়) যিনি প্রবল প্রতিশ্রুতিময়তায় অন্যত্র লিখবেন, ‘একটি পরকীয়া কবিতায় এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেল…/ কবিরা সকলেই পরপুরুষ…’।

অথচ, অন্যদিক্‌ একেবারেই এইসব নতুন মেধা বর্জন করেই তো লিখছেন আরো কেউ কেউ।  দ্বিতীয় ভাগের কবিরা, চটজলদি চটকদার শব্দ চয়ন থেকে দূরে মনস্ক লেখালেখি করছেন, তুলে আনছেন গ্রাম সমাজে তন্নিষ্ঠ ছবি আর চিরকালীন ভারতবর্ষের কথা।  দ্বিধাবিভক্ত পৃথিবীকে দ্বিধাবিভক্ত করেই দেখা যাচ্ছে । ইন্ডিয়ার থেকে ভারতের মুখ বেশি করে দেখা যাচ্ছে ।

দুঃখ যখন দখিন হাওয়া, মেঘলা দুপুর

তোমার পায়ের শব্দ শুনি – বাজিয়ে নুপূর

আসছ তুমি, ভাঙছ গো দমবন্ধ দুয়ার

সিক্ত চুলে বাঁধছ আমার নিকট ও দূর

( রুবাই, মুজিবর আনসারী)

অথবা,

কাঁসাইয়ের বালুকারাশির ওপর

ছুটির মেজাজে ঐ ট্রাক ড্রাইভার

ঝুমুরের সুর ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে পড়েন

 

কোজাগরী আলোয় অসহায় তিনি

হঠাৎ জামা খুলে চেয়ে দেখেন

নিজের ভক্তাচিহ্নগুলি

 

তাঁকে যেন কাশফুলের মত লাগে

রক্তকরবীর মত লাগে  ।   (ট্রাকড্রাইভার, রাজীব ঘোষাল)

যদিও ভক্তাচিহ্ন মানে যে চৈত্রের চড়কের আঙটার দাগ সে কথা ফুটনোটে বলতে হয়, সম্ভবত ইন্ডিয়া-বাসী কবিদের জ্ঞাতার্থেই।

অথবা,

আমাদের রান্নাঘরের টালির ফাঁক বেয়ে

একফোঁটা দু ফোঁটা তিনফোঁটা করতে করতে

ঝমঝমিয়ে উঠছে সুরধ্বনি।

গৃহকর্ত্রী পিঁড়ি উলটে দেয় পবনদেবতাকে

দু ঠোঁটে ভয় জমাট বেঁধে আছে, আমার পাশে

আমার ছোটবোন জাপটে ধরে আছে বাঁশের খুঁটি।

 

তখনো রান্না হয়নি। জল ঢুকছে উনুনে।

বুভুক্ষু দু চোখে তিন্নি দাঁড়িয়ে আছে মেঝেতে।

 

হাঁসগুলি প্যাকপ্যাক করে জষ্টির প্রথম জলে।

( সংস্কৃতি, মন্থন মোদক)

আমার কেমন মনে হতে থাকে যে এই কবিতাগুলি যেন কেবল প্রান্তিক এবং গরিব “ভারত”-অংশের জীবনের ধারাভাষ্য নয় শুধু, অন্ধ কোন আঁকড়ে ধরা নয়। সচেতনে, একটা প্রান্তিকতার বয়ান তৈরি করা, যা অন্য , ওই ইন্ডিয়া বয়ানের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইছে। এখানে চলেছে এক অদৃশ্য পলিটিক্স, চলছে কথোপকথন, উত্তর প্রত্যুত্তর। গঠনে সচেতন হয়েও ভেঙে ভেঙে দিতে চাইছে অতিসচেতনতার পণ্যসর্বস্বতাকে। প্রশান্ত মাহাত লেখেন যখন, “এক এক সময় খেলার মধ্যে তুমি আমি/হয়ে উঠি খেলনা/ খেলা শেষে পড়ে থাকি একা একা”, বোঝা যায় তার দৃষ্টি অনেক ভেতর অব্দি ক্ষয়কে দেখে ফেলেছে।

পুরুলিয়ার মাহাত পরিবারের ছেলে, তরুণ ও প্রতিভাময় কবি অভিমন্যু মাহাত  তাঁর ‘জঙ্গল মহল’ কবিতায় লেখেন,

“রাত্রির তরল অন্ধকারে উথালে পাথালে ভেসে বেড়াচ্ছে

পুলিশি ছোবল, আমরা নিয়ত ওষুধপত্র খাই

ভাইরাস লকাপে

আমরা অবগত পৃথিবী, পৃথিবী অবগত আমরা

আমরা অর্ধপেট বিলাসী, করা লাঙলের কর্ষণে মুদ্রিত হয়

আমাদের ইস্তাহার…”

ওই কবিতাতেই অভিমন্যু  যখন লেখেন, ‘আমরা দেখতে চাই না প্রভাতি কাগজে উন্নয়নের বিজ্ঞাপনী ফর্দ/ আমরা আছি সহস্র পাক বাবুই ঘাস নিয়ে…’  তখনই স্পষ্ট হয়ে যায় দু হাজারের কবিদের সমসাময়িকতার ইস্তাহার, কতটা স্পষ্ট ও সচেতন তার মেধা।

 

লড়াইটা লড়াই থাকে না আর, যখন আরো বেশি গতিময় কথোপকথন তৈরি হয় দুই দল কবির ভেতরেই, বা এক কবির ভেতরেই বসে থাকা অন্য কবির সঙ্গে।  মিসড কল-চমকানো বিশ্বজিৎ মন্ডলই ইন্ডিয়ার সঙ্গে ভারতের কথোপকথনের ছলে লেখেন, “(আমার) কাঁধে লাঙলের দাগ; সারা দেহে ম’ম’ করছে কাহানের গন্ধ”, (কাহান : জমি চাষ, এই ফুটনোট সহ)। এবার , বুঝি যে কবিতা সাহসী হচ্ছে ক্রমশ। বা সুস্নাত চৌধুরী লেখেন হাইওয়ে সিরিজ। “ঈশ্বর আমাদের হাইওয়ে দিয়েছেন/ স্টপেজ দিয়েছেন/ হোর্ডিং লাগিয়েছি আমরা ক’জন/মাঠপুকুর, খলিসাকোটা, কালীতলা…

আবার বলিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে, সচেতনভাবে ভারত আর ইন্ডিয়ার খেলাটাকে রংদার করে তোলার জন্যই, মিলিয়ে দিতে চান ক্রমাগত দুই ভাষাকে। কবিদের যা কাজ, নানা রকমের ক্ষমতাকাঠামোর ভেতরে ঘুণ ধরানো, তছনছ করা। সেইটে সার্থকভাবেই করতে চান , এখনো।

দেবাশিস দত্তের এই কবিতাটি খুঁজে পেয়ে যে কারণে আমি বেশি বেশি করে আন্দোলিত হই।

যে মিলন শালবনে ক্যারিব্যাগ ভরে রাখে চাঁদ

যে মিলন শালবনে ছড়ায় আঁধার, আঁধারে রেখেছে আলপিন

কেন্দুপাতার ঘরে সশস্ত্র যুবক চুরি করে চতুর্দশী রাত

যে মিলনে ইস্তেহার নয়, সাইনবোর্ড হয়েছে সম্রাট…

 

 

“……. একটা আস্ত শহর জ্বালিয়ে দেবার পর
গুনে গুনে ১১৭টা গর্ভবতী মেয়েকে হত্যা করার পর
এমনকী তাদের সমাধিস্থলটুকু নিশ্চিহ্ন করার পরও
ব্যস্ত ফুটপাতের মানুষজন কী অনায়াসে হেঁটে যাচ্ছে
হিপ্নোটাইজ্ড যুবক-যুবতী ঢুকে পড়ছে সাইবার কাফের
দরজা খুলে…..”
(হিংসার স্বপক্ষে কী কী বলা যায়/ অর্ণব সাহা)
কিংবা দেখছে…. একটা প্লেন একটা বিরাট উঁচু বাড়ির পেটের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে ; আর সেই বাড়িটার ভেঙে পড়া ধুলোয় কাশতে কাশতে এ দশক শিখে নিলো সমস্ত বাদ-কে সন্দেহ করতে। প্রায় সবকিছুকে
অস্বীকার করে চলে যাবার এক নিস্পৃহ আর ঠান্ডা শক্তি আছে তার। যূথবদ্ধতা থেকে দূরবর্তীতে তার অবস্থান চিহ্নিত করলো শূন্য। পাড়ায় পাড়ায় তৈরি হতে থাকলো ফ্ল্যাট। আমরা ৬৫ ডেসিবেলের ওপরে উঠে গাইতে থাকলাম— ‘এই একলা ঘর আমার দেশ/ আমার একলা থাকার অভ্যেস’।
এই দশক খুব individual diligence-এর সাথে কাজ করেছে। একসঙ্গে দলবেঁধে আমরা কবিতা লিখিনি। এটা ‘রাংতায় মোড়া যুগের অসুখ’ হতে পারে। আমি বলব এটাই এই সময়ের যাপনচিত্র। দেশে লিখব না বিদেশে এসব নিয়ে মাথা ঘামায়নি শূন্য। লেখাটা কোথায় ছাপা হচ্ছে সেটা ignore করেই just লিখে গেছে। দল করেনি, তাই দলাদলিও নেই। ‘নতুন কবিতা’র নতুনটাকে হৃদয়ে নিয়ে কবিতার শরীর পাল্টাতে থাকলো এই উত্তর-নতুন কবিতা পর্বে এসে। এবং আগেই বলেছি, এই কাজে শুধু শূন্যের ছেলেমেয়েরাই নয়, বরং ‘নতুন কবিতা’র অনেক কবি ও নব্বই দশকের অনেক কবিও সামিল। ২০০৪-০৫ নাগাদ সময় থেকে উত্তর-নতুন কবিতার (শূন্য দশকেরও) পাপড়িগুলো আস্তে আস্তে মেলতে থাকলো। কেন পথে হল দেরি? তার কারণ, আগের ধারার কিছু রেশ ও রসদ। দেখা গেল, কোনো আন্দোলন করে নয়, কোনো ক্যাম্প করে নয়, কোনো ম্যানিফেস্টো, কর্মসূচি করে নয়, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত প্রয়াসে এক একজন এক এক রকম ভাবে ব্যাপ্তি ও বিস্তার ঘটাতে থাকলেন— পুরোনো অনেক কিছুকে নবীকরণের মাধ্যমে এবং নতুন নতুন জানলার নির্মাণ ও তার গরাদ ভাঙার মাধ্যমে। দেখলে মনে হবে একঝাঁক ছেলেমেয়ে পিকনিক করতে এসছে। আর প্রত্যেকে নিজের নিজের খেলায় মশগুল। এরা ব্লগে কবিতা তুলে দিল। ফেসবুকে দিয়ে দিল সদ্য লেখা কবিতা। সেখানে গ্রুপ করল। সেখানেই আলোচনা করল। তর্ক করল। ই-বুক করল। এ লেখা যখন টাইপ করছি তখন অস্তনির্জন খবর দিচ্ছে পিডিএফ ম্যাগাজিনের। এবং শেষপর্যন্ত শূন্য কিন্তু কোনো জার্সি চাপালো না নিজের গায়ে। কোনো অনুশাসনে, কোনো শিবিরভুক্ত করতে চাইলো না নিজের কবিতাকে। যে কোনোরকম বিধিনিষেধের আওতার বাইরে দাঁড়ালো। অনেক খোলামেলা ভাবে এর প্রবণতা বিস্তারের দিকে। ‘ধারাকবিতা’, ‘নতুন কবিতা’ কোনো কিছুকেই একদম শেষ কথা ধ’রে না নিয়ে এই দশক নিজের মত ক’রে সেগুলোকে আত্তীকৃত ক’রে এগিয়েছে এবং এগোচ্ছে। এটা ঠিক যে, শূন্য দশকের শুরুর দিকে দু-চারজনকে বাদ দিলে বেশিরভাগ কবির লেখা আলাদা করে চেনা যেতনা। প্রত্যেক কবিই শুরুর দিনগুলোয় কারোর না কারোর একটা হাত ধরে ফেলেন। যাত্রাশুরুর দিনে ‘নতুন কবিতা’ প্রতিকবিতার হাত ধরেছিল। প্রত্যেক কবির একটা গ্রীনরুম থাকে। যেখানে সে তৈরি হয়। একইভাবে এই দশকের (শূন্য দশক) শুরুর দিকে আমরাও অনেকেই সেই জায়গা থেকেই ‘নতুন কবিতা’র চর্চা করেছি। কিন্তু, “I am not made like anyone… I have seen; I dare believe that I am not made like anyone in existence. If I am not better, at least I am different.” তাই নিজের স্বকীয় স্বর নির্মাণের basic human instinct থেকেই আমরা যাত্রাপথের ম্যাপটা নিজের নিজের মত করে বদলাতে থাকলাম। আজ তার পাপড়ি অনেক। আরো হবে। অনেক রং। অনেক গন্ধ। কোনো নির্দিষ্ট brand name বা লেবেল দিয়ে তাকে বোধহয় ডাকা যাবেনা। অনেক রকমের style of expression দেখা যাচ্ছে। কোনো ছুঁতমার্গ ছাড়াই। প্রত্যেকের আলাদা হাওয়া। আলাদা রুকস্যাক। সিঙ্গল হ্যান্ড জেনারেশন। এটা অনস্বীকার্য যে, ‘নতুন কবিতা’ না থাকলে আজকে আমার কবিতা এরকম হত না। ‘নতুন কবিতা’র প্রেরণাটা নিয়ে আমরা যে যার মত রাস্তা ধরলাম। এবং এটা দেখে ভালো লাগছে, উত্তর-নতুন কবিতার এই পর্বে এসে এই দশকের কবিতা তাকে (‘নতুন কবিতা’কে) অতিক্রম করে চলে যাচ্ছে। বেশ কিছুটা অস্বীকার করেও। ‘নতুন কবিতা’র কবিরা যে কবিতায় বিশ্বাসী, সময়ের ধর্ম অনুসারে আমার কবিতা সেই শিবিরভুক্ত হোক এটা আমি চাইনা। মনে হয় না আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই সময়ের কেউ সেটা চাইবেন। অন্যতম মূল্যবান দর্শন যেটা শিখেছি এই ধারা থেকে তা হল— পা রাখো জুতোর বাইরে। এটাই শূন্যের চেতনার পাসওয়ার্ড। ( অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়, এমা! ন্যাংটো! জার্সি নেই)

শূন্যের চেতনার সম্বন্ধে আমরা যা যা বলি ও ভাবি, সেগুলি সবই মনে হয় কোথাও গিয়ে জায়গা করে নেয় , এই শূন্য দশকের নিজস্ব কথনভঙ্গির ওপরও।  যে কথনভঙ্গিতে আছে বহুস্বরের পরিসর, আছে ই-মেলে ঈশ্বরের পদচিহ্ন। আছে, তথাকথিত দর্শনহীনতার ভেতরে, ছেতরে পড়া অনেকটা ঐশ্বর্য।

আমাদের কাছে উন্মোচিত হচ্ছে কবিতা, এখনো।

 

 

 

 

 

 

সত্যবতী : কাব্যে উপেক্ষিতা?

সেই কবে, একটি দ্বিপ্রাহরিক আড্ডা অথবা জমায়েতে, ব্যোমকেশের গুপ্তকথা ফাঁদা হইয়াছিল।* ফাঁদিয়াছিলেন ইন্দুবাবু ও ব্যোমকেশ স্বয়ং। তাঁহাদের বক্তব্য হইতে পরিস্ফুট হইয়াছিল, ব্যোমকেশের জন্ম খুব সহজে হয়নাই। সে ক্ষণজন্মা। না, তাহার কর্মকৃতিতে তো সে ক্ষণজন্মা প্রমাণ করিয়াই নিজেকে ছাড়িয়াছে। কিন্তু পুরুষকারবলেই শুধু নহে। বস্তুত তাহার স্রষ্টার অভিপ্রায়েই এমন কিছু একটা ছিল, যাহা তাহাকে অনন্যসাধারণ করিয়াছে।

ব্যোমকেশের আদিতে কী কী ছিল, বিশ্লেষণ করিতে গিয়া গুপ্তকথার রচয়িতারা ফাঁদিয়াছিলেন তাহার মূল কার্যকারণ, তাহার অস্তিত্বের রেজঁ-দে’ত্র ( raison d’etre)। সে চারিত্রের ভিতরে জমিয়া ছিল দু চারিটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য, এক , অন্ধকারের উপস্থিতি, দুই,  বৈপরিত্য, তিন, তাহার চরিত্রের এক আশ্চর্য পরিবর্তন, তাহার জীবনের এক সন্ধিক্ষণ, চিত্রচোরের সময় হইতে। আসলে দুই পর্বে বিভক্ত করাই যায় ব্যোমকেশ কাহিনিগুলিকে। এক শুরু হইতে ব্যোমকেশ ও বরদা পর্যন্ত একটি পর্ব। ব্যোমকেশ ও বরদার রচনাকাল ১৩৪৩। আর চিত্রচোরের রচনাকাল ১৩৫৮। অর্থাৎ দুই কাহিনির মধ্যে ফারাক ১৫ বৎসরের।

ইতিমধ্যে ব্যোমকেশ জীবনে একটা ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে, যাহার সম্বন্ধে প্রথমে কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা, প্রগাঢ় আবেগ ও আগ্রহ ও পরে চটুল রসসঞ্চার প্রতি পাঠকই অনুভব করিয়া থাকেন। তাহা অন্য কোন বাংলা ডিটেকটিভ কাহিনিতে সুপ্রতুল নহে। ইহা ব্যোমকেশের প্রেম ও বিবাহ।

দেখা যাক, গুপ্তকথার লেখকেরা এই বিষয়ে কি বলেনঃ

“মনে করে দেখুন, ব্যাচেলর হিসেবেই তাকে আমরা গোড়া থেকে পাই। সকলে বোধ হয় ধরেই নিয়েছিলাম যে অন্য ডিটেকটিভদের মত ব্যোমকেশও আজীবন কৌমার্য অবলম্বন করেই চলবে।…নিজের চরিত্রের অমোঘ নিয়মেই ব্যোমকেশ শেষ অব্দি প্রেমে পড়ে যায়। প্রথম পরিচয় থেকেই (যে) আপাতরসকষহীন ব্যোমকেশের কাছে সত্যবতী একটি পুঞ্জীভূত নাটকীয়তা, ও রোমান্সের পিন্ডরূপে উপস্থিত…সত্যবতীর প্রথম বৈশিষ্ট্য সে একজন সম্ভাব্য অপরাধী। বৃদ্ধ করালীবাবুকে হত্যা করার মোটিভ বাড়ির আর চারজন আশ্রিত যুবকের মত এই আশ্রিতা ও অনাথা মেয়েটিরও ছিল। এমনকি এও জানা যায় যে যে ছুঁচটি দিয়ে করালীবাবুকে হত্যা করা হয়, সেটি সত্যবতীর সেলাইয়ের বাক্সের মধ্যেই ছিল। এবং সে মিথ্যে কথা বলে ধরাও পড়ে যায়। অর্থাৎ খুনের অপরাধের আবহ পুঞ্জীভূত হয়ে উঠেছে সত্যবতীর চারিদিকে।“

*ব্যোমকেশের গুপ্তকথা  / তৃণাঞ্জন চক্রবর্তী ও যশোধরা রায়চৌধুরী, কড়ি ও কোমল পত্রিকা, ১৯৯৯

আসলে সত্যবতীর একটা এনিগমা আছে। যা, অর্থমনর্থমের একদম গোড়া থেকেই, ব্যোমকেশ স্রষ্টা ধরিয়ে দিয়েছেন। প্রথমত মেয়েটির “গায়ের রং ময়লা, লম্বা রোগা গোছের চেহারা”। ‘সুশ্রী কি কুশ্রী, বুঝিবার উপায় নাই।‘ “মাথার চুল রুক্ষ”

লক্ষ্যনীয়, প্রথম গল্প সত্যান্বেষীর সেই মেসবাড়ি, যেখানে ব্যোমকেশ আবিষ্কৃত হচ্ছে অজিতের চোখে, সে কিন্তু অতুল নামের এক অতিসাধারণ যুবকের ছদ্মবেশের আড়াল থেকে। মুখে চোখে বুদ্ধির ছাপ আছে, সুশ্রী সুগঠিত চেহারা, গায়ের রং ফরসা, হলেও, সে কিন্তু “সম্প্রতি কোন কষ্টে পড়িয়াছে, …বেশভূষার কোনও যত্ন নাই, চুলগুলি অবিন্যস্ত, গায়ের কামিজটা ময়লা, এমন কি পায়ের জুতাজোড়াও কালির অভাবে  রুক্ষভাব ধারণ করিয়াছে।“

অর্থাৎ , বিধাতার অদৃশ্য নির্দেশবশতঃ, ব্যোমকেশ ও সত্যবতী পাঠকের গোচরে আসিয়াছে একইপ্রকার অবস্থা বিপাকের প্রেক্ষিতে। তাহারা দুইজনেই রহস্যময়, প্রায় অজ্ঞাতকুলশীল, পিতৃমাতৃহীন। তাহাদের দেখিয়া বুঝিবার উপায় নাই তাহারা ভাল কি মন্দ, তাহারা সুশ্রী কি কুশ্রী। একটা গোলানো ধাঁধাভাবের অন্তরাল হইতেই তাহাদের আত্মউন্মোচন। একভাবে, স্রষ্টার ভিতরের অভিপ্রায় ও চিরকালীন একটা প্রশ্রয় এইরূপ, সাদাও নহে, কালও নহে চরিত্রের প্রতি বর্ষিত হইতেছে বলিয়াই বোধ হয়,  অতুলবেশী ব্যোমকেশ এবং সম্ভাব্য ক্রিমিনাল সত্যবতী দুইজনই এক ছাঁচে ঢালাই হইয়া আবির্ভূত হইলেন পাঠকের সম্মুখে।

ব্যক্তিত্বের কথাই যদি ধরা যায়, সত্যবতী কিন্তু তাহার ব্যক্তিত্বের অবয়ব নিয়াই আবির্ভূত হইয়াছে অর্থমনর্থমের প্রাঙ্গনে। লক্ষ্য করুন অজিতের বিবরণে “মেয়েটির গলায় একটু জিদের আভাস” ( যখন সে মিথ্যা বলিতেছে!)। “অস্পষ্ট অথচ বিদ্রোহপূর্ণ উত্তর”। ব্যোমকেশ বলিতেছে, “মেয়েটা ভয়ানক শক্ত, এমন মুখ টিপে রইলে, কিছুতেই মুখ খুললে না।“

আর , সুকুমার অ্যারেস্ট হয়ে যাবার পর, সত্যবতীর সেই আচমকা নাটকীয় আগমন,হ্যারিসন রোডের ব্যাচেলর কুঞ্জে। এমন সঘন নাটক সম্পূর্ণ অসংঘটিতপূর্ব। অজিতের বয়ানে, “আমাদের বৈচিত্রপূর্ণ জীবনেও এমন ব্যাপার পূর্বে কখনো ঘটে নাই।“ তারপরেই অসামান্য ভাষাবন্ধনে অজিত বলেঃ “সত্যবতীকে পূর্বে আমি একবারই দেখিয়াছিলাম, সাধারণ শিক্ষিত বাঙ্গালী মেয়ে হইতে সে যে আকারে –প্রকারে একটুও পৃথক, তাহা মনে হয় নাই। সুতরাং ঘোর বিপদের সময় সমস্ত শঙ্কাসঙ্কোচ লঙ্ঘন করিয়া সে যে আমাদের কাছে উপস্থিত হইতে পারে, ইহা যেমন অচিন্তনীয়, তেমনই বিস্ময়কর। বিপদ উপস্থিত হইলে অধিকাংশ বাঙালীর মেয়েই জড়বস্তু হইয়া পড়ে। তাই এই কৃশাঙ্গী কালো মেয়েটি আমার চক্ষে যেন সহসা একটা অপূর্ব অসামান্যতা লইয়া দেখা দিল। তাহার পায়ের মলিন জরির নাগরা হইতে রুক্ষ অযত্নসম্বৃত চুল পর্যন্ত যেন অনন্যসাধারণ বিশিষ্টতায় ভরপুর হইয়া উঠিল।“

পরস্পরবিরোধী শব্দের সমাহারে যেন বিপরীত গতির দুইটি প্রস্তরখন্ডের ধাক্কায় ফুলকি ছিটকাইয়া উঠিতেছে! একদিকে কৃশাঙ্গী কালো, অন্যদিকে অসামান্যতা। একদিকে রুক্ষ, অযত্নসম্বৃত, অন্যদিকে অনন্যসাধারণ, বিশিষ্টতা। ভাষার অপূর্ব মুনশিয়ানায় ব্যোমকেশের জনক তথা অজিত যেন কী এক ভোজবাজি সৃষ্টি করিলেন। সত্যবতী পাঠকের মনে চিরস্থায়ী আসন করিয়া নিল।

বাংলা ভাষায় কি এমন আর একটিও চরিত্র আছে যাহার ওপর সমস্ত বাংলা সাহিত্য পাঠকের এমন মমতা? বোধ হয় ব্যোমকেশ সত্যবতী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দম্পতি। ফার্স্ট কাপলও বলা যাইতে পারে। এত জনপ্রিয়, এত নিকট মানুষ আমাদের আর একটিও নাই।

সাহিত্যিক প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের কথাই ধরা যাউক। তিনি স্বনামধন্য, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম সুহৃদ। তাঁহার নিকট হইতে যে সার্টিফিকেট ব্যোমকেশ সত্যবতীর প্রাপ্তি হইয়াছিল তাহা যেন তুলনাহীন। আত্মজনের ন্যায় , বাস্তবের অধিক বাস্তবের ন্যায়, এই দম্পতির ব্যাপারে খুঁটিনাটি বিবরণ আলোচনা করিতেন প্রতুলবাবু।

“শার্লক হোমস কোনও মহিলার জন্য উদ্‌বেলিত-হৃদয় হয়েছেন, কিম্বা পোয়ারোর হৃদয় বিচলিত হয়েছে একথা ভাবা যায়না। কিন্তু সবাই একরকম নন।  লর্ড পিটার উইম্‌সিও আছেন।  একটি খুনের মামলা তদন্ত করতে গিয়ে একটি কৃশাঙ্গী কালো মেয়ের সঙ্গে ব্যোমকেশের দেখা হয়। মেয়েটির দাদাকে পুলিশ একটি মামলায় ভুল করে জড়িয়েছল। লর্ড পিটার উইম্‌সির সঙ্গে হ্যারিয়েট ডেনের পরিচয়ও একটি খুনের মামলাকে উপলক্ষ্য করে।

বিয়ের পরেও ব্যোমকেশ সত্যবতী হ্যারিসন রোডের মেসের তিনতলার অংশে কয়েক বছর বসবাস করেছিলেন। সঙ্গে অজিতও। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর কলকাতা শহরের চরিত্র বদলে গেল। হ্যারিসন রোড অঞ্চল তখন আর সত্যবতীর পছন্দ হবার কথা নয়। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার কয়েক বছর পর ব্যোমকেশ আর অজিত লেখের কাছে কেয়াতলায় এক টুকরো জমি কিনে বাড়ি করেছে। …অজিত তখন বইয়ের ব্যবসায় মন দিয়েছে। ব্যোমকেশের কাহিনি লিখে তার কিরকম আয় হত জানবার উপায় নেই। শরদিন্দুবাবুর জন্য সে রোজগারের পথও বন্ধ হয়েছে।  গল্প বলার ভঙ্গীরও একটু বদল হয়েছে। “

ইহা প্রতুলবাবুর বয়ানে ব্যোমকেশ সত্যবতীর জীবন কাহিনি। বাস্তবের জীবন হইয়তে কিছুমাত্র কম নহে।

প্রতুলবাবু আরো বিস্তারিত জানান, তিনি শরদিন্দুবাবুকে লিখিয়াছিলেন, কলকাতায় ট্যাক্সতির দুর্ভিক্ষ, কাজেই সত্যবতীর অসুবিধা হইতেছে। তাহাকে গাড়ি কিনিয়া দিতে হইবে। বাড়ি হইয়াছে এইবার গাড়ি। প্রতুলবাবু দেখিয়াছেন, বিয়ের নিমন্ত্রণে যাবে বলিয়া উহারা গোলপার্কের কাছে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। সত্যবতীর প্রসাধন বাসী হইয়াছে। কিন্তু শরদিন্দু এই ডিমান্ড মানেন নাই। বলিয়াছেন, বেচারা ব্যোমকেশ কোথা থেকে পাইবে , বরং একটা অটো রিক্সা কিনিয়া দিলে হয় উহাকে।

প্রতুলবাবু একের পর এক চিঠিতে শরদিন্দুকে পুণেতে পত্রাঘাত করিতেন। আর নানাভাবে তাঁহাকে অতিষ্ঠ করিতেন। একটি কালো শাড়ি পরা মেয়েকে তিনি নাকি দুঃস্বপ্নেও দেখিয়াছিলেন। সে ছুরি বার করিয়া তাঁহার নিস্তারের পথ একটি শিকড় কাটিয়া দিতেছিল। তাহার মুখ ক্ষণতরে দেখিয়াছিলেন, সে সত্যবতী।

আসলে সত্যবতীকে ঘিরিয়া জল্পনা কল্পনাটা তাঁহাদের অন্যতম পাসটাইম বলা যাইতে পারে।

তাঁহার একটি চিঠির উত্তরে শরদিন্দুবাবু লিখিয়াছিলেন, “ব্যোমকেশ আমাকে আনগ্রেটফুল ফাদার বলে তার করতে যাচ্ছিল জেনে ভীষণ রাগ হয়েছিল। ভেবেছিলাম ওকে ত্যাজ্যপুত্র করব, নেহাৎ সত্যবতীর কথা ভেবে নিরস্ত হয়েছি। মেয়েটা বড় ভাল। ভাগ্যদোষে অপাত্রে পড়েছে।  ওর কান্না আমিও দেখেছি। কাঁদলে ওকে বড় সুন্দর দেখায়।“

এইহেন সত্যবতীর জন্য বুক ফাটায় দোষ নাই। তাহাকে ভয় পাইতেও দোষ নাই। তবে কেন বলিব, সত্যবতী উপেক্ষিতা? কী কারণ?

১৩৪৩ হইতে ১৩৫৮, এই পনেরো বৎসরে ব্যোমকেশ চারিত্র্যের অনেক পরিবর্তন হইয়াছিল। নিঃসন্দেহে শরদিন্দু, মানে ব্যোমকেশ স্রষ্টার , কলকাতা ত্যাগ করিয়া মুম্বই ফিল্মের কাজে পুণে চলিয়া গিয়া স্থিতু হইবার সঙ্গে ইহার যোগ আছে। কিন্তু আরো কিছু কি আছে, যাহা ব্যোমকেশ ও সত্যবতীর প্রগাঢ় প্রেমের কাহিনিটিকে অন্য ভাবে মোচড় দিল? যাহার ফলে, আমাদের প্রিয় চরিত্র সত্যবতী অনেকটাই যেন জোলো ও অনুল্লেখ্য হইয়া পড়িবে ধীরে ধীরে? কেন্দ্রীয় চরিত্র হইতে হইয়া উঠিবে প্রান্তিক চরিত্র?

আসলে অর্থমনর্থমে ব্যোমকেশ অন্য অর্থে সত্য অনুসন্ধিৎসু হইয়া পড়ার ঠিক পর পর কয়েকটি কাহিনিতে সত্যবতীর অনুপস্থিতি বড় রহস্যময়। পীড়াদায়কও বটে। যে সত্যবতী সর্বদিক হইতে ব্যোমকেশের যোগ্য সহধর্মিনী, যাহার উৎস ব্যোমকেশের ন্যায়ই আপতিক, বিপদাপন্ন, যে ব্যোমকেশের মতই অনন্যসাধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন, প্রতিশ্রুতিময়, শিক্ষিত অথচ দুঃস্থ, তাহাকে আবার নবকলেবরে, অনেক পরে পুনরাবির্ভূত হইতে আমরা দেখিলাম, চিত্রচোরে। মধ্যবর্তী সময়ে , আশা জাগিয়াছিল, সে ব্যোমকেশের ন্যায় বিপুলকর্মার সুযোগ্য সহকারী হইয়া উঠিবে, অথবা মননশীল এক ভূমিকায় তাহার মিউজ বা উৎসাহপ্রদানকারিণী হইয়া উঠিবে। কিন্তু তাহা হইল না কেন?

চিত্রচোরে সত্যবতী একেবারে চিরকালীন গৃহবধূ। তাহার জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হইল, ব্যোমকেশের স্বাস্থ্যরক্ষা তথা যত্ন আত্তি।

শুধু তাই নহে, যে কোন সাধারণ বধূর ন্যায় সে স্বামীর সহিত কলহে ব্যাপৃত। কোথায় গেল তাহার অনন্যসাধারণতা, কোথায় গেল তাহার ব্যক্তিত্বের দ্যুতিময়তা। সে ঘোর দাম্পত্যকলহের বেড়াজালে জড়াইয়া রাখিয়াছে ব্যোমকেশকে। সেই কলহের বিবরণ আসল রহস্য কাহিনির ঝালরমাত্র । তাহা বিনোদনের উপরে বিনোদন প্রদান করে, বোঝার ওপর শাকের আঁটির ন্যায় গুরুতর ঝঞ্ঝাটের ওপরে সুখপ্রদ রসবোধ বা হিউমারের প্রলেপ লাগায়।

“সত্যবতী ব্যোমকেশের পায়ের দিকে একটা কটাক্ষপাত করিয়া তীক্ষ্ণস্বরে বলিল, যার রোগা শরীর তার মোজা পায়ে দিয়ে বাইরে যাওয়া উচিত। বলিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়া গেল।

আমি হাসি চাপিতে না পারিয়া বারান্দায় গিয়া দাঁড়াইলাম। কয়েক মিনিট পরে ব্যোমকেশ বাহির হইয়া আসিল। তাহার ললাটে গভীর ভ্রুকুটি, কিন্তু পায়ে মোজা।“

চিরকালীন এক চিত্র। যে অবস্থায় পুরুষ নারীর নিকটে চির “পরাধীন” সেই সেবার পরিমন্ডলে, ব্যোমকেশ সত্যবতীর নিকটে পরাজিত হইবেই। এই পরাজয় আসলে ছদ্ম পরাজয়। ইহার সহিত আসিবে ব্যোমকেশের ঘুষ দিয়া স্ত্রীর মন জয় করিবার জন্য এসেন্সের শিশি কেনা। আর , দুই তিনটি গল্পের পরেই, খোকা হইবার “সুসংবাদ” প্রাপ্ত হইবে। কেননা, ওই কাহিনিতে  সত্যবতীকে নিরাপদ সন্তানপ্রসবের জন্য সুবিধাজনকভাবে সুকুমারের কাছে পাঠাইয়া দেওয়া হইবে। ব্যোমকেশ অজিতেরও সময় হইল বাহিরে গিয়া দুর্গরহস্যের সমাধান করার। গল্পের পরতে পরতে সত্যবতীর সেই “আদি ও অকৃত্রিম ভারতীয় নারী” সুলভ চিত্রণে, আমরাও বুঝিব, এখন তাহার সসম্মান ঠাঁই হইয়াছে গল্পের কেন্দ্রভূমি হইতে মার্জিনে, সে এখন রোমহর্ষক দুর্গরহস্যকাহিনির ফুটনোট হইয়া উঠিবে।

“একদিন কার্তিকমাসের সকাল বেলায় ব্যোমকেশ ও আমি আমাদের হ্যারিসন রোডের বাসায় ডিম্ব সহযোগে চা –পান শেষ করিয়া খবরের কাগজ লইয়া বসিয়াছিলাম। সত্যবতী বাড়ির ভিতর গৃহকর্মে নিযুক্ত ছিল”… এই হইতে শুরু করিয়া, যখন পুরন্দর পান্ডের অনুরোধে পাহাড়ঘেরা সাঁওতাল পরগণায় আবার যাইবার উপক্রম হইল, তখন “(সত্যবতীকে) এ অবস্থায় কোথাও নিয়ে যাওয়া চলে না…।“ “কিন্তু ও যদি যেতে চায়? কিম্বা যদি তোমাকে ছাড়তে না চায়?…” ইত্যাকার আলোচনায়, অজিত ব্যোমকেশকে মুক্তিদান করিতে “সত্যবতী প্রবেশ করিল। অবস্থাবশে তাহার মুখখানি শুকাইয়া গিয়াছে, দেহাকৃতি ডিম-ভরা কৈ মাছের মত। সে আসিয়া একটা চেয়ার থপ্‌ করিয়া বসিয়া পড়িল। আমরা নীরব রহিলাম। সত্যবতী তখন ক্লান্তিভরে বলিল, ‘আমাকে দাদার কাছে পাঠিয়ে দাও। এখানে আর ভাল লাগছে না।‘ ব্যোমকেশের সহিত আমার চোখে চোখে বার্তা বিনিময় হইয়া গেল। সে বলিল, “ভাল লাগছে না! ভাল লাগছে না কেন?’ সত্যবতী উত্তাপহীন স্বরে বলিল, ‘তোমাদের আর সহ্য হচ্ছে না। দেখছি আর রাগ হচ্ছে।‘ … ইহা নিশ্চয়ই এই সময়ের একটা লক্ষণ, নচেৎ আমাদের দেখিয়া রাগ হইবার কোনও কারণ নাই। ব্যোমকেশ একটা ব্যথিত নিশ্বাস ফেলিয়া বলিল, “যাও তাহলে, আটকাব না। অজিত তোমাকে সুকুমারের ওখানে পৌঁছে দিয়ে আসুক। – আর আমরাও না হয় এই ফাঁকে কোথাও ঘুরে আসি।“

এই পর্বেই সেই জলবিভাজিকা রচিত হইল। ইহার পর খোকার নিরিখে ছাড়া সত্যবতীকে দেখা যাইবে না। ঘ্যানঘেনে অভিযোগকারিণী স্ত্রী, বাড়ি গাড়ির দাবি, “আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে”র দাবি ইত্যাকার নানা দাবিতে সদা সর্বদা স্বামীকে চাপে রাখা “টিপিক্যাল” স্ত্রী হইয়া উঠিবে সে। তাহার অবস্থান এইবার সত্যসত্যই পর্দার আড়ালে।

সূক্ষ্ম রসবোধ, নারীর প্রতি সামান্য অবজ্ঞা, এবং পারিবারিক জীবনের প্রতি কিঞ্চিত ঔদাসিন্যময় তির্যক নেত্রাভিক্ষেপ… এই হইবে মূল আধার। কাহিনির মূল পর্বের সহিত চুলপরিমাণ সম্পর্ক থাকিবে সত্যবতীর।

ইহার কারণ কী? খুঁজিতে বসিয়া দেখি, যেন সমস্ত বিষয়টিতেই লাগিয়া আছে এক বীক্ষণের ঘোর। যে বীক্ষণ, ব্যোমকেশের জীবনের অন্য পরিবর্তনগুলির মতই ( যেমন পুলিশের সঙ্গে তাহার সম্পর্কের পরিবর্তন, তাহার বাড়ি বানানো, অজিতের ব্যবসা করা)  তাহার পরাধীন ভারতের এক বিদ্রোহী প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও অন্ধকার-সহোদর প্রান্তিক মানুষ হইতে অতি প্রাতিষ্ঠানিক এক নব্যবাবু, স্বাধীন ভারতের সরকারের সহিত হাতে হাত মিলাইয়া চলা সফল ব্যক্তিতে পরিণত হইবার ফল। ( এ বিষয়ে গুপ্তকথাটি আর একবার স্মর্তব্য। ) যে বীক্ষণ  “নারী এক কল্যাণময়ী গৃহশোভামাত্র”  , বা ‘ পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’-র মূলস্রোতের দর্শনকেই ফুলমার্ক্স দিয়া চলে।

হয়ত বা, ব্যোমকেশের জনপ্রিয়তা এবং ভারতের স্বাধীনতা , দুইয়ের বিষময় ফল ফলিয়াছে সত্যবতী চরিত্রের উপরে। আমাদের নিকটে এক তেজস্বিনী কেন্দ্রীয় চরিত্রের অবসান ঘটিয়াছে কেবলই প্রান্তীয় এক “রমণী-জননী” কম্বো উপস্থিতির বিনোদনে।

এ প্রসঙ্গে অনিন্দ্যসুন্দর চক্রবর্তীর মুক্তমনা বাংলা ব্লগে প্রকাশিত একটি রচনা পাঠককে পড়িতে বলিব। লেখাটি নারীবিষয়ে ব্যোমকেশ ও অজিতের সর্বাঙ্গীন বিচারধারা সম্পর্কিত একটি মেধাবী আলোচনা। পাইবেন এইস্থলে- https://blog.mukto-mona.com/2016/08/24/49329/